আমাদের অভিভাবক এবং কয়েকটি প্রশ্নপত্র…

কয়েকদিন থেকেই একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি। কাকতালীয় কি না জানি না, আমি যে ব্যাপার নিয়ে ভাবি, সেটা নিয়ে চিন্তা করার, জানার আরও আরও উপাদান কেমন করে যেন পেয়ে যাই। সেদিন চোখে পড়ল অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারের ‘অভিভাবক যখন অভিশাপ’ লেখাটি। তার পরদিন হাতে এলো একটা বই, ‘নারী ও গণিত’। একুশ তারিখের পত্রিকায় আরও কিছু কাহিনী। কি আশ্চর্য! আমি এই বিষয়গুলো নিয়েই ভাবছিলাম!

প্রশ্নপত্র ও অভিভাবকঃ

কয়েকদিন থেকেই একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি। কাকতালীয় কি না জানি না, আমি যে ব্যাপার নিয়ে ভাবি, সেটা নিয়ে চিন্তা করার, জানার আরও আরও উপাদান কেমন করে যেন পেয়ে যাই। সেদিন চোখে পড়ল অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারের ‘অভিভাবক যখন অভিশাপ’ লেখাটি। তার পরদিন হাতে এলো একটা বই, ‘নারী ও গণিত’। একুশ তারিখের পত্রিকায় আরও কিছু কাহিনী। কি আশ্চর্য! আমি এই বিষয়গুলো নিয়েই ভাবছিলাম!

প্রশ্নপত্র ও অভিভাবকঃ
ভাবের উদ্রেক এমনি এমনি হয়নি অবশ্য। শিক্ষার চলমান পরিস্থিতি এসব চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। কদিন আগেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার একটি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। কারণ- প্রশ্নপত্র ফাঁস! কি অদ্ভুত! আমার ভাবতে খুব বেশি অবাক লাগে কেমন করে অভিভাবকেরা চান তাদের সন্তান ফাঁস করা প্রশ্ন দিয়ে এইচএসসি পাশ করুক। এরকম হাজারো উদাহরণ আমাদের দেশে দেওয়া সম্ভব। যেমন, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য অভিভাবক লক্ষ্য টাকার বিনিময়ে সন্তানের হাতে তুলে দেন ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে সবাই জানে। আমি নিজে কয়েকজনকে চিনি যারা এইসব ডাকাতি করে ভর্তি হয়ে খুব ভালো ভালো বিষয় নিয়ে পড়ছে। তাদের জন্য আমার আসলে করুণা হয়। কারণ, অভিভাবক নামে অত্যন্ত ভরসার কেউ তাদের এই কুপথে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের জন্য আমার খারাপ লাগে, তারা তাদের অভিভাবকদের কাছে ‘সত্য’ কি জিনিস সেটা শিখতে পারল না! আফসোস!


২০১৪ সালের এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র(ছবি কৃতজ্ঞতাঃপ্রিয়.কম।)

গত বছরের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছিল। আমার একটা লেখায় তখন আমি বলেছিলাম,

“যেই অভিভাবক সন্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন টাকায় কেনা প্রশ্ন, তিনি কি আদৌ একজন বাবা/মা? কীভাবে এই অন্ধকারের পথে তারা তাদের সন্তানকে এগিয়ে দিচ্ছেন আমার ছোট্ট মস্তিষ্ক তা বোঝে না।”

আমি আসলে এখনও বুঝতে পারিনি!

এবার যদি অন্যভাবে চিন্তা করি… এক বড় ভাইয়া লিখেছেন, যদি আমাকে আমার পরীক্ষার প্রশ্ন এনে দেওয়া হয় তাহলে কি আমি সেটার সদব্যবহার করব নাকি ‘আমি সাধু’ বলে চুপ করে থাকব? অর্থাৎ, উনি হিউম্যান নেচারের পক্ষে গীত গেয়ে বলেছেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস যারা করছে(সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা), তাদের ধরা উচিৎ। উনার ধারণা, অভিভাবকেরা এটার সাথে জড়িত নন। আমার তাদের ধরা নিয়ে আপত্তি নেই, কিন্তু অভিভাবকেরা সংশ্লিষ্ট নন এতে আলবৎ আপত্তি আছে। পঞ্চম শ্রেণির একটা বাচ্চা কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস নামক ভয়ংকর একটা কাজের সাথে জড়াবে? অষ্টম বা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরাও যে এসব করতে পারে না, আমি নিশ্চিত(নিজে এ সময়গুলা পার করে এসেছি, আমি তো জানি!)। তার মানে হল, এইসব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যাদের দ্বারা ফাঁস হয় তারা এবং যেসব অভিভাবক এসব করছেন তারা সমান অপরাধী।

কুয়েটের রাতুল নামে এক ভাইয়ার মত আমারও বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, ‘আমার মনে হয় PEC, JSC, SSC, HSC পরীক্ষা নেয়ার আর কোন যৌক্তিকতা নাই। এতগুলা কর্মঘন্টা নষ্ট করার কোন মানে হয় না। জন্মের সময় বার্থ সার্টিফিকেটের সাথে এই ৪ টা সার্টিফিকেটও দিয়ে দেয়া হোক। দেশের ভবিষ্যত ফাঁস হওয়া প্রশ্নটার মতই আবছা’

শুধু কি এই কয়টা পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে? বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বিসিএস পরীক্ষা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হচ্ছে। যারা দেশ চালাবেন, যারা শিক্ষকতার মহান পেশাকে গ্রহণ করবেন, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি চালাবেন, তারা যদি বিসমিল্লাহতেই চুরি-চামারি করে এসবে প্রবেশ করেন, তাদের দ্বারা এই দেশ কতটুকু আগাবে আমার সন্দেহ হয়।

মাঝে মাঝে খুব হতাশ হই। এখন আর ছেলেমেয়েরা সেরকম গল্পের বই পড়ে না। ফেসবুকিং করে। গল্পলেখার আসরে গল্প পাঠায় না। হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে না, কবিতা যে পড়ে না আমি নিশ্চিত। তবে বিভিন্ন অনলাইন সেলিব্রেটির খুচরা পোস্ট পড়ে। সেই সেলিব্রেটি যদি বলে, ‘কাল পশ্চিম দিকেই সূর্য উঠবে, দেইখেন, আমি কইয়া রাখলাম’… ছেলেমেয়েরা সেটা নিয়ে তুমুল আলোচনা করবে অনলাইনে। কোনদিন sideralis এ গিয়ে সূর্যের গতিবিধি দেখবে না, জানবেও না Constellation গুলোর কত চমৎকার বাংলা নাম আছে! এই বৈশাখে গুলতি দিয়ে আম পাড়তে পারে না এরা, Tom Clancy’s Rainbow Six Vegas 2 খেলে।

এখন, তাদের এই ভালনারেবল অবস্থায় যদি শ্রদ্ধেয় অভিভাবকেরা হাতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তুলে দেন, তাহলে এদের পরের প্রজন্ম কি হবে চিন্তা করা যায়?! এরা এদের সন্তানদের হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে বলবে, যাও বাবা খুন করে আসো। আবার তাদের সন্তানকে এই সন্তানেরা বলবে, যাও বাবা বাংলাদেশ বেঁচে দিয়ে আসো। একবার ভেবে দেখুন তো। আমরা কি এগুলোই শিখাচ্ছি না আমাদের এই প্রজন্মকে? তাহলে এতো বাজে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আমরা কেমন করে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি বলুন?

তার মানে এই না যে, সব অভিভাবকই এমন। এরকম ভুল পথে পা বাড়ানো অভিভাবক আসলেই কম। এটা একটা আশার বিষয়। আমার এই লেখা হয়তো কোন ভুল পথে পা বাড়ানো অভিভাবক পড়ছেন না। কিন্তু আমি খুব কষ্ট পাই যখন এলাকার কোন ছোট ভাই বলে, ভাইয়া আর পড়ার দরকার কি? টাকা দিয়ে কোশ্চেন কিনে আপনার ভার্সিটিতে ভর্তি হব। ঝামেলা শেষ।

ছোট বয়সের মানুষগুলোর মাথায় ক্রমেই আমরা এইসব ঢুকিয়ে দিচ্ছি তাই না? আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে এসব রুখে দিবার জন্য। না আন্দোলন করে না। মন মানসিকতা বদলে। অভিভাবককে সন্তানদের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে হবে, কি অপরাধীটাই না ভাবছে সে আপনাকে।

আমরাই তো এসব নোংরা সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশকে দূরে রাখব তাই না?

৯ thoughts on “আমাদের অভিভাবক এবং কয়েকটি প্রশ্নপত্র…

  1. ধন্যবাদ আপনার এই পোস্ট এর
    ধন্যবাদ আপনার এই পোস্ট এর জন্য।

    এখন আর ছেলেমেয়েরা সেরকম গল্পের বই পড়ে না। ফেসবুকিং করে। গল্পলেখার আসরে গল্প পাঠায় না। হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে না, কবিতা যে পড়ে না আমি নিশ্চিত।

    হুমায়ূন আহমেদের বই-ই কেন সাজেস্ট করলেন বুঝলাম না। সাহিত্য কি একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ-ই লিখে গেছেন?

    1. আমি কোন সাজেস্ট করিনি, এবং
      আমি কোন সাজেস্ট করিনি, এবং কখনও বলিনি সাহিত্য একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ লিখে গেছেন…

      আমি হয়তো লিখতে পারতাম, রবীন্দ্র পড়ে না বা সুনীল পড়ে না… তখন আপনার মতই একজন বলে বসতো, কেন? সাহিত্য কি রবীন্দ্র বা সুনীলই লিখে গেছেন? এপার বাংলার লেখকেরা কি দোষ করল?

      আসলে আমি সাহিত্যের একটা রেফারেন্স দিবার জন্যই হুমায়ূন আহমেদের নাম বলেছি… 🙂

      ভালো থাকবেন… 🙂

    2. সহমত। হুমায়ূন আহমেদকে খাটো
      সহমত। হুমায়ূন আহমেদকে খাটো করে কিছু বলছি না, তবে উনার শেষ বয়সের লেখাগুলো সস্তা সাহিত্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আর উনি শেষ সময় হয়ে গিয়েছিলেন একজন সস্তা পুস্তক ব্যাবসায়ী।

  2. আমি হেলাল হাফিকেরএকটা
    আমি হেলাল হাফিকেরএকটা কবিতাএকটু অন্য রকম করে ………একটু চেঞ্জ করে প্রকাশ করায় কেও ধরতেই পারল না , মাঝ খান হতে ফাও পশংসা পেলুম ।
    তা হলে বুজেন

    1. ভাগ মতো পড়লে বুঝবেন। অবশ্য
      ভাগ মতো পড়লে বুঝবেন। অবশ্য ভাগে পড়ার সম্ভাবনা কম, দু পাতা হুমায়ূন আর পাতা দুয়েক তচলিমা নারচিন পড়লেই তো সবাই এখন বোদ্ধা পাঠক!

  3. গল্পের বই যে কেউ পড়ে না এ কথা
    গল্পের বই যে কেউ পড়ে না এ কথা সত্যি নয়। অনেক পরিবারে এখনো এই চর্চা আছে। অন্তত আমার কাছের পরিবারগুলোতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *