পহেলা মে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা দিবস

দিন আর দিবস দু’টি শব্দ এক অর্থ বহন
করলেও এই দু’টি শব্দের তাৎপর্য এক নয়। ৩
দিন সাধারণ
যে কোনোদিনকে বোঝায় আর দিবস
বলতে আমরা কোন সাধারণ
দিনকে বুঝি না।
একটি ঘটনাকে স্মরণে রাখতে কিংবা
এর তাৎপর্য মানব
জীবনে কী শিক্ষা বহন
করে তা উপলব্দি করার জন্যেই আমরা ওই

দিন আর দিবস দু’টি শব্দ এক অর্থ বহন
করলেও এই দু’টি শব্দের তাৎপর্য এক নয়। ৩
দিন সাধারণ
যে কোনোদিনকে বোঝায় আর দিবস
বলতে আমরা কোন সাধারণ
দিনকে বুঝি না।
একটি ঘটনাকে স্মরণে রাখতে কিংবা
এর তাৎপর্য মানব
জীবনে কী শিক্ষা বহন
করে তা উপলব্দি করার জন্যেই আমরা ওই
দিনটিকে স্মরণে রাখি। আর এই বিশেষ
দিনটিকে আমরা অন্য সাধারণ দিন
থেকে আলাদা করার জন্যেই দিবস
হিসেবে উল্লেখ করে থাকি।
যে কোনো দিবসই মানুষের
একাকীত্বকে ভেঙ্গে একটা
মহামিলনের উৎসবে পরিণত করে। সবাই
মিলে সেই স্মৃতি রোমন্থন করে আনন্দ
বেদনায় একাকার হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে মে দিবসটা একটু ভিন্ন। কারণ
মে দিবস পালিত হচ্ছে বা এ দিবস
পালনের পিছনে যে, ঘটনাকে কেন্দ্র
করা হচ্ছে তা সবই শ্রমিক
শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। তাই এ দিবস
নিয়ে শ্রমিকদের অনেক আনন্দ
বেদনা উৎসাহ উদ্দীপনা রয়েছে।
তবে মালিক পক্ষ
কিংবা সাধারণরা এ নিয়ে তেমন
মাতামাতি করেন না বললেই চলে।
তা ছাড়াও এ দিনে শ্রমিকদের আনন্দ
করার মতো কিছুই নেই। তাদের সেই
পুরানো স্মৃতির
সাগরে সাঁতরিয়ে নিজেদের
অধিকার আদায়ের
কথা নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়। ১
মে বিশ্বজুড়ে পালিত
হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এ
দিবসটিকে ঘিরেই
শ্রমজীবী মানুষরা তাদের অধিকার ও
মর্যাদার লড়াইয়ে সোচ্চার হন।
শ্রমজীবী মানুষরা তাদের অধিকার
আদায়ের লড়াই করতে গিয়ে রক্ত
দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন।
মেহনতি মানুষরা শ্রমের মর্যাদা ও
অধিকার আদায়ে এভাবেই সংগ্রাম
করেছেন। তাদের সেই রক্ত, সেই
সংগ্রাম, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার
আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে মহান
মে দিবস।
বিশ্বজুড়ে যখন থেকে শিল্প
কারখানা গড়ে ওঠে তখন থেকেই
পুঁজিবাদ প্রথা চালু হয়। আর এসময়
থেকেই শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার জুলুম
নির্যাতন শোষণ শুরু হয়। এ সময় কাজের
কোনো নির্দিষ্ট সময় সীমা ছিল না।
আট ঘন্টার জায়গায় দশ বারো চৌদ্দ
ষোল ঘন্টাও কাজ করতে হতো।
অতিরিক্ত কাজের জন্যে কোন
মজুরি প্রদান করা হতো না। মালিক
শ্রেণির শোষণের
যাতাকলে নিষ্পেষিত হতে লাগল
শ্রমিক সমাজ। সেই অসহনীয় যন্ত্রণার
ক্ষোভ দিনে দিনে পুঞ্জিভুত
হতে লাগল শ্রমিক সমাজের ভেতর। সেই
পুঞ্জিভুত ক্ষোভ ১৮৮৬ সালের ১
মে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে বহিঃপ্রকাশ
ঘটল। শ্রমিক সমাজ এই অন্যায়ের
প্রতিবাদে ও তাদের অধিকার
আদায়ে রাজ পথে নেমে পড়ল। আট
ঘন্টা কর্মদিবস পালনের
দাবিতে তারা সাধারণ ধর্মঘট পালন
করতে লাগল। ১৮৮৬ সালের এই শ্রমিক
বিক্ষোভের ৩৮ বছর আগে ১৯৪৮
সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক
সমাজ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য
একত্রিত হয়েছিল। তারা স্লোগান
তুলেছিল দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই
করো। পরবর্তীতে এই স্লোগান এশিয়
ইউরোপ
আমেরিকা আফ্রিকা মহাদেশের সকল
দেশেই শ্রমিকদের মাঝে নতুন প্রাণ
সঞ্চার করেছিল। সেই নতুন প্রাণ
নিয়েই শ্রমিকরা ৮ ঘন্টা কাজের
দাবিতে মাঠে নেমেছিল। শ্রমিকদের
দীর্ঘদিনের এ দাবি মালিক পক্ষ
না মেনে উল্টো তাদেরকে শাসিয়ে
এই যৌক্তিক আন্দোলনকে স্তমিত করার
অপচেষ্টায় তারা লিপ্ত হলো। কিন্তু
শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড়। ১৮৬৪
সালের ৪
মে সন্ধ্যা বেলা হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
শিকাগোর হে মার্কেটের এক
বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকরা তাদের
চলমান আনন্দোলনের
কর্মসূচি হিসেবে মিছিলের
প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসময় বিভিন্ন
এলাকা থেকে শ্রমিকরা এসে
মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলে অংশ
নেয়া শ্রমিকদের প্রাণের
দাবিগুলো স্লোগানে স্লোগানে
আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল।
হে মার্কেটের সামনে বিশাল
সমাবেশ আনুষ্ঠিত হলো।
সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন শ্রমিক
নেতা আগস্ট স্পীজ। তিনি তার
বক্তব্যে শ্রমিকদের প্রাণের
দাবিগুলোর
স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরছিলেন। এ সময়
পুলিশ
বাহিনী সমাবেশকে ঘিরে দায়িত্ব
পালন করছিলেন। হঠাৎ পুলিশের
সামনে একটা বোমার বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনাস্থলে একজন পুলিশ সদস্য মারা যান।
শ্রমিকদের নিক্ষিপ্ত
বোমা বিস্ফোরণে এক পুলিশ সদস্যের
মৃত্যু খবর পুলিশের উপরস্থ অফিসারদের
কানে গেলে তারা ক্ষিপ্ত
হয়ে শ্রমিকদের ওপর
অ্যাকশনে যেতে পুলিশদের নির্দেশ
দেন। পুলিশ
বাহিনী হিংস্রাত্মকভাবে
নির্বিচারে শ্রমিকদের ওপর
গুলি চালায়। শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ
হয়ে যায়। এসময় হে মার্কেটের
সামনে ১১ জন শ্রমিক নিহত হয়। মালিক
পক্ষ নিজেদের পিট বাঁচাতে পুলিশের
পক্ষ নেয়। শ্রমিকদের
দাবি দাওয়া না মেনে ১১ শ্রমিকের
মৃত্যু ভিন্নদিকে প্রভাবিত করার জন্যই
শ্রমিকনেতা আগস্ট স্পীজসহ মোট আট
জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মালিক
শ্রেণিরা অর্থের প্রভাব
খাটিয়ে সরকারের ওপর
মহলকে প্রভাবিত করে অভিযুক্তদের
প্রহসনমূলক বিচারের সম্মুখীন করে ১৮৮৭
সালের ১১ নভেম্বর আটজনের
মধ্যে ছয়জনের ফাঁসির রায় কার্যকর
করে। লুইস লিং নামের এক শ্রমিক
ফাসি কার্যকর হওয়ার আগের
রাতে কারাগারের ভেতর
আত্মহত্যা করেন। আরেকজন
শ্রমিককে পনের বছরের কারাদ- প্রদান
করা হয়।
ফাঁসি কার্যকর হবার আগে ফাঁসির
মঞ্চে শেষবারের মতো শোষিত
শ্রমিকদের নেতা আগস্ট স্পীজ
অকুন্ঠচিত্তে দুনিয়ার সব শ্রমিকদের
উদ্দেশে একটি বাণী উচ্চারণ করলেন।
তিনি বললেন আজ আমাদের এই
নিঃশব্দতা তোমাদের আওয়াজ
অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।
পরে এই নিষ্ঠুর অবিচার শ্রমিক হত্যা ও
শ্রমিকদের ফাঁসি সবটাই ছিল
মালিকপক্ষ ও পুলিশের একান্ত
কারসাজি তা প্রকাশ পেয়ে যায়।
ইলিনয়ের গভর্নর ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন এক
বিবৃতিতে বলেন ১৮৮৬ সালের ৪
মে হে মার্কেটের সামনে শ্রমিকদের
বিরুদ্ধে পুলিশের যে অ্যাকশন
হয়েছিলো তার ঘোষণা দেন
সে সময়ের পুলিশ কমান্ডার।
তিনি আরো বলেন পুলিশের ওপর
যে বোমাটি ছোঁড়া হয় সেটি কোন
শ্রমিক ছোড়ে নি। এই লোকটার পরিচয়
পাওয়া যায় নি। তিনি ছিলেন
অজ্ঞাত। সে সময়ের
সংবাদপত্রগুলো এভাবেই রিপোর্ট
করেছিল যে পুলিশের ওপর
বোমা ছোঁড়ে কোন এক অজ্ঞাত
ব্যক্তি। এ সময় পুলিশ অনেকটা নীরব
ভূমিকা পালন করেছিল। আর শ্রমিকদের
দিকে সমস্ত বুলেট আসছে পুলিশের দিক
থেকে।
এরপর এ বিচার সবার কাছে পরিষ্কার
হয়ে যায়। যে ছয় শ্রমিকের
ফাঁসি ছিলো প্রহসনের বিচার,
যা পৃথিবীর সব মানুষকেই ব্যথিত
করেছে। এর পর মালিক পক্ষ
অনেকটা নমনীয় হয়। শ্রমিকদের
আটঘন্টা কাজ ও ন্যায্য মজুরি প্রদান
করেন। এভাবে শুরু
হতে থাকে শ্রমিকদের মর্যাদা ও
আধিকার প্রতিষ্ঠা। তবে আজও
যে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছে না এমন নয়।
আজও শ্রমিকদের আন্দোলন থেমে নেই।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আজও
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও
মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
শ্রমিকরা এখনো তাদের শ্রমের
ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। শুধু তৃতীয় বিশ্বের
দেশগুলোই শুধু নয়। পৃথিবীর সবদেশেই
যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত
হচ্ছে মে দিবস। তবে তৃতীয় বিশ্ব
ছাড়াও অনেক দেশেই
এখনো মে দিবসের সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য
বাস্তবায়িত হয় নি। মালিক পক্ষ
এখনো শ্রমিকদের অধিকার
থেকে নানাভাবে বঞ্চিত করার
পাঁয়তারা করছে।
শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে আমাদের
ধর্মে যে বিধান
রয়েছে সেখানে মহানবী হযরত মুহম্মদ
(সঃ) বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম
মুছে যাওয়ার আগেই তার পারিশ্রমিক
প্রদান কর।’ মহানবী সমাজে শ্রমিকদের
মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এ
বাণী উচ্চারণ করেছিলেন।
কেননা ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা হওয়ার
আগে অর্থাৎ জাহেলি যুগে শ্রমিকদের
মনিবেরা চাকর হিসেবেই দেখতো।
তাদেরকে মানুষ
হিসেবে মর্যাদা দিত না।
মর্যাদা দূরে থাক, জুলুম অত্যাচার আর
নির্যাতনের শেষ ছিল না। ইসলাম ধর্ম
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর
মহানবী শ্রমিকদেরকেও অন্যসব মানুষের
মাঝে সমতা ফিরিয়ে আনেন। তখন
থেকেই মানুষের মাঝে বৈষম্য
কমে আসে। এর পর থেকেই
সমাজে শ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত
হয়। রাসূলের যুগে শ্রমিকদের
মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের
বিবর্তনে পুঁজিবাদীদের
আগ্রাসনে আবার শ্রমিকরা শোষণের
যাতাকলে নিষ্পেষিত হতে লাগল।
তাই শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার
আদায় ও মর্যাদা রক্ষার
লড়াইয়ে আন্দোলন করে রক্ত
দিয়ে ইতিহাস রচনা করেছে।
বিশ্বব্যাপী সেই ইতিহাস স্মরণীয়
হয়ে রয়েছে। মে দিবসের মাধ্যমে।
মে দিবসে বাংলাদেশের শ্রমিকরাও
রাজপথে নেমে আসে। তাদের
অধিকারের দাবিতে স্লোগান দেয়।
আজও কি বাংলাদেশের শ্রমিকের
ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! হয়
নি। অন্যান্য দেশের
চেয়ে বাংলাদেশে জনসংখ্যার
আধিক্য থাকার
কারণে শ্রমিকরা আরো বেশি শোষিত
বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ যে হারে মানুষ
বাড়ছে সে তুলনায় কর্মসংস্থান
সৃষ্টি হচ্ছে না। এই সুযোগে মালিক পক্ষ
শ্রমিকদের নানাভাবে বঞ্চিত করছে।
সমাজের সর্বত্রই শোষণের শিকার
হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষরা। অথচ আমরাই
আবার বলে থাকি শ্রম ছাড়া ভাগ্যের
পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। আমাদের
ধর্মেও একথা রয়েছে যে, একমাত্র শ্রমই
মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়
বা ঘটাতে পারে। কিন্তু এখন
দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।
যারা রাতদিন শ্রম দিচ্ছেন তারাই
মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আর এই
শ্রমিকদের শ্রমের টাকায় মালিকপক্ষ
রাজকীয় জীবনযাপন করছে।
প্রতিনিয়তই মালিক ও শ্রমিকদের
মধ্যে জীবনমানের পার্থক্য বাড়ছে।
মালিকপক্ষ দিন দিন আরো উচ্চ
বিলাসি হচ্ছে। আর শ্রমিকদের জীবন
মান দিন দিন নিচের দিকে ধাবিত
হচ্ছে। তাছাড়াও সব সম্পদ পুঞ্জীভূত
হচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের
হাতে। যার ফলে সমাজের চিত্রও
তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। ১ মে,
শ্রমিকদিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
কিন্তু এই দিবস পালনের মধ্য
দিয়ে শ্রমিকদের জীবনের
কোনো পরিবর্তন ঘটে নি।
দেখা যাচ্ছে এইদিন যারা বড় গলায়
শ্রমিকদের পক্ষে বক্তৃতা দেন।
শ্রমিকদের অধিকার
আদায়ে নানা নীতি বাক্যে কথা
বলেন, পরের দিন তারাই আবার
জোঁকের মতো শ্রমিকদের রক্ত
চুষে খাচ্ছেন। এটাই আমদের দেশ ও
সমাজের বাস্তব চিত্র। সমাজপতি ও
শিল্পমালিকদের আসল রূপটি যদি এই হয়
তাহলে শ্রমিকরা শ্রমের
মর্যাদা কী করেই বা পাবেন?
শ্রমিকদের ন্যায় আধিকার
থেকে বঞ্চিত হওয়ার পেছনে মূলত
দায়ী পুঁজিবাদী আগ্রাসন।
আমরা দেখেছি ২০১১ সালের
মধ্যদিকে খোদ আমেরিকায় হাজার
হাজার মানুষ
পুঁজিবাদী বিরোধী স্লোগান
নিয়ে রাস্তায়
নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।
তাদের এই আন্দোলনের নাম ছিল ওয়াল
স্ট্রিটবিরোধী আন্দোলন। এ
আন্দোলনে শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই
রাজপথে নামেন নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপকরাও নেমেছিলেন। এ আন্দোলন
শুধু নিউইয়র্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল
না। ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর অনেক
দেশেই। মার্কিনীদের দাবি ছিল
যুক্তরাষ্ট্রে ধনী মানুষের
সংখ্যা শতকরা একভাগ, আর বাকি ৯৯
ভাগ মানুষই হচ্ছে গরিব। এই ৯৯ ভাগ
মানুষ ওই একভাগ মানুষের কাছে এক
প্রকার জিম্মি। এরা কখনো ওই ধনীদের
ওয়াল টপকিয়ে ধনী হতে পারছে না।
পুঁজিবাদ আগ্রাসনের বলি এখন শুধু
শ্রমিকরাই হচ্ছেন না। এর প্রভাব
বিস্তার করছে অন্যান্য
পেশাজীবী মানুষের ওপরও। বর্তমান
পুঁজিবাদ পৃথিবীতে প্রত্যেক দেশের
সরকারও কাজ করছে পুঁজিবাদীদের
পক্ষে। সরকার এসব
ধনী মানুষগুলোকে আরো ধনী হওয়ার
সুযোগ দিচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে এরা ঠিকমতো কর
দিচ্ছে না, ব্যাংক থেকে হাজার
হাজার কোটি টাকা লোন
নিয়ে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে
ছেড়েছে। তারপর আবার সেই লোন
সঠিক সময় পরিশোধ করছে না।
পরে দেখা যায় নানা ছল-
চাতুরি করে সে ঋণ মওকুফের
পাঁয়তারা করে। এক সময় মাফ পেয়েও
যায়। কারণ সরকার ও রাজনৈতিক
দলগুলোকে এসব পুঁজিপতিরা বিভিন্ন
সময় অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন। তাই
রাজনৈতিক দলগুলো এক প্রকার
জিম্মি হয়ে পড়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন
মানুষের হাতে। পরে যে দলই ক্ষমতায়
আসুক, তারা সেই সরকারের সহায়তায়
দেশ ও জাতির সম্পদ লুটপাট
করে নিরাপদে পার পেয়ে যায়।
পৃথিবীর সবদেশেই এমন চিত্র
বিরাজমান। তবে এবার আমরা একটু নিজ
দেশের দিকে তাকাই। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে যদি শতকরা একজন ধনী হন,
তাহলে আমাদের দেশে লাখে একজন
ধনী ধরা যায়। এ সংখ্যা এর
বেশি হবে বলে মনে হয় না। এই ষোলশ
জনের কাছে আজ ষোল
কোটি বাঙালিসহ সরকারও এক প্রকার
জিম্মি। এ কারণেই আমাদের দেশের
শ্রমিকরা আরো বেশি বঞ্চিত হচ্ছে।
শোষণের শিকার হচ্ছে। এই দেশে এই
সমাজের শোষণের এই চিত্র
কোনোদিনও দূর হবে না বা দূর
করা সম্ভব না বলে আমার ধারণা।
কেননা যারা এই সমাজ পরিবর্তন
করবেন, শোষণ মুক্ত একটা সমাজ গড়বেন,
তাদেরকেই ওই সব
ধনী লোকগুলো নানাভাবে ম্যানেজ
করে এক প্রকার অদৃশ্য
শৃঙ্খলবন্দি করে ফেলেছেন।
সমাজপতিরা যদি এভাবে বন্দি হয়ে
পড়েন অর্থের মোহে তাহলে এই
সমাজের পরিবর্তন আসবে কী করে?
নিউইয়র্ক, মেলবোর্ন এসব স্থানের জনগণ
পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন
করতে রাস্তায় নামতে পেরেছিল।
কিন্তু বাংলাদেশে শ্রমিকরা তাদের
অধিকারের দাবি নিয়ে রাস্তায়
বের হবেন তাও পারছেন না।
বাংলাদেশের
কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে
সঠিকভাবে শ্রমিকদের শ্রমের মূল্য
দিচ্ছে না। তারা শ্রমিকদের এক
প্রকার
জিম্মি করে ইচ্ছামতো বেতনভাতা
দিচ্ছেন। অন্যদিকে দেখা যায়
নির্দিষ্ট সময়ের চেয়েও অতিরিক্ত সময়
শ্রম খাটিয়ে রাখেন। বিশেষ করে এই
সুযোগটা মালিকপক্ষ
বেশি পেয়ে থাকেন গার্মেন্টস
সেক্টরে। গার্মেন্টস বাংলাদেশের
ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের
অন্যতম একটা মাধ্যম। আর এ অর্জনের
ক্ষেত্রে অনেকটাই নির্ভর
করে শ্রমিকদের ওপর। অথচ দেখা যায় এই
শ্রমিকরা রাতদিন পরিশ্রম করেও সঠিক
বেতনভাতা পাচ্ছে না। আবার
বেতনভাতা যাই পাক, তা আবার মাস
শেষে সঠিক সময় পাচ্ছেন না। অতীব
দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, এই
পরিশ্রমের টাকা পেতে শ্রমিকদের
আন্দোলন করতে হয়। আন্দোলন
করতে নেমে রাজপথে পুলিশের
গুলিতে প্রাণও দিতে হয়। পুঁজিবাদ
প্রথা বিশ্বের অনেক দেশে থাকলেও
শ্রমিকদের এমন অবমূল্যায়ন
চোখে পড়ে না। শুধু গার্মেন্টস
সেক্টরে নয়, বাংলাদেশের সবকিছুই
আজ পুঁজিপতিদের কাছে জিম্মি।
প্রতিটা সেক্টরই আজ মুষ্টিমেয় কিছু
মানুষের হাতে জিম্মি। তবে এই
পুঁজিবাদ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন
করেও কোনো লাভ হবে না।
কেননা গোটা পৃথিবীই আজ
পুঁজিপতিদের হাতে। পুঁজিবাদ
প্রথা বাতিল করতে গেলে অর্থাৎ
মানুষ যদি অর্থের
অট্টালিকা গড়তে না পারে তখন আর
সে অর্থের পেছনে ছুটবে না। আর
অর্থের পেছনে না ছুটলে শিল্প
কারখানা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য
গড়ে তুলবেন না। ফলে দিন দিন
কর্মসংস্থান আরো কমবে।
একথা উপলব্ধি করতে পেরেই
সমাজতান্ত্রিক দেশ চীন তাদের
নীতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়
সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করতে হবে। সরকারকে পুঁজিবাদ বান্ধব
না হয়ে শ্রমিকবান্ধব হতে হবে।
কেননা গণতান্ত্রিক দেশে অধিকাংশ
মানুষের
সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন
করাই সরকারের মূল কাজ। এ জন্য
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায়
একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না,
তার বাস্তবায়নও করতে হবে। কঠোর আইন
থাকতে হবে শ্রমিক
নীতিমালা অমান্য
করলে কিংবা কোনো শ্রমিক
কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ
দিলে লেবার কোর্টের মাধ্যমে তার
বিচার করতে হবে। শেষ পর্যন্ত
কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করার
ক্ষমতাও কোর্টের হাতে থাকবে।
দেশ ও জাতির উন্নয়ন
চাইলে সরকারকে আরো বেশি শ্রমিক
বান্ধব হতে হবে। শ্রমের মর্যাদা অবশ্যই
দিতে হবে। শুধু
মে দিবসে বাণী দিয়েই
সে মর্যাদা আদায় হবে না। শ্রমিকের
মর্যাদা না দিলে সে দেশ ও জাতির
কোনোদিনও উন্নয়ন সাধিত হবে না।

৪ thoughts on “পহেলা মে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা দিবস

  1. ভালো লিখেছেন। মনে হয় মোবাইল
    ভালো লিখেছেন। মনে হয় মোবাইল থেকে পোস্ট করেছেন তাই লাইনগুলো এমন ছোট ছোট হয়ে গেছে। দেখতে/পড়তে বাজে লাগছে।

    1. একমত( মনে হয় মোবাইল থেকে
      একমত( মনে হয় মোবাইল থেকে পোস্ট করেছেন তাই লাইনগুলো এমন ছোট ছোট হয়ে গেছে। দেখতে/পড়তে বাজে লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *