প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী ও লোককবি নিবারণ পণ্ডিত

আমার মঞ্জুর মায়ে তো কনট্রোল বুঝে না।
রান্ তে গেলে কান্ তে বসে লবণ ছাড়া রান্ ধে না।।
ও আহারে, কার্ড লইয়া কত ঘুরলাম
কত বাবুর পায়ে ধরলাম
ঠেলা ধাক্কা কত খাইলাম রে
ও আহারে, আমার ভাঙা ঘরে নেড়ার ছানি
মেঘ না হইতে পড়ে পানি
টেপ টেপানি গেল নারে
আমার টেপ টেপানি গেল না।।

চর্যাপদের অনাহারি কবির জঠরজ্বালা অগ্নিকণ্ঠ উচ্চারণের সাথে নিবারণ পণ্ডিতের এই গানের তফাৎ কোথায়? কালে কালে যুগে যুগে মহান কবি-শিল্পীদের গানে-কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলার দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনার ছবি।


আমার মঞ্জুর মায়ে তো কনট্রোল বুঝে না।
রান্ তে গেলে কান্ তে বসে লবণ ছাড়া রান্ ধে না।।
ও আহারে, কার্ড লইয়া কত ঘুরলাম
কত বাবুর পায়ে ধরলাম
ঠেলা ধাক্কা কত খাইলাম রে
ও আহারে, আমার ভাঙা ঘরে নেড়ার ছানি
মেঘ না হইতে পড়ে পানি
টেপ টেপানি গেল নারে
আমার টেপ টেপানি গেল না।।

চর্যাপদের অনাহারি কবির জঠরজ্বালা অগ্নিকণ্ঠ উচ্চারণের সাথে নিবারণ পণ্ডিতের এই গানের তফাৎ কোথায়? কালে কালে যুগে যুগে মহান কবি-শিল্পীদের গানে-কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলার দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনার ছবি।

কবি নিবারণ পণ্ডিত জন্মগ্রহণ করেছিলেন অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সগড়া গ্রামে। পরিবারটি ছিল কৃষিনির্ভর। কিন্তু পিতা ভগবানচন্দ্র ‘পণ্ডিত’ উপাধি পেয়েছিলেন শিক্ষকতা করার জন্য। গণনাট্য পত্রিকার ১৯৮১ সালের জানুযারি-মার্চ সংখ্যায ‘কবির আত্মকথন’ শীর্ষক নিবন্ধে নিবারণ পণ্ডিত লিখেছিলেন,

“১৯১২সালের২৭ ফেব্রুয়ারি আমার জন্ম৷ জেলা ময়মনসিংহ, মহকুমা কিশোরগঞ্জ, গ্রাম সগড়া৷ আমাদের পরিবার কৃষিনির্ভর ছিল৷ তবে আমার বাবা ভগবানচন্দ্র পণ্ডিত তার ‘পণ্ডিত’ উপাধি পেয়েছিলেন শিক্ষকতা করার জন্য৷ আমার বয়স যখন বছর দশেক তখন বাবা মারা যান৷ দিন যাচিছল কোনোমতে, কিন্তু পরপর কয়েকবছর অজন্মার ফলে আমাদের মা-বেটার সংসারও অচলপ্রায় হল৷ বিড়ি বেঁধে কিছু আয়ের চেষ্টা করেছি ঐ সময়টাতে৷ পরে দেশত্যাগী হয়েও ঐ বিড়ি সম্বল করেছিলাম৷ কিশোরগঞ্জের রামানন্দ স্কুলে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা আমার৷ কিশোর বসেই রথতলার জনসভায় মাঝে মাঝে যেতাম বন্ধুদের সাথে৷ ছোট বয়সেই আমি গ্রাম্য গান কবিতা রচনা করতে পারতাম বলে গায়ক ও বাদকরা আমাকে দলে নিয়ে যেতেন৷”

গ্রামীণ গানের আসরের গায়কদের তিনি গোপনে গান লিখে দিতেন। কবির আত্মকথনে জানা যায় শুরুর দিকে তিনি প্রেম ও ভক্তিরসের গান রচনা করলেও অতি অল্প বয়স থেকে রূঢ় বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে তার চিন্তাজগতের পরিবর্তন হতে থাকে এবং ক্রমে তিনি মানুষের প্রতি অন্যায়, অবিচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকেন। দুর্নীতিপরায়ণ সমাজের ওপরতলার মানুষদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে থাকেন তার গানের মধ্য দিয়ে। ঠিক এরকম সময়েই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।

১৯৪১ সালে ঢাকায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার প্রেক্ষিতে নিবারণ পণ্ডিত রচিত একটি গান সে সময় বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সেই বিখ্যাত গানটি হল—

“…শুনতে পাই ঢাকা সরে,
মানুষে মানুষ মারে, ঘর পোড়ায় দিন দুপুরে,
করে নানা অত্যাচার—
যে যাহারে যেথায় পায়, ছুরিকাঘাত করে গায়,
পিছন থেকে মারে মাথায়, নাই তার কোন প্রতিকার৷”

কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি গান বাঁধতেন, গাইতেন৷ পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সালে ময়নসিংহ জেলার নেত্রকোনায় সারাভারত কৃষকসভার নবম সম্মেলন উপলক্ষে তিনি গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে প্রচার চালান৷

“হারে ও কৃষক ভাই
মোদের কি বাঁচবার উপায় নাই।
হায় হায়রে—
থালাবাসন হাঁড়িকুরি গৃহস্থের বেসার
ক্রমে ক্রমে বিক্রী করি চলিছে সংসার
অভাবগ্রস্ত প্রায় সমস্ত গৃহস্থ বেকার
অস্থি চর্মসার হইয়াছে থাকি অনাহার।”

[এই গানটির প্রথমাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে ময়মনসিংহ জেলা নেত্রকোনায় সারাভারত কৃষক সভার নবম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন উপলক্ষে এই গানটি তিনি রচনা করেন। গানটি কৃষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।]

আর, ওই সময়েই গারো পাহাড় এলাকার হাজং আদিবাসী চাষিদের টংক প্রথা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল৷ ওই আন্দোলনের স্বপক্ষে তিনি গান রচনা করেন ও কৃষকদের সংগঠন করে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালান৷ তার টংক কথা, হাজং আন্দোলনের গান, জনযুদ্ধের গান ইত্যাদি গণ সঙ্গীত বৃহত্তর ময়মনসিংহের কৃষক আন্দোলনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

নিবারণ পণ্ডিতকে লেখা একটি চিঠিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছিলেন,“আপনি আমাদের মধ্যে সত্যিকারের জনগণগীতিকার৷ শ্রমজীবী জনতা থেকে কোনদিনও বিচিছন্ন হন নি৷ একই হাতে বিড়ি বানিয়ে ও গান বানিয়ে সংগ্রাম করেছেন৷ সুদীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি কাল যাবৎ জনজাগরণে আপনার যে অমূল্য অবদান তাতে আপনাকে নিরাময় করার জন্য জনগণের কাছে অর্থসাহায্য চাইবার দাবি আপনার সবচেয়ে বেশি…আপনি মরে গেলেও কোন সরকারি বা আধা সরকারি দান গ্রহণ করতে পারেন না জানি, তাহলে তো দু’শ টাকার সরকারি ‘স্বাধীনতা যোদ্ধার’ পেনসন ভোগ করতে পারতেন৷”

আর একটি স্মৃতিচারণায় নিবারণবাবু সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, “নিবারণ পণ্ডিত গণনাট্যে এসে গান লেখেন নি, তিনি কৃষক আন্দোলনে থেকে গান লিখেছেন৷ পরে তাকে গণনাট্যে নিয়ে আসা হয়৷”

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানেই থেকে যান। পাকিস্তান সরকারের আনা কৃষি-বিলের বিরুদ্ধে গান লিখে পুস্তিকা ছেপে তা কৃষকদের মাঝে গিয়ে গাইতে থাকেন। এর ফলে কবি পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়েন। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি আনসার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। মুক্তি পেয়ে ২৭ ডিসেম্বর ১৯৫০সালে তিনি সপরিবারে ভারতে চলে যান। প্রতিভাবান গায়ক কবি নিবারণ পণ্ডিত প্রায় তিন শতাধিক গণসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। কঙ্কন ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় তার গানের সংকলন ‘লোককবি নিবারণ পণ্ডিতের গান (১৯৮৬)’নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই মহান গণসঙ্গীত শিল্পীর জীবনাবসান হয় ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর।যিনি জীবনের রূঢ় বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন শোষণ-বঞ্চনার কারণ এবং আজীবন রচনা করেছেন, গেয়েছেন মানব-মুক্তির গান, সেই মানুষটিই আজ তার উত্তর পুরুষের কাছে বিস্মৃতপ্রায়। আমরা কি প্রতিনিয়ত আমাদের উত্তর পুরুষের কাছে ভীরু কাপুরুষের উপমা হতে চলেছি?

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী

৪ thoughts on “প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী ও লোককবি নিবারণ পণ্ডিত

  1. গণসঙ্গীত আমাদের দেশ থেকে
    গণসঙ্গীত আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পোস্টে শিল্পীর একটা ছবি এড করে দিলে ভাল হত।

  2. দারুণ লাগলো লেখাটা। উনার নামই
    দারুণ লাগলো লেখাটা। উনার নামই জানতাম না এবং আমার মতো অনেকেই জানেন না। আপনার পোস্টের কল্যানে জানতে পেলাম। এরকম আরও পোস্ট চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *