রেমেদিওস, প্রিয়তম মার্কেসকে দেখে রেখ..

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্য দুনিয়ায় বড় একটা পালা বদল হয়ে গেল। কথা সাহিত্যে যাদু বাস্তবতার রোমান্টিক অধ্যায়ের শেষ হল? না, প্রসঙ্গটা তার চেয়েও আরও বেশী বিস্তৃত। মার্কেস চলে গেলেন, কথা সাহিত্য রচণা শৈলীর একটি যাদুকরী অধ্যায়েরও শেষ কিংবা নতুন অধ্যায়ের যাত্রা শুরু হওয়ার অপেক্ষা শুরু হল। কথা সাহিত্যে যাদু বাস্তবতার অন্য সব লেখকের চেয়ে মার্কেসের রচণা শৈলী একেবারেই পৃথক ছিল। মার্কেস শুরু করতেন একেবারে ভেতর থেকে। তার যে কোন উপন্যাস পড়ার শুরতেই মনে হবে, অনেকক্ষণ আগে শুরু হওয়া একটি গল্পের মাঝখান থেকে যাত্রা শুরু হল, এখন ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে পথ চিনে নিয়ে চলতে হবে। যেমন নি:সঙ্গতার একশ’ বছরের শুরুটাই দেখুন না! ‘বহু বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল আরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ারের মনে পড়ে যাবে সেই দূর বিকেলের কথা, যেদিন তাকে সঙ্গে নিয়ে বরফ আবিস্কার করেছিল তার বাবা(নি:সঙ্গতার একশ’ বছর, জি এইচ হাবীবের অনুবাদ থেকে)।



গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্য দুনিয়ায় বড় একটা পালা বদল হয়ে গেল। কথা সাহিত্যে যাদু বাস্তবতার রোমান্টিক অধ্যায়ের শেষ হল? না, প্রসঙ্গটা তার চেয়েও আরও বেশী বিস্তৃত। মার্কেস চলে গেলেন, কথা সাহিত্য রচণা শৈলীর একটি যাদুকরী অধ্যায়েরও শেষ কিংবা নতুন অধ্যায়ের যাত্রা শুরু হওয়ার অপেক্ষা শুরু হল। কথা সাহিত্যে যাদু বাস্তবতার অন্য সব লেখকের চেয়ে মার্কেসের রচণা শৈলী একেবারেই পৃথক ছিল। মার্কেস শুরু করতেন একেবারে ভেতর থেকে। তার যে কোন উপন্যাস পড়ার শুরতেই মনে হবে, অনেকক্ষণ আগে শুরু হওয়া একটি গল্পের মাঝখান থেকে যাত্রা শুরু হল, এখন ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে পথ চিনে নিয়ে চলতে হবে। যেমন নি:সঙ্গতার একশ’ বছরের শুরুটাই দেখুন না! ‘বহু বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল আরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ারের মনে পড়ে যাবে সেই দূর বিকেলের কথা, যেদিন তাকে সঙ্গে নিয়ে বরফ আবিস্কার করেছিল তার বাবা(নি:সঙ্গতার একশ’ বছর, জি এইচ হাবীবের অনুবাদ থেকে)।

মার্কেস ধারাবাহিকভাবে একই ধারায় গল্প বলেন না। এক একটা চরিত্র তুলে ধরেন এবং তার আদ্যপান্ত বর্ণনা করেন। চরিত্রের বর্ণনার ভেতর দিয়েই তিনি এক কাহিনী থেকে পাঠককে আরেক কাহিনীতে নিয়ে যান। তার রচণা শৈলীর এই বিশেষত্বকে অনেকে তুলনা করেছেন বাইজানটাইন যুগের মোজেইক শিল্পকর্মের সঙ্গে। এটাকেই আর একটু এগিয়ে গিয়ে বলা যায়, বাইজানটাইন সভ্যতা যেমন ইউরোপীয় সভ্যতার পতন্নোমুখ সময়ে শিল্প সম্পদের অফুরান ভান্ডারর হিসেবে বিশ্ব সভ্যতার আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল, যাদু বাস্তবতার রাজনৈতিক পটভূমি থেকে বিশ্ব যখন ভার্চুয়াল বাস্তবতার উত্তরণের সন্ধিক্ষণে, খোনে মার্কেসই ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের স্রস্টাদের ভেতরে শেষ ‘মানবিক চরিত্র’। মার্কেস নিজেও হয়ত সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। এ কারনেই তার শেষ চিঠিতে তার দেখা সর্বশেষ সময়ের মানুষগুলোর জন্য তার এই নিতান্ত মানবিক আহবান, “তরুণ কিংবা বৃদ্ধ কারোর জন্যই আগামীকালটি নিশ্চিত নয়। হতে পারে আজই তুমি শেষবারের মতো দেখতে পাচ্ছ, যাকে তুমি ভালোবাসো। অতএব, আর অপেক্ষা না করে যা করার তা আজই করে নাও, যেহেতু আগামীকাল কখনো আসবে না। তখন ব্যস্ত থাকার কারণে শেষ আকাঙ্ক্ষাটি বলতে না পারার জন্য এবং একটি হাসি, একটু আলিঙ্গন আর একটি চুমুর জন্য সময় না পাওয়ার জন্য নিশ্চিতভাবেই বিলাপ করবে। যাদের ভালোবাসো তাদের তোমার কাছে রাখো; তাদের কানের কাছে গিয়ে বলো যে তাদের তোমার ভীষণ প্রয়োজন এবং তাদের তুমি ভীষণ ভালোবাসো। সব সময় তাদের সঙ্গে সুব্যবহার কোরো; ‘আমি দুঃখিত’, ‘আমাকে মাফ কোরো’, ‘দয়া করে’, ‘ধন্যবাদ’ এবং ভালোবাসার সব শব্দ বলার জন্য সময় রেখো।”

দুই
ল্যাটিন অ্যামেরিকা থেকে উঠে আসা যাদু বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তর ব্যবধান কিংবা নৈকট্য খোঁজা নিয়ে যখন ইউরোপে তুমুল বিতর্ক চলছে, ল্যাটিন আমেরিকায় যাদু বাস্তবতার ব্যাখা বিশ্লেষণে ভাষার ব্যবহার কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে, তখন মার্কেস খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন, ঔপনিবেশিক মানসিকতায় অস্তিত্বের সংকটই যাদু বাস্তবতার মূল কথা। পরাবাস্তবার ভিত্তিভূমি যেখানে পরিবর্তণশলী সময়ের সংকটে ঘুরপাক খাওয়া নি:সঙ্গ মানুষের এককেন্দ্রিক অভিব্যক্তি, সেখানে যাদু বাস্তবতা একটি জনপদের সামস্টিক রাজনৈতিক কল্পনা-বিলাস যার ভিত্তিও তৈরি হয় নিজের ঐতিহ্যগতসত্তা হারানোর প্রবল আত্মপীড়ণ থেকে। ল্যাটিন আমেরিকায় যখন স্পানিস ঔপনিবেশ সবকিছু গ্রাস করে ফেলল, ‘উড়–ক্কু শিয়ালে’রা যখন ইনকার-মায়া সভ্যতার উপকথা থেকে তিরোহিত হতে থাকল তখনই এ জনপদের মানুষের ভেতরে প্রবল হল অস্তিত্ব সংকট। ইউরোপে মধ্যযুগ থেকে শিল্প বিল্পবে উত্তরণের সময়ে ব্যক্তি মানসে অবচেতন মনের দুর্দান্ত প্রভাব অনেককে নি:সঙ্গ করে তুলছিল জনারণ্যের ভেতরেই। সেই অবচেতন মনের এককেন্দ্রিক অভিব্যক্তিই ছিল পরাবাস্তবতা। লুই বুনুয়েল এবং সালভাদর দালি’র যৌথ পরিচালনার ছবি, ‘অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগে’র কথাই ধরুন। প্রথম দৃশ্যেই একটি কালো ভাসা ভাসা চোখ চিরে ফেলা হয় ক্ষুরের তীক্ষè আঘাতে। আর কিছুটা এগিয়ে যান দৃশ্যান্তরে, সমুদ্র সৈকতের বালু ফুঁড়ে একটি নারীর শরীর ক্রমশ: প্রকাশিত হয়। শরীরটি যখন কোমর পর্যন্ত উঠে আসে তখন দু’টো শক্ত-সামর্থ পুরুষের হাত প্রচন্ড আক্রোশে তার স্তন মর্দন করতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই নারী মূর্তিটি ভয়ংকর এক দৈত্যে রূপ নেয় এবং মর্দনরত হাত দু’টোকে উধাও করে দেয়। এর পরের দৃশ্যে একটি অতি শীর্ণ দেহের একটি কুকুর হেঁটে চলে যায়। এই দৃশ্যগুলোর ভেতরে সাদা চোখে ঐক্যতান খোঁজা খুবই দুস্কর। অবচেতন মনে যা কিছু সংকটজনক চিত্র কিংবা চরিত্র আমরা দেখি, সেগুলো খোলা চোখের বাস্তবতায় ব্যাখা করা যায় না।

পরাবস্তাবতার সত্যও তাই ব্যাখাতীত। কিন্তু মার্কেস তার ‘প্রেম ও অন্যান্য দানবে’ ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করেন। ঘটনাটার শুরু ছিল মার্কেস যে পত্রিকা অফিসে সাংবাদিকতা করতেন সেখানকার এক দিনের প্রধান শিরোনামের সংকট থেকে। প্রধান শিরোনোমের খবরটি কি হবে সেদিন, তার কিনারা করতে গলদঘর্ম হয়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই ‘এসপেক্তাদের’ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নীতি নির্ধারণী বৈঠক শেষ করলেন। বৈঠক শেষ হওয়ার মুহুর্তে সম্পাদক মার্কেসকে বললেন, শহরে একটা সমাধি স্থানান্তর হবে, তার ব্যাপারে খোঁজ-খবর করে আসতে। সেই খোঁজ নিতে গিয়ে মার্কেস দেখলেন, কফিনের ভেতরে যে মেয়েটির শরীর, তার চুল পায়ের পাতা ছাড়িয়ে আরও কিছুটা দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নারীটিই পরে মার্কেসের ‘প্রেম ও অন্যান্য দানবে’ হাজির হয় সিয়েরভা মারিয়া চরিত্র হিসেবে।

কলাম্বিয়ায় জলাতঙ্ক রোগের মহামারীর সময় সিয়েরভা রোগাক্রান্ত হয়েও সুস্থ হয়ে গেল। এই সুস্থতাই তার জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনল। তার সুস্থা থাকা নিয়ে শহরের মানুষ তাকে অতি মানবিক ঐন্দ্রিজালিক ক্ষমতার অধিকারী ভাবতে শুরু করল, রোগ-শোকে তার নামে বন্দনা শুরু হল। মেয়েটিও এক সময় ভেবে বসল তার অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা আছে যেগুলো চার পাশে আর কারও নেই। এক সময়ে মেয়েটি খেয়াল করল যখনই যে নিজের ভেতরে অদ্ভুত ক্ষমতা অনুভব করে তখনই তার চুল ক্রমাগত লম্বা হতে থাকে।’ মার্কেসের এই বাস্তবতায় শিহরণ আছে, সমাজে অলৈকিকতার প্রতি বিশ্বাস কিভাবে তৈরি হয় তার ইতিবৃত্ত বলা আছে। একজন সুস্থ মানুষকে কিভাবে কোন বাস্তবতায় নিজের বাস্তব অস্তিত্ব ভুলে সমাজের বিশ্বাসের ছাঁচে নিজেকে বদলে ফেলেন তারও পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বাস আর বাস্তবতার এই শিহরণ ‘নি:সঙ্গতার একশ’ বছরে’ও। উরসুলা ইগুয়ারানের তার বংশে শুয়োরের লেজ বিশিষ্ট কারও জন্মের আশংকায় শতায়ূ হন, এই আশংকা রেখে যান পরবর্তী বংশধরদের জন্য যেমন তার দাদীর দাদী রেখে গিয়েছিলেন তার দাদী এবং আরও পরবর্তী সময়ে উরসুলার জন্য! এই আশংকা বিশ্বাসের পাশাপাশি কর্নেল আরেলিায়নো বুয়েন্দিয়ার যুদ্ধ চর্চা কিংবা আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার জ্ঞান অন্বেষণ এবং পৃথিবীর গোলাকার পিঠ আবিস্কার, মেলকিয়াদেসের পায়ের তলায় সষের্ জমা করে দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোর সাধনা সবকিছু এগিয়ে চলে। বুয়েন্দিয়া পরিবারের এই চরিত্রগুলোই বলে দেয় অস্তিত্ব সংকট রক্ষায় তারা একেকজন একেকরকম চিন্তা ও কর্মপথ বেছে নিয়েছেন, যার ভেতরে ইন্দ্রজাল এবং শক্তির প্রদর্শন এবং জ্ঞান চর্চা তিনেরই সন্নিবেশন আছে। আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিশ্বাসের সংক্রমণ, যার পেছনে হাল ধরে আছে ‘অতি মানবিক প্রাণ সংহারী রাজনীতি’। যাদু বাস্তবতার মূল কথা এটাই। একই বাস্তবতার ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়েই ল্যাটিন রেনেসাঁর অন্যতম পুরোধা হুলিও কোর্তাসারের ১৯৫০ সালেই লিখেছিলেন ‘এল এক্সামেন’। সমসায়মিক সময়ে হোরহে লুইস বোরহেসের দর্শনও ছিল একই। আর যাদু বাস্ততবতার চর্চা কিংবা পাঠ নিয়ে যাদের আগ্রহ তাদের কাছে গুরু হিসেবে পরিচিত জার্মান শিল্প-সাহিত্য সমালোচক ফ্রানজ রহ। ১৯২৫ সালে তার প্রবন্দ ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম:পোস্ট এক্সপ্রেসনিজম’ এর মধ্য দিয়েই যাদু বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়, যার শেষ হয়ে গেলে ফ্রানজ রহের আদর্শ উত্তরসূরী মার্কেসের বিদায়ের মধ্য দিয়ে।

তিন.
যাদু বাস্তবতার পর কোন বাস্তবতা। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় ‘ভার্চুয়াল বাস্তবতা’। এর শুরু এখন নয়, আশির দশক থেকেই। এখন যারা শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করছেন তাদের সামনে সংকট, সম্ভাবনা, কল্পনা, অস্তিত্বের প্রশ্ন সব কিছু সামনে দাঁড়িয়ে আছে এই ‘ভার্চুয়াল বাস্তবতা’। এটা এমন এক জগৎ আপনাকে নৈ:শব্দ আর নির্জনতায় একাকীত্বের ভেতরেও হাজার মানুষের পৃথিবীর বৃত্তে ছড়িয়ে দেয় একই সময়ে। এই বাস্তবতায় আপনি দেখতে পারেন, শুনতে পারেন, লিখতে পারেন, আাঁকতে পারেন, শুধু ছুঁতে পারেন না। মানুষ তার নিজের অজান্তেই এই ‘ভার্চুয়াল বাস্তবতা’র দাস হয়ে উঠছে। ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যে প্রত্যেকেই যেন প্রত্যেকের উপনিবেশ। এ কারনে রাজনীতিটাও জমে ভাল। চতুর রাজনীতিবিদরা এই ভার্চুয়াল বাস্তবতার মায়জাল সৃস্টির পেছনে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিশাল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। একদিন দেখা যাবে ফাঁকা রাজপথে মানুষ নেই, শুধু মানুষের ছায়া আছে। আর মানুষের বহুল অনচারে সাইবার জগতে প্রতিবেশগত বিপর্যয় এড়াতে বিশ্ব সম্মেলন বসেছে।

যাদু বাস্তবতার জন্ম হয়েছিল প্রবল ঔপনিবেশিক থাবায় জাতিগত অস্তিত্ব সংকটে। আর ভাচুর্য়াল বাস্তবতার জন্মসূত্রও সেই উপনিবেশ। এবার মানবিক সত্তার উপরে ‘উপ-মানবিক’ ভার্চুয়াল দুনিয়ার আগ্রাসন, যার অধিপতি এবং আধিপত্যবাদের শিকার দু’টোই আমরা, যারা আজকের যুগের মানুষ। আমরা মানবিক সত্তার অতিস্ত¡ রক্ষায় প্রবল এক যুদ্ধের এগিয়ে যাচ্ছি ধীর পায়ে।‘স্মার্ট’ দুনিয়ার স্মার্ট ব্যক্তি যখন প্রতি মুহুর্তে সংযুক্ত থাকতে যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, তখন তাকে সামজিক অনুষ্ঠানে সশরীরে হাজির করাই হবে আগামীর চ্যালেঞ্জ। কথা হচ্ছে শিল্প সাহিত্যে এই ভার্চুয়াল বাস্তবতার চর্চার প্রসঙ্গ আসছে কেন? শিল্প-সাহিত্য চর্চার ভেতরে সব সময়ই সমসাময়িক প্রসঙ্গই মুখ্য হয়ে ওঠে, হোক না তা শত বছরের নষ্টালজিক ভাবনা থেকে উৎসারিত। অতএব আজকের যারা সাহিত্যিক, শিল্পী তারা এই ভার্চুয়াল বাস্তবতায় কেউ কেউ আক্রান্ত হবেন, কেউ কেউ এর বিনয়ী অভিযাত্রী হবেন। অভিযাত্রীরাই শেষ পর্যন্ত লড়াই করবেন মানবিক সত্তার জয়গান নতুন বাস্তবতায় উজ্জ্বল করে তুলতে, তার মাধ্যম কাগজই হোক আর ওয়েব পেজই হোক শিল্প-সাহিত্য চর্চাই হবে তার কক্ষপথ, যাদু বাস্তবতার ‘মানবিক’ মার্কেস নিশ্চয় তাদেরও প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

চার.
‘লিফ স্টর্ম’ উপন্যাস দিয়ে যাত্রা শুরু করা কথা সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েলা মার্কেস একমাত্র পেশাদার সাংবাদিক যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৫৫ সালে এসপেক্তাদের’ পত্রিকায় ধারাবাহিক রিপোর্ট শুরু করেন। বিষয়টা ছিল কলাম্বিয়া নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধ জাহাজ ডুবে যাওয়া নিয়ে। জাহাজডুবির পর সরকারি তরফে প্রচার করা হয়, জাহাজটি ঝড়ের কবলে পড়ে যুবে গেছে এবং জাহাজের বেঁচে থাকা নৌবাহিনী সদস্যদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু মার্কেসের অনুসন্ধানী রিপোর্টে দেখা যায়, জাহাজডুবির মূল কারন ছিল জাহাজে অতিরিক্ত চোরাই পণ্য বহন, যেখানে জাহাজ ডুবেছিল, তার কাছাকাছি কয়েক মাস সময়ে ওই অঞ্চলে ঝড়ের কোন আলামতই দেখা যায়নি, আরও অনেক ছোট-বড় জাহাজও সমুদ্রের সেই পথ পাড়ি দিয়েছে একই দিনে, তারাও ঝড়ের কবলে পড়েনি। কলাম্বিয়া নৌবাহিনীর সেই জাহাজে অতিরিক্ত চোরাই পণ্য বহনের দলিল-পত্রও মার্কেজ প্রকাশ করে দিলেন। ডুবে যাওয়া জাহাজে যে পরিমাণ পণ্য থাকার তথ্য উদ্ধারকারীরা যথাযথ প্রমাণ সহ দেয়, তার ওজন জাহাজের ধারন ক্ষমতার দ্বিগুনেরও বেশী। এ রিপোর্টের পর তৎকালীন কলাম্বিয়ান সরকার হতভম্ব হয়ে পড়ে। এই রিপোর্টের কারনে শেষ পর্যন্ত এসপেক্তাদের’ পত্রিকাই বন্ধ করে দেয় সরকার এবং মার্কেজকেও একরকম কলাম্বিয়া ছাড়তে বাধ্য করে। ১৯৭০ সালে ১৯ পর্বের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনটিই প্রকাশিত হয়, ‘অ্যা শিপরেকড সেইলর’ নামে। এটিও মার্কেসের অন্যতম সেরা উপন্যাসের মর্যাদা পেয়েছে। কারন প্রতিবেদনটি’র বর্ণনায় মার্কেস বেশ কিছু কল্পিত চরিত্র ব্যবহার করেছিলেন। বই আকারে প্রকাশের সময় প্রথম ও শেষ দু’টি অধ্যায় নতুন করে লিখেছিলেন মার্কেস। ‘একটি অপহরণ সংবাদ’ ‘কর্নেল কে কেউ চিঠি লেখে না’ উপন্যাসগুলোও লেখা হয়েছে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় বাস্তব সত্যের মুখোমুখি থেকে।

পাঁচ.
নদীর স্রোতে একটু একটু করে ভেসে যাওয়া নৌকার ভেতরে দু’জন নর-নারী, বয়সের যাদের চামড়া ঝুলে গেছে, মুখে শত রকমের বিচিত্র ভাঁজ, শুধু চোখে দ্যুতি। তারা প্রেমে পড়েছিল প্রথম যৌবনে। তরুনী ফ্লোরেন্টিনোকে বিয়ে করতে হয়েছিল প্রেমিক ফারমিনাকে ছেড়ে অভিজাত চিকিৎসক জুভেনাল উরবিনোকে। কিন্তু উরবিনোর মৃত্যুর পর ফারমিনা আবার ফ্লোরেন্টিনো’র কাছে হাাজির জন প্রথম যৌবনের সইে সতেজ মন নিয়েই। নদীবক্ষে তাদের মধুর মিলন পর্বে শুধু পৃথিবীর প্রকৃতি যেন নয়ম মহাবিশ্ব যেন উদ্বেলিত হয়। জাদু বাস্তবতার মার্কেস আসলে নিখাদ রোমান্টিক প্রেমিক। প্রেমের যাদুকর বলেই হয়ত ‘নি:সঙ্গতার একশ’ বছরে অগণিত প্রেমিকের আরাধ্য সৃষ্টিছাড়া সুন্দরী রেমেদিউসকে ঐন্দ্রিজালিক ক্ষমতায় পাঠিয়েদিয়েছিলেন দূর আকাশে। এখন মার্কেসও হয়ত সেখানেই পৌঁছে গেছেন! রেমেদিওস, প্রিয়তম মার্কেসকে দেখে রেখ।

রাশেদ মেহেদী
সাংবাদিক
ঢাকা
২০.০৪.২০১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *