পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত “কে-টু” জয়ের পেছনের তিক্ত ইতিহাস

কে-টু, পাকিস্তানের কারাকোরাম মাউন্টেইন রেঞ্জে অবস্থিত পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত। ২৮,২৫০ ফিট আকাশছোঁয়া উচ্চতার এই চূড়াকে পৃথিবীর সুউচচ পর্বতগুলোর মধ্যে আরোহণের জন্য সবচেয়ে কঠিন বলে বিবেচনা করা হয়। চরম অনিশ্চিত আবহাওয়া, বিপদজনক খাড়া পাথুরে দেয়াল, যখন তখন নেমে আসা তুষারধ্বস, প্রচণ্ড অক্সিজেনস্বল্পতা সবটা মিলিয়ে কে-টু আরোহণ করা যেকোনো পর্বতারোহীর জন্যই বিশাল এক অর্জন। ঠিক একারণেই যুগযুগ ধরে প্রতিবছর স্বপ্নের পিছু নিয়ে এখানে ছুটে আসে অসমসাহসী কিছু লোক। এদের কেউ কেউ স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় পোরার সুযোগ পায়, কেউ কেউ এখানেই চিরতরে হারিয়ে যায়। এর দুর্গমতা ও পর্বতারোহীদের স্থায়ীভাবে এখানেই রেখে দেয়ার রেকর্ডের (!) কারনে এর নাম হয়ে যায় “কিলার মাউন্টেইন” , “Savage Mountain”,“Mountain of the Mountains” ইত্যাদি।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ১৯৫৪ সালের সফল ইটালিয়ান এক্সপিডিশনের আগপর্যন্ত মোট পাঁচটি দল এই পর্বতে অভিযান চালায়। তার মধ্যে আমেরিকানদের ১৯৩৮,১৯৩৯, ১৯৫৩ সালের অভিযান তিনটিই মোটামুটি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় উঠতে সক্ষম হয়।
১৯৫৪ সালের ৩১শে জুলাই ইটালিয়ান টিমের সদস্য “আচিলি কম্পেগননি” ও “লিনো লাচেডেলি” প্রথমবারের মতো কে-টু জয় করেন। তখন থেকেই ইটালিতে এটি একটি গৌরবময় জাতীয় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু কে-টু জয়ের এই গৌরবময় ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্বাসঘাতকতার এক করুণ ও শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়।
আজকে আমরা এমনি এক কাহিনী শুনবো যা পরবর্তীতে একজন ক্লাইম্বারের, বলা ভালো পর্বতারোহণের পুরো ইতিহাসটাই পাল্টে দিয়েছিলো।
—————————————————
জুলাই ৩০, ১৯৫৪।
আকাশছোঁয়া অনিঃশেষ বরফের রাজ্যে অন্ধকার নেমে আসতেই ক্লান্ত পর্বতারোহী তার মাথার উপরের ঢালটায় কি যেন খুঁজলো। “লিনো! আচিলি!! কোথায় তোমরা?” চিৎকার করে ডেকে উঠলো সে। কিন্তু ওদের হয়ে কেবল নীরবতাই উত্তর দিলো। সারাদিনের একটানা লোড ফেরি করার অমানুষিক পরিশ্রমের শেষে ওয়াল্টার বোনাত্তি ও তার সঙ্গী অকুতোভয় হানযা পোর্টার আমির মেহেদি পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বত পাকিস্তানের কে-২ এর বুকে ২৬,৫৭৫ ফিট পর্যন্ত উঠে এসেছে।
এটা সেই সময় যখন পৃথিবীর বুকে পর্বতারোহণের পরমআরাধ্য পুরস্কার কে-টু এর চূড়া সুসংঘটিত একটা ইটালিয়ান টিমের প্রায় হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, প্রতিনিয়ত যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঠিক আগের বছরটাতেই পৃথিবীর সরবচ্চ চূড়া এভারেস্টে প্রথমবারের মতো মানুষের পা পড়েছে। এবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতের পালা।
জুলাই মাসের সেই সকালবেলায় ইটালিয়ান টিমের ক্লাইম্বিং লিডার ৪০ বছর বয়সী আচিলি কম্পেগননি এবং তার সহঅভিযাত্রী ২৯ বছর বয়সী লিনো লাচেডেলি কে-২ এর সামিট পুশের উদ্দেশে ৯ নম্বর ক্যাম্পে উঠে আসে। ওয়াল্টার বোনাত্তি যদিও পুরো ইটালিয়ান টিমের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী ছিলেন কিন্তু আল্পসের বুকে নতুন নতুন রুটে আরোহণ করে এরি মধ্যে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে চূড়ায় ওঠার প্রাথমিক টিমে তাকে রাখা হয়নি! গৌরবের সুখস্বপ্ন দেখার পরিবর্তে এখন তাকে এবং সেসময়ের সবচেয়ে অভিজ্ঞ হানযা ক্লাইম্বার মেহেদিকে চূড়ান্ত দলের মানে কম্পেগননি আর লাচেডেলির কাছে মহামূল্যবান অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো পৌঁছে দেয়ার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে হয়েছে। আগের রাতের মিটিঙে সাব্যস্ত হয়েছে ২৫,৯০০ ফিট উচ্চতায় বরফের যে তুলনামুলক নিরাপদ অংশটুকু আছে সেখানেই কম্পেগননি আর লাচেডেলি ৯ নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করবে। সারাদিন অমানুষিক খেঁটে সেই জায়গাটায় পৌঁছে তারা দেখতে পেলো কোথায় ক্যাম্প! কোথায় কি! এখানে যে কেউই নেই!
আরও ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন তারা ওপরের দিকে রওয়ানা দিলো তখনি ওদের জানা হয়ে গেছে যে আজকে ওদের আর নিচে নামা হচ্ছে না। সমস্যা নেই- তাতেও তো তাদের সঙ্গীরা পরেরদিন সামিটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো অন্তত হাতে পাচ্ছে আর কম্পেগননি আর লাচেডেলির সাথে এক তাঁবুতে কোনরকমে এই রাতটা কাটিয়ে দেয়া যাবে- ভাবল ওরা। কিন্তু ওদের কপালে যে কি লেখা আছে তা যদি ওরা তখন জানতো!
আরও কিছুদূর ওঠার পরও টিমের কারো কোন চিহ্ন না দেখে বোনেত্তি এবার চিৎকার করে তাদের ডাকলো। “আচিলি!! লিনো! তোমরা কোথায়? উত্তর দিচ্ছো না কেন?! আচিলি!! লিনো!” তার বারংবার ডাক পর্বতের গায়ে ধ্বনিত হতে লাগলো। এরিমদ্ধে দোয়াতকালির মতো অন্ধকার নেমে এসেছে কে-টু এর বুকে। মেহেদির সাথে কোন হেডল্যাম্প নেই, বোনাত্তির সাথে যেটা ছিল সেটাও এখন আর কাজ করছে না। এবার সত্যিই চিন্তা হল বোনাত্তির। ওপরের ওদের কোন বিপদ হয়নি তো। তখুনি অন্ধকারের বুক চিরে দিয়ে একটা আলো জ্বলে উঠলো। নিশ্চয়ই ওপরের ওরা ওর ডাক শুনতে পেয়েছে- খুশিমনে ভাবল বোনাত্তি। অপ্রত্যাশিতভাবে আলোটা আসছে আগে থেকে ঠিক করে রাখা সামিট রুটের বেশ কয়েকশ ফিট ওপরের বামদিক থেকে। ওখানেই একটা বেরিয়ে থাকা পাথরের আড়ালে ক্যাম্প করেছে কম্পেগননি আর লাচেডেলি।
বোনাত্তি শুনতে পেলো লাচেডেলি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করছে, “অক্সিজেন এনেছো তোমরা?”
এপাশ থেকে বোনাত্তিও চিৎকার করে আশ্বস্ত করলো, “হ্যাঁ”
এবার অন্যদিক থেকে উত্তর এলো , “দারুণ। তাহলে এবার ওগুলো ওখানেই রেখে তোমরা সোজা নিচে চলে যাও!”
নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলো না বনেত্তি। এর মানে কি ? লাচেডেলি কি বোঝাতে চাইলো?!!
বোনেত্তি আবার চিৎকার করে জানালো , “আমি পারবোনা! মেহেদির নামার মতো অবস্থা নেই!”
কিন্তু যেভাবে হঠাৎ করে লাইটটা জ্বলেছিলো ঠিক সেভাবেই হঠাৎ করে নিভে গেলো। মরিয়া হয়ে এবার মেহেদিও তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে চিৎকার করে উঠলো, “”No good, Compagnoni Sahib! No good, Lacedelli Sahib!” বোনাত্তিও যোগ দিলো, ““লিনো! আচিলি!! এসবের মানে কি?! আমাদের সাহায্য কর। দোহাই লাগে!” ৯ নম্বর ক্যাম্প থেকে একটা শব্দও কেউ উচ্চারণ করলো না! চিৎকার করে বারবার সাহায্যের আকুল আবেদন যেন ক্রমশ পর্বতের গায়ে প্রতিধ্বনি তুলে ওদেরকেই বিদ্রুপ করতে থাকলো……………।


ছবিতে বোনাত্তি ও লেচেদেলি দুইদলের ক্যাম্প সাইট দেখা যাচ্ছে।

রাগে, দুঃখে, হতাশায় বনাত্তি বোবা হয়ে গেছে! একচুল নড়ার শক্তিও বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছে ও। মেহেদির ডাকে সৎবিত ফিরল বনাত্তির। তিক্ত সত্যিটা গিলতে সময় লাগছে বেশ! এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না ওর যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক পর্বতটার বুকে ২৬,৫৭৫ ফিট উচ্চতায় একটা ঢালে ওদের আটকা পড়ে গেছে। ও ঠিকই নেমে যেতে পারতো নিচে, এমনকি হেডল্যাম্প ছাড়াই কিন্তু মেহেদির জন্য সেটা ছিল অসম্ভব। অসমসাহসী মেহেদি তখন ক্লান্তিতে, আতঙ্কে পাগলের মতো আচরণ শুরু করেছে। বেশ কয়েকবার বনাত্তি ওকে একরকম জোর করেই নেমে যাওয়া থেকে বিরত রেখেছে। সাথে তাবু নেই, তার মানে কোন আশ্রয়ও নেই, নেই কোন খাবার! তারপরও বেঁচে থাকার স্বাভাবিক তাগিদে ডানে-বাঁয়ে কোন বরফ বা পাথরের আড়াল খুঁজতে শুরু করলো ওরা। কিন্তু বিধিবাম। তেমন কিছুই তো চোখে পড়ছে না। শেষে এই উচ্চতায় যেটা আগে কেউ কখনো করার সাহস করেনি সেটাই করতে বাধ্য হল ওরা। একটা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বিভোয়াক (বিশ্রামের উদ্দেশে বরফের গায়ে গর্ত খুঁড়ে বা পাথরের খাঁজে তৈরি করে নেয়া আশ্রয়স্থল)!
এমন উচ্চতায় শুধু তীব্র বাতাস বা ঝড়ই নয়, সামান্য একটা বরফধ্বস থেকে সাময়িকভাবে বাঁচার জন্য ন্যূনতম আড়ালটুকুও ওদের আর রইল না।
আইসএক্স বা বরফকুঠার দিয়ে বরফের গায়ে একটা চলনসই গর্ত খুড়তেই অনেকক্ষণ লেগে গেলো ওদের। খোড়া শেষ করে প্রথমে মেহেদিকে বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসলো বনাত্তি। ঢালু বরফের গায়ে এইমাত্র তৈরি করা সমতল সিটের মতো জায়গাটায় এখন ওরা গায়ের সাথে গা লাগিয়ে বসে আছে। কোথায় উষ্ণতা, কোথায় আশ্রয় ! তীব্র শীতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে নিজেদের ভাগ্যকে শাপশাপান্ত করাই সার হল ওদের……………

কে-টু অভিযানের পূর্বকথা ————————————-
১৯৫৪ সাল।
সময়টা ছিল অদ্ভুত। দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ আর ক্ষত থেকে সবে সেরে উঠেছে। পঞ্চাশের দশকে অভিযানের স্বর্ণযুগের সেই সময়টায় প্রতিটি অভিযানের সাথেই জাতীয় গৌরব আর অর্জন লতায়পাতায় জড়িয়ে গিয়েছিলো। সবগুলো বড় শক্তি এবার যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পর্বতারোহণের মঞ্চ, হিমালয়ে নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ইঁদুর দৌড়ে নেমে পড়েছে। এর আগে হিমালয়ে কখনই উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য না পাওয়া ফ্রান্স ১৯৫০ সালের অন্নপূর্ণা জয় দিয়ে তাদের অপূর্ণতার ক্ষতে কিছুটা প্রলাপ লাগিয়েছে। ৮০০০ মিটার উঁচু অন্নপূর্ণার মহাকাব্যিক জয় যুদ্ধে জার্মানদের হাতে নাকাল হওয়া পুরো ফ্রান্স জাতিটাকেই গৌরবের অনন্য এক অনুভূতি উপহার দেয়। এমনকি এর কিছু বছর পর ১৯৫৬ সালে পুচকে জাপানও নেপালের ২৬,৭৮১ ফিট উচ্চতার মানাসলু জয়ের মধ্যে দিয়ে এই রেসে সামিল হয়ে পড়ে।
যাইহোক, কে-টু অভিযানে ফিরে আসি। যুদ্ধপরবর্তী ঐ সময়টায় যেকোনো অভিযানে দলনেতা হিসেবে অটোমেটিক চয়েস ছিল সামরিক পটভূমির কোন করতিত্তবান ব্যক্তি। কর্তাব্যক্তিদের মনে হতো এই মাপের যেকোনো অভিযানে সফল হওয়ার জন্য যে শৃঙ্খলা ও নির্দেশনা দরকার সেটার জন্য একজন সামরিক ব্যক্তিই উপযুক্ত পছন্দ। এই চিন্তাভাবনার ফসল হিসেবেই আমরা অন্নপূর্ণায় মরিস হেরজগ, এভারেস্টে স্যার জন হান্ট এবং নাঙ্গা পর্বতে কার্ল মারিয়া হেরলিগকোফার-কে দলনেতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় খুজে পাই।
যুদ্ধে হেরে যাওয়া বিধ্বস্ত ইতালির জন্য হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার বড় এক উপলক্ষ হিসেবে আসে কে-টু এর ১৯৫৩ সালের অভিযান। এমন এক মহাগুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় দলনেতা হিসেবে তাই বেছে নেয়া হয় ৫৭ বছর বয়সী প্রোফেসর “আরদিতো দেসিও”-কে। তিনিই পুরো এক্সপিডিশনটা পরিচালনা করবেন নিজ হাতে।
যাইহোক, মজার ব্যাপার হল প্রাথমিক সামিট টিমের নিশ্চিত সদস্য হওয়া নিয়ে একজনের ব্যাপারে কখনই কারো মনে কোন প্রশ্ন ছিলো না। তিনি আচিলি কম্পেগননি। সবাই জানতো যে আচিলি প্রফেসর দেসিও-র বিশেষ অনুগ্রহভাজন ও পছন্দের পাত্র। এক আচিলি ছাড়া দলের বাকি সবার সাথে দেসিও-র ব্যবহার ছিল প্রচণ্ড রুক্ষ ও কঠোর। এমন অভিযানের জন্য হয়তো তেমনটাই দরকার ছিলো!
বেস ক্যাম্পে প্রতিদিনের অর্ডার গুলো উনি সবাইকে টাইপ করে দিতেন। একদিন সবার হাতে এলো তার একটা নির্দেশনা যেটায় লেখা – “যে আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে না তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। তাকে শাস্তি দেয়া হবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র “প্রেস” (পত্রিকা) দিয়ে।” তার মিলিটারি মেজাজের “সামান্য” একটি নজির এটি! (পরবর্তীতে ওয়াল্টার বনেত্তির সাথে ঠিক তাই করা হয়েছিলো!)

এবার মূল কাহিনীতে ফিরে আসি।
২৬,৫৭৫ ফিট উচ্চতায় আটকা পরা বনেত্তি আর তার সঙ্গী মেহেদির জীবন পাল্টে যেতে যাচ্ছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে শীতের তীব্রতাও নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় সকাল পর্যন্ত নিজেদের টিকে থাকা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিয়েছে বনাত্তির মনে। ওদিকে মেহেদির সেসব চিন্তা করার মতো অবস্থাও নেই। ও এতো কাহিল হয়ে পড়েছে যে কিছুক্ষণ আগে বনাত্তি একরকম জোর করেই ওর পায়ের ক্রেম্পন খুলে দিয়েছে, নইলে ওর ফ্রস্ট বাইটের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেত। পুরো রাত বনাত্তি কাটালো নিজের পাঁচটা আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। সন্দেহ হচ্ছিলো ওগুলো আছে কিনা! মাঝে মাঝে মাথায় হরেকরকম চিন্তা তৈরি করে দেখছিল এখনো ও সুস্থভাবে চিন্তা করতে পারছে কিনা। সাথে একটু একটু পরপর চলছিলো আইসএক্স দিয়ে নিজের অসাড় পা দুটোয় ক্লান্তিকর বাড়ি মারা।
ভোররাতের দিকে তুষারপাত এতো বেড়ে গেলো যে বেশ কবার ওদের আস্তানা পুরোপুরি ঢেকে যায়।
সকালের দিকে শরীরটা একটু নড়াচড়া করার সাথে সাথে বনাত্তির মনে হল ও যেন একটুকরা বরফ, এমনি জমে গেছে ও। আলোর প্রথম রেখা দেখা যেতেই মেহেদি একরকম দৌড়ে ৮ নং ক্যাম্পের দিকে নামা শুরু করে। ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে গেলেও গতরাতের মতো মেহেদিকে আবার আটকানোর অবস্থা বনাত্তির নেই। চোখের সামনে দিয়ে মেহেদিকে এভাবে নেমে যেতে দেখে নিঃশ্বাস নিতে একরকম ভুলেই গেছে ও। কিন্তু মেহেদি একটু সমতল জায়গায় পৌঁছানো মাত্র বনাত্তি বুঝতে পারলো লোকটা এখন “ওকে”। ৮ নম্বর ক্যাম্পের নিরাপদ আশ্রয় আর বেশি দূরে নয়……………….


(বোনাত্তি)
২৬০০০ ফিট উচ্চতায় বিভীষিকাময় একটা রাত কাটিয়ে বোনাত্তি ও মেহদি অবশেষে ৮ নং ক্যাম্পে ফিরে আসতে সক্ষম হল। ওদের দেখে ক্যাম্পের লোকজন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। এই দুজন বেঁচে আছে! কিভাবে সম্ভব?! তাড়াতাড়ি ওদের দুজনকে তাবুতে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলো লোকজন। একহাজারটা প্রশ্ন ওদের দিকে ছুটে আসছে দেখে প্রমাদ গুনলো ক্লান্ত বোনাত্তি। কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো অবস্থা ওদের ছিলোনা। হয়তো ওদের মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেই ক্যাম্পের লোকজন ওদের শুশ্রূষাতে নেমে পড়লো। অলৌকিকভাবে বোনাত্তি পুরোপুরি অক্ষত ও সুস্থ ছিল। কিন্তু মেহদি অতোটা ভাগ্যবান নয়। ওর দু’পায়ের পাতা আর সবগুলো আঙ্গুল খুব খারাপভাবে ফ্রস্তবাইটের শিকার হয়েছে। তখনো বোঝা না গেলেও পরে ওর দু’পায়ের সবগুলো আঙ্গুল কেটে ফেলে দিতে হয়েছিলো। সেই ইটালিয়ান এক্সপিডিশনের সত্যিকারের আত্মত্যাগ করেছিলো মেহদি। তার সময়ের শ্রেষ্ঠ হাঞ্জা ক্লাইম্বার মেহদির ক্লাইম্বিং ক্যারিয়ারের সেখানেই ইতি ঘটে। অমন দুর্দান্ত এক পর্বতারোহী এরপর আর কখনো পর্বতে চড়তে পারেনি।
ওদিকে সামিটের নেশায় বুঁদ কম্পেগননি আর লাচেডেলি এসবের প্রায় কিছুই জানেনা। ভোর হতেই বোনাত্তি আর মেহদির রেখে যাওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো নিয়ে তারা সামিটের উদ্দেশে রওনা দেয়।
সেদিন ছিল ৩১শে জুলাই। বিকেলের খানিকটা পরে তারা প্রায় একই সাথে কে-২ এর চূড়ায় পৌঁছায়।


কে-২ এর চূড়ায়

ইটালিয়ান টিমের কে-২ জয়ের এক বছর পর La Conquista del K2 (Victory Over K2) নামে প্রকাশিত ওই এক্সপিডিশনের অফিসিয়াল রিপোর্টে দলনেতা দেসিও কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প উপস্থাপন করেন। কম্পেগননি ও লাচেডেলির বয়ান দিয়ে তিনি বলেন যে এই দুজন নাকি কল্পনাও করেনি যে বোনাত্তি ও মেহদি সেই রাতে নেমে না গিয়ে বিভোয়াক করে রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিয়েছিলো। তাদের ভাষায় “পরদিন সকালে আমরা যখন বোনাত্তি ও মেহদিকে ৮ নং ক্যাম্পের দিকে দ্রুত নেমে যেতে দেখলাম নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আর কিভাবেই বা করবো ?! আমাদের সুদূর কল্পনাতেও ছিল না যে দুজন মানুষ ২৬০০০ ফিট উচ্চতায় এমন ভয়ঙ্কর আবহাওয়ায় কোন আশ্রয় ছাড়া উন্মুক্ত অবস্থায় পুরো রাত টিকে থাকতে পারে!
কম্পেগননি আর লাচেডেলি দুজনেই দাবী করে যে সেদিন রাতে সাহায্যের জন্য বোনাত্তি ও মেহদির বারংবার চিৎকার তাদের কানেই পৌঁছেনি। অক্সিজেন রেখে দিয়ে বোনাত্তি ও মেহদিকে নিচে চলে যেতে বলার পর নাকি তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ হয়নি এবং এর জন্য তারা বাতাসের তীব্র গর্জনকে দায়ী করে। বাতাসের তীব্রতায় নাকি বাইরের কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না!
যাইহোক, এখানেই ওই গল্পের শেষ নয় বরং মূলত এখনি ঘটনার ঘনঘটার শুরু।
অভিযান শেষে প্রকাশিত বইয়ে সামিট ডে-র বর্ণনা দিতে গিয়ে কম্পেগননি আর লাচেডেলি দাবী করেন দুপুরের দিকে চূড়ার খুব কাছাকাছি এসে হঠাৎ তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়। অক্সিজেনের অভাবে প্রায় মরার দশা হয় তাদের।
তাদের ভাষায় “হঠাৎ অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা ছিল ভীতিকর। মনে হচ্ছিলো অক্সিজেনের অভাবে হাঁসফাঁস করতে থাকা ফুসফুসটা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে যাবে। হুট করে যেন আমাদের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে, দুই পা এগোনোর শক্তিও পাচ্ছিলাম না। বিশুদ্ধ অক্সিজেনের আশায় তাড়াতাড়ি আমরা অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলে খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে শুরু করলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ধীরে ধীরে আমরা হারানো শক্তি ফিরে পেলাম।”
পরবর্তীতে সমসাময়িক ক্লাইম্বাররা অনেকেই কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন তোলেন – কেন তারা দুজন পিঠে থাকা তিনটি করে খালি, ভারি অক্সিজেন সিলিন্ডার সেখানেই খুলে না রেখে বয়ে বয়ে সামিট পর্যন্ত নিয়ে যান।
এর জবাবে “Victory over K2” বইতে কম্পেগননি ও লাচেডেলি বলেন, সামিটের কাছাকাছি যে জায়গায় তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় সেখানটা ছিল প্রচণ্ড খাড়া এবং ভঙ্গুর ধরনের বরফ অঞ্চল। ওই অবস্থায় সিলিন্ডারগুলো খুলতে হলে তাদের বরফের উপর বসে পড়তে হতো যা ছিল প্রচণ্ড বিপদজনক।
বিকেলের কিছু পরেই প্রায় একই সাথে তারা দুজন কে-২ এর সামিটে পৌঁছান। চূড়ায় আধা ঘণ্টার মত থেকে কম্পেগননি ও লাচেডেলি নিয়মমাফিক কিছু ছবি তোলার কাজ সেরে নেন। যে দুটি ছবি পরবর্তীতে পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠে তার একটিতে দেখা যায় অক্সিজেন মাস্ক পরা অবস্থায় কম্পেগননি চূড়ায় দাড়িয়ে আছেন আর অন্য ছবিতে লাচেডেলি অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছেন। দ্বিতীয় ছবিটিই সন্দেহের সলতে-তে আগুন ধরিয়ে দেয়। কারণ ছবিতে লাচেডেলির গোঁফে এবং দাড়িতে যে বরফ কুঁচির দাগ দেখা যাচ্ছিলো সেটা কেবল অনেকক্ষণ ধরে ব্যবহার করতে থাকা অক্সিজেন মাস্ক এইমাত্র খুলে ফেলা কোন মানুষের মুখেই থাকতে পারে। কিন্তু সামিটের ৬৫০ ফিট নিচেই তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার দাবির সাথে কোনভাবেই তা মেলে না!
যাইহোক, কে-২ জয় করে ক্লাইম্বার দুজন যখন সামিট থেকে নামা শুরু করে তখন দিনের শেষ আলোটুকুও দিগন্তে হারিয়ে গেছে। প্রায় অন্ধকার রাস্তায় সেই রাতেই সরাসরি ৮ নং ক্যাম্পে পৌঁছানোটাই এখন তাদের টার্গেট। পথে একবার মরতে বসেছিলো দুজনের দলটা। এক রশিতে বাঁধা থাকা অবস্থায় পা ফস্কে তারা প্রায় ৫০ ফিট গড়িয়ে নেমে আসে। সে যাত্রা কেবল ভাগ্যের জোরে বেঁচে যায় তারা। অবশেষে একরাশ অর্জন ও মুক্তির অনুভূতি নিয়ে রাত ১১ টার দিকে ৮ নং ক্যাম্পে নেমে আসে কে-২ জয় করে ফেরা এই দুই ক্লাইম্বার। ক্যাম্পে তুমুল আনন্দের ফোয়ারা ওঠে যেন। পাঁচটা হৃদয় তখন একটাই বিজয়ের আনন্দে এক হয়ে গেছে। অভিযানের সফলতার কারনেই হোক বা কে-২ জয়ের আনন্দেই হোক আগের রাতের বিশ্রী ঘটনাটাকে একরকম জোর করেই মন থেকে সরিয়ে রাখেন বোনাত্তি। ক্লান্ত দুই ক্লাইম্বারকে বিশ্রামের সুযোগ দিতে ক্যাম্পের একমাত্র তাঁবুতে তাদের থাকতে দিয়ে অন্যান্য তিনজন রাতের বাকি সময়টুকু বাইরেই কাটিয়ে দেয়। সকাল হতেই আবার শুরু হয় তাদের বেস ক্যাম্পমুখী যাত্রা ।
ইটালিয়ান টিমের কে-২ জয়ের এক বছর পর Victory Over K2 (La Conquista del K2) নামে প্রকাশিত বইয়ে দলনেতা দেসিও কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প উপস্থাপন করেন। কম্পেগননি ও লাচেডেলির বয়ান দিয়ে তিনি বলেন যে এই দুজন নাকি কল্পনাও করেনি বোনাত্তি ও মেহেদি সেই রাতে নেমে না গিয়ে বিভোয়াক করে রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষায় “পরদিন সকালে আমরা যখন বোনাত্তি ও মেহেদিকে ৮ নং ক্যাম্পের দিকে দ্রুত নেমে যেতে দেখলাম নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আর কিভাবেই বা করবো ?! আমাদের সুদূর কল্পনাতেও ছিল না যে দুজন মানুষ ২৬০০০ ফিট উচ্চতায় এমন ভয়ঙ্কর আবহাওয়ায় কোন আশ্রয় ছাড়া উন্মুক্ত অবস্থায় পুরো রাত টিকে থাকতে পারে!”
কম্পেগননি আর লাচেডেলি দুজনেই দাবী করে সেদিন রাতে সাহায্যের জন্য বোনাত্তি ও মেহেদির বারংবার চিৎকার তাদের কানেই পৌঁছেনি। অক্সিজেন রেখে দিয়ে বোনাত্তি ও মেহেদিকে নিচে চলে যেতে বলার পর নাকি তাদের পক্ষে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বাতাসের তীব্রতায় নাকি বাইরের কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না!
তার লেখা বইয়ে বোনাত্তি তারপরের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, “পরদিন আমি অপেক্ষা করছিলাম কম্পেগননি আর লাচেডেলির ক্ষমা প্রার্থনার জন্য। কিন্তু ৮ নং ক্যাম্পে দেখা হওয়ার পরও “ধন্যবাদ বোনাত্তি” এই সামান্য কৃতজ্ঞতামাখা ধন্যবাদটুকুও আমি পাইনি। এমনকি বেস ক্যাম্পে নেমে আসার পরও তাদের পক্ষ থেকে সৌজন্যমূলক কোনকিছু শুনিনি! আমি তখন বয়সে একেবারেই তরুণ ছিলাম, কিছুটা হয়তো দূরদৃষ্টিসম্পন্নও ছিলাম। তাই কিভাবে কিভাবে যেন মনে হচ্ছিলো আসল কাহিনী অভিযান থেকে দেশে ফেরার পরই শুরু হবে।”
কিন্তু এমন একটা বিতর্কিত অধ্যায় জনসমক্ষে গুরুত্ব সহকারে আসেনি কেন?
মূল ব্যাপারটা বুঝতে হলে পুরো এক্সপিডিশনের গভীরে যেতে হবে। অভিযানের লিডার দেসিও’র লেখা Victory Over K2 বইটা ছিল চমৎকারভাবে অভিযানের বীরত্বগাথা গেয়ে যাওয়া সুচারুভাবে সাজানো এক নিপুণ দলিল। বইটি কেবল কে-২ জয়ের বীরত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত এক গল্পই তুলে আনেনি, সাথে যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইটালিকে দিয়েছিল আজীবন গর্ব করার মত কিংবদন্তীর এক আখ্যান। বোনাত্তি ও মেহেদিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশ্বাসঘাতকতার বিতর্কিত কাহিনী বইটির জাদুকরী ইমেজ একেবারেই নষ্ট করে দিতো। তাই এই ব্যাপারটার ভয়াবহতা বইয়ে পুরোপুরি চেপে যান দেশিও। এক্সপিডিশন লিডার যেহেতু পুরো বিষয়টা হালকা চালে বর্ণনা করেছেন তাই অন্যদেরও আর এ নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না।
যাইহোক, এখানেই এই গল্পের শেষ হতে পারতো কিন্তু আসলে এরপরই ঘটনা নাটকীয়ভাবে অন্যদিকে মোড় নেয়।
অভিযানের বেশকয়েক বছর পর তার লেখা “My Mountains” বইয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া অবিচারের এতদিনের জমা হওয়া সব ক্ষোভ সবিস্তারে উগড়ে দেন বোনাত্তি। চরম সত্য ঘটনাটা প্রথম বারের মত সবার সামনে চলে আসে। প্রকাশের পরপরই বইটা রীতিমত বিতর্কের ঝড় বইয়ে দেয়। কিন্তু তখনো কেউ কল্পনা করেনি এর চেয়েও বড় নাটক অপেক্ষা করে আছে! আসল বিস্ফোরণ ঘটে তারও বছরতিনেক পর ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে। কে-২ জয়ের দশম বর্ষ পূর্তিতে ক্লাইম্বিং জার্নালিষ্ট “নিনো গিগ্লিও”-র লেখা দুইটি আর্টিকেল প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে এতদিনের পুরোনো মুখরোচক বিতর্কটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা লাভ করে। “After Ten Years, the Truth About K2″ নামে লেখা তার প্রথম আর্টিকেলটিতে গিগ্লিও দাবি করেন বোনাত্তি আসলে কম্পেগননি আর লাচেডেলির কাছ থেকে কে-২ জয়ের গৌরব চুরি করতে চেয়েছিলেন। আর এই ষড়যন্ত্রে মেহদিকে প্রথম কে-২ জয়ী পাকিস্তানি করার লোভ দেখিয়ে দলে ভিড়িয়েছিলেন! কম্পেগননি আর লাচেডেলির অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনেও তিনি বনাত্তির ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন সেই রাতে ২৬০০০ ফিট উচ্চতায় উন্মুক্ত বিভোয়াকে থাকার সময়ই বনাত্তি ইচ্ছে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের করে দেন যাতে কম্পেগননি আর লাচেডেলি সামিটে যেতে না পারেন।
নিজের বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অভিযোগ শুনে বিস্ময়ে, অপমানে কাতর হয়ে পড়া বনাত্তি ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দেন। প্রায় দু’বছর চলার পর সেই মামলার নাটকীয় নিষ্পত্তি হয় ১৯৬৬ সালে।আদালতে জেরার মুখে একপর্যায়ে সাংবাদিক নিনো গিগ্লিও স্বীকার করেন বনাত্তির বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগের সূত্রদাতা আর কেউ নন, স্বয়ং কম্পেগননি!!!!!
আদালতের রায়ে বনাত্তির বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমানিত হয় এবং বোনাত্তিকে নির্দোষ ঘোষনা করা হয়।কিন্তু ততদিনে ক্লাইম্বার হিসেবে বোনাত্তির সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে , বিশেষত ইটালিতে তার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে। হতাশায় মুচড়ে পড়েন বোনাত্তি।
এর পঞ্চাশ বছর পর ২০০৪ সালে এক অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে বোনাত্তি জানান তিনি এখন বিশ্বাস করেন ৩০শে জুলাইয়ের সেই রাতে কম্পেগননি আর লাচেডেলি ইচ্ছে করেই পূর্বনির্ধারিত জায়গার প্রায় ৬০০ ফিট ওপরে পাথরের আড়ালে ৯ নং ক্যাম্প তৈরি করেন যাতে করে কোনভাবেই বোনাত্তি ও মেহেদি সেখানে পৌছাতে না পারেন এবং সামিটে শুধু তাদের পক্ষেই যাওয়া সম্ভব হয়। বোনাত্তি ও মেহেদির কাল্পনিক সামিটের শেষ সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়াই ছিল সে রাতে কম্পেগননি আর লাচেডেলির অমানবিক নীরবতার কারণ!
তিনি আরও বিশ্বাস করেন সামিটের কাছাকাছি অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাও সম্পূর্ণ বানোয়াট।সম্ভবত তাদের সামিটকে আরও বীরত্বপূর্ণ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তার বিরুদ্ধে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়ার অভিযোগও উড়িয়ে দেন তিনি। এবং এর পক্ষে অকাট্য যুক্তিও দেখান। মাস্ক এবং রেগুলেটর ছাড়া অক্সিজেন সিলিন্ডার খুলে গ্যাস বের করে দেয়া অসম্ভব। আর সেই রাতে মাস্ক এবং রেগুলেটর দুটোই ছিল ৯ নং ক্যাম্পে থাকা কম্পেগননি আর লাচেডেলির কাছে।
বোনাত্তির এরপরের দাবীটি আরও বেদনাদায়ক। তিনি দাবি করেন কম্পেগননি আর লাচেডেলি একবারের জন্যও তার ও মেহদির বাঁচা মরার কথা চিন্তা করেননি। তার ভাষায়, “ওরা তো একবারের জন্য জানতেই চায়নি আমরা আশ্রয় পেয়েছি কিনা বা নিরাপদে নামতে পারব কিনা। আমার আর মেহদির আসলে সেইরাতে বেঁচে থাকারই কথা ছিল না। আর আমরা মারা গেলে ওদের কিচ্ছু যায় আসতো না বরং এই অভিযান আরও গৌরবময় হত। আর এটা তো সবারই জানা যে দুয়েকটা মৃত্যু যেকোনো অভিযানকে আরও গৌরবময় করে!”
“My Mountains” বইয়ে বোনাত্তির মনের গভীরে জমে থাকা অব্যক্ত কষ্টের কিছুটুকু টের পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন, “১৯৫৪ এর কে-২ এক্সপিডিশনের আগপর্যন্ত অন্য মানুষের জন্য আমার মনে অনেক ভালবাসা ও বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ওই এক্সপিডিশনে যা ঘটেছে তারপর থেকে আমি আর মানুষকে বিশ্বাস করতে পারিনা। শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেই আমি একা একা পথ চলি। কে-২ আমার জীবনটাকে এতোটাই বদলে দিয়েছে!”

৮ thoughts on “পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত “কে-টু” জয়ের পেছনের তিক্ত ইতিহাস

  1. হুম! পাহাড়ে চড়ার
    হুম! পাহাড়ে চড়ার ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বিদেশে বিতরক-ক্যাচাল হয়, বাংলাদেশেও হয়! :ভাবতেছি: :ভাবতেছি:

    1. ধন্যবাদ শেহজাদ আমান। আপনাকে
      ধন্যবাদ শেহজাদ আমান। আপনাকে দিয়েই ইস্তিশনে আমার প্রথম ব্লগের কমেন্ট শুরু হল। :ফুল: প্রতিমন্তব্যে দেরিতে দুঃখিত।
      হুম। খেয়াল করলে দেখবেন কোন দেশ, জাতি বা পর্বতের প্রথম আরোহণের ক্ষেত্রেই এসব ক্যাচাল বেশি হয়। জাতীয় কিংবা ব্যক্তিগত গৌরব জড়িত হওয়াটাই এর মূল কারণ।

  2. ওরে বাবা এ তো দেখি এলাহি
    ওরে বাবা এ তো দেখি এলাহি কাজকারবার। নাম যশের জন্য মানুষ এমন অমানুষ কেমনে হয়? ভালো লাগলো আপনার তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটা পড়ে।

  3. অনেক কিছুই জানলাম আপনার
    অনেক কিছুই জানলাম আপনার লেখাটা পড়ে। ইষ্টিশনে স্বাগতম। এইরকম চমৎকার সব পোস্ট দিয়ে আমাদের মন ভরিয়ে দিবেন ভবিষ্যতে সেই আশাই করছি। :ফুল: :ফুল: :ফুল:

    1. ধন্যবাদ মরহুম। হ্যাঁ, বানানের
      ধন্যবাদ মরহুম। হ্যাঁ, বানানের দিকটা আরো মনোযোগ দাবি করে বটে। পরেরগুলোতে অবশ্যই নজর দেবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *