সেন্ট মারটিনের হেডল্যান্ডে রিপ কারেন্টের মৃত্যুফাদ। হত্যা না দুর্ঘটনা ?

সেন্ট মারটিনে আহসানউল্লাহ ইউনিভারসিটির ছাত্রদের দুঃখ জনক মৃত্যুর পরে, সেন্টমারটিনের মাথা বা কোনার দিকের কিছু ছবি সহ বেশ কিছু স্ট্যাটাস পড়লাম যেখানে জানতে পারলাম এলাকার লোক জানিয়েছে এই এলাকাটায় ঘন ঘন মৃত্যু ঘটে।। লেখা গুলোতে দেখলাম, সেন্টমারটিন দ্বীপের একটা ছবি যেইটায় একটা কোনার মত অংশ বেরিয়ে আছে।

আমার মনে হয়েছে। একটা দ্বীপের মাথা বা কোণা যদি রিস্কি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বীপ বা সমুদ্র সৈকত যেখানে একই ধরনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে সেখানে একই রকম দুর্ঘটনা হবে এবং নিশ্চয়ই এর কোন প্যাটারন থাকবে। এই ব্যাপারে আরও কিছু স্টাডি করে কিছু জানলাম, সেইটা শেয়ার করছি।


সেন্ট মারটিনে আহসানউল্লাহ ইউনিভারসিটির ছাত্রদের দুঃখ জনক মৃত্যুর পরে, সেন্টমারটিনের মাথা বা কোনার দিকের কিছু ছবি সহ বেশ কিছু স্ট্যাটাস পড়লাম যেখানে জানতে পারলাম এলাকার লোক জানিয়েছে এই এলাকাটায় ঘন ঘন মৃত্যু ঘটে।। লেখা গুলোতে দেখলাম, সেন্টমারটিন দ্বীপের একটা ছবি যেইটায় একটা কোনার মত অংশ বেরিয়ে আছে।

আমার মনে হয়েছে। একটা দ্বীপের মাথা বা কোণা যদি রিস্কি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বীপ বা সমুদ্র সৈকত যেখানে একই ধরনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে সেখানে একই রকম দুর্ঘটনা হবে এবং নিশ্চয়ই এর কোন প্যাটারন থাকবে। এই ব্যাপারে আরও কিছু স্টাডি করে কিছু জানলাম, সেইটা শেয়ার করছি।

বাংলাদেশের সাথে পৃথিবীর অন্য সৈকতের মানুষ মারা যাওয়ার একটা পার্থক্য হোল, ভাটার সময় কোন দেশে আপনাকে নামতেই দিবেনা। কিন্তু, বাংলাদেশে অনেক মানুষ, ভাটার সময় পানিতে নেমে ভেসে যায়, এই অজ্ঞানতার কারনে অনেক জীবন বিনষ্ট হচ্ছে। এই জন্যে কক্সবাজার বা কুয়াকাটায় যাওয়ার আগে গুগল করে কক্সবাজারের জোয়ার ভাটার একটা লিঙ্ক আমি দিচ্ছি, যা বুকমার্ক করে রাখতে পারেন, যাওয়ার আগে নিয়ে যেতে পারেন।

2014 Tide table for Cox’s Bazar

কিন্তু পড়তে পড়তে জানলাম, ভাটার সময় মানুষের ভেসে যাওয়া বাদেও আর একটা বিপদজনক ইস্যু আছে। এইটা সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা অনেক কম। একে বলা হয়, রিপ কারেন্ট। বাংলায় আমরা সুবিধার জন্যে এর নাম দিতে পারি উলটো স্রোত।

সমুদ্র সৈকতে ৮০% মৃত্যু এই রিপ কারেন্ট বা উলটো স্রোতের জন্যে হয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও প্রতি বছর গড়ে ২২ জন মারা যায় রিপ কারেন্টের কারনে । আমাদের দেশেও সমুদ্র সৈকতে যেই সব মৃত্যু হয়, তার বেশীর ভাগ এই রিপ কারেন্টের জন্যেই হওয়ার কথা। এবং সেন্ট মারটিনের মাথার দিকে যে সরু অংশ তাও রিপ কারেন্টের একটা বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে।

বলে রাখা ভালো রিপকারেন্ট প্রিথিবীর সব সৈকতে হয় এবং এই জন্যে সতর্কতা নিতে হয়, রিপ কারেন্টের ভয়ে সমুদ্রযাত্রা বন্ধ করার দরকার নাই। কিন্তু সতর্কতা গুলো নিতে হবে।

রিপ কারেনট বা উলটো স্রোত কি জিনিষ ?

এইটা এক ধরনের ঢেউ যা সমুদ্রের তটে ধাক্কা খেয়ে, উলটো দিকে প্রবাহিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে, এই ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাওয়া ঢেউ বাতাসের কারনে বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যর কারণে চিকন একটা পথ ধরে, সমুদ্রে ফিরে যেতে পারে। এবং এর ফলে সেই সরু পথে যদি কেউ থাকে তবে ঢেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে গভীর সমুদ্রে নিয়ে ফেলতে পারে। এই সরু পথের ঢেউটাকেই বলা হয়, রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোত।

আমি রিপ কারেন্টের কিছু ছবি দিচ্ছি,

এইটা যে কোন স্থানে হতে পারে। যে কোন সমুদ্রে হতে পারে, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যর কারণে রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোত নিয়মিত হতে পারে।

কি ভাবে রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোত চিনবেন ?

রিপ কারেন্ট বা উলটো স্রোতের একটা ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এইটা দেখতে মনে হয় খুব শান্ত এবং উপর থেকে একে গাঢ় নীল দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোতের সময়ে দেখবেন কিছু না কিছু ভেসে সাগরের দিকে যাচ্ছে বা আশেপাশের ঢেউ এর মধ্যে ঢেউ এর মাথা দেখা যাচ্ছে না। ছবি গুলো খেয়াল করেন, রিপ কারেন্ট যখন প্রবাহিত হয় তখন সে ফেরার পথে ঢেউয়ের মাথা ভেঙ্গে দেয়। ফলে এই স্থান টা বেশী শান্ত দেখায়।

রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোতে পড়লে কি করবেন ?

যারা সাতার জানেন তারা রিপ কারেন্টে পড়লে, উলটো দিকে তীরের দিকে না গিয়ে সৈকতের সমান্তরাল ভাবে উলটো স্রোত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, সাগরের স্রোত যখন টান দিবে তখন শক্তি দিয়ে স্রোতের বিপরীতে ফেরা যাবে না।

কয় ধরনের রিপ কারেন্ট আছে ?

আমি পড়লাম, তিন ধরনের রিপ কারেন্ট আছে। একটা ফিক্সড আর একটা হঠাৎ আর একটা টপোগ্রাফিক যার মধ্যে অন্যতম একটা হচ্ছে হেডল্যান্ড এর কারনে রিপ কারেন্ট। ফিক্সড টা হয় কিছু কিছু এলাকায় যেমন যেই খানে ব্রিজ আছে বা যেই খানে কোন গভীর গর্ত আছে। হঠাত যেইটা হয়, সেইটা যে কোন জায়গায় বাতাসের কারনে হতে পারে।

আর টপোগ্রাফিক রিপ, যেইটার মধ্যে হেডল্যান্ড একটা অন্যতম কারণ – সেইটাই সেন্ট মারটিনের দ্বীপের কোণার মত অংশে দেখা যায় । এইটা একটা হ্যাডলেন্ড । এইটা রিপ কারেন্ট হওয়ার জন্যে টিপিকাল জায়গা। যেইটা আমি অনেক গুলো লেখায় পেয়েছি।

সেন্ট মারটিনের এই অংশটা একটা হেডল্যান্ড বৈশিষ্ট্যর এলাকায় যেই খানে রিপ কারেন্ট ঘন ঘন হবে প্রাকৃতিক বৈশিষ্টের কারনে। কারন বাতাসের কারনে দুই দিকের পানি ধাক্কা দিয়ে এর মাথায় বা তার দুই পাশেই একটা রিপ কারেন্ট তৈরি করতে পারে। এইটা একটা মৃত্যু ফাঁদ। এই খানে প্রাকৃতিক অবস্থানের কারনে অনেক বড় বড় চ্যানেল তৈরি হয়েছে যেই গুলো দিয়ে ঘন ঘন উলটো স্রোত বা রিপ কারেন্ট প্রবাহিত হওয়ার চান্স বেশী। যা শান্ত পানি দেখে নামা পর্যটকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

এই খানে আমি দুইটা ছবি দিলাম। প্রথম ছবিটা নেটে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। কিন্তু আহসানুল্লআহ ইউনিভারসিটির ছাত্ররা বলছে, তাদের বন্ধুরা ভেসে গেছে ভিন্ন জায়গায়, হেডল্যান্ডের ত্রিকোনের মুখে নয়, বরং পাশের জায়গায়। রিপকারেন্ট নিয়ে আমার যে স্টাডিও সেইটাই বলে রিপকারেন্ট হেডল্যান্ডের মুখে এবং পাশে উভয় দিকেই হতে পারে। তবুও সবার বোঝার জন্যে আবার জোর দিলাম। এইটা জীবন মৃত্যুর বিষয় এইটা নিয়ে হেলা করার কোন সুযোগ নেই।

সেন্ট মারটিনের এলাকাবাসি জানে এই এলাকায় সাতার কাটতে নাই। তাই সামনে কাউকে দেখলে এরা মানা করে। কিন্তু সেইটা সবাই জানার সুযোগ হয় না। এই ভাবেই সামান্য অসাবধানতার কারনে অনেক পর্যটক মারা যায়।

আহসানুল্লাহ ইউনিভারসিটির এত গুলো ছাত্র মারা গেলো, তারা খুব সম্ভব এই এলাকায় ফিক্সড হেডল্যান্ড রিপ কারেন্টের কারনেই পানিতে ভেসে গ্যাছে । বেশ কিছু লিঙ্ক পেলাম, যাতে জানতে পারলাম প্রতি বছর এই এলাকায় অনেকেই ভেসে যায়। বাংলাদেশে এতো বছরে ধরে এই এলাকায় এতো মানুষ মারা গেল, এলাকার লোক জানে যার কথা সেই জায়গায় প্রশাসন কেন সাঁতার কাটা নিষিদ্ধ করছেনা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি করছেনা ? সেই প্রশ্ন আমাদেরকে করতেই হবে।

এইটা একটা বেসিক জিনিষ যেইটা অল্প আধ ঘন্টার গুগুল সার্চে জানা যায়। এইটা কেন আমাদের সরকার জানতে পারবেনা এবং জনগনের নিরাপত্তার জন্যে কক্সবাজার এবং সেন্ট মারটিনের জন প্রতিনিধি এবং প্রশাসন কেন একটা ওয়ার্নিং দিয়ে রাখতে পারে না ?

রিপকারেন্ট একটা দুর্ঘটনা কিন্তু সেন্ট মারটিনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারনে হেডল্যান্ড ধরনের টপোগ্রাফিক রিপ কারেন্ট কিন্ত নিয়মিত একটা বৈশিষ্ট্য । এই স্থানে যদি একটা মৃত্যুও ঘটে আমরা তাকে দুর্ঘটনা বলতে পারি না, এই গুলো হত্যা । এর জন্যে দায়ী এই অদক্ষ রাজনীতিকিকৃত প্রশাসন এবং অপরাজনীতি।

রিপ কারেন্ট বা উল্টো স্রোত যে কোন সৈকতে হতে পারে। এবং শান্ত অংশ যেই খানে মনে হবে, সেই খানেই এইটা বেশী দেখা যায়। এর জন্যে সমুদ্র যাত্রা বন্ধ করার দরকার নাই। এই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু সেন্টমারটিনের এই হেডল্যান্ডের কথা আলাদা। এই দিকে নামাই উচিত নয়।

আমি অল্প পড়াশোনা করে যা জানলাম তা শেয়ার করলাম। যেই লিঙ্ক গুলো থেকে এই বিষয়ে জানতে পেরেছি সেই গুলো দিলাম যাতে আরও জানতে চাইলে আপনেরা আরও গভীরে যেতে পারেন।

আহসানুল্লাহ ইউনিভারসিটির যেই সব ছাত্র সাগরের ভেসে তাদের পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মারা গ্যাছেন, তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।

তথ্যসূত্রঃ

১. Rip Current Survival Guide

২. http://beachsafe.org.au/surf-ed/ripcurrents

৩. http://www.miseagrant.umich.edu/explore/dangerous-currents/types-of-currents/

৪. http://www.noaa.gov/features/protecting_0808/images/ripcurrent2.jpg

৫. http://www.nws.noaa.gov/beachhazards/index.shtml

৬. http://en.wikipedia.org/wiki/Rip_current

৭. http://en.wikipedia.org/wiki/Headlands_and_bays

৮. http://www.bing.com/images/search?q=headlands&FORM=HDRSC2

বিঃদ্রঃ এই লেখাটি আমার নিজের নয়। লিখেছেন জিয়া হাসান । বিষয়টি জরুরী এবং জনসচেতনতামূলক হওয়াতে তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে ব্লগে প্রকাশ করা হল।

১০ thoughts on “সেন্ট মারটিনের হেডল্যান্ডে রিপ কারেন্টের মৃত্যুফাদ। হত্যা না দুর্ঘটনা ?

  1. গুরুত্বপূর্ণ ও ভ্রমন
    গুরুত্বপূর্ণ ও ভ্রমন পিপাসুদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি লিখা ।পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ ।

    1. যত বেশি সম্ভব হয় তত শেয়ার করে
      যত বেশি সম্ভব হয় তত শেয়ার করে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দিন। আমাদের সবার সচেতনতাই পারবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে।

  2. ফেসবুকে লেখাটা পড়েছিলাম।
    ফেসবুকে লেখাটা পড়েছিলাম। ব্লগের পাঠকদের জন্য শেয়ার করে খুব ভালো একটা কাজ করেছেন। যেই কাজটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের করার কথা, সেটা জনগণকেই করতে হচ্ছে, আফসোস… এই সিম্পল বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই সতর্কবার্তা প্রচার করার ব্যবস্থা থাকলে এতগুলো তরুণের করুন মৃত্যু হতোনা।

    1. যেই কাজটা রাষ্ট্রীয়

      যেই কাজটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের করার কথা, সেটা জনগণকেই করতে হচ্ছে, আফসোস

      সত্যিই দুঃখজনক। শুনলাম কক্সবাজার প্রশাসন নাকি মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৈকতে আপাতত কাউকে নামতে দিবে না। মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার অবস্থা আর কি।

  3. চমৎকার তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট এবং
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট এবং এটি বেশ জনগুরুত্বপূর্ণও বটে। পোস্টটি সবার শেয়ার করা উচিত ভ্রমণপিপাসুদের কাছে তথ্যগুলো পৌছে দেওয়ার জন্য। শেয়ার দিলাম। ইস্টিশন কর্তৃপক্ষকেও জনগুরুত্বপূর্ণ পোস্টটি প্রমোট করার জন্য ভেবে দেখার অনুরোধ জানাইলাম।

    সরকারের পর্যটন মন্ত্রানালয়ের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানাচ্ছি।

    1. সরকারের পর্যটন মন্ত্রানালয়ের

      সরকারের পর্যটন মন্ত্রানালয়ের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানাচ্ছি।

      সহমত। রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার এসে কোন লাভ নেই। সমদ্রে নামার আগেই সবাইকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *