বৃষ্টি

সূর্য উঠে গেছে। বেশ খাণিক্ষণ হলো। এই যায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন একটা মায়া মায়া ভাব। এই বৈশাখের আগুন গরমেও সকাল বেলাটা থাকে স্নিগ্ধ, কোমল। মাঝে মাঝে কুয়াশাও দেখা যায়। কিছু পাখির কিচির মিচির শোনা যায়। আমার বাসাটার উঠোনে এলে দেখা যায়, দূরে দুটো তাল গাছ, আর বিস্তৃত আকাশ!
মনটা নিমিষেই ভালো হয়ে গেলো। উঠান ঝাট দেয়ার শব্দ পাচ্ছি। রহিমের মা উঠান ঝাট দিচ্ছে। জীবন চলতে শুরু করেছে। প্রতি রাতের বিরতি শেষে আবার নবজন্ম হয় জীবনের। ট্রেন চলছে।


সূর্য উঠে গেছে। বেশ খাণিক্ষণ হলো। এই যায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন একটা মায়া মায়া ভাব। এই বৈশাখের আগুন গরমেও সকাল বেলাটা থাকে স্নিগ্ধ, কোমল। মাঝে মাঝে কুয়াশাও দেখা যায়। কিছু পাখির কিচির মিচির শোনা যায়। আমার বাসাটার উঠোনে এলে দেখা যায়, দূরে দুটো তাল গাছ, আর বিস্তৃত আকাশ!
মনটা নিমিষেই ভালো হয়ে গেলো। উঠান ঝাট দেয়ার শব্দ পাচ্ছি। রহিমের মা উঠান ঝাট দিচ্ছে। জীবন চলতে শুরু করেছে। প্রতি রাতের বিরতি শেষে আবার নবজন্ম হয় জীবনের। ট্রেন চলছে।

আমার বয়স ত্রিশ। এই বয়সটা সত্যিকারের পৃথিবীটাকে দেখার সময়। চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সময়। সে সব না করে আমি সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এসেছি এই নিভৃত গ্রামে। একেবারে প্রাচীন একটা গ্রাম। দিনের শুরু হয় ফজরের আজানে, মুয়াজ্জিনের মিষ্টি কণ্ঠে। রাত নামে বড্ডো তাড়াহুড়োয়। আটটা মানেই নিশুতি রাত। একটা দুটো কুপিবাতি জ্বলা কুড়েঘরে আসর জমে। গল্পের, পুঁথির। আমার ভালোই লাগে।

এইসব হিমেল বাতাসে আমি প্রচন্ড সুখি হই। এই স্নিগ্ধ পাখির কলকাকলি আমাকে সেই আনন্দটা দেয়, যেটা আমি এক বিশাল মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙের টপ ফ্লোরে বসে রিভল্ভিং চেয়ার ঘুরাতে ঘুরাতে পাই নি। যান্ত্রিকতা আমাকে বিদ্ধ করে। আমি যান্ত্রিকতা ঘৃণা করি।

তাই আমি সব ছেড়েছুড়ে চলে আসি এই প্রাচীন একটা গ্রামে। ছয় অঙ্কের স্যালারি ছেড়ে আজ আমি গণিতের শিক্ষক। পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের দৃশ্য হলো কৌতূহলী শিশুর মুখ। আমি তাই আনন্দের সাথে এই শিক্ষকতা করি। আমার ভালো লাগে।

এতোসব আনন্দের মাঝে আমার তার কথা মনে পড়ে। খুব! একটু দেখতে ইচ্ছে করে। দেখি না তাও। দেখলেই যদি ফুরিয়ে যায়? অধরা স্বপ্ন হিসেবে থাকুক সে। আমার একমাত্র প্রেমিকা, নেফারতিতি। নেফারতিতি নামটা আমার দেয়া। হয়তোবা সে জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নয়, কিন্তু আমিও তো নিতান্তই সাধারণ মানুষ!

আজ কেনো যেনো ওর কথা খুব মনে পড়ছে। মন বিষণ্ণ করা বাতাসে। নেফারতিতি, ইস! পাশে যদি পেতাম তোমাকে!

মনটা বিষণ্ণ লাগছে। প্রচন্ডভাবে মনে পড়ছে পাগলটাকে। পাগলই তো। না হলে কেও এই কাজ করে? স্বপ্ন পূরণ করতে গেছেন, অজ পাড়াগাঁয়ে। হুহ! আমি তো তার স্বপ্ন না, দুঃস্বপ্ন! দূর ছাই, ভালো লাগে না।

আস্ত পাগল একটা। সেই ভার্সিটি থেকে দেখছি। এত্তো ভাবুক ছেলেটা! সারাক্ষণ কি যেনো ভাবছে। আর কলম কামড়াতে কামড়াতে হিসেব করছে। না, জীবনের হিসেব না। কবিতার ছন্দের হিসেব। মাঝে মাঝে গণিত। আর খুব সাবধানে আমাকে দেখতো সে। খুব সাবধানে। বোকা কোথাকার। আমি যেনো বুঝতাম না। রাগ হতো খুব। কাছে এসে বসলে কি হতো? কথা বললে কি হতো? আমার কাছে ধরা পড়লেই সেই ঝাকড়া চুলগুলো দুলিয়ে ভুবন ভোলানো হাসি দিতো। আমি ওর হাসির প্রেমে পড়েছিলাম। আমি মানুষটার প্রেমে পড়েছিলাম।

একটা আস্ত বোকা। ভালোবাসার কথা জানাতে তিন বছর লেগেছিলো। এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? কোন এক গ্রামে নাকি গণিতের শিক্ষক হয়েছেন। বাচ্চাদের নামতা শেখাচ্ছেন! ফাজলেমীর সীমা থাকা উচিত।

ভালো লাগে না কিছু। আমাকে স্বপ্ন দেখাতো ও। একটা টিনের চালের বাড়ির স্বপ্ন। গাছপালা ঢাকা। বৃষ্টির দিনে কফি হাতে নিয়ে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনবো আমরা দুজন। ঘরভর্তি আমাদের বাচ্চারা দুষ্টুমি করবে। উঠোনে তারা লুটোপুটি খাবে। আমরা পুকুর পাড়ে বসে জোছনা দেখবো।

তা আর হলো কই? আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওই যে, সমাজ! কোন বাবা মা, প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারের কাছে মেয়ে দেবে?

ভালো লাগছে না কিছু। যাবো নাকি চলে, ওর কাছে। কানের কাছে কাচের চুড়ি ঝুনঝুন করে বাজিয়ে বলবো, “আমি এসেছি।” জানি না, কিচ্ছু জানি না আমি।

বিকেলটা অসাধারণ সুন্দর! আমি পুকুর পাড়ে বসে আছি। আশে পাশে বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলছে। দেখতে ভালো লাগে। জীবনটা নেহায়েত মন্দ না!
শিউলি ছুটে আসছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“স্যার, আপনারে খুজে।”
“কে?”
“এক আপায় আপনারে খুজতাসে।”
“কোথায়?”
শিউলি হাত বাড়িয়ে দেখালো। তাকাতেই আমার সত্ত্বা অসাড় হয়ে আসে। নেফারতিতি! হাসছে, সেই ভুবন ভোলানো হাসি। চুল উড়ছে হাওয়ায়। আমার বিকেলটাই অন্যরকম হয়ে গেলো!

ইস! কি সুন্দর যায়গাটা। এতো সুন্দর পুকুর আগে দেখি নি। পানি টলটলে। বাচ্চারা দৌড়ঝাঁপ করছে। ওই যে, পাগলটা বসে আছে। যথারীতি ভাব জগতে আছে। ইস! আগের থেকে শুকিয়েছে বেচারা। আহারে!

“কেমন আছো?”
“খুব ভালো!”
“এইদিকে হটাত!”
“এমনি এসেছি, হানিমুন!”
“বিয়ে করে ফেলেছো? কংগ্রাচুলেশনস! হাজব্যান্ড কোথায়?”
“আমার দিকে তাকিয়ে আছে।”
“কোথায়? আশে পাশে তো সব পিচ্চি পোলাপান!”
“উফফ! বেকুব কোথাকার!”

ঠিক তখনই বৃষ্টি নামে। ভালোবাসার বৃষ্টি!

৭ thoughts on “বৃষ্টি

  1. ভাল লিখেছেন। কিন্তু পোস্টে
    ভাল লিখেছেন। কিন্তু পোস্টে ট্যাগ না থাকলে লেখা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা পাওয়া যায় না। দয়া করে সব সময় পোস্টে ট্যাগ এড করে দিবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *