এলিস মুনরোর জীবন ও সাহিত্যকর্ম

সাহিত্য জগতে এলিস মুনরো নামে সর্বাধিক পরিচিত এলিস অ্যান লেডল ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই কানাডার অন্টারিও প্রদেশের উইংগহ্যাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা এরিক রবার্ট লেডল ছিলেন সংগতি সম্পন্ন কৃষক, তার ছিল খেঁকশিয়ালের খামার আর মা এন চ্যামনি লেডল স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এলিস মুনরো সেখানকার নিরিবিলি ও শান্ত গ্রাম্য পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেন। এলিস এখানকার স্কুলে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চলে যান পশ্চিম অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার উপরে পড়াশুনা করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়েই তিনি রেঁস্তোরার পরিচারিকা, ক্ষেতে তামাক পাতা তোলার কাজ, লাইব্রেরীর কেরানি ইত্যাদি নানা ধরনের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।



সাহিত্য জগতে এলিস মুনরো নামে সর্বাধিক পরিচিত এলিস অ্যান লেডল ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই কানাডার অন্টারিও প্রদেশের উইংগহ্যাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা এরিক রবার্ট লেডল ছিলেন সংগতি সম্পন্ন কৃষক, তার ছিল খেঁকশিয়ালের খামার আর মা এন চ্যামনি লেডল স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এলিস মুনরো সেখানকার নিরিবিলি ও শান্ত গ্রাম্য পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেন। এলিস এখানকার স্কুলে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চলে যান পশ্চিম অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার উপরে পড়াশুনা করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়েই তিনি রেঁস্তোরার পরিচারিকা, ক্ষেতে তামাক পাতা তোলার কাজ, লাইব্রেরীর কেরানি ইত্যাদি নানা ধরনের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই ১৯৫১ সালের ২৯ ডিসেম্বর মাত্র ২০ বছর বয়সে সহপাঠি জেমস আর্মস্ট্রং মুনরোকে বিয়ে করেন এবং লেখাপড়া শেষ না করেই কলেজ ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন ভ্যানকুভারে। এই ভ্যানকুবারে চলে আসাকে তিনি বিয়ের একটি বড় অভিযান বলে মনে করেন। সেখানে জেমস চাকরী করতেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এবং এলিস বাড়িতে বসে লিখতেন। ১৯৬৩ সালে মুনরো দম্পত্তি ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের ভিক্টোরিয়াতে চলে যান। সেখানে তারা একটি বইয়ের দোকান খোলেন, মুনরো বুকস নামের সেই বইয়ের দোকানটি আজও চলছে। ১৯৭২ সালে এলিস-জেমস দম্পতিটির বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৯৭৬ সালে তিনি গেরাল্ড ফ্রেমলিনকে বিয়ে করেন। তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ক্লিনটন নামের একটি ছোট শহরে।
এলিস তিন কন্যার জননী। ১৯৫৩ সালের অক্টোবর মাসে তার ২১ বছর বয়সে মেয়ে শিলা মার্গারেট মুনরো জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া ক্যাথরিন জন্মের মাত্র পনের ঘন্টা পরেই মারা যান। তৃতীয় কন্যা জেনী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৭ সালে। চতুর্থ কন্যা আন্দ্রেয়ার জন্ম ১৯৬৬ সালে ২০০২ সালে। প্রথম কন্যা শীলা মুনরো তার শৈশব স্মৃতি প্রকাশ করেন “মা ও মেয়ের জীবনঃ এলিস মুনরোর সঙ্গে বড় হওয়া” গ্রন্থে।
সুইডিশ একাডেমী ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর সাহিত্যে ১১০তম নোবেল পুরষ্কারটি ঘোষণা করেন। এবার এই পুরষ্কারটি চলে যায় কানাডার ৮২ বয়সী কথা সাহিত্যিক এলিস মুনরোর হাতে। কানাডার সময় ভোর চারটার সময় যখন নোবেল পুরষ্কার ঘোষিত হয় তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তার মেয়ে তাকে ফোন করে খবরটি পৌঁছে দেয়। এর কিছুক্ষণ পর কানাডার রেডিও বিবিসি সাংবাদিক যখন তাকে বলেন, আপনি ত্রয়োদশ নারী সাহিত্যিক হিসেবে পুরষ্কারটি পেয়েছেন তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠেন এবং ক্ষুন্ন কন্ঠে বলেন, “এটা কি করে সম্ভব, এটা খুবই ভয়াবহ একটা ব্যাপার, আমরা নারী মাত্র ১৩ জন!” নোবেল কমিটির প্রেস রিলিজে তাকে সমকালীন ছোট গল্পের মাস্টার হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়, তিনি খুব সাজিয়ে গল্প বলতে পারেন। তার গল্পের বিষয়বস্তু বাস্তববাদী। তার গল্পে নাটকীয়তার মারপ্যাচ নেই, যা আছে তা হল নারী-পুরুষ সম্পর্ক, মফস্বল শহরের জীবনযাত্রা, দুই প্রজন্মের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব, আবেগের টানাপোড়েন। ছোট গল্পের দক্ষ স্রষ্টা তিনি; সমসাময়িক লেখকদের থেকে অনেক উপরে তার স্থান। তার গল্পে রুশ বাস্তববাদী কথা-সাহিত্যিক আন্তন চেখভের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বিধায় সিনথিয়া ওজিক তাকে অভিহিত করেছেন একালের কানাডার চেখভ হিসেবে।
তার গল্পের চরিত্ররা উঠে আসে সাধারণ মানুষের কাতার থেকে। তার প্রায় সব গল্পই গড়ে উঠেছে গ্রামাঞ্চলের ছায়া ঘেরা পরিবেশকে ঘিরে। গল্পের শিল্প উপাদান খুঁজতে অন্য বড় লেখকদের মত বিশ্ব ভ্রমণে বের হননি। রবীন্দ্রনাথের কথার সুর ধরে বলা যায়, ঘর হতে শুধু দু-পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপর দুইটি শিশির বিন্দু নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছেন। জীবন, মৃত্যু, প্রেম, বিরহ এগুলোই তার লেখার মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নোবেল প্রাপ্তির সংবাদ পেয়ে মনের অনুভূতি ব্যাক্ত করলেন- “আমি আশ করছি পুরষ্কারটি ছোট গল্পকে মানুষজনের সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে তুলে ধরবে, শুধু এরকম কিছু নয় যা তুমি উপন্যাসে প্রবেশের আগে লেখলে।”
ছোট গল্পের অনেক বড় মাপের একজন শিল্পী তিনি; সাহিত্য জগতে ছোট গল্প নামে যে ধারাটি আধুনিক ব্যস্ত মানুষের জীবনে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দিনদিন, তিনি সে ধারার একজন নিষ্ঠাবান লেখক। এলিস মুনরোর সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মধ্য দিয়ে ছোট গল্প তার অনেক দিনের বঞ্চণা কাটিয়ে সাহিত্য অঙ্গনের সামনের কাতারে চলে এল। এর পূর্বে নোবেল কমিটি ছোট গল্পকে যেন ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চান নি। নোবেল কমিটির সেই বদনাম এবার ঘুচে গেল। ছোট গল্প লেখার পাশাপাশি তিনি কবিতাও লেখছেন তবে এ পর্যন্ত উপন্যাস লেখা হয়ে উঠেনি। তবে উপন্যাসই তিনি লেখতে চেয়েছিলেন। অধিকাংশ লেখাই শুরু করেন উপন্যাসের লেখার কথা চিন্তা করে-উপন্যাসের মত করেই এগোতে শুরু করেন। তবে সামনে এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারেন এটা আর উপন্যাস হয়ে উঠছে না। তার বয়স কম থাকা অবস্থায় ছোট গল্প লেখাটাই তার জন্য সুবিধাজনক ছিল। নিজের ছোট ছোট সন্তান ছিল, সহযোগিতা করার মত কেউ ছিল না। উপন্যাস লেখার জন্য যে অখন্ড সময়ের দরকার তা তার ছিল না। সবসময় শঙ্কায় থাকতেন সামনে হয়ত এমন কিছু ঘটে যাবে যাতে করে উপন্যাস লেখার সময় আর পাবেন না। এর ফলে এমন কিছু লেখাই অব্যাহত রাখেন যা খুব কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এভাবেই তিনি ছোট গল্পের মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। সারা জীবন ধরে ছোট গল্প লেখা তার কাছে ছিল উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি, তবে উপন্যাস লেখা আর হয়ে উঠেনি।
মাত্র এগারো বছর বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লেখক হবেন। সেভাবেই তিনি এগিয়ে গেছেন। এরপর সারাজীবনে একমুহূর্তের জন্যও এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ান নি। অক্লান্ত ভাবে শুধু লেখেই চলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়েই তার গল্প প্রথমে কলেজ সাময়িকী ও পরে বিভিন্ন বিখ্যাত সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে ঐ জীবনেই তাকে খ্যাতি এনে দিতে থাকে। তার প্রথম গল্প ছায়ার পরিমাপগুলো প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। তার মোট গল্পগ্রন্থের সংখ্যা সতেরটি। এই ৮২ বছরের জীবনে অসংখ্য গল্প লিখেছেন- প্রতি তিন-চার বছরে একটি করে গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে তার। এ পর্যন্ত প্রকাশ হওয়া তার গল্প গ্রন্থগুলো হল- আনন্দময় ছায়াদের নৃত্য (১৯৬৮), মেয়েদের আর নারীদের জীবন(১৯৭১), কিছু কথা তোমাকে বলতে চেয়েছি(১৯৭৪), তুমি নিজেকে কি মনে কর(১৯৭৮), বৃহস্পতির চাঁদেরা(১৯৮৩), প্রেমের অগ্রগতি(১৯৮৬), আমার যৌবনকালের বন্ধুরা(১৯৯০), মুক্ত গোপনীয়তা(১৯৯৪), নিষ্ঠাবান নারীর প্রেম(১৯৯৮) ও রানওয়ে(২০০৪), অনেক বেশী সুখ(২০০৯) ও অন্যান্য। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তার সাম্প্রতিকতম আত্মজীবনীমূলক গল্পগ্রন্থ প্রিয় জীবন।
১৯৬৮ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ আনন্দময় ছায়াদের নৃত্য কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরষ্কার গভর্নর জেনারেল অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। তার এই প্রথম গল্পগ্রন্থটি কানাডার পাঠক মহলে বেশ আলোড়নও তৈরী করেছিল। তিনি মোট তিনবার তার দেশের ঐ সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরুষ্কারটি জেতেন। নোবেল পুরুষ্কারের ঠিক নিচেই যার অবস্থান বলে ধারনা করা হয় সেই ম্যান বুকার প্রাইজ পান ২০০৯ সালে। ২০০১ সালে প্রকাশিত হেইটশিপ, ফ্রেন্ডশিপ, কোর্টশিপ, লাভশিপ, ম্যারেজ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। এওয়ে ফ্রম হার শিরোনামে ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন নির্মাতা সারাহ পলি, চলচ্চিত্রটি অস্কার পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পেয়েছিল।
নিজের লেখা গল্প পরবর্তিতে মাঝে পরিমার্জন করলেও পরে বুঝতে পেরেছেন কাজটি ভুল হচ্ছে কারন সংশোধন করার সময়ে তো গল্প লেখাকালীন সময়ের ছন্দটি আর থাকে না।
১৯৯৭ সাল থেকে কম্পিউটার ব্যাবহার করেন, তবুও একটি বা দুটি খসরা হাতেই করে নেন, তারপরে আসেন কি-বোর্ডে। একটি গল্প শুরু থেকে শেষ করা পর্যন্ত তার নূন্যতম দুই মাস সময় লাগে। তবে তার অধিকাংশ গল্প সাত-আট মাস আগে শেষ করতে পারেন না। খসরা আকারে লেখার পর নানা ধরনের অনেক পরিবর্তন সাধন করেন, মাঝে গল্পের গতিপথও তাকে বদলে দিতে হয়। খুব বেশী সমস্যায় পড়ে না গেলে এই বিশ্বনন্দিত গল্পকার প্রায় প্রতিদিনই লেখতে পছন্দ করেন। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠেই লেখতে বসেন। বাস্তবের কঠোর জীবনের ছোঁয়া পাবার আগেই দু-তিন ঘন্টা লেখে ফেলেন।
সাহিত্য জগতে প্রবেশ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন পরিবার থেকেই। এলিস মুনরোর বাবা মৃত্যুর আগে একটা বই লেখে গেছেন- একটি উপন্যাস। তার বাবাকে খুব কম বয়সেই কৃষিতে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য নেমে পড়তে হয় বিধায় লেখতে পারেন নি, তবে জীবনের শেষদিকে এসে বই লেখার সিদ্ধান্তে অটল হন ও লিখে ফেলেন।
সারা জীবন ধরে অক্লান্ত বিরামহীনভাবে লেখেই চলেছেন তিনি। যে আমলে নারীরা সন্তান লালন-পালন ছাড়া আর কিছুই করত না- সেই সময় থেকেই লেখতে শুরু করেন। জীবনের এই শেষ বয়সে এসে ক্লান্তি বোধ করেন। তবে এটাকে অনন্দময় ক্লান্তি বলে বোধ হয় তার কাছে। গত জুলাই মাসে তিনি জানিয়েছেন, তিনি আর লিখবেন না। সাহিত্যে তার অপরিসীম অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পাওয়া নোবেল পুরষ্কারটি হয়ত তার ক্লান্তির দেয়াল ভেঙ্গে আবার সাহিত্য রচনার দিকে ঠেলে দেবে, এমনটা আশা করা যায়।

তথ্য সূত্রঃ ইন্টারনেট,
বিভিন্ন সময় দেওয়া তার সাক্ষাৎকার।

৬ thoughts on “এলিস মুনরোর জীবন ও সাহিত্যকর্ম

  1. বেশ পূর্বে একটি সাপ্তাহিক
    বেশ পূর্বে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য এলিস মুনরোর জীবন ও সাহিত্য কর্মের উপর তথ্যমূলক একটা লেখা লেখেছিলাম। এখানে ব্লগের বন্ধুদের জন্য লেখাটি শেয়ার করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *