পিশাচ উপন্যাসিকা ‘বংশালের বনলতা’ part5

part1 http://www.istishon.com/node/6831
part2 http://www.istishon.com/node/6993
part3 http://www.istishon.com/node/7134
part4 http://istishon.blog/node/7803
১৫

part1 http://www.istishon.com/node/6831
part2 http://www.istishon.com/node/6993
part3 http://www.istishon.com/node/7134
part4 http://istishon.blog/node/7803
১৫
রাস্তা ফাঁকা, গাড়িঘোড়া নেই বললেই চলে। শেখ সাহেব চতুর্থ সংশোধনী দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আর খবরের কাগজের মুখÑদুটোই বন্ধ করেছেন। মাঝেমধ্যেই গাঢ় সবুজ রঙের উর্দি পরা রক্ষীবাহিনীর গাড়ি পাশ দিয়ে হুসস্ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই বাহিনীর জওয়ানেরা সারা দিন রেকি করে। একটা মাছিও গলতে পারবে না এদের চোখের সামনে দিয়ে। খান সেনাদের উচিত ছিল এদের কাছে ট্রেনিং নেওয়া। ফুলবাড়িয়া রেলগেট (সেই সময় ফুলবাড়িয়াতে বাসস্ট্যান্ডের জায়গায় একটা রেলওয়ে স্টেশন ছিল) পার হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালের কাছে ডানে মোড় নিল রিকশা। ঠিক সেই সময় মুখ খুললেন জীবন বাবু,
‘আপনি লিলিথ হাউসে কত দিন হলো আছেন?’
‘কী হাউস বললেন? “লিলি” হাউস?’
‘ভাই, লিলি হাউস তো বলিনি। বলেছি লিলিথ হাউস।’
‘এ আবার কী ধরনের নাম। জীবনেও শুনিনি। ও বাড়ির যে একটা নাম আছে, তাই-ই তো জানতাম না।’
‘না জানাই স্বাভাবিক। নামফলকের মার্বেল স্ল্যাবটা তুলে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। তা ছাড়া ‘করিম্যা’ কমিশনার যে বাড়ির মালিক, সেই বাড়ির নাম যদি দেওয়াও হয়, তাহলে সেটা হবে “হাজেরা কুটির”।’
‘জীবন বাবু, কিছু যদি মনে না করেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করি?’
‘শুনুন ভাই সাহেব, আমি কালীঘাট হাইস্কুলের হেডমাস্টার। সারা দিন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার অন্যতম প্রধান কাজ। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে একাধিক প্রশ্ন করেন।’
‘বাড়িটা সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কী করে আপনি? আমার সাথে কথাই বা বলতে চান কেন?’
‘প্রথমে প্রশ্নের উত্তরে বলছি, ওই বাড়িটা একসময় আমার ঠাকুর্দার ছিল। আমার ছেলেবেলা কেটেছে ওখানেই। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো, বহুদিন আগে নিদারুণ এক দুর্ঘটনার কারণে এই বাড়িটি আমাদের ছেড়ে যেতে হয়েছিল। স্কুলের একটা কাজে ঢাকা ডিজি অফিসে এসেছিলাম। সন্ধের লঞ্চে খুলনা ফিরে যাব আজকেই। নবাবপুর রোডের যে হোটেলে উঠেছি, সেটি ওই বাড়িটা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ভাবলাম, এত কাণ্ড যে বাড়িতে ঘটল, সেটা একবার দেখেই আসি। ওখানে যদি কেউ থাকে, তার সাথে দুটো কথাও বলা যাবে।’

দুর্দান্ত এই লোকের কথা বলার আর্ট। যাকে বলে টু দ্য পয়েন্ট কথা বলে মানুষটি। বঙ্গদেশে একশো জনের ভেতর নিরানব্বই জনেরই এই গুণটির অভাব আছে। এঁর কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে। গুলিস্তান সিনেমা হল পার হচ্ছে রিকশা। পাঁচ-সাত মিনিটের ভেতর দৈনিক বাংলার মোড়ে পৌঁছে যাবে। ভেবে দেখলাম, এঁর কাছ থেকে হয়তো পুরো ঘটনাটা শোনার একটা সুযোগ থাকলেও থাকতে পারে। বলা যায় না, মূর্তিটার ব্যাপারেও এঁর কিছু না কিছু জানা আছে।
মতিঝিল থেকে স্টেডিয়ামে ঢোকার গেটের পাশেই একটা ভালো রেস্টুরেন্ট ছিল, এখনো আছে। জীবন বাবুকে নিয়ে গেলাম সেখানে। একে তো রোববার, তার ওপর লাঞ্চ আওয়ারের এখনো অনেক দেরি। ফাঁকা রেস্টুরেন্টে সমুচা আর দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে কোনার একটা টেবিলে থিতু হয়ে বসলাম দুজনে। জীবন চৌধুরীকে বললাম,
‘বাবু, স্বীকার করছি আমার পুরো মনোযোগ আপনি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। আমার ধারণা, রিকশায় বসে যে কথাগুলো আপনি বললেন, সেটা আসলে মূল বক্তব্যের ভূমিকা। ডিনার সার্ভ করার আগে অ্যাপিটাইজার। আপনাকে এখানে নিয়ে আসার পেছনে একমাত্র কারণ আপনার মূল বক্তব্য শোনানো। আপনি শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষ, আশা করি, আমার উদ্দেশ্য ধরতে পেরেছেন। মনে হয়, এখন আপনার ঝেড়ে কাশার সময় হয়েছে, কী বলেন?’
দুটো মাংসের পুর দেওয়া সমুচা খেয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে কথা শুরু করলেন জীবন বাবু,
‘আপনকে গোড়া থেকেই বলি। ১৮৫৫ সালে ওই বাড়িটি বানিয়েছিল আইজ্যাক কোহেন নামের এক ইহুদি। বেশির ভাগ লোকই মনে করে বাড়িটি আর্মেনীয় ধাঁচের। আসলে ওটার স্থাপত্যশৈলী সিরীয়। তখন দেশে চলছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চালু করলেন তাঁর কুখ্যাত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন। সারা দেশ জুড়ে সৃষ্টি হলো বড় বড় সব আয়েশি জমিদারের। এসব জমিদারদের বখে যাওয়া ছেলেদের চড়া সুদে হ্যান্ডনোটে টাকা ধার দেওয়াই ছিল কোহেনের মূল ব্যবসা। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড়ের বুকির কাজও করত সে। কোহেনের এ দেশে ঘাঁটি গড়ার পেছনে ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে। লন্ডনে বসে ইংরেজরা দেখল ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসারেরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে। কথাটা খুবই সত্যি। এত বড় ঐশ্বর্যশালী ভূখণ্ডের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যদি ইংল্যান্ডের একটি কোম্পানি হয়, তাহলে কোম্পানির লোকেরা ওই অঢেল সম্পদের একটি অংশ তাদের পকেটে তো পুরবেই। কোম্পানির কর্মচারীরা তখন ব্যবসা-বাণিজ্য দুর্নীতি কিংবা নীল চাষ করে দুহাতে পয়সা লুটছে। এ রকম অবস্থায় দলে দলে ইংরেজ ভাগ্যান্বেষী এ দেশে আসতে থাকে। তবে এ কথা ঠিক যে তাদের অনেককে নিঃস্ব হাতেও এখান থেকে ফিরতে হয়েছে।
কোহেনের ব্যাপারটা ভিন্ন। সে টাকা বানিয়েছিল অন্যভাবে, হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ব্রিটিশ নাগরিক হলেও কোহেনের বাপ-ঠাকুর্দা ছিল সিরীয়। সিরিয়ার এমন কিছু ইহুদি আছে, যারা পুজো করে অত্যন্ত প্রাচীন কিছু অপদেবতার। বহু আগে থেকেই ইহুদিরা অর্থলোভী চশমখোর হিসেবে সারা দুনিয়ায় পরিচিত। এরা বিশ্বাস করে, কিছু প্রাচীন অপদেবতা আছে, যাদের নৈবেদ্য দিলে প্রচুর অর্থলাভ ঘটে। এদের কাবালিস্টও বলা যায়। কোহেনের বাপ-দাদারা ছিল এমনই একটি কাল্ট বা সঙ্ঘের সদস্য। এই কাল্টের আদি গুরু রাব্বি আকিবা বাস করত সিডন নামের প্রাচীন এক নগরে। আকিবা সাফির যাযির এবং যোহর নামের দুটো বইয়ে সবকিছু লিখে রেখে যায়। সে-ও আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগের কথা। ধীরে ধীরে ভয়ংকর শক্তিশালী হয়ে ওঠে এই কাল্ট। সাধারণ ইহুদি খ্রিষ্টানরা দেখল সবকিছু কাল্টের দখলে চলে যাচ্ছে। এদের না থামালে আর চলছে না। তারা একসাথে হয়ে ঘোষণা দিল, এই কাল্টের সদস্যরা আসলে শছু ানের পুজো করে। তাদের প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা হোক। রাতারাতি প্রাণ হারাল কাল্টের অসংখ্য সদস্য।
আমার ধারণা, কোহেনও সেই দলেরই একজন। তবে সে সব পরিচিত অপদেবতা বাদ দিয়ে পূজা করত এক অপদেবীর। এই অপদেবীর নামই লিলিথ। দেবীর শ্রীচরণে পুরো বাড়িটাই উৎসর্গ করে কোহেন, নাম দেয় ‘লিলিথ হাউস’। বাড়ির দোতলায় বড় একটি হলঘরকে সে বানিয়েছিল তার রংমহল। সেখানে মদ, জুয়া, বাইজি নাচÑসব অপকর্মই সমানে চলত। ঝামেলা শুরু হলো এখান থেকেই। আজকাল বারবনিতারা সমাজের বোঝা। কিন্তু তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বেশ্যারা ছিল সমাজের মান্যগণ্য বিত্তশালী সম্প্রদায়। রবীন্দ্রনাথের গল্প-কবিতায় নগরের নটীর উল্লেখ আছে শয়ে শয়ে। ওটা থেকেই এদের গুরুত্ব বোঝা যায়। সেকালে নামকরা নটীদের নিজ বাড়িতে এনে মজমা বসানো আভিজাত্যের অন্যতম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোহেন ছিল ঢাকার সেরা এক নটী কনকলতার নিয়মিত গ্রাহক। সপ্তাহে দুদিন লিলিথ হাউসে সে তাকে আনবেই। নটীও কোহেনকে সাধারণ গ্রাহক হিসেবে না দেখে অনুরাগী হিসেবেই দেখতে শুরু করল। হাজার হলেও কোহেন শ্বেতাঙ্গ, তার ওপর অসম্ভব শক্তিশালী।
একবার বিক্রমপুরের অল্প বয়সী এক জমিদার কোহেনের অতিথি হয়ে কনকলতার সান্নিধ্যে এল। এর পর থেকেই কনকলতাকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠল সে। ইচ্ছে, কনকলতাকে পাকাপাকিভাবে নিজের কাছে রেখে দেবে। কিন্তু কোহেন তো সেটা মেনে নিতে পারে না। এ নিয়ে একদিন গন্ডগোল চরমে উঠলে বিক্রমপুরের জমিদার সবার সামনে কোহেনকে শুয়োরখেকো বিদেশি সাদা কুত্তা বলে গালি দিলে বসল। কোহেনও কম যায় না। সে ধরল ঢাকার পুলিশ সুপার অ্যান্ড্রু ম্যার্থাসকে। একজন ব্রিটিশ নাগরিককে হুমকি দেওয়ায় তিন মাসের জেল হয়ে গেল বিক্রমপুরীর। নব্বই দিনের জেল-জীবনে জমিদার প্রতিজ্ঞা করল, ইহুদি সুদখোরের শেষ দেখে ছাড়বে।
বিক্রমপুরীর কপাল ভালো। ইহুদির শেষ দেখার জন্য তাকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর ঢাকার কিছু সিপাহিকে টাকা খাওয়াল বিক্রমপুরী। এক রাতে লিলিথ হাউসে হানা দিল বিদ্রোহী সিপাহিরা। কোহেন তখন দোতলার রংমহলে কনকলতার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। প্রথমে রংমহলের দামি ইরানি কার্পেটের ওপর দুজনকে জবাই করে সিপাহিরা। এরপর কোহেনের হাত, পা, জিহ্বা, পুরুষাঙ্গ কেটে টুকরো করে আগুন লাগিয়ে দেয় ঘরটিতে।
আমার ঠাকুর্দা অশ্বিনীকুমার চৌধুরী ১৯২১ সালে বাড়িটা নিলামে কিনে নেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, সেই সময় বঙ্গভঙ্গ বড় একটা ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছিল। পূর্ববঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা করার পর আবার একসাথে জোড়া লাগানোর কারণে ঢাকার নবাবরা তখন ইংরেজ সরকারের ওপর নাখোশ। নবাবদের খুশি করার জন্য মরিয়া ইংরেজ সরকর। প্রচুর টাকা খরচ করে ঢাকায় নানান রকমের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে লাগল তারা। বদলে যেতে লাগল নগরের গুরুত্ব ও চেহারা। হাসপাতাল, জেল, পুলিশ বিভাগে এটা-সেটা সাপ্লাই করে ঠাকুর্দা তখন অনেক টাকার মালিক। ঠাকুর্দারা খুলনার বাগেরহাটের লোক, ওঁর বাবা ছিলেন স্থানীয় জমিদারের নায়েব। তখন সব ফ্যামিলিই ছিল জয়েন্ট ফ্যামিলি। আমরা সবাই বাগেরহাট থেকে এসে ওই বাড়িতে উঠলাম। আর্মানীটোলার এক মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলাম আমি।
ইসলামপুরে বড় একটা দোকান কিনে কাপড়ের পাইকারি কারবার শুরু করলেন বাবা। ঠাকুর্দা থাকলেন তার পুরোনো ব্যবসা অর্থাৎ নিলামে ওঠা বাড়িঘর আর জমি কেনাবেচা নিয়ে। পয়সা আসতে লাগল হু হু করে। সেই সাথে আসতে শুরু করল সমস্যাও। তিন দিনের কী এক জ্বরে ঠাম্মা মারা গেলেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য কলকাতা থেকে আইস বক্সে ভরে পেনিসিলিন অ্যাম্পুল আনা হলো। তবে সেই পেনিসিলিন এসে যখন পৌঁছাল, তখন ঠাম্মা ধরাধাম ত্যাগ করেছেন। এর পরই বদলে যেতে লাগলেন ঠাকুর্দা। প্রতিদিন পাঁড় মাতাল হয়ে বাড়িতে ফিরতে লাগলেন। রেগে থাকতেন সব সময়, কথা বলতেন চিৎকার করে, ব্যবহার করতেন সদরঘাটের কুলিদের ভাষা। বাড়ির লোকের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন মূর্তিমান বিভীষিকা। এরই মধ্যে আমার মায়ের গর্ভপাত হলো, যখন তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মায়ের এমন অবস্থা দেখে তাঁর সেবা-শুশ্রƒষার জন্য বাবা খুলনা থেকে আমার এক বিধবা মাসিকে নিয়ে এলেন। খুব অল্প বয়সে বিধবা হওয়া এই মাসি তখন পূর্ণ যুবতী। একরাতে মা’র অবস্থা বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হলো। মাসির কাছে আমাকে রেখে বাবা তাঁকে নিয়ে গেলেন রেলওয়ে হাসপাতালে। রাতদুপুরে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলেন ঠাকুর্দা। মা অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর খাবার-দাবারের দাছিু ¡ পড়েছিল মাসির ওপর। মাসি তাঁকে রাতের খাবার দিতে গেলেন। ফিরলেন অনেক দেরি করে আলুথালু হয়ে। ঠাকুর্দা তাঁর সর্বনাশ করেছেন। সেই রাতেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন মাসি এবং ভোরের দিকে হাসপাতালে মারা যান আমার মা।
সকালে মায়ের লাশ নিয়ে বাসায় ফিরে বাবা দেখলেন, ঠাকুর্দা সেখানে আরেক নাটক সাজিয়ে বসে আছেন। দুজন কনস্টেবলসহ লালবাগ থানার দারোগা মাসির লাশ সামনে শুইয়ে রেখে তাঁর পথ চেয়ে আছে। বাবা ওই যে থানায় গেলেন, আর ফিরলেন না। বিচারে দশ বছরের জেল হয় তাঁর। ফুসফুসে পানি জমে জেলখানাতেই মারা যান ছয় মাসের ভেতর। এই ঘটনার পর এক বছর বেঁচে ছিলেন ঠাকুর্দা, তবে তা না থাকার মতোই। বিচিত্র এক রোগে ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল তাঁর হাত, পা, মুখ। শুয়ে থাকতে থাকতে বড় বড় সব ঘা হয়েছিল সারা গায়ে। লোকে বলত, কেউ তাঁকে বান মেরেছে। বান মারা রোগীর কোনো চিকিৎসা নেই। কথা বলতে পারতেন না, পারতেন না শক্ত কোনো খাবার খেতে। সারা দিন শুয়ে শুয়ে শুধু গোঁ গোঁ আওয়াজ করতেন। বোঝা যেত অসহ্য কষ্ট ভোগ করছেন। রাজ্যের যত গরিব অপদার্থ আত্মীয়স্বজনে বাড়ি ভরে থাকত। দেখতে দেখতে চিকিৎসার নামে ঠাকুর্দার টাকা-পয়সা, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ফুঁকে দিল তারা। শেষের দিকে না খেতে পেয়ে ধুুঁকে ধুঁকে মারা যান ঠাকুর্দা। এরপর আমার মামারা আমাকে খুলনায় নিয়ে যান। আজ অবধি ওখানেই আছি।’
জীবন বাবু এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে মনে হলো চিত্রনাট্য থেকে সংলাপ পড়ে শোনাচ্ছেন। হয়তো তাঁর সব কথাই সত্যি, তবু কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। তাঁকে বললাম,
‘আপনারা এই বাসায় উঠেছিলেন কত সালে? বয়স কত তখন আপনার, আর এত সব জানলেনই বা কীভাবে?
‘পাবেন, আপনার সব প্রশ্নেরই জবাব পাবেন। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। ঠাকুর্দা বাড়িটা কিনে ঠিকঠাক করেন প্রথমে। আমরা উঠি ১৯২৫ সালের দিকে, আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আমার স্মরণশক্তি মন্দ নয়। তা ছাড়া এই বাড়িটিতে ওঠার পরপরই আমূল বদলে যায় আমাদের জীবন, ছারখার হয়ে যায় পুরো পরিবার। ছেলেবেলা থেকেই বাড়িটা সম্পর্কে একটা অদ্ভুত ধারণা আছে আমার। কেন যেন মনে হয়, সাংঘাতিক অশুভ একটা কিছু আছে ওখানে। বিষয়টি আমার মধ্যে একধরনের অবসেশনের জন্ম দিয়েছে। ওখানে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, সেইটে জানার জন্য বহু বছর ধরে তিল তিল করে ওটার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেছি।’
‘আপনার দাদা ঠিক কোন ঘরটাতে থাকতেন, বলতে পারবেন?’
‘ঠাকুর্দা প্রথমে থাকতেন দোতলার রংমহলে। ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর নিচতলায় চলে আসেন। বাড়িটিতে ঢুকতেই ডান দিকে ঘেরটোপ বারান্দাঅলা যে ডায়মন্ড শেপ্ড রুমটা আছে, তার পরের ছোট কামরাটিতে। মারাও যান ওখানেই। ঘরের কথাই যখন উঠালেন, তখন বলি। আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন, ঠাকুর্দা তাঁর ঘরের ক্লজিটের কাছে কখনো কাউকে যেতে দিতেন না। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা অবস্থাতেও অনেকবার তাঁকে দেখেছি ক্লজিটের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে। ওদিকে কেউ যাওয়ার চেষ্টা করলে আঁ আঁ করে চিৎকার জুড়ে দিতেন। অনেকেই ভেবেছিল, ঠাকুর্দা ওখানে সোনার মোহর চাঁদির টাকা ঘড়া ভর্তি করে রেখেছেন। তিনি মারা গেলে ক্লজিট খুলে দেখা গেল, সেখানে কিছুই নেই, সম্পূর্ণ খালি.

(চলবে)
mtoimoor@hotmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *