০৭ মে, “লাহিড়ীরহাট গণহত্যা” দিবস

০৭ মে, রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বেদনা বিধুর দিন, “লাহিড়ীরহাট গণহত্যা” দিবস। ১৯৭১ এর এই দিনে রংপুর শহরতলীর লাহিড়ীরহাটে এক বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায় পাক হানাদার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশের মতো রংপুরেও পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্বিচারে হত্যা করেছে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। রংপুর জেলার চিহ্নিত গণহত্যার স্থানগুলোতে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো। তেমনই একটি বর্বর গণহত্যা চালানো হয় লাহিড়ীরহাট এলাকায় যা রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে “লাহিড়ীরহাট গণহত্যা” নামে পরিচিত। জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসল্লিদের নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকের দল। আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি লাহিড়ীরহাট গণহত্যার শিকার সেই সব বীর শহীদদের।

লাহিড়ীরহাট গণহত্যা :

১৯৭১ সালের ৭ মে রংপুরবাসী প্রত্যক্ষ করলো ধর্মের রক্ষক দাবীদার ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। দিনটি ছিল শুক্রবার। সময় আনুমানিক দুপুর দুইটা। মাত্রই জুম্মার নামাজ শেষ হয়েছে রংপুর শহর থেকে প্রায় ১৪ কিমি দূরে লাহিড়ীরহাট (স্থানীয়ভাবে বলা হয় নারীরহাট) মসজিদে। এমন সময় মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ালো পাক হানাদার বাহিনীর ৪টি ট্রাক। সারা বাংলায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সদস্যরা তখন বাঙালি হত্যায় মরিয়া হয়ে নেমে পড়েছে। তাই পাক বাহিনীর ট্রাক দেখেই মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসল্লিরা প্রাণভয়ে ছুটতে থাকলেন যে যে পাশে পারেন। কিন্তু রক্তের হোলি খেলায় মত্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে ফেললো ৩২ জন নিরীহ মুসল্লিকে। হাত পিঠমোড়া করে বেঁধে এলোপাথাড়ি মারধোর করতে করতে মুসল্লিদের নিয়ে যাওয়া হয় লাহিড়ীরহাট পুকুরপাড়ে। দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় সারিবদ্ধভাবে। মুহূর্তেই গর্জে উঠলো হানাদারদের অস্ত্র। গুলি করে হত্যা করা হলো সকল মুসল্লিকেই। নিজেদের মুসলমান হিসেবে দাবি করা পাকিস্তানি হানাদারদের এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকা জনমানবশূন্য হয়ে যায়। প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় এলাকাবাসী। ৩২ জন মুসল্লির লাশ পড়ে থাকে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে। সেদিন লাশ দাফন করার মতো এলাকায় ছিল না কোনো মানুষ। মুসল্লিদের লাশের পাশে বসে কোরান তেলাওয়াত করেনি কেউ । কাফন পরানো হয়নি সেই শহীদদের।

সেদিনের সেই বর্বরতায় শহীদদের সকলের পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পরে তেমন কোন উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়নি। তাই আজ ৪২ বছর পরেও জানা সম্ভব হয়নি সেই সকল শহীদদের অনেকেরই পরিচয়।

রংপুরের মুক্তিযোদ্ধারা তৃণমূল পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে যাদের পরিচয় পেয়েছেন তারা হলেন –

১) আবেদ আলী সরকারের পুত্র মনোয়ার হোসেন বেণু (রংপুরের শহরের রাধাবল্লভ)
২) শমসের আলী পেয়াদার পুত্র নওয়াব আলী বাপাত (সাতগাড়া মিস্ত্রীপাড়া)
৩) আব্দুল মজিদের পুত্র আব্দুল করিম (পীরজাবাদ)
৪) শমসের আলী পানাতির পুত্র আজগর আলী (দামোদরপুর)
৫)আমীর উল্লাহ শাহের পুত্র শাহ্‌ সেকেন্দার আলী (দামোদরপুর)
৬) সেকেন্দার আলীর পুত্র মিন্টু মিয়া (দামোদরপুর)
৭) নয়া মিয়া প্রেসিডেন্টের পুত্র শাহ্‌ মোঃ নূরল আনাম (দামোদরপুর)
৮) খোদাবকস্ মৌলভীর পুত্র মোঃ আজহার আলী (দামোদরপুর)
৯) মোঃ আমিন-এর পুত্র মোঃ আজগর আলী (দেওডোবা বড়বাড়ি)
১০) মহির উদ্দিনের পুত্র মোঃ মনসুর আলী (দেওডোবা বড়বাড়ি)
১১) খট্টু শেখের পুত্র মোঃ আব্দুল জব্বার মিয়া (দেওডোবা বড়বাড়ি)
১২) নছির উদ্দিনের পুত্র আব্দুস সাত্তার (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৩) বাতাসু মিয়ার পুত্র মোঃ মোফাজ্জল হোসেন (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৪) আব্দুল মুকিতের পুত্র মোঃ নবানু মিয়া (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৫) মোঃ কান্দুরা মিয়ার পুত্র মোঃ আব্দুল আজিজ (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৬) খোকা মামুদের পুত্র মোঃ এসরাতউল্লাহ (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৭) মোঃ আব্দুল গফুরের পুত্র মোঃ নূরুল ইসলাম (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৮) করিম উদ্দিন মুন্সীর পুত্র মোঃ আব্দুস সোবহান (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
১৯) মোঃ আলিম উদ্দিনের পুত্র মোঃ ইয়াসিন আলী (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
২০) মোঃ আলিম উদ্দিনের পুত্র মোঃ সোলায়মান মিয়া (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
২১) হাছেন আলীর পুত্র মোঃ আব্দুর রাজ্জাক (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
২২) মিয়াজন মিয়ার পুত্র মোঃ মনসুর আলী (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
২৩) শহর উদ্দিনের পুত্র মোঃ লুৎফর রহমান (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)
২৪) আব্দুল জব্বারের পুত্র আব্দুর রহিম (ন্যাকাড়টারী বড়বাড়ি)। অন্য শহীদের পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমি :

লাহিড়ীর হাট বধ্যভূমি রংপুরের প্রধান বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম। রংপুর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে রংপুর-বদরগঞ্জ সড়কের পাশে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমির অবস্থান। এই বধ্যভূমিতে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের মতোই চরম অবহেলায় এখনও দখলদারদের দখলে রয়েছে এ বধ্যভূমি। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও মূল বধ্যভূমির জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। সামান্য একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে লাহিড়ীর হাট-শ্যামপুর রোডের পাশে একটি অংশে। এ ছাড়া কোনো কিছুরই চিহ্ন নেই সেখানে। স্থানীয়দের দাবি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা হয়েছে তার স্মারক বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সেই সময়কে মনে রাখবে, শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে ধরে রাখতেই আগামী প্রজন্মের জন্য এই সব বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। রংপুরের গণমানুষের দাবী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও শত শহীদের আত্মবলিদানের যে স্মৃতিগুলো এখনও অবশিষ্ট রয়েছে সেই সব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। জেলার প্রতিটি বধ্যভূমিতে একটি করে কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হোক। সরকারীভাবে এখনই উদ্যোগ না নেয়া হলে হয়তো আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না এখানে কেমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিলেন তাদের পূর্বসূরি নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।

১৫ thoughts on “০৭ মে, “লাহিড়ীরহাট গণহত্যা” দিবস

  1. এরাই নাকি প্রকৃত মুসলমান!
    এরাই নাকি প্রকৃত মুসলমান! ইসলাম রক্ষার মিশনে নামছিল। আর শুয়োরের পালের সহযোগী জামাত আজও দাবী করে একাত্তরে ওরা শুধু ধর্মের কারনে পাকিদের সহায়তা করছিলো। সেই একই কাহিনী আজও ঘটে চলেছে এই দেশে ধর্মের নাম দিয়ে চলছে স্বার্থ সিদ্ধি।

    রংপুরের এই নারকীয় হত্যাজজ্ঞ সম্পর্কে জানা ছিলোনা। দেশের আনাচে কানাচে এমন কতো যে হত্যাজজ্ঞের ঘটনা আছে কে জানে? আমরা আমাদের ইতিহাসটাও সঠিক ভাবে লিখে যেতে পারলাম না। আপনাকে ধন্যবাদ ভাই, রংপুরের এই বধ্যভূমির ইতিহাস জানানোর জন্য।

    1. ধন্যবাদ আতিক ভাই। রংপুরের সব
      ধন্যবাদ আতিক ভাই। রংপুরের সব বধ্যভূমিগুলো (কমপক্ষে ১৪টা) নিয়ে পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা আছে।

      1. দারুণ একটা কাজ হবে ভাই।
        দারুণ একটা কাজ হবে ভাই। অপেক্ষায় রইলাম আপনার সিরিজ পোস্টের। আর সবগুলো পর্ব দেওয়া হলে সেটা নিয়ে ইস্টিশনের ই-বুক কর্নার থেকে একটা ই-বুক করা যায় কিনা আপনাকে এবং ইস্টিশন মাস্টারকে অনুরোধ জানালাম। ভালো একটা সংগ্রহ হবে নিঃসন্দেহে।

        1. ধন্যবাদ ভাই। খুব বেশী
          ধন্যবাদ ভাই। খুব বেশী অপেক্ষায় থাকতে হবে না। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

  2. আফসোস যে দেশীয় রাজাকারদের
    আফসোস যে দেশীয় রাজাকারদের শাস্তি দিতে পারতেছি, কিন্তু পাকিস্তানী সেই কুত্তা, যারা এসব কাজ করেছে, আর তাদের নিরদেশদাতা সেইসব পাকিস্তানী সেনাবাহীনির মাথাদের কিছুই করতে পারি নাই আমরা।

    বাংলাদেশের উচিত ছিল, যতদিন সেসব বর্বর পাকিস্তানীর বিচার ও শাস্তি না হয়, ততদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে না যাওয়া। কিন্তু, সেটা আর হলো কই।

  3. ইস্টিশন কর্তৃপক্ষের বরাবরে
    ইস্টিশন কর্তৃপক্ষের বরাবরে একটা অনুরোধ থাকবে- যথোপযুক্ত তথ্য সম্বলিত এসব মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক পোষ্টগুলো (ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত পোষ্টগুলো সহ) সংকলন করে একটা আর্কাইভ করে পরবর্তীতে সেটা ই-বুক আকারে বের করুন। আর আপনাদের তো একটা ই-বুক স্টোর আছেই। সেখান থেকে সেটা প্রকাশ করে বিনামূল্যে সংগ্রহের সুযোগ করে দিন। নতুন প্রজন্মকে বাঙলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর জন্য এটা একটা ভালো উদ্যোগ হতে পারে।

    চমৎকার এই পোষ্টের জন্য উত্তর বাংলাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  4. এদের বিচার নিয়েও এখন দেখি
    এদের বিচার নিয়েও এখন দেখি সরকার রাজনীতি করছে,আর একটারও ফাসি হয় না কেন?????

    1. আমি বিশ্বাস করতে চাইনা সরকার
      আমি বিশ্বাস করতে চাইনা সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যূতে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করছে। কিন্তু রায় ঘোষণার দীর্ঘসুত্রিতা এবং সমসাময়িক ঘটনাবলি সেই বিশ্বাসের মূলে সন্দেহের সৃষ্টি করছে। তারপরেও প্রত্যাশা থাকবে যত দ্রুত সম্ভব বিচার কাজ সমাপ্ত ও রায় বাস্তবায়নের। আপনাকে ধন্যবাদ। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

  5. হানাদার আর তাদের দেশের
    হানাদার আর তাদের দেশের রাজাকারারা যে কত বড় জানোয়ার ছিল সেটা আমি ভাল করে জানি। তারা ধর্ম রক্ষার নামে আমাদের মা-বোনকে তুলে নিয়েছিল। প্রকৃতির বিচার ধীরে হয় এবং তা খুব নিষ্ঠুর। এখন কি রাজাকার আর তাদের উত্তরসূরিদের অবস্থা কি ৭১ এ আমরা যেমন নিরাপত্তাহীন ছিলাম, ঠিক তেমনই হবে????

    1. এখন কি রাজাকার আর তাদের

      এখন কি রাজাকার আর তাদের উত্তরসূরিদের অবস্থা কি ৭১ এ আমরা যেমন নিরাপত্তাহীন ছিলাম, ঠিক তেমনই হবে????

      এমনই তো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা দেখছি কই?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *