শফিক সাহেবের পহেলা বৈশাখ

(১)

অফিস থেকে এসেই শফিক সাহেবের স্বভাব টিভির সামনে গিয়ে একটানা নিউজ দেখা প্রতিটা চ্যানেলে। তখন বাসার অন্যদের সিরিয়াল , ছবি দেখা সব বন্ধ। অন্যরা বলতে শফিক সাহেবের এক মেয়ে ,মেয়েটা এবার ক্লাস নাইনে উঠল, তিনজনের সংসার একদম ছোট পরিবার।

(১)

অফিস থেকে এসেই শফিক সাহেবের স্বভাব টিভির সামনে গিয়ে একটানা নিউজ দেখা প্রতিটা চ্যানেলে। তখন বাসার অন্যদের সিরিয়াল , ছবি দেখা সব বন্ধ। অন্যরা বলতে শফিক সাহেবের এক মেয়ে ,মেয়েটা এবার ক্লাস নাইনে উঠল, তিনজনের সংসার একদম ছোট পরিবার।
শফিক সাহেব একটা গার্মেন্টস এর স্টোর অফিসার, যদিও নামে অফিসার কিন্তু মাঝে মাঝে এই উনাকেই কুলির মতো বড় বড় বস্তা নামাতেও হাত লাগাতে হয়। মাঝে মাঝে গায়ে লাগে, বি এ পাশ করা একজন মানুষ যদি এসব কাজ করে, কিন্তু আবার সয়ে নেয়, কারন এটা গার্মেন্টস, আজ যান বললে কাল থেকে চাকরি টা আর নেই। আর উনার পূর্ব পুরুষেরা উনার জন্যে তেমন কিছুই রেখে যান নি যা নিয়ে উনি টিকে থাকতে পারবেন, তাই সব সহ্য করেই এই চাকরি টা করছেন। উনি এই পদে আছেন প্রায় ৪ বছর কিন্তু ৪ বছরে ৫ বারে বেতন বেড়েছে ৩ হাজার টাকা, ডুকেছিলেন ৬ হাজার টাকায় আর এখন ৯ হাজার টাকা। এই দিয়েই ঘর ভাড়া সহ সব দিয়ে পুষিয়ে নিতে হিমসিম খেতে হয়, মাঝে মাঝে বৃষ্টির নানুবারি থেকে ওর মামারা কিছু পাঠায় নাহলে হয়ত আরও বেশি কষ্ট হত।

নিউজ চ্যানেলে একটা খবর হচ্ছিল, প্রতিবছর এই সময় টা তে ইলিশ মারা নিষেধ থাকলেও, বাজার থাকে ইলিশময়, কোত্থেকে আসে এই ইলিশ। এইটা ইলিশের প্রজনন সময়, এই সময় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু বাজারে কিভাবে যাচ্ছে ???
খবরের মাঝখানে ব্যাঘাত ঘটল শিল্পীর ডাকে “ এই বৃষ্টির বাবা খেতে আসো ” অনিচ্ছা সত্ত্বেও টি ভি টা বন্ধ করে খাবার টেবিলে গেলেন, কারন উনি জানেন উনি না যাওয়া পর্যন্ত অন্যরা বসে থাকবে।

খাবার টেবিলে হটাত বৃষ্টি বলে উঠল – বাবা পরশু কি জানো তো ???
শফিক সাহেব – কি মা ? পরশু কি ? তোর জন্মদিন তো না ? এইত কিছুদিন আগেই গেলো ? তোর স্কুলের বেতনও দিয়ে এলাম ১০ তারিখ , হুম, বুঝতেছিনা মা, তুই ই বল ।
বৃষ্টি – ধুর বাবা, তোমার কিচ্ছু মনে থাকে না, পরশু ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ।
শফিক সাহেব – ও হ্যা ঠিক তো, এই জন্যেই তো গত কাল অফিস ছুটির দিনেও চলল, ১৪ তারিখ বন্ধ থাকবে বলে, বয়স হয়েছে তো ভুলে যাই মা।
বৃষ্টি – জি না, আমার বাবা মোটেও বুড়া না, তুমি বেশি বুঝ হুহ। শুন না বাবা ওইদিন সবার ঘরে পান্তা ইলিশ খাবে, আমরা খাবো না বাবা ? আর ওই রিমি রা কাল বের হবে সবাই, সবাই নতুন শাড়ি কিনেছে, আমি বের হই বাবা ? মার ওই লাল পারের সাদা কালো কাজ করা শাড়িটা পড়ব , বল না বাবা বের হই ??
শঃ সাহেব – আচ্ছা ঠিক আছে মা, কিন্তু সাবধানে যাবি, আর সবাই একসাথে থাকবি, দেখে রাস্তা পার হবি।
বৃষ্টি – আচ্ছা আচ্ছা, আমি আর ছোট নেই, এতো চিন্তা না করলেও হবে। বল না বাবা কাল ইলিশ আনবে না ?
শঃ সাহেব – বৈশাখে তো ইলিশের গায়ে আগুন লাগে রে মা, যা দাম। তাও দেখি আনবো।
বৃষ্টি – হ্যা বাবা এনো এনো , কতদিন ইলিশ খাই না। সেই কতদিন আগে ছোট মামা নানু বাড়ি থেকে এনেছিল এরপর আর খাওয়ায় হয় নি।
বৃষ্টির মা শফিক সাহেবের চেহারা দেখে হটাত বলে উঠলেন “ এই তোরা বাপ মেয়ে কথা বলবি না খাবি ?? এই বৃষ্টি তোর না স্কুল আছে কাল, যা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়।”

(২)

রাত তখন প্রায় ৩ টা হটাত শিল্পীর ঘুম ভেঙ্গে গেলো, দেখে পাশে বৃষ্টির বাবা নেই। কি ব্যাপার এতরাতে উনি কই গেলেন। উঠে দেখে বারান্দার দরজা খোলা। বারান্দায় বসে বসে শফিক সাহেব সিগারেট খাচ্ছিলেন।

শিল্পী – কি ব্যাপার তুমি এতো রাতে এইখানে কি কর ? আর এই সময়ে সিগারেট তো তুমি খাও না, কি হয়েছে ?

শফিক সাহেব – না তেমন কিছুই না, এমনেই ঘুম আসছিল না তাই।

শিল্পী – উহু কিছু তো একটা হয়েছে, তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি তোমার বউ, আমার কাছে কেন লুকাও ?? কি হয়েছে আমাকে বল তো। অফিসে কিছু হয়েছে ??

শফিক সাহেব – না আসলে বৃষ্টির কথা ভাবছিলাম, মেয়েটা কখনও কিছু চায় না, আর আমার মেয়েটা অনেক বুঝে দেখলা, ওর বান্ধবীরা সবাই নতুন শাড়ি কিনেছে কিন্তু ও বলল ও তোমার পুরানো শাড়িটাই পড়বে। একদম তোমার মতো হয়েছে মেয়েটা। মেয়েটা ইলিশ মাছ খেতে চাইল কিন্তু কিভাবে আনবো মাথায় আসছে না। ঘর ভাড়া, আর কাঁচা বাজার করে হাতে আছে কেবল গাড়ি ভাড়া আর মাস চালানোর খরচ।

শিল্পী – আরেহ বাদ দাও তো ছোট মেয়ে এমনেই বলেছে দেখবে ওইদিন বন্ধুদের সাথে ঘুরার খুশিতে সব ভুলে যাবে, তুমি এইগুলা নিয়ে টেনশন করো না, আসো শুতে আসো। কাল সকালে অফিস তো যেতে হবে।

এই বলে শিল্পী অনেকটা হাত ধরে টেনে নিয়েই রুমে চলে গেলো।

একাউন্টস – কি শফিক সাহেব কি খবর ? আছেন কেমন ?

শফিক সাহেব – এইত স্যার আপনাদের দোয়ার। আপনি কেমন আছেন, ভাবিরা ভালো আছে ?

একাউন্টস – হ্যা ওরা ভালোই আছে, আপনি হটাত এই তলায় ? কিছু বলবেন ?

শফিক সাহেব – না মানে স্যার কিছু এডভান্স লাগতো হাজার খানিকের মতো।

একাউন্টস – শফিক সাহেব আপনি সিনিওর অফসার আপনার তো জানার কথা হেড অফিস থেকে কড়া নিষেধ মাসের শেষ ১০ দিনের আগে কাউকে এডভ্যান্স দেওয়া বন্ধ।এখন আমি কি করি বলুন তো ? আমিও চাকরি করি নাকি ? নিয়ম না মানলে তো আমাকেও কাল থেকে বলে দিবে আপনি আসেন।

শফিক সাহেব – সবই বুঝি স্যার, খুব দরকার ছিল তাই।

একাউন্টস – কি করব বলেন, আচ্ছা এই নেন ৩০০ টাকা, এইটা আমার নিজের পকেট থেকে দিলাম। এর বেশি আর পারলাম না ভাই।

শফিক সাহেব – অনেক ধন্যবাদ স্যার, অনেক বেশি ধন্যবাদ ।

পরদিন অফিস বন্ধ তাই ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা করেই কাঁচা বাজারের দিকে গেলেন শফিক সাহেব, পকেটে সম্বল ৪০০ টাকা। প্রায় অনেক্ষন পুরা বাজারে ঘুরলেন সব জায়গায় বড় ইলিশ, আর ইলিশ আজ কেজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে না। বেশিরভাগ ই জোড়া জোড়া, এর একেক জোড়া ইলিদাম ১৪০০, ১২০০ সব হাজারের উপরে।
দূর থেকে একজায়গায় অন্যদের থেকে একটু ছোট আকারে ইলিশ দেখলেন, মন টা খুশিতে ভরে উঠল। তাড়াতাড়ি ওইদিকেই গেলে।

– ভাই ইলিশ কত ?
– একদাম জোড়া ৭০০ ।
– ভাই কম হয় না। কিছু কমায় রাখেন ভাই।
– কয় জোড়া নিবেন ? ২ জোড়া নিলে ৫০ টাকা কম।
– না ভাই কমায় রাখলে ১ টা নিতাম আর কি।
– না রে ভাই, একটা মাছ নাই, আমি আরেকটা মাছ কার কাছে বেচুম ?? ভাই এর চেয়ে আপনি চাপিলা মাছ কিনেন, এইটাই পুরাই ইলিশ মাছের স্বাদ আর কেজি মাত্র ২০০ টাকা।
শফিক সাহেব চুপচাপ সরে আসলেন, ইচ্ছে করছিল মাছ বিক্রেতা কে কিছু কথা শুনাতে, কিন্তু তাও কেন যেন চলে আসলেন, পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছিলেন মাছ বিক্রেতা বলছে “ পকেটে নাই ট্যাকা আইছে ইলিশ মাছ খাইতে, কত্তুন যে আহে এসব ”

(৩ )

বৃষ্টি হেঁটে যাওয়ার পথ টা আজ রিক্সা করেই ফিরছে খুব ক্লান্ত লাগছে, আজ সারাদিন অনেক বেশি মজা করেছে সে, আজ জীবনে প্রথমবারের মতো নাগরদোলায় চড়েছে, সারাদিন মেলায় ঘুরেছে। আরও নতুন কিছু বন্ধু পেয়েছে, সব মিলিয়ে অনেক খুশি সে। আসার সময় রিমি বার বার করে বলছিল ওদের বাসায় খেয়ে যেতে ওর আম্মা আজ ইলিশ মাছের অনেক রকম রান্না করেছে, ভুনা, সরিষা ইলিশ আরও কত কি। বৃষ্টিও শুনিয়ে শুনিয়ে বলে এসেছে আজ ওদের ঘরেও কেবল ইলিশ মাছ। মা না খেয়ে বসে থাকবে তাই সে কোনভাবেই খেতে পারবে না ।

বৃষ্টি যখন বাসায় পৌছায় তখন প্রায় ৯ টা। সে দ্রুত রুমে গিয়ে কাপড় পাল্টে নিল, আর ফ্রেশ হয়ে এসেই মা কে বলল মা তাড়াতাড়ি খাবার দাও খুব খিদা পেয়েছে।

বৃষ্টির মা – এমনে তো তোকে ১২ টা বাজেও ডেকে খাওয়াতি পারিনা, আজ ১০ টা বাজার আগেই খিদা লেগে গেলো ??

বৃষ্টি – হু লাগছে লাগছে, দাও দাও তাড়াতাড়ি খেতে দাও।
খাবার টেবিলে আনার সাথেই সাথেই বৃষ্টি বাবাকে বারান্দা থেকে নিয়ে এসে বসে গেলো। শফিক সাহেব যদিও বার বার বলছিল এখন খিদে নেই, তাও মেয়ের জোরাজুরি তে না এসে পারলেন না।
প্লেটে খাবার নিয়েই বৃষ্টি বলে উঠল কই মা ইলিশ মাছ টা নিয়ে আসো, সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি কখন খাবো, যাও যাও।

শফিক সাহেব – মা শোন আজ এক ঘটনা হয়েছে সকাল বেলা বাজারে গেলাম তোর কথা মতো ইলিশ কিনতে, কিন্তু বাজারে গিয়েই দেখি সব ছোট ছোট ইলিশ, অপরিপূর্ণ, তখনই মনে পড়ল কালকের খবরের কথা এই ইলিশ মাছ খাওয়া অবৈধ। এখন ইলিশ মাছ খাওয়া ও ধরা সম্পূর্ণ অবৈধ তাই আর কিনিনি রে মা, এই দেখ চাপিলা মাছ এনেছি, এর স্বাদ ইলিশ মাছের কাছেও হার মানে, দেখতে কি সুন্দর দেখ খেয়েই দেখ।

শফিক সাহেব দূর থেকে দেখলেন বৃষ্টির চোখ ছল ছল করছে, উনি নিজ চোখে মেয়ের কান্না দেখতে পারবেন না তখন উঠে যেতে চাচ্ছিলেন তখন বৃষ্টি বলে উঠল।

বৃষ্টি – ওহ রে, বাবা আমি তো ভুলেই গেছিলাম, কাল আমাদের রফিক স্যার ও ঠিক এই কথাটাই বলছিলেন, এখন ইলিশ মাছ ধরা ও খাওয়া আইনত অপরাধ। কারন এটা ওদের প্রজননের সময়। এই সময় ইলিশ ধরলে ওদের বংস ধ্বংস হয়ে যায় আর এতে এতে আস্তে আস্তে ইলিশ হারিয়ে যাবে। তুমি ঠিক করেছ বাবা। মা কই মাছ টা দাও প্লেটে খুব খিদা পেয়েছে।

শফিক সাহেবের মনে তখন একটা কথায় ঘুরছিল “ বৃষ্টি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, এইত কিছুদিন আগে ১৪ ছেড়ে ১৫ তে পা রাখল, অনেক কিছুই বুঝতে দিখে গেছে আমার মেয়েটা, অনেক কিছুই কাটিয়ে নিতে শিখে গেছে। ”

৩ thoughts on “শফিক সাহেবের পহেলা বৈশাখ

Leave a Reply to মরহুম Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *