আমি কি বাঙালি?

বাঙালির নিজস্ব খাবার কি? বাঙালির নিজস্ব পোশাক? আজ বাঙলা নববর্ষের দিনে সবাই নাকি একদিনের জন্য বাঙালি সাজবে? বাঙালি খাবার খাবে? এটা নিয়ে শ্লেষ ছলে বলা হয় কথাগুলো। ধর্মান্ধ মুসলিম মৌলবাদীরা আবার বৈশাখ পালনে এ্যালার্জি বোধ করেন। এবারই সিলেটে একটা ভূইফোড় মৌলবাদী সংগঠন বৈশাখ পালনের নামে বেল্লাপনাকে ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা শহরে ইসলামী নিয়মে বর্ষবরণ করে দেখিয়ে দিবে। এরা যাই হোক বর্ষবরণ “ইসলামী” ধারায় পালনের কথা বলছে, অন্য মৌলবাদীরা বাঙলা নববর্ষকে পুরোপুরিই শরীয়ত বিরোধী মনে করে।ঢাকা শহর সহ দেশের শহুরে জীবনে যে বৈশাখ পালনের বর্তমান চেহারা তা খুব বেশিদিনের নয়। ৮০ দশকে খুব সম্ভবত ঢাকার বাইরে চারুকলা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা করে।ক্রমে সেটা ঢাকায় রমনায় জনপ্রিয় হয়ে যায়। বৈশাখের প্রথম প্রভাতে “এসো হে বৈশাখ” দিয়ে বর্ষকে বরণ করার রীতি তা একান্ত শহুরে মধ্যবিত্তের। অবশ্য এটা এখন সর্বশ্রেণীর মাঝে গিয়ে নিজের স্থান নিতে পেরেছে।এই বৈশাখ নিয়ে এত কথা, এত সমালোচনা, এভাবে নয়, ওভাবে নয়… এর কারণটা হচ্ছে আমরা কতটুকু বাঙালি থাকবো আর কতটুকু মুসলমান, কতটুকু ইউরোপীয়ান সেটা স্থীর করতে পারি নাই।আমরা আমাদের আইডেন্টি নিয়ে চিরকাল কনফিউস ছিলাম।মুসলাম কি বাঙালি হতে পারে? এই বাঙালি যখন শ্রীকান্তের একটা লাইন পড়ে “বাঙালি আর মুসলমান ছেলেদের মাঝে ফুটবল খেলা…” সে গোস্বা হয়ে যায়!শরৎচন্দ্র বলেন, আমি মুসলমান বলতে হিন্দুস্থানী মুসলমান ছেলেদেরে বুঝিয়েছি, বাঙালি মুসলিমকে বুঝাই নাই…। বাঙালি মুসলমান তখন হাঁফ ছেড়ে বাচেঁ।কিন্তু এরাই শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর মাত্র ১০ বছরের মধ্যে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে! এক লাথিতে সমগ্র রবীন্দ্র রচনাবলী গড়াগড়ি খায় পাকিস্তানের বর্ডারে…।নজরুলকে গোলাম মোস্তফারা বলেন তাকে মুসলমানী করে আনতে হবে। তার শ্যামা সংগীতকে ভুলে যেতে হবে…বড্ড বেশি হিন্দুয়ানী এই লোকটা, কবিতায় ভগবান,ভগবান…।তারাই আবার পাকিস্তান আমলে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করে পুলিশের বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে…।বাঙালির শরীরে কোন জাতির রক্ত বেশি প্রবাহিত হয় জানি না। তবে আমার কাছে এদের স্ববিরোধী বলে বেশি মনে হয়…।

বাঙালির পোশাক কি লুঙ্গি? শব্দটাই বলছে সে বার্মিজ। মানে বর্মা থেকে এসেছে লুঙ্গি। পাঞ্জাবী, ধুতির ইতিহাস বাঙালির ইতিহাসে নেই।বাঙালি পুরুষ এক প্রকার অর্ধ উলঙ্গই থাকতো।কৃষিজিবি এই সমাজ ব্যবস্থায় মাঠেই তার দিন কাটতো বেশি। গ্রীষ্ম প্রধান এই দেশে গায়ে কাপড় রাখাই কঠিন।শাড়িও বাঙালি নারীর নিজস্ব পোশাক নয়। আজকের যে শাড়িকে আমরা দেখি এটা ঠাকুর বাড়ির এক বৌ (দেবন্দ্রনাথের পুত্রবধূ জ্ঞানান্দনি দেবী) বাঙালি নারীর সম্ভ্রমকে রক্ষা করতে এগিযে আসেন।মূলত দক্ষিনী নারীদের শাড়ি পরার ধরনকে তিনি ফলো করে নতুন একটা স্টাইল দেন।ব্লাউজ প্রচলন করেন। এর আগে বাঙালি নারী একটা থান কাপড়কে গায়ে জড়িয়ে রাখতো…।

পৃথিবীর কোন জাতিই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি। সময় ও বাস্তবতা তাকে তার পোশাক, খাদ্যকে পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।চাইনিজরা যেমন কোন এক দুর্বিক্ষর সময় অনেক কিছুকে এক সঙ্গে ফুটিয়ে খাবার ব্যবস্থা করেছিল যা আজকের সুপ্য নামে পরিচিত।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় কাপড় কলের অভাবে পুরুষের আলখেল্যাকে ছোট হতে হতে আজকের শার্টের জন্ম। শর্ট থেকেই শার্ট।লং স্কাট থেকে আজকের মিনি স্কাট। যুদ্ধের পরে কাপড়ের স্বল্পতা বহুকালের কালচার এভাবে পাল্টে যায়।… এই শার্ট আর প্যান্ট আজকের কসমপলিজমের একটা নমুনা।পৃথিবীর সব জাতি এই একটা পোশাকই পরছে রোজ। নিজেদের ঐতিহ্য আর পোষাককে পুরোপুরি জাদুঘরে তারা পাঠায়নি।বিশেষ দিনে নিজেদের পোশাক পরে তাকে আজো আগলে রেখেছে ভালবাসায়। যেমন আমরা বিশেষ দিনে উপমহাদেশের বিশেষ পোশাক পাঞ্জাবী পরি।কেউ হয়ত এটাকে বাঙালির পোশাক মনে করে খুব আহ্বলাদ পান।বহুকাল এটা আমাদের পূ্র্ব পুরুষরা পরে এসেছে, এটাকে তাই খুব দূরের বলার আর দরকার নেই।বিশেষ দিনে পাঞ্জাবী পরে নিজেদের পালাপার্বন পালন করলে ভালই লাগে। দেখতে সুন্দর লাগে। মনে মধ্যে বেশ একটা উৎসবের ছোঁয়া পাওয়া যায়।এটা সমালোচনা করা উচিত নয়।বৈশাখে পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ খেলে দোষের কিছু নেই। “একদিন বাঙালি সাজার” যে শ্লেষপূর্ণ ইঙ্গিত সেটা ঠিক নয়।মানুষ একদিন বৈশ্বিক হয়ে যাবে। অনেক বেশি বিশ্ব নাগরিক হবে তার জীবনযাপনে।পোশাকে সে ব্যবধান ঘুচে গেছে আগেই। সময় ও বাস্তবতা আরো কাছে এনে দিবে মানব জাতিকে।কিন্তু তাই বলে আমাদের পহেলা বৈশাখ হারিয়ে যাবে না। আমরা একদিন পাঞ্জাবী পরে, বাহারী শাড়ি পরে বৈশাখী মেলায় যাবো। সাধ্যে কুলালে পান্তার সাথে ইলিশ ভাজা খাবো।সেটা কিছুতে “বছরে একদিন বাঙালি” সাজা হবে না।যে কোন জাতি তার ভাষার সর্বচ্চ ব্যবহার ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার মধ্যে সক্রিয়তাকে ধরে রাখে।পাঞ্জীব বা ফতুয়া কি শাড়ি পারার মধ্যে নয়।বাঙালি তার ভাষা ও সাহিত্য যা বাঙলায় লেখা হয় তার উত্তোরত্তর অগ্রগতির উপর নির্ভর করছে তার বিলিন হয়ে যাওয়া না যাওয়া। এটা পৃথিবীর যে কোন জাতিসত্তার বেলায় সত্য।

ইসলামী মৌলবাদীরা পহেলা বৈশাখকে সহ্য করতে না পারার কারণ এর সেক্যুলার চরিত্র। এটা বাঙালির মধ্যে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে “বাঙালি” পরিচয়ে বড় করে দেখায় যা “মুসলিম জাতীয়তাবাদ”-এর জন্য হুমকি স্বরূপ। যারা বৈশাখের বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারছেন না বাস্তবতার কারণে তারা কৌশলে ইসলামী রূপ দিয়ে এটাকে বাঙালি হিন্দুর থেকে আলাদা করতে চেয়েছে। অনেকটাই তারা সফল হয়েছে।

বাংলাদে্শের বাস্তবতা হচ্ছে এখানে বৈশাখ হিন্দু আর মুসলমান দুই দিনে পালন করে। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ সরকার রোমান ক্যালেন্ডার অনুসারে যে বাংলা পঞ্জিকা সংশোধন করে তার ভিত্তিতে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ফিক্সড হয়ে যায়। মূলত হিন্দু সম্প্রদায় ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে লোকনাথ ক্যালেন্ডারে এখনো আস্থা রেখেছে। কোলকাতায়ও বাংলাদেশের বাংলা পঞ্জিকাকে ফলো করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু লোকনাথ পঞ্জিকাঅলারা কোটি কোটি টাকার ব্যবসার সমাপ্তির বাস্তবতায় হিন্দু ধর্মের তিথি-নক্ষত্র দেখে পূজা-পার্বন পালনের বাধ্যবাধকতার কথা বলে লোকজনকে লাইনে আনে। সরকারও ভোটের ভয়ে সরে আসে এখান থেকে।সূর্য ক্যালেন্ডার আসলে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিখুত ক্যালেন্ডার চন্দ্র বর্ষিয় ক্যালেন্ডার তুলনায়।…আমরা কি সবাই মিলে একদিনে বৈশাখ করতে পারবো না?

আশার কথা তরুণরা ঠিকই একই দিনে বৈশাখ পালন করছে।এই দিনগুলোতে আমি বড় আশাবাদী হয়ে উঠি। মানুষের সেক্যুলার উৎসবে এত বেশি সাড়া দেখে আমি বিশ্বাস করি মানুষ শেষতক অসাম্প্রদায়িক হতে পারে।ধর্মই তাদেরকে পৃথক করে। মৌলবাদ তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। এইরকম উৎসব তাদেরকে ফের কাছে টেনে আনে।মিলনমেলায় সামিল করে।…
সবাইকে আমার নববর্ষের শুভেচ্ছা।

২ thoughts on “আমি কি বাঙালি?

  1. ভালো লাগলো আপনার ভাবনাচিন্তা।
    ভালো লাগলো আপনার ভাবনাচিন্তা। এই বিষয়টা নিয়ে কয়েকদিন ধরেই চিন্তা করছিলাম। আপনার সাথে চিন্তার মিল দেখে ভালো লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *