আমার যাপিত জীবন-৪ (আত্মকথাঃ মেয়ে বন্ধু…)

*
আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই তখন আমার বয়স খুব কম। এখনকার বাচ্চাদের হিসেবে হয়তো কম বলা যাবে না… কিন্তু নব্বই-এর দশকে একটা বাচ্চা ৫/৬ বছরের আগে স্কুলে যেতো না। আমাদের সময় ক্লাস ওয়ানের আগে এখনকার মত প্লে-নার্সারি-কেজি এতোগুলো ক্লাস ছিল না। তখন সবে মাত্র নার্সারি নামের একটা ক্লাস চালু হয়েছে। ৫/৬ বছর বয়সের বাচ্চারা বেশির ভাগই নার্সারিতে ভর্তি হত। সেখানে আমি মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে সরাসরি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই… এবং সেটাও সম্পূর্ণ নিজের জেদে!


*
আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই তখন আমার বয়স খুব কম। এখনকার বাচ্চাদের হিসেবে হয়তো কম বলা যাবে না… কিন্তু নব্বই-এর দশকে একটা বাচ্চা ৫/৬ বছরের আগে স্কুলে যেতো না। আমাদের সময় ক্লাস ওয়ানের আগে এখনকার মত প্লে-নার্সারি-কেজি এতোগুলো ক্লাস ছিল না। তখন সবে মাত্র নার্সারি নামের একটা ক্লাস চালু হয়েছে। ৫/৬ বছর বয়সের বাচ্চারা বেশির ভাগই নার্সারিতে ভর্তি হত। সেখানে আমি মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে সরাসরি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই… এবং সেটাও সম্পূর্ণ নিজের জেদে!

ফলে স্কুল জীবনের প্রথম দিন থেকে আমি ছিলাম ক্লাসের সবচেয়ে পিচ্চি স্টুডেন্ট! আর পরবর্তী জীবনে কোনদিন এক ক্লাসে দুই বার না পড়ার কারণে এই “ক্লাসের সর্ব কনিষ্ঠ স্টুডেন্ট”-এর পদটাতে আমি আজীবনের জন্য বহাল আছি। ক্লাসের সবচেয়ে ছোট বলে বাকি ক্লাসমেটগুলোর সাথে আমার সব সময়ই একটা দূরত্ব থেকে যেত। ওরা প্রায় সবাই সমবয়সী ৩/৪জন পেয়ে যেত যাদের সাথে মিশতো-ঘুরতো-খেলতো। আমার কোন সমবয়সী নেই, কাজেই মেশা-ঘোরা-খেলার বন্ধুও তেমন ছিল না! পাড়ায় ২/৪জন খেলার সাথী ছিল বটে, কিন্তু ওরা আবার তেমন পড়ালেখা করা ভদ্র ঘরের ছেলে ছিল না বলে বাসা থেকে খুব একটা মিশতে দিতো না।
আশ্চর্য শোনালেও এটাই সত্যি যে পুরো স্কুল লাইফে আমার কেবল একগাদা সহপাঠিই ছিল, কিন্তু তেমন কোন বন্ধু ছিল না! আমি বেড়ে উঠেছি অনেকটা একা একা, বন্ধু সংগ ছাড়াই… একটা পর্যায়ে ব্যাপারটাতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। সুযোগ থাকা সত্যেও তখন সবাইকে এভোয়েড করা শুরু করলাম (হয়তো অবচেতন ভাবেই)। ফলে ৯ম-১০ম শ্রেণীতে থাকাকালিন সময়েও আমার খুব একটা বন্ধু ভাগ্য হলো না। শুধু অর্পন-ফুয়াদ এরকম এক দুইজন ক্লাসমেট-এর সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হল কেবল।
মেট্রিক পরীক্ষা দেবার পর অনেকে কত কিছু করে। কত জায়গায় ঘুরতে যায়, বন্ধুদের নিয়ে কত কী প্ল্যান থাকে। আমার কোন প্ল্যান ছিল না। আমি এস,এস,সির পর টানা ৬ মাস (ডিপ্লোমায় ভর্তি হবার কারণে ক্লাস শুরু হতে প্রায় ৬মাস লেগে গিয়েছিল) একা একা কেবল বই পড়েই কাটিয়েছি! (মুন মামার লাইব্রেরীর বিশাল কালেকশন থেকে আমি প্রায় তিন শতাধিক বই নিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম ঐ সময়টাতে) বই পড়ে কিছু ধার করা অভিজ্ঞতা হল… টের পেলাম- বন্ধু থাকাটা জীবনে খুব জরুরী!

কলেজে উঠে হঠাৎ করেই নিজের ভেতর একটা পরিবর্তন আনলাম। সবার সাথে মিশতে শুরু করলাম। গুরু-গম্ভীর ভদ্র-নম্র স্বভাবটা একরকম জোর করেই একটু পরিবর্তন করলাম। সবার সাথে হেসে কথা বলার অভ্যাস করলাম, আড্ডা-তর্ক-হাসি-ঠাট্টায় অভ্যস্ত হলাম, টিচারদের সাথে আর্গুমেন্ট ও ডিসকাশন বাড়ালাম… আর এসব করতে করতে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- “আমি পারি!”
আমি যে শুধু পারি তা-ই না, খুব ভাল ভাবেই পারি। ক্লাসের সবচেয়ে কনিষ্ঠ ছেলেটা দিন দিন ক্লাসের সবচেয়ে চটপটে ও “ব্রাইট” ছেলেতে পরিনত হতে লাগলো। এখানে বলে রাখা ভাল- ডিপ্লোমা যারা করতে আসে তাদের অনেকেই ইন্টার পর্যন্ত পড়ে আসতো। তাছাড়া গ্রামের স্কুল থেকে বা বারবার ফেল করে অবশেষে ভোকেশনাল থেকে মেট্রিক পাশ করে এসেও ডিপ্লোমায় ভর্তি হতো অনেকে। ফলে ওদের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য এখানে আরো বেশি ছিল। আমার খুব কম ক্লাসমেটই আমার চেয়ে নূন্যতম ৩/৪ বছরের বড় ছিল। বেশির ভাগই ছিল ৫/৬ এমনকি ৮ বছরের বড়! অথচ আমি তাদের সাথে খুব সহজ ভাবে মিশে যেতে লাগলাম।
বন্ধু আড্ডা মাতানোর এই প্রতিভা যখন নিজের মধ্যে আবিষ্কার করলাম অত্যন্ত পুলকের সাথে ঠিক তখনই মনে হতে লাগলো- আমার কোন মেয়ে বন্ধু নেই! সত্যিকার অর্থে স্কুল জীবনে আমাদের ছেলে-মেয়ে আলাদা শিফটে ক্লাস হবার কারণে মেয়েদের সাথে মেশার সুযোগই হয়নি। আর নিজের কোন বোন না থাকায় মেয়েদের সংস্পর্শে আসার সুযোগও হয়নি আগে কখনও। আমি যখন মেট্রিক পাশ করি তখন আমার বয়স চৌদ্দ প্লাস। কোন মেয়েকে দেখলে তখনও বুকের ভেতর কোন অনুভূতি তৈরী হওয়া শুরুই করেনি! বস্তুত এসব বয়ঃসন্ধিকালিন অনুভূতির ব্যাপারগুলো টের পাই কলেজের সেকেন্ড-থার্ড ইয়ারে থাকার সময়…তবে প্রচুর বই পড়া এবং ক্লাস নাইন থেকেই কিছুটা লেখালেখি-সাহিত্য আড্ডার সাথে সংযোগ থাকার কারণে আমি বরাবরই বয়সের তুলনায় একটু বেশি ম্যাচ্যুরড্‌ মাইন্ডের ছিলাম। সে কারণেই কিনা জানি না- প্রেম-ট্রেম নিয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না কোন কালেই। বয়স অনুপাতে স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলো আমাকে খুব একটা কাবু করতে পারতো না। রিলেশন-এফেয়ার শব্দগুলো খুব ন্যাকা ন্যাকা ছেলেমানুষিমনে হতো কেন যেন! তখন থেকেই ভালবাসাকে খুব উচ্চমার্গিয় কিছু একটা ভাবতে শিখে গিয়েছিলাম…!

যা হোক, মূল প্রসংগে আসি। কলেজে ওঠার পর কেন যেন মনে হতে লাগলো নিজেকে বিকশিত করার জন্য মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি জানা দরকার। আর মানুষ বলতে শুধু ছেলেদের সম্পর্কেই নয়, মেয়েদের সম্পর্কেও জানা জরুরী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী, চিন্তার জগৎ, অনুভূতিগুলো সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন। আর সেটা জানার একমাত্র উপায় হলো মানুষের সাথে মেশা।
যে আমি মাত্র ২/৩ বছর আগেও ছেলেদেরকে পর্যন্ত এড়িয়ে চলতাম সেই আমিই মনে মনে মেয়ে বন্ধু খুঁজতে লাগলাম। প্রেম-রিলেশন-এফেয়ার-ফ্লার্ট মারা কিংবা টাইম পাস টাইপের কিছু করার জন্য নয়… স্রেফ তাদের মানসিকতা সম্পর্কে জানার জন্য!
কিন্তু কপালে না থাকলে যা হয় আরকি… এমন এক ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছি যে ডিপার্টমেন্টে মেয়েরা পড়ে না বললেই চলে! কম্পিউটার-ইলেক্ট্রিক্যাল-আর্কিটেক-এ মেয়ে ভরপুর। এমন কি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এও তখন প্রচুর মেয়ে পড়তে আসে। কিন্তু অটোমোবাইল? গাড়ির নিচে শুয়ে ইঞ্জিন খোলাখুলি! এইগুলো কি আর মেয়েদের কাজ? এমনই একটা ধারনা ছিল সে সময়টায় (এখনও যে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে এমন নয়)! ফলে আমাদের ডিপার্টমেন্টে তেমন কোন মেয়ে ছিল না। শুরুতে যাও আর কোন ডিপার্টমেন্টে সীট না পেয়ে একান্তই বাধ্য হয়ে ৫/৬জন ছিল তারাও অচিরেই এপ্লিকেশন করে ডিপার্টমেন্ট চেঞ্জ করে ফেলল। কোথাও সুবিধা করতে না পেরে কেবল ‘রিমা’ নামের একটা মেয়ে আমাদের সাথে থেকে গেল বটে কিন্তু সেও ক্লাস শেষ হলেই গিয়ে জুটতো অন্য ডিপার্টমেন্টে তার বান্ধবীদের সাথে। আমি হতভাগা মেয়েদের সাথে মেশার সুযোগই পেলাম না। বেশি সাহসী বন্ধুরা অন্য ডিপার্টমেন্টের মেয়েদের প্রোপজ-টোপজ করে চুটিয়ে প্রেম করতে লাগল। আমার যেহুতু তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না তাই প্রোপজ করারও কোন সুযোগ ছিল না! প্রোপজ করে কি আর ফ্রেন্ডশীপ করা যায়?

আমার একটা খালাতো বোন আছে, নাম জেরিন। ছোট বেলা থেকে ওর সাথে আমার পায়ে পায়ে ঝগড়া! ১/২ বছরের পিঠাপিঠি কাজিনদের মধ্যে যেমন হয় আরকি! ওরা তখন থেকে আমাদের এলাকায়ই থাকে। প্রায়ই দেখা হয়। দেখা হয় মানে ঝগড়াও হয়! আমি তখন ওর সাথে একটু ভাল ভাবে (মানে ঝগড়া না করে!) মেশা শুরু করলাম। আগে যে মিশতাম না তা নয়। আগে মিশতাম কাজিন হিসেবে। ও ছেলে না মেয়ে এটা মাথায় আসেনি আগে কখনো। কলেজের সেকেন্ড-থার্ড ইয়ারে ওঠার পর থেকে আমি ওর সাথে মিশতে শুরু করলাম বন্ধু হিসেবে… আমার মনে আছে- একদিন আমি ওকে ঠিক এভাবেই প্রোপজ করেছিলাম যে- তুই আমার বন্ধু হবি? আমার কোন মেয়ে বন্ধু নেই!
ও খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিল সেটা। লাইফে কিছু মেয়ে বন্ধুরও দরকার আছে এটা আমি তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং সেও আগ্রহ করেছিল যথেষ্টই! এমনকি সে তার কিছু বান্ধবীর সাথে আমাকে পরিচয়ও করিয়ে দেবার প্রস্তাব দেয়। যদিও অতোটা এগুতে আমার প্রেস্টিজে লেগেছিল… মনে হয়েছিল নিজেকে বেশি সস্তা করে ফেলা হবে তাহলে!
যাই হোক, বলতে গেলে জেরিনই আমার প্রথম মেয়ে বন্ধু! আর রিমা সহ স্কুলে কোচিং করার সময় যে দুই-একটা মেয়ের সাথে পরিচয় ছিল তারা ছিল নেহায়েতই ক্লাসমেট।

কলেজের ফাইনাল ইয়ারে ওঠা পর্যন্ত এমনটাই ছিল আমার জগৎ। লাস্ট সেমিস্টারে এসে কোন একটা ঘটনাক্রমে আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় আরেকটি মেয়ের সাথে। এই মেয়েটা আমার চেয়ে একাডেমিক্যালি ২ বছরের জুনিয়র ছিল। প্রথম প্রথম ভাইয়া ডাকতো… আস্তে আস্তে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে, এক সময় বন্ধুর মত আচরণ করি। এই মেয়েটার গল্প আমি আমার “দু’ পাতার গল্প” (http://www.istishon.com/node/2818) -তে বলেছি। সংগত কারণেই এখানেও আমি তার নাম উল্লেখ করছি না। এই মেয়েটাই আমার জীবনের প্রথম মেয়ে যে কিনা নিজে মুখ ফুটে আমাকে প্রপোজ করেছিল। আমি তাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে প্রস্তুত ছিলাম না। কেন? সেটা এই লেখাতেই কিছুটা বলেছি। আর মোটামুটি ভাবে ব্যাখ্যা করেছি “দু’ পাতার গল্প”-তে।

এই অভিজ্ঞতাটা আমাকে অনেকখানি বদলে দেয়। মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করার আগ্রহটায় একটু ভাটা পড়ে যায় তখন। মনে তখন প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ-এর একটা কথা বার বার খেলা করতো- “ছেলেতে মেয়েতে কখনও বন্ধুত্ব হয় না! জীবনে কখনো না কখনো তারা একে অপরের প্রেমে পড়বেই…”
আমার কাছে মনে হতে লাগলো- সত্যি কি তাই? তাহলে তো মেয়েদের মনো জগৎ সম্পর্কে জানতে যাওয়ায় বিপদ আছে!
এখানে বলে রাখা ভাল- আমি কিন্তু মোটেও মেয়েদেরকে হেয় করার জন্য এগুলো বলছি না। আমি এটাও বোঝাতে চাচ্ছি না যে মেয়েরা মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনলেই পটে যায়! আমি সেরকম অর্থে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ভোলানোর চেষ্টা কখনওই করিনি কারো সাথে… আবার তাই বলে এটাও দাবী করছি না যে আমার ব্যক্তিত্ব এতোটাই আকর্ষনীয় যে মেয়েরা আমার সাথে কথা বললেই প্রেমে পড়ে যায়!
তাহলে আমি আসলে কী বলতে চাচ্ছি? ঐ ঘটনার পর আমি ঘটনার অনুঘটন নিয়ে অনেক ভেবেছি। ভেবে ভেবে একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি যে- ঐ ইমোশনটা হয়তো ঠিক ভালবাসা ছিল না। তবে আমি যেটা করেছি (সব সময়ই করি) মেয়েটার কথা মন দিয়ে শুনেছি। তার ইচ্ছার মূল্য দিয়েছি। সংগত কারণেই এটা স্রেফ বন্ধুর প্রতি ভদ্রতা বা ফরমালিটি বৈ এমন কিছু নয়… কিন্তু এই কাজটুকুই হয়তো অনেকে করে না। আমি করি। শুধু মেয়েদের সাথেই যে করি তা নয়, সব বন্ধুদের সাথেই করি। হয়তো প্রকৃতিগত (বা জিনেটিক্যাল!) কারণে মেয়েদের একটু এক্সট্রা ফেভার দিয়ে থাকতে পারি। আর সেটাই ঐ মেয়েটার মনে একটা ভাল লাগার অনুভূতির জন্ম দেয়। হয়তো তার অবচেতন মন ভেবে বসে- বাহ! ছেলেটা তো বেশ কেয়ারিং…! এই “কেয়ারিংনেস”টা হয়তো মেয়ে মাত্রই পছন্দ করে… এর বেশি কিছু না।

মনে হতে পারে একটা ঘটনা থেকেই এতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম? আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এটা আমার পরবর্তী আরো অনেক ঘটনার অনুঘটন বিশ্লেষণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। ২০০৯-এ ডিপ্লোমা পাশ করার পর বেশ কিছুদিন এসব নিয়ে ভাববার অবকাশ পাইনি। জীনটা তখন হঠাৎ করেই প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পরে। ২০১২ সালের প্রথম দিকে ঘটনাক্রমে আমি ফেসবুকে এক্টিভ হয়ে পরি। একাউন্ট যদিও ২০০৯-এ খোলা হয়েছিল কিন্তু মূলতঃ এক্টিভিটি শুরু হয় এই ২০১২ থেকেই। ফেসবুকের জগতে আমি বিষ্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম নতুন এক আমাকে। ভার্চুয়াল জগতে যে এতো মানুষের সাথে এতো সহজে মেশা যায় এই ব্যাপারটা আমাকে অবিভূত করে। একদিন আবেগের বশে স্ট্যাটাসই দিয়ে ফেললাম- Fall in Love with FB!
তখন প্রচুর সময় দিতাম ফসবুকে। দিনের ১৪ থকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ও দিয়েছি কোন কোন দিন। প্রচুর বন্ধু হতে লাগলো… তাদের মধ্যে ছেলে মেয়ে সবই ছিল। লক্ষ্য করলাম এখানেও সেই পুরনো কাসুন্দি বিদ্যমান! ছেলেরা ফিমেইল আইডি দেখলেই ছোক ছোক শুরু করছে… তার পর গতানুগতিক ন্যাকামো, রিলেশন-এফেয়ার-ব্রেক আপ হাবিজাবি। সংগপোনে এড়িয়ে চলতে লাগলাম ব্যাপারগুলো। তবে আগাগোড়াই যেটা করতাম (এখনো করি) তা হল গণ হারে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করা। আর সবাইকেই সমান ভাবে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা। ফলে আগের মতই অনেক শুভাকাংখী-ভক্ত বা ফ্যান জুটে যেতে লাগলো। অনেকের সাথে ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল। ফেসবুকে বয়স অনুসারে অনেকগুলো ছোট-বড় ভাই-বোন বানিয়ে ফেললাম। তাদের সাথে এখনও আমার সম্পর্ক আপন ভাই-বোনের চেয়ে কোন অংশে কম না!
তবে এখানেও যে ব্যাপারটা খেয়াল করলাম তা হলো- ফিমেইল আইডিগুলো থেকে অনেক ধরনের কথা আসতো। আসতো প্রপোজও! যে কারণে ফিমেইল আইডির কারো সাথে বন্ধুত্ব করার চাইতে ছোট বা বড় বোন বানানোতেই আমার আগ্রহ ছিল বেশি। এমন অনেককেই আমি প্রথম চ্যাটিং-এই কোথায় থাকে কী করে এসব কথার ছলে বয়স অনুমান করে ছোট/বড় বোন বানিয়ে ফেলেছি! তাদের সাথে তুই তুকারিতে চলে গিয়েছি যাতে পরবর্তীতে রিলেশনটা অন্য কোন দিকে মোড় নেবার সুযোগ না পায়!
তবুও কিছু আইডি বন্ধুর মতই থেকে গেছে। যেমন মেয়ে বন্ধু বানানোর সেই পুরোনো আকাংখা থেকে আমার বেশ কিছু “ইথোপিয়ান” মেয়ে বন্ধু হয়ে যায়! তারা আমাকে এখনও খুব ভালবাসে এবং আমাকে দিয়ে তাদের বাংলাদেশীদের সম্পর্কে খুব ভাল একটা ধারনা জন্ম নিয়েছে! এই রিলেশনগুলো থেকে আমি আবার একটু সাহসী হয়ে উঠি। কিছু কিছু মেয়ের সাথে বন্ধুর মতই মিশতে শুরু করি তখন। তত দিনে বেশ কিছু স্বেচ্ছা রক্ত দানকারী বা অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সাথে জড়িয়ে পরার কারণে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ভার্চুয়াল জগতে একই সাথে কাজ করতে গিয়ে কারো কারো সাথে ঘনিষ্টতা বেশ বেড়ে যায়। আমাকে পেয়ে বসে সেই পুরোন নেশায়…
ঘনিষ্ট মেয়েদের সাথে আমি মিশতে শুরু করি একজন নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত বন্ধুর মতই। তাদেরকে সুযোগ করে দিই তাদের মনের কথা (যতটুকু সম্ভব) নিশ্চিন্তে শেয়ার করার। কারণ সেই একটাই… আমি তাদের অনুভূতিগুলো স্পর্শ করতে চাই!
এ পর্যায়ে এসে মাঝে মাঝে কিছুটা জটিলতা দেখা দেয়। সেই পুরোনো সমস্যা পেয়ে বসে কাউকে কাউকে। তাছাড়া যাকে এতো আপন ভেবে মনের অনেক লুকোনো গোপন কথা শেয়ার করা যায় সেতো সাধারণ কেউ নয়… সেতো অবশ্যই বিশেষ কেউ!
এই “বিশেষ”টা কতটুকু বিশেষ? কেমন “বিশেষ”? এই কমপ্লেক্সটা দেখা দেয়া খুব স্বাভাবিক। আমাদের মস্তিস্ক এই কমপ্লেক্স নিতে অভ্যস্ত নয়। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে সম্পর্কটা কি শুধুই বন্ধুত্বের- নাকি আরো একটু বেশি কিছু? যদি বেশি কিছু হয় তবে তার ভবিষ্যত কী?

ফেসবুক থেকে এবার একটু বাস্তবতায় আশা যাক। আমার এক বেয়াইন আছে, আমার চেয়ে বয়সে বছর দু’য়েক-এর বড়। মাঝে মাঝেই রসিকতার ছলে আমাকে জিজ্ঞেস করেন- জীবনে কত মেয়েকে পটিয়েছি? কিংবা- আমার কয়টা গার্ল ফ্রেন্ড? সত্যি কেউ না থাকলে নাকি উনি আমার সাথে প্রেম করবেন!
এটা নিছকই রসিকতা। বেয়াইন বলে কথা! কিন্তু এই কৌতুহল আমি আরো অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করেছি। সেটা কী ফেসবুকে কী বাস্তব জীবনে।
ভার্সিটিতে ইভেনিং শিফটে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বুড়োরা আসে পড়তে! দেখা যায় ডিপ্লোমা করে চাকরি শুরু করেছে বহু আগে, এখন একটা সার্টিফিকেটের জন্য আর পদন্নোতি হচ্ছে না… তাই ইভেনিং-এ বি,এস,সি করতে আসা। ফলে তাদের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য আরো এক ধাপ বেড়ে গেছে এই লেভেলে এসে! আমাদের সম ব্যাচের যে একেবারে কেউ নেই তা নয়। তবে তাদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা একেবারেই নগন্য। মাঝে কিছুদিন বিভিন্ন কারণে কয়েকটা সেমিস্টার গ্যাপ দিয়ে ফেলেছিলাম। ভার্সিটিতে তাই এখন আমি বলতে গেলে আদু ভাই! কিন্তু আদু ভাই হলেও এখনো আমার চেয়ে কম বয়সী কেউ আমার ব্যাচ ম্যাট হতে পারেনি…! তবে ইদানিং জুনিয়র ব্যাচের কিছু মেয়ে দেখা যাচ্ছে ক্যাম্পাসে। একটু নিজের ঢোল না পিটালেই নয়- এখনও ভার্সিটিতে যে কোন ক্লাসে দেখা যায় আমি প্রথম সারির ছাত্র! ফলে ক্লাস নোট, এসাইনমেন্ট কিংবা এ জাতীয় বিষয়গুলোর জন্য যে সব স্টুডেন্ট আমার স্মরণাপন্ন হয়, তাদের মধ্যে কিছু মেয়েও থাকে। কারো নাম বলাটা ঠিক হবে না তাই নাম উল্লেখ না করেই বলি- আমার এমন ২/১জন মেয়ে ক্লাসমেটও ঐ একই প্রশ্ন আমাকে করেছে!

এদের মধ্যে এক-দুইজনের সাথে ঘনিষ্টতাটা এতো বাড়াবাড়ি রকমের বেশি যে, যে কারো চোখে বিষয়টা অন্য কিছু মনে হতে পারে! আমার সাথে মনের সব জমানো গোপন কথা খুলে বলে এরা হালকা হয়। আমি সত্যি তাদের কাছে “বিশেষ কেউ”! কিন্তু এরা কেউই আমার বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু নয়…। আসলে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু হওয়া বোধহয় সম্ভবও নয়! বন্ধু হতে পারাটাই কি অনেক বড় কিছু নয়? ক’জন পারে একজন সত্যিকারের বিশ্বস্ত বন্ধু হতে?
আমার এই লেখা পড়ে কারও কারও মনে হতে পারে আমি নিজেকে খুব ব্যক্তিত্বশীল-সুপুরুষ হিসেবে ঢোল পেটাচ্ছি! ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। শিরোনাম-এর যতার্থতা বজায় রেখেই আমি মূলতঃ আমার আত্মকথা বলে যাচ্ছি। আমার এই আত্মকথায় আমার অনেক বন্ধুর অনেকদিনের পুরোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি। কে জানে হয়তো নিজেকেও!
সব শেষে আমি এক কথায় আমার এই লেখাটি লেখার উদ্দেশ্য বলতে চাই। যদিও সেটা জরুরী ছিল না। কারণ, আমি আমার ব্যক্তিগত নোটে কী লিখব না লিখব সেটা কাউকে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই… তবুও লিখছি যাতে আমার প্রতি কারো কোন ভুল ধারনা জমে না থাকে।

“…ভালবাসা আর বন্ধুত্বকে আমি খুব একটা আলাদা কিছু বলে মনে করি না। ভালবাসা একটা অনুভূতির নাম, আর বন্ধুত্ব হচ্ছে তারই সাথে সম্পৃক্ত একটা সম্পর্কের নাম। অদ্যবধি আমার সাথে যত মানুষের পরিচয় হয়েছে তারা সবাই আমার বন্ধু… আমি সবাইকেই ভালবাসি, কেয়ার করি, সম্মান ও গুরুত্ব দেই। হয়তো কাউকে একটু বেশি কিংবা কম। আর প্রেম বলতে যে বিশেষ সম্পর্কের কথা আমরা বোঝাই সেটাও আমার কাছে এখনও খুব একটা বিশেষ কিছু বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, সেই বিশেষ একজনটা হয়তো এজন্য আমার কাছে বিশেষ হবে যে তার সাথে আমার শুধু বন্ধুত্ব বা ভালবাসার সম্পর্কই থাকবে না, থাকবে শারিরীক সম্পর্কও। তার প্রতি অধিকার-দায়িত্ববোধ সবকিছুই থাকবে অন্য আর সবার থেকে একটু বেশি। তার সাথে আমার ভালবাসা-বাসি থেকে জন্ম নেবে আমাদের নতুন প্রজন্ম। তাকে হয়তো আমি এতো ভালবাসব যে সে আমাকে ছেড়ে স্বর্গেও যেতে চাইবে না! ব্যস, এটুকুই…”

[বিঃ দ্রঃ অনেকদিন ধরে একটা কবিতা মাথার ভেতর ঘুর ঘুর করছে। লিখতে পারছি না… কবিতাটা অনেকটা এরকমঃ

শত সহস্র বছর ধরে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে
আমি কেবল তোমারই প্রতিক্ষায় আছি হে- প্রিয়তমা!

…শুধু কেবল তোমারই হাত ধরে হাঁটবো বলে
লক্ষ ক্রোশ পথ একা হেঁটেছি তবু-
ধরিনি কারো বাড়িয়ে দেয়া হাত।

কত বর্ষা পাড় করেছি,
চোখের সামনে ফুটতে দেখেছি
সহস্র কদম ফুল।
শুধু তোমার খোপায় গুঁজে দেব বলে
আমি হাত বাড়াইনি সে ফুলের দিকে
উপেক্ষা করেছি শত রমনীর
খোপার আহ্বান!

‘১লা’ কাটিয়েছি সবগুলো ১লা বৈশাখ, ১লা ফাগুন
তবু অন্য কাউকে খুঁজিনি আমি…
শুধু তোমারই অপেক্ষায় বিসর্জন দিয়েছি
সব ক’টা রঙিন বসন্ত
প্রেমময় ভ্যালেন্টাইন।

…শুধু তোমার কানে ঠোঁট গুঁজে বলব বলে
অদ্যাবদি কাউকে বলিনি-
ভালবাসি, ভালবাসি…
আমি তোমাকে ভালবাসি!

]

– সফিক এহসান
১৫ এপ্রিল ২০১৪

৪ thoughts on “আমার যাপিত জীবন-৪ (আত্মকথাঃ মেয়ে বন্ধু…)

  1. অনেকদিন পর লিখলেন সফিক
    অনেকদিন পর লিখলেন সফিক ভাই।যদিও লিখায় আপনার ব্যাক্তিগত উপাখ্যানই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে তথাপি আপনার লিখাটা ভাল লেগেছে ।
    নিয়মিত লিখবেন আশা করি ।

    1. বেশ ভালো আছি! ফেবুতে তো কথা
      বেশ ভালো আছি! ফেবুতে তো কথা হয়ই…
      ইস্টিশনে খুব একটা আসার সময় পাই না আজকাল। নতুন সাইকেল কিনেছি তো, এখন সাইকেলেই বেশি যাতায়াত করি- ট্রেনে ওঠা হয় না!
      :আমারকুনোদোষনাই:

      :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: 4 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *