ফিরে দেখা ১৯৭৫

আমাদের সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বাংলাদেশের ইতিহাসের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন উল্লেখযোগ্য দু’টি ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সকালের সূর্য ঠিকই ভাদ্রের তালপাকা গরমের টিকি ছড়াচ্ছে। আমাদের পাড়ার নেহায়েত দরিদ্র নূন আনতে পান্তা ফুরোনোর শিবু-কাজলের মা উঠোনে মায়ের সঙ্গে গল্প করছিলেন। আজ ভোরে ঘটে যাওয়া বঙ্গবন্ধু খুনের ঘটনা রেডিও থেকে শুনে মা এবং মাসিমা পরস্পরের সঙ্গে আদান-প্রদান করছিলেন।

আমাদের সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বাংলাদেশের ইতিহাসের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন উল্লেখযোগ্য দু’টি ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সকালের সূর্য ঠিকই ভাদ্রের তালপাকা গরমের টিকি ছড়াচ্ছে। আমাদের পাড়ার নেহায়েত দরিদ্র নূন আনতে পান্তা ফুরোনোর শিবু-কাজলের মা উঠোনে মায়ের সঙ্গে গল্প করছিলেন। আজ ভোরে ঘটে যাওয়া বঙ্গবন্ধু খুনের ঘটনা রেডিও থেকে শুনে মা এবং মাসিমা পরস্পরের সঙ্গে আদান-প্রদান করছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের মাত্র বছর চারেক অতিক্রান্ত। আমার মা ভাষাহীন। শিবুর মা বলে চলছিলেন- দেশটা যখনই ভালভাবে চলার আয়োজন করছে, তখনই শেখ মুজিবকে মেরে ফেলল। শিবুর মায়ের ভাষায় বাকশাল করে শেখ মুজিব গরীবের পক্ষে দেশটি পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগটাই কি না ভেস্তে গেল!

সেদিনের সেই সোনাঝরা রুদ্দোরে বঙ্গবন্ধু খুনের প্রতিবাদ করার একটি মানুষ মিলল না আমাদের হবিগঞ্জ শহরে। আমাদের ঘরে সেজোভাই হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি, তাকেও দেখলাম দেরি করেই ঘুম থেকে উঠতে। সদ্য কলেজ পাশ করে হেথায়-হোথায় চাকরির ধর্ণা দিচ্ছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্কায় তিনিও বাকরুদ্ধ!

আমার বাল্য বেলায় বঙ্গবন্ধুকে মাত্র একবার দেখেছি। আমার সবচেয়ে বড় বোন হবিগঞ্জের নতুন স্টেডিয়ামের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর হাতে তার স্কুলের মেয়েদের টিফিনের এক’শ এক টাকা তুলে দিয়েছিলেন দেশ গড়ার জন্য। সেই জনসভায়ই বঙ্গবন্ধুর খুনি, হত্যার ষড়যন্ত্রকারী তাহের উদ্দীন ঠাকুরকে দেখা গেছিল জনসভার মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর পা থেকে জুতো খুলতে। এ নিয়ে আমাদের বড় ভাই-বোনদের বৈকালিক আড্ডায় তুমুল কথা হল। কারন আমাদের ঘরে ভাসানী ন্যাপেরও এক কর্মী ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সেই যে সামরিক শাসনের জোয়াল নামল, সেই জোয়াল চ্ছিন্ন হল পনের বছর পর ১৯৯০ সালে। বাকশালের মোড়কে যে গণতন্ত্র পথ হারাল, সেই গণতন্ত্রকে খুজতে গিয়ে আমার মতো অনেকের শিক্ষা জীবন বাধাগ্রস্থ হল।

গণতন্ত্র এক মানবিক সমীকরণ। মানুষের ক্ষমতায়ন। যখনই মানুষ ক্ষমতা হারায়, তখন সে নির্জীব। তার মানবিক গুণাবলীও হয়ে যায় অকেজো। প্রতিবাদের ভাষা হারায়। প্রতিরোধের ক্ষমতা হারায়। পারস্পরিক বিশ্বাসে ভাটা পড়ে।

২০১৪-র বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র পথ হারিয়েছে। মানুষের মনে আজ শঙ্কা- নির্ভয়ে পথ চলার, নিরাপদে ঘরে ফেরার। যদি বোঝা যেত আমরা কেবল একটি দলের কিছু সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি, তাও একটি কথা ছিল। সন্ত্রাসের লালনকারী গণ প্রতিনিধিত্বহীন সরকার নিজে। এই সুযোগে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও আজ নির্বাসিত! সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা যত শিগগির এই আত্ম সমালোচনা করবেন, ততই মঙ্গল।

আমরা যখন দিনেদুপুরে শহরাঞ্চলে মানুষের খুন-গুম, হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলছি, ঠিক সে সময়েই কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলে একটি নয়, কয়েকটি মাদ্রাসা থেকে, মাইকে ঘোষণা করে কয়েক হাজার লোক নিরীহ প্রান্তিক হিন্দু পাড়ায় আক্রমণ করে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে, লুটে-পুটে মানুষের সোনার স্বপ্ন ছাই করে দিচ্ছে!

সুশাসনের আরেক নাম যদি গণতন্ত্র হয়, তাকে উদ্ধারের দায়িত্ব নিতে হবে ক্ষমতাসীন দলকেই। আলাপ-আলোচনা করে, সমঝোতায় এসে উদ্ধার করবে, না হত্যা ও বিভীষিকাময় পুরনো ইতিহাসের পথ ধরেই অগ্রসর হবে তা নির্ধারণ করতে হবে তাদেরকেই।

চূড়ান্ত বিচারে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী কিংবা মাফিয়া গুণ্ডারা যে একটি গণতান্ত্রিক দলের নিয়ন্ত্রক হতে পারে না, তা রাজনীতিবিদদের চেয়ে আর বেশি ভালো কে জানে?

সর্বশেষ নিউইয়র্কের একটি ঘটনা দিয়ে এ লেখার ইতি টানব। ১৯৯০ সালে ডেভিড ডিনকিন নামে সংখ্যালঘু থেকে এক ব্যক্তি নিউইয়র্কের মেয়র হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সৈনিক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেছেন। কিন্তু চার বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ছিলেন খুবই ব্যর্থ। তার আমলে নিউইয়র্কের পাতাল রেলে প্রায়শ খুন খারাবি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত। মানুষের পারস্পরিক প্রীতি ও সৌহার্দের সম্পর্কে টান পড়ে দ্রুত। পাতাল রেলে কিংবা বাসে চলাচলের সময় মানুষ ভাবতে থাকে- এই বুঝি পাশের লোকটি লম্পট, খুনি অথবা ছিনতাইকারী!

মেয়র বদলানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করলেও মানুষের মন থেকে শঙ্কা যায় না। মানুষ ট্রেনে উঠে পত্রিকা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখে, যাতে পাশের লোকটির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। এক সকালে সাবওয়ে ট্রেনের ঘোষক কন্ট্রাক্টর চলন্ত ট্রেনে মাইকে ঘোষণা দিলেন- “গুড মর্নিং প্যাসেঞ্জারস। প্লিজ আন কভার ইয়োর ফেইস, সে হ্যালো টু ইয়োর ন্যক্সট প্যাসেঞ্জার।” ট্রেনের যাত্রীরা মুখ থেকে তাদের পত্রিকা সরালেন যন্ত্রের মত, আর পাশের যাত্রীটিকে বললেন- “হাই, হাও আর ইউ”। মানবতা যখন ভুলুন্ঠিত হয়, তাতে ক্ষমতার মদ মত্ততা বাড়লেও মানুষ ভেতরে ভেতরে মরে যায়। সেই মরে যাওয়া মানুষ কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে?

নিউইয়র্ক, ৬ মে ২০১৪

৬ thoughts on “ফিরে দেখা ১৯৭৫

  1. গণতন্ত্র এক মানবিক সমীকরণ।
    গণতন্ত্র এক মানবিক সমীকরণ। মানুষের
    ক্ষমতায়ন। যখনই মানুষ ক্ষমতা হারায়, তখন
    সে নির্জীব। তার মানবিক গুণাবলীও
    হয়ে যায় অকেজো। প্রতিবাদের
    ভাষা হারায়। প্রতিরোধের
    ক্ষমতা হারায়। পারস্পরিক
    বিশ্বাসে ভাটা পড়ে।

  2. সেই মরে যাওয়া মানুষ কিভাবে

    সেই মরে যাওয়া মানুষ কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে?

    সেটাই। একদল নস্ট আরেক দল নস্টকে কখনো লাইনে আনতে পারেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *