সাদা পোশাক ও সাদা মাইক্রোবাস ভীতি কাটবে কবে?

প্রতিদিনকার মত বিভাগীয় গণ-গ্রন্থাগারে পত্রিকা পাঠের জন্য বসলাম । পত্রিকা পাঠ করে প্রতিদিন যেমন ভিন্ন ভিন্ন জগতের খবর পাই ২৯শে এপ্রিলের পত্রিকা থেকে ঠিক তেমনটাই আশা করেছিলাম । এক এক করে দেশের সকল জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকা গুলোর পাতা উল্টালাম । বিশেষ করে প্রথম এবং শেষ পাতার সংবাদ শিরোনাম এবং সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, খোলা কলাম গুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেয়াই নিত্যদিনকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজকের পত্রিকার প্রতিও এর ব্যতিক্রম কিছু হল না । তবে পূর্বের দিনগুলো থেকে পত্রিকাগুলোর খবরের অনেক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হল । প্রতিদিন যেমন সংবাদ শিরোনামগুলো এবং সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়তে বিভিন্ন বিষয়ের খবর থাকে ২৯শে এপ্রিলের পত্রিকার সে ধারা থেকে অনেক ভিন্ন মনে হল । দেশের প্রায় সকল পত্রিকাগুলো দু’টি খবরকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের সংবাদ শিরোনাম এবং সম্পাদকীয়, উপ-সম্পদকীয় সাজানো চেষ্টা করেছে । তার মধ্যে প্রথম খবরটি ছিল গত ২৮শে এপ্রিল সুনামগঞ্জসহ দেশের কয়েকটি স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ে ৩১ জন নিহত হয়েছে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে । গ্রামের পর গ্রামের ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড হয়েছে । একটি ট্রেনের কয়েকটি বগি কালবৈশাখি ঝড়ে কুপোকাত করে রেখেছে । কালবৈশাখীতে এত মানুষের মৃত্যুর সংবাদও পত্রিকাগুলোর প্রধান, আকর্ষণীয় এবং বুদ্ধিজীবিদের লেখার বিষয়বস্তু হতে পারে নি । প্রধান শিরোনাম ছিল গুম এবং অপহরণ এবং দেশজুড়ে আতঙ্কের খবর । গত কয়েক মাস ধরে দেশে যে গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে তার মাত্রা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । দিনের পর দিন গুম ও অপহরণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । গত কয়েক দিন আগে দেশের পরিবেশবাদী সংঘঠন বেলা’র নির্বাহী পরিচালক আইনজীবি রেজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ এবং মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণায় তাকে অপহরণকারীরা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে । পরে যদিও সরকার এবং আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মতৎপড়তায় এবি সিদ্দিক উদ্ধার হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে । ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক যেভাবেই উদ্ধার হোক না কেন তাতে তার পরিবারের মধ্যে যে আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে সেটাই বড় কথা । আবু বকর সিদ্দিককে ফিরে পাওয়ার পর তার গুম হওয়ার পিছনে কি কারন থাকতে পারে তা খুঁজে বের করার জন্য যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তা এবং সরকারের নানা মহল থেকে এবি সিদ্দিক গুমের পিছনে অনেক রহস্য সম্মৃদ্ধ শাখা-প্রশাখা ছড়াতে শুরু করেছে । প্রতিটি গুম এবং অপহরণ হওয়ার পর দেশের সবগুলো প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জোড়ালো ভাবে প্রচার করছে । তবুও দেশের গুম ও অপহরণের সংখ্যা বেড়েই চলছে ।

ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর দীর্ঘ দু’ই বছরের কিছু বেশি সময় অতিবাহিত হলেও দেশের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তার কোন কূল কিনারা করতে পারে নি । দেশের মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান গুম ও অপহরণের ঘটনায় উদ্দেগ প্রকাশ করে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও গুম, অপহরণের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলছে । আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতা সাবেক রেলমন্ত্রী বর্ষীয়ান রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত অপহরণ ও গুমের ঘটনাকে অনভিপ্রেত ঘোষণা করলেও এ ক্ষেত্রে কোন উন্নতি হচ্ছে না । বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিএনপির ৩০৭ জন নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে । মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাষায় গুম ও অপহরণের দায়ভার থেকে সরকার পার পাবে না বলে হুমকি দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন সাড়া মিলছে না । প্রধানমন্ত্রী কিংবা শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীদের মূখ থেকে গুম ও অপহরণ নিয়ে উদ্ধিগ্ন হয়ে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে কোন দিক-নির্দেশনা দেওয়ার খবর এখনো কোন গণমাধ্যম প্রকাশ কিংবা প্রচার করেনি । রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরা যেমন অপহরণের শিকার হচ্ছে তেমনি ব্যবসায়ী, শিক্ষকও গুমের শিকার হচ্ছে । তবে পত্রিকাগুলোর জরিপমতে, রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি গুমের আশাঙ্কায় আছে এবং অতীতে যারা গুম ও অপহৃত হয়েছে তাদের বেশিরভাগ রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ী । পত্রিকাগুলো বলছে, যারা গুম কিংবা অপহরণ হচ্ছে তাদেরকে অপহরণকারীরা ফেরত দিলে জীবিত ফিরছে না হয় লাশ হয়ে । আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী লক্ষণীয় কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেনা বা নিচ্ছে না ।

এতদিন একজন করে গুম হলেও সম্প্রতি একটি উপজেলার প্যানেল মেয়রসহ মোট পাঁচজন অপহরণ হয়েছে । পত্রিকার ভাষ্যমতে গত ২৪ ঘন্টায় ১২ জন গুম হয়েছে অর্থ্যাৎ প্রতি ২ ঘন্টায় একজন । এরকম চলতে থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে গুমের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে । দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিল্মি স্টাইলে মানুষকে গুম কিংবা অপহরণ করা হচ্ছে । আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাক পরিহিতরা সাদা মাইক্রোবাসে করে লোকজনকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে । গুম বা অপহরণের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা কোন প্রকার উচ্চ-বাচ্য করারও সাহস পায়না যদি সত্যিকারার্থেই এরা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য হয়ে থাকে । আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও কিছু সময় পার হওয়ার পর জানা যাচ্ছে গুম এবং অপহৃতের সাথে জড়িত এসকল ব্যক্তিরা আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ছিল না । তাদের কাছের অস্ত্র এবং তাদের পোশাক ও মাইক্রোবাসের ধরণ দেখলে তাদেরকে আইন শৃঙ্খলাবাহীনির সদস্য থেকে পৃথক করার কোন উপায় থাকে না বলে জানিয়েছে অপহরণ থেকে ফিরে আসা অনেকেই । তাইতো ২৯শে এপ্রিল প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা তাদের প্রধান শিরোনাম করেছে , ‘সাদা পোশাক ও সাদা মাইক্রোবাসধারীদের ভয়ে আতঙ্কিত দেশবাসী”।

বাংলাদেশ পুলিশবাহিনী এবং অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত র‌্যাব বাহিনীর সুনাম বিশ্বব্যাপী । অন্যান্য বাহিনীকে না হোক অন্তত র‌্যাবকে দেশের অপরাধীরা সাক্ষাৎ যমের মত ভয় করে । তবুও কোন সাহসে অপহরণকারীরা নির্বিঘেœ তাদের কাজ চালিয়ে দেশকে উৎকণ্ঠায় ভরিয়ে তুলছে ? সরকারও কেন এ ব্যাপারে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে ? তাহলে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী থেকে যারা আস্থা হারাচ্ছে তারা কি সঠিক পথেই এগুচ্ছে ? সরকার কি জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার প্রমান দিচ্ছে নাকি ইচ্ছা করেই চুপ করে আছে ? দেশের বাঘা বাঘা সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়ে যাচ্ছে অথচ যারা গুম, অপহরণের সাথে জড়িত তারা নির্বিঘ্নে তাদের অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে । সরকারকে অবশ্যই জনগণের বন্ধু হতে হবে । জনগণের সুখ-দুঃখের ভাগীদার যেমনি সরকার তেমনি সরকারের সামর্থের সীমাবদ্ধতার দিকেও জনগণের খেয়াল রাখা জরুরী । জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হোক সে ব্যক্তি সরকার বিরোধী । দেশবাসী দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, যারা গুম ও অপহরণ চক্রের সাথে জড়িত তাদের কোন রাজনৈতিক ব্যানার নাই । তারা সরকার ও জনগণের শত্রু । কাজেই সরকারকে কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে এখনই অপহরণ ও গুমের হাত থেকে সকল দল, মতের লোকদেরকে রক্ষা করতে হবে । দেশের প্রত্যেকটা পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের । জনগণ বিশ্বাস করে, সরকার এখনও ততোটা অকার্যকর হয়নি যে কারনে তারা দেশের মানুষের জান, মালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে । দেশটা যেন বিদেশীদের কাছে হাসি-ঠাট্টার একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত না হয় সে জন্য সকল দায়িত্বশীলদের সচেতন হতে হবে ।

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
raju69mathbaria@gmail.com

৩ thoughts on “সাদা পোশাক ও সাদা মাইক্রোবাস ভীতি কাটবে কবে?

  1. যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সবচেয়ে
    যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সবচেয়ে বড় আইন-ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়, তাহলে এরকম চলতেই থাকবে!

  2. প্রকৃতির তান্ডব নিয়ে
    প্রকৃতির তান্ডব নিয়ে বুদ্ধিজীবিরা কলাম না লিখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ প্রকৃতির এসব জয় করা কঠিন বিষয়। আর আদৌ সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। তবে অপহরণ, গুম এই আতংক মানুষ্য সৃষ্টি আর এটা নিয়ে প্রতিবাদ জানানো, কলাম লেখা উচিত। যেমনটা আপনিও করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *