কিছু পান্তা পেয়াজ আর চা বিস্কিটের গল্প

আইজুদ্দিনের মন মতলব বোঝা দায়।

সেই সক্কাল বেলা হাল গরু নিয়ে বেরিয়েছে, আজকের এই বেলায় তার জমিতে হাল দেওয়া চাই’ই চাই। ফজরের নামাজ শেষ করে তাই দেরি করেনি সে, ঘাড়ের গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে সাত সকালে বের হয়েছে। আজ দিনটা এমন কেন? ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই চারদিকে কেমন যেন এক উৎসবের আমেজ! ছোট বড় ছেলে বুড়ো সবার মধ্যে কেমন জানি এক খুশি খুশি ভাব। তা যা হোক, আজ তার জমি চাষ দেওয়া শেষ করতেই হবে।


আইজুদ্দিনের মন মতলব বোঝা দায়।

সেই সক্কাল বেলা হাল গরু নিয়ে বেরিয়েছে, আজকের এই বেলায় তার জমিতে হাল দেওয়া চাই’ই চাই। ফজরের নামাজ শেষ করে তাই দেরি করেনি সে, ঘাড়ের গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে সাত সকালে বের হয়েছে। আজ দিনটা এমন কেন? ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই চারদিকে কেমন যেন এক উৎসবের আমেজ! ছোট বড় ছেলে বুড়ো সবার মধ্যে কেমন জানি এক খুশি খুশি ভাব। তা যা হোক, আজ তার জমি চাষ দেওয়া শেষ করতেই হবে।

জমির আলে বসে বিড়ি ধরায় আইজুদ্দিন। সুখি সুখি ভাব আসে তার চোখে মুখে, গরীব মানুষের এইটুকু বিলাসিতা সে খুশি মনেই উপভোগ করে।গরু দুটোও একটু খানি অবসর পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেয় আর নির্নিমেষ চোখে মালিকের দিকে চেয়ে দ্যাখে। আরো দুটো কষে দম দ্যায় আইজুদ্দিন তারপর উঠে পাছা ঝেড়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে নেয় একবার। দুরের গ্রামের রাস্তায় এতো মানুষ কেন? ঢাকঢোলের শব্দের সাথে এক সুরে কি যেন গান গায় সবাই। কান পাতে আইজুদ্দিন, সম্মিলিত আওয়াজ কানে ভেসে আসে তার

“এসো হে বৈশাখ এসো এসো”

দুরের আলে তার ঘোমটা পরা বউয়ের ছায়া ভেসে ওঠে। ছায়াটি ক্রমশ মানুষের অবয়ব ধরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাল রেখে আলে উঠে আসে আইজুদ্দিন। ঘর্মাক্ত মুখের ঘাম ঘাড়ের গামছায় মুছে দ্যায় তার বৌ। পাশে রাখা বাটি মেলে ধরে বলে
ঃ নেন, মুখ হাত খান ধুইয়া আহেন।
ঃ গাঁয়ে এতো মাইনশের ভিড় ক্যা? সবাই কেমুন জানি হাউকাউ করতাচে!
ঃ ও আল্লা, আজ না পয়লা বৈশাখ, পোলা মাইনশে আনন্দ করতাচে।
ঃ আজকের দিনে কিয়ের এতো আনন্দ? পয়লা বৈশাখ হইচে তো কি হইচে?
ঃ ওম্মা, বছরের শুরুতে নতুন বছর বরণ কৈরা নিতাচে, পান্তা ইলিশ খাইতাচে, মেলায় গিয়া মাটির বাসন-কোসন কিনতাচে, সাদা পাড়ের সাড়ী পইরা মাইয়ারা বাঙ্গালী সাজতাচে।
ঃ এই দিনে আইসা নতুন কৈরা বাঙ্গালী সাজনের দরকার হয় নাকি? তাইলে কি সারা বছর ওরা বাঙ্গালী থাহেনা?
ঃ এতো কতার কাম কি? ওগো-র টেহা দিয়া ওরা পান্তা কিন্না খাইব, খাউক। আপনি হাত মুখ ধুইয়া আহেন।

রগচটা আইজুদ্দিনের মাথা গরম হয়ে ওঠে। লাথি দিয়া বাটি-টা ছিটকে ফেলে দ্যায় সে। পান্তা মরিচ পেয়াজ গুলো আলের কিনারা ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ে। হতভম্ভ বৌ টা অবিশ্বাসীর চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। আইজুদ্দিন গজরাতে থাকে।

ঃ বছরের পত্তেকটা দিন পান্তা খাইয়া কাটাই আর শালারা আইজ পান্তা খাইয়া বাঙ্গালী সাজবার আইচে। সারা বছর পান্তা খাইয়া পায়ে রস-বাত ধইরা যায় কেউ খোঁজ রাখে না আর আইজকা আইয়া পান্তা খাইয়া ওরা ক্যান বাঙ্গালী হওয়ার ভড়ং ধরে? যে শালাগো সকাল বেলা চা নাস্তা খাইয়া বিকেল বেলা বেরেক-ড্যান্সের পার্টি না করলে দিন মাটি হইয়া যায়, রাইতে গিয়া টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল না দেইখলে ঘুম ধরে না তারা ক্যান এই দিনে আইসা পান্তা খাইয়া আমাগো অপমান করবো?
যা, আইজ খামুনা তোর পান্তা পিয়াজ, আমার জন্নি আজ চা-বিস্কুট নিয়া আয়।

বৌ অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকে, আইজুদ্দিনের চোখে কি জল?

৭ thoughts on “কিছু পান্তা পেয়াজ আর চা বিস্কিটের গল্প

  1. “মেকি” আর “প্রকৃত” এর মাঝে
    “মেকি” আর “প্রকৃত” এর মাঝে পার্থক্য কতটুকু তা কৃষক আইজুদ্দিনের চোখের জলেই প্রমাণিত ।

    দারুন লিখেছেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *