টেলিভিশন

ডেক্সপোর বোতলটা একটানে শেষ করে ড্রেনে ছুড়ে ফেলল ইদ্রিস। বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে আছে। ৭০ টাকার ডেক্সপো এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। ফার্মেসির দোকানদার মামুন শালা একটা আস্ত জাউরা। বলে কি না সাপ্লাই নাই তাই ১০০ টাকার কমে ডেক্সপো বিক্রি করা যাবে না। ইদ্রিস খুব ভাল করেই জানে মামুইন্যার স্টকে ডেক্সপোর পাহাড় জমে আছে। কিন্তু কিছুই করার নাই। সুযোগ পেলে একদিন এর শোধ নিতে হবে।


ডেক্সপোর বোতলটা একটানে শেষ করে ড্রেনে ছুড়ে ফেলল ইদ্রিস। বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে আছে। ৭০ টাকার ডেক্সপো এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। ফার্মেসির দোকানদার মামুন শালা একটা আস্ত জাউরা। বলে কি না সাপ্লাই নাই তাই ১০০ টাকার কমে ডেক্সপো বিক্রি করা যাবে না। ইদ্রিস খুব ভাল করেই জানে মামুইন্যার স্টকে ডেক্সপোর পাহাড় জমে আছে। কিন্তু কিছুই করার নাই। সুযোগ পেলে একদিন এর শোধ নিতে হবে।

বিরক্তির সাথে সাথে ইদ্রিসের মেজাজটাও চরম খারাপ হয়ে আছে। আবুইল্লা হারামজাদা বোতলের অর্ধেকটাই শেষ করে রেখে গেছে। কথা ছিল ফিফটি ফিফটি খাওয়ার। দুইজনে মিলে ৫০ টাকা করে দিয়েছে ডেক্সপো কিনবে বলে আর হারামজাদা বেশিরভাগই শেষ করে ফেলেছে। এইটাকেও একদিন সময় করে সাইজ করতে হবে।

রাত নেমেছে অনেক আগেই। শীতের সময় এমনিতেই দিনের আলোর স্থায়িত্ব কমে যায়। এই ঢাকা শহরে এখনও শীতের আমেজ পুরোপুরি নামে নি। শেষ রাতে কেবল হালকা কুয়াশা পড়ে। ইদানিং এই সময়টাতেই ইদ্রিসের কাজ শুরু হয়। আজ রাত শেষ হলে ইদ্রিস এবং তাঁর সঙ্গীরা কাজে নামবে। কাজের আগের রাতে একটু গা গরম করার জন্য ডেক্সপো খাওয়ার ধান্দা করেছিল দুইজন মিলে। আবুইল্লা খানকির পোলা দিল মুডটা অফ করে।

হলুদ ল্যাম্পগুলো একাকী নিঃসঙ্গ রাস্তায় আলোর পসরা সাজিয়ে বসেছে। কিছু কিছু জায়গায় হলুদের জায়গায় সাদা রঙের ল্যাম্প জ্বলছে। সরকারের কি টাকাপয়সা কমে গেল নাকি? হলুদ ল্যাম্পের আলতেই রাস্তাটাকে বেশি সুন্দর দেখায়। যদিও রাস্তার সৌন্দর্যে ইদ্রিসের কিছুই যায় আসে না। সরকার ল্যাম্পের টাকা মেরে দিল কি না তাতেও তাঁর কিছু যায় আসে না। সে শুধু জানে প্রতিরাতে ডেক্সপো খাওয়ার জন্য তাঁর টাকার দরকার এবং সেই টাকার জন্য সবকিছু করতেই সে রাজী।

নোংরা দেয়ালটার জায়গায় জায়গায় লালচে কালো ছোপ ছোপ দাগ। এতক্ষণ এখানেই হেলান দিয়ে বসেছিল দুইজন। ডেক্সপো খাওয়ার পর ব্লাডারে খুব চাপ পড়ে। আবুল গেছে ব্লাডার ফাঁকা করতে। তার ব্লাডারও প্রেশার দিচ্ছে। হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াল ইদ্রিস। দেখা না গেলেও জানে শার্টের পিছনটা নোংরা হয়ে গেছে। “আমি শালা আসলেও একটা ভোদাই”- অস্ফুট স্বরে নিজেকেই গালিটা দিল। অবশ্য শার্টটাতে ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টাও করল না। আবুল আসলে তাঁকে দিয়েই শার্টের পিছনটা পরিষ্কার করানো যাবে।

দিনকাল আজকাল ভালো যাচ্ছে না। ডেক্সপোতে আগের মত নেশা হয় না। শালার ওষুধ কোম্পানিগুলোও ফাইজলামি শুরু করেছে। আসল জিনিস আর দেয় না। তাই ডেক্সপোর সাথে নতুন কিছু আইটেম মিশাতে হয়। নেশাটা তখন ভালই জমে। এই নতুন আইটেম মেশাতে পারত বশির। বিভিন্ন আইটেম মিশিয়ে ককটেল বানানোটা নাকি একটা সিক্রেট তাই কাউকে শেখায় নি। ডেক্সপো কিনবার টাকা বেশিরভাগ সময় ইদ্রিসই দিত বলে ইদ্রিসের সাথে তাঁর আলাদা খাতির ছিল। কয়েকবারই ডেক্সপো ককটেল কিভাবে বানাতে হয় সেটা শেখাতে চেয়েছিল কিন্তু ইদ্রিস খুব একটা আগ্রহ দেখায় নি। গত সপ্তাহের অবরোধে অরিজিনাল ককটেল ফুঁটাতে গিয়ে শালা নিজেই ফুটে গেছে। ইদ্রিসের মাঝে মাঝেই আফসোস হয় ডেক্সপোর মিক্সিঙটা শিখে রাখা হয় নি বলে।

কি ব্যাপার; এখনও আবুইল্লা আসছে না কেন ভাবতে ভাবতে ড্রেনের যে পাশটায় অন্ধকার সেদিকে এগোল সে। ব্লাডারের প্রেশার বেড়ে গেছে। প্যান্টের চেইন খুলে ড্রেনের মাঝে মুত্র বিসর্জন করতে করতে মর্জিনার কথা ভাবছিল ইদ্রিস। বস্তিতে নতুন এসেছে। খাসা মাল একটা। ভাব নেয় খুব বেশি। ব্যাপার না, নতুন নতুন সবারই একটু তেজ থাকে বেশি। কামলা খাটতে খাটতে তেজ কোথায় গিয়ে পালাবে ছেমড়ি এখন বুঝতে পারছে না।

মুত্র বিসর্জন প্রায় শেষ এমন সময় শব্দটা ইদ্রিসের কানে ঢুকল। বস্তির এই অংশটায় ড্রেনগুলোর পাশে কিছু ছাপরা মতন বানানো হয়েছে যেগুলো গার্মেন্টসের মেয়েদেরকে ভাড়া দেওয়া হয়। ছাপরাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে কাশেম ড্রাইভার। শালা একটা লুইচ্চা। কোন মেয়ের উপর নজর পড়লেই হয়। ফ্রি থাকার বন্দোবস্ত করে দেয়। একদম ফ্রি যে দেয় তা না। রাতের বেলা শালা ভাড়া উসুল করতে আসে। আবার দিনের বেলা বড় গলায় এইসব মেয়েদের রাতে কিভাবে খেয়েছে সেইটার গল্পও করে। খবিশ একটা। তবে মর্জিনার দিকে নজর দিলে কাশেমকে জন্মের মত শিক্ষা দিবে ঠিক করে রেখেছে ইদ্রিস।

উহ-আহ শব্দেই পরিষ্কার কাশেম এখন নতুন মেয়েটাকে খাচ্ছে। ইদ্রিস খেয়াল করে তাঁর তলপেটের নিচটা শিরশির করে উঠছে। রক্তে কাঁপন লাগা শুরু হয়েছে। নাহ, এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আজ অনেক কাজ পড়ে আছে। বড় ধরণের ইনকাম অপেক্ষা করছে। উল্টাপাল্টা কিছুই চিন্তা করা যাবে না। মাস্তি করার সময় পরেও পাওয়া যাবে। দ্রুতহাতে প্যান্টের চেইন লাগাতে লাগাতে আবুইল্লার কথাই ভাবল সে। শালা গেল কোথায়?

*****
সুফিয়ান এর চেহারায় একটা সুফি সুফি ভাব আছে। কথা খুব কম বলে। ছোট করে ছাটা দাড়িগুলো গালের সাথে লেপটে আছে। লম্বা একহারা গড়নের সুফিয়ানকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না ককটেল বানাবার ব্যাপারে সে একটা উস্তাদ লোক। সুফিয়ানকে ইদ্রিসদের দলের সবাই ভয় পায়। সেই ভয় এর সাথে অবশ্য শ্রদ্ধারও একটা মিশ্রণ থাকে। এমন গুণী লোককে শ্রদ্ধা না করে তো উপায় নেই। উপরন্তু ককটেল ফুটানোর পর টাকাগুলোও সুফিয়ানই তাঁদেরকে দেয়। আজকের অবরোধের ব্যাপারে তাঁদেরকে ইন্সট্রাকশন দেওয়ার জন্যই সুফিয়ান সবাইকে একসাথে ডেকেছে।

“সবাই আছেন তো?” গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করল সুফিয়ান।

“হ, সবাই আছে।“ দলের নেতা হিসাবে ইদ্রিসই উত্তর দিল।

“গত সপ্তাহে বশির মারা গেছে। আমি চাই না এমনভাবে আপনাদের আর কেউ মারা যান কিংবা আহত হন। কিভাবে ককটেল বহন করতে হবে কিংবা ফাটাতে হবে সেটা আমি আগেরবার ভাল করেই বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। বশির ঠিকমত ইন্সট্রাকশন মানতে পারে নি। তাই ককটেলের সাথে সাথে নিজেও ফুটে গেছে। আশা করছি আপনারা এখন থেকে সাবধান হবেন। ফাঁকা রাস্তায় না ফাটিয়ে চেষ্টা করবেন বাস কিংবা লেগুনাতে ফাটাতে। পুলিশের গাড়িতে ফাটাতে পারলে সবথেকে ভাল হয়। তবে চেষ্টা করবেন যেন ধরা না পড়েন। বুঝতেই পারছেন এখন সময় খারাপ। আপনাদের জামিন করানো কঠিন হয়ে যাবে।“

“আমার একটা কথা আছে।“ ইদ্রিসের কথায় তাঁর দিকে ফিরে তাকাল সুফিয়ান।

“এখন টাইম ভালা না। রিস্ক অনেক বেশি। টাকা বেশি দিতে হইব। পার ককটেল ৫০ ট্যাকায় কেউই রাজী না। মিনিমাম ১০০ ট্যাকা কইরা দিতে হইব। আর পুলিশের গাড়িতে ফাটাইতে পারলে ৩০০ ট্যাকা। ফিফটি পারসেন্ট ট্যাকা এখনই ক্যাশ দিতে হইব। সবাইরে জিজ্ঞাস কইরা দেখেন মনে চাইলে।“

কথাগুলো বলে সমর্থনের আশায় চারপাশে তাকাল ইদ্রিস। সবাই মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে দেখে তাঁর মনটাই ভালো হয়ে গেল। নাহ, লিডার হিসাবে সে খারাপ না।

“পার ককটেল ১০০ টাকা ঠিক আছে। তবে পুলিশের গাড়িতে ফাটাতে পারলে ২৫০ টাকা করে পাবেন। এখন ফান্ডের অভাব। ক্ষমতায় যেতে পারলে আপনাদেরকে পুষিয়ে দেওয়া হবে।“

“বালের কথা কইয়েন না। ক্ষমতায় গিয়া তো ভুইল্যাই যাইবেন। তখন পুলিশ দিয়া আমাগোরে পুন্দাইবেন। আমরা বিজনেস করি। যেই ট্যাকা দিব তাঁর কাম করুম। ৩০০ টাকা দিলে আছি নাইলে গেলাম।“

খ্যাঁকরে উঠল ইদ্রিস। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। এই শালাগুলো হচ্ছে আসল বাইনচুদ। বাইরে ভদ্র ভদ্র কথা বলবে আর ভিতরে দুই নাম্বারি করে বেড়াবে।

“ঠিক আছে, ৩০০ করেই পাবেন। তবে গাড়িতে যেন আগুনও ধরে যায় সেই খেয়াল রাখবেন। তাই আপনাদের সুবিধার জন্য কিছু পেট্রোল বোমা নিয়ে এসেছি। সাবধানে বহন করবেন। খেয়াল রাখবেন যেন নিজেরাই ফুটে না যান। আসুন, টাকা নিয়ে যান আর আজ কে কোথায় অবস্থান নিবেন সেটাও বুঝে নিন।“

কথা শেষ করে ব্যাগের ভিতর থেকে ১০০ টাকার নোটের একটা বান্ডিল বের করল সুফিয়ান। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখগুলোতে সাথে সাথেই আলোর নাচন দেখা দিল। সবাই আগ্রহ নিয়ে সুফিয়ানকে ঘিরে ধরল। দূর মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে।

*****
ধানমণ্ডি মাঠ পেরিয়ে Empire Plaza-র উল্টোদিকে স্টার কাবাবে নাস্তা সেরেছে তাও প্রায় ২ ঘন্টা হয়ে গেছে। ধানমন্ডি মাঠের গেটে র্যা বের দুইটা গাড়ি দাঁড়ানো ছিল সকালে, এখনও আছে। এই গাড়িগুলো না গেলে কিছুই করা যাবে না। পুলিশের উপর এটাক করা এক জিনিস, আর র্যাটবের উপর এটাক করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। ধরতে পারলে একদম এনকাউন্টার করে দিবে। ইদ্রিস অপেক্ষা করছে উপযুক্ত সময়ের। তাঁর সাথে আরও ২ জন এইখানে ককটেল আর পেট্রোল বোমা ফাটাবে। ইচ্ছে করেই সে এই রিস্কি জায়গাটা বেছে নিয়েছে। বেছে নেওয়ার পিছনে দুইটা কারণ। দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে সে এই দলের লিডার। দলের লিডারেরই উচিৎ সবথেকে কঠিন কাজগুলো করা। তা না হলে অধিনস্তরা তাঁকে সন্মান করবে না।

প্রথম কারণটা একটু ভিন্ন। রাস্তার ওইপাড়ে Empaire Plaza-র ডানপাশে LG টেলিভিশন কোম্পানির একটা শো-রুম আছে। এই শো-রুমটাই ইদ্রিসের এইখানে আসার প্রধান কারণ। শো-রুমের সামনের অংশটা কাঁচের তৈরি। কাঁচ ভেদ করে যতদূর দৃষ্টি যায় ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ঠাঁসা। টেলিভিশনের সংখ্যাই বেশি। কাঁচের প্রবেশ দরজার ঠিক বাম পাশে একটা ৩২ ইঞ্চি এলসিডি টেলিভিশন। যতক্ষন শো-রুম খোলা থাকে ততক্ষণ টেলিভিশনটা চালু থাকে। বাস, লেগুনা কিংবা পুলিশের জীপের পাশাপাশি এই টেলিভিশনটাও ইদ্রিসের অন্যতম টার্গেট। অন্য টার্গেট মিস করলেও এই টার্গেট কোনমতেই মিস করা যাবে না।

সেই দিনটার কথা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে ইদ্রিসের। বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। এই দোকানটার সামনে তখন অনেক লোক। সবার আনন্দিত চিৎকারে কান পাতা দায়। অনেক লোকের মাঝে সেও ছিল একজন। হঠাত শো-রুমের কাঁচের দরোজাটা খুলে যায়। সিকিউরিটির এক লোক এসে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিতে থাকে। সবাইকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আরও কয়েকজনের সাথে ইদ্রিস এর প্রতিবাদ জানায়। হৈচৈ বাড়তে থাকে। হঠাত করেই কোত্থেকে পুলিশ এসে লাঠিপেটা শুরু করে। সেই লাঠির আঘাত এর অপমান এখনও ইদ্রিস ভুলতে পারে নি। এই দোকানে আজ সে আগুন দিবেই দিবে।

*****
“আসসালামু আলাইকুম স্যার, ভালো আছেন?”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম; আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমি ভাল। আপনি ভালো আছেন আজিজ?”

“জী স্যার।“

অবরোধের দিন এই হচ্ছে সুবিধা। দেরী করে অফিসে আসলেও কেউ কিছু বলে না; টাই এর নট বাঁধতে বাঁধতে ভাবছিল কায়সার। ২ মাস হল এই অফিসে কাজ শুরু করেছে সে। পাশ করে বেকার বসে থাকার চাইতে কিছু করা ভাল। সেলসম্যান পরিচয় দিতে প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হত, এখন গায়ে লাগে না। কেউ তো আর তাঁকে খাওয়ায় কিংবা পড়ায় না। নিজেরটা নিজেরই করতে হবে। LG-র এই শো- রুমে তাঁর সাথে আরও দুইজন সেলসম্যানের কাজ করে। এখনও এসে পৌছায় নি। অবরোধের দিন মিরপুর থেকে এখানে আসাটা একটু কঠিনই। সে শঙ্করে থাকে তাই হরতাল অবরোধে কোন সমস্যা হয় না।

সামনের মাসে বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষা। সেটার জন্য ছুটি দরকার। কিভাবে ছুটি ম্যানেজ করা যায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সেই কথাই ভাবছিল। ঠিক এমন সময় বিকট শব্দে কেঁপে উঠল কায়সার। সামনের রাস্তাটা ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। সিকিউরিটি গার্ড আজিজকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। আবারও বিকট শব্দ। ককটেল ফাটানো হচ্ছে। রাস্তায় লোকজনের ছুটাছুটি শুরু হয়েছে। দূর থেকে পুলিশের হুইসেল শোনা গেল। কায়সার বুঝতে পারছে না কি করবে। শো-রুমে ফাঁকা রেখে বাইরে যাওয়াটা ঠিক হবে না আবার ভিতরেও থাকতে মন সায় দিচ্ছে না। এমন সময় ব্যাপারটা চোখে পড়ল তাঁর।

আগুনের একটা গোলা উড়ে আসছে শো-রুমের দরজা বরাবর। বিকট শব্দের সাথে গোলাটা বিস্ফোরিত হল। বিস্ফোরণের সাথেই কাঁচ ভাঙার শব্দ। ভাঙা কাঁচের টুকরো মুখে আঘাত করায় গালের একপাশে কিছুটা কেটে গেছে বুঝতে পারল কায়সার। কিন্তু এই বিষয় তাঁকে পীড়া দিচ্ছে না। সে আতঙ্কিত চোখে দেখল শো-রুমের ভিতর আগুন ধরে গেছে। প্রথমে ধরেছে ৩২ ইঞ্চি এলসিডি টেলিভিশনটায়। ক্রমশ আগুনের শিখা এগিয়ে আসছে। কিভাবে এই আগুনের কুণ্ড থেকে বের হবে মাথায় আসছে না। গত কয়দিনে আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর যেই ছবি সে পত্রিকায় দেখেছে তাঁদের মত পরিণতি ভোগ করতে সে রাজী না। কিছু একটা করা দরকার। তাঁকে বাঁচতেই হবে। কিন্তু কিভাবে?

*****
মনসুর আর রুবেল পালাতে পারলেও ইদ্রিস পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেল। লাঠির বাড়ি একটাও মাটিতে পড়ছে না। পুলিশ তাঁকে ইচ্ছামত পিটাচ্ছে। ইদ্রিস অনুভব করতে পারছে তাঁর কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও আজ সে অনেক খুশি। সে পেরেছে টেলিভিশনটা পোড়াতে। আহ, শান্তি। প্রতিশোধ নেওয়া গেল।

LG-র শো-রুমে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। লোকজন পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। মনে হয় না খুব একটা কাজ হবে। ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। কেউ কি আটকা পড়ল নাকি? পড়ুক, কি আসে যায় তাতে? এই দেশে মানুষের জীবনের দাম সবথেকে কম আর লাশের দাম সবথেকে বেশি। যেই সরকারই আসুক না কেন সে ইদ্রিস তো ইদ্রিসই থাকবে। তাই এই দেশ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও ইদ্রিসের কিছুই আসে যায় না। কিছুই যায় আসে না।

৩১ thoughts on “টেলিভিশন

  1. এই দেশে মানুষের জীবনের দাম

    এই দেশে মানুষের জীবনের দাম সবথেকে কম আর লাশের দাম সবথেকে বেশি। যেই সরকারই আসুক না কেন সে ইদ্রিস তো ইদ্রিসই থাকবে। তাই এই দেশ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও ইদ্রিসের কিছুই আসে যায় না। কিছুই যায় আসে না।

    কথা সত্য।

  2. ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে।

    ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। কেউ কি আটকা পড়ল নাকি? পড়ুক, কি আসে যায় তাতে?

    আজ আমাদের মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে সহ্য হয়ে গেছে, এখন আর মৃত্যুর খবরে আমাদের অবাক করে না।

    1. আজ আমাদের মৃত্যুর খবর শুনতে

      আজ আমাদের মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে সহ্য হয়ে গেছে, এখন আর মৃত্যুর খবরে আমাদের অবাক করে না।

      :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

  3. আপনার কাছ থেকে নতুন ধাঁচের
    আপনার কাছ থেকে নতুন ধাঁচের গল্প পেয়ে ভালো লাগলো। একই টাইপ গল্পে বন্দী হওয়া কাজের কথা না। তবে সাইকো-থ্রিলার লেখা বন্ধ কইরেন না উৎসাহ দিলাম বইলা। 😀 :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. আমি কইসি নাকি সাইকো-থ্রিলার
      আমি কইসি নাকি সাইকো-থ্রিলার লেখুম না :মানেকি: নিজের লেখা নিয়ে কিছু নিরীক্ষা করছি। আপনাদের উৎসাহ পেয়ে ভাল লাগলো। 😀 মনে হয় উৎরে যাব। এই গল্পটা লিখে মজা পাইসি। সামনে ভিন্ন ধাঁচের আরও কিছু গল্প লিখব ইনশাল্লাহ। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আতিক ভাই। :ধইন্যাপাতা:

  4. অনেকদিন পর আপনার থেকে একটা
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    অনেকদিন পর আপনার থেকে একটা ভিন্ন মাত্রার গল্প পেলাম। বরাবরের মতই বলব নিজেই নিজের রেকর্ড ভঙ্গ করলেন।

    1. অনেক ধন্যবাদ দুলাল ভাই
      অনেক ধন্যবাদ দুলাল ভাই :ধইন্যাপাতা: আপনার উৎসাহ সবসময়ই আমাকে প্রেরণা যোগায় :বুখেআয়বাবুল: তবে একটু বেশি বলে ফেললেন না তো এইবার :লইজ্জালাগে:

      1. না, বেশী বলিনি। থ্রিলারের
        না, বেশী বলিনি। থ্রিলারের বাইরে আপনি যে লিখতে পারেন, এটা অনেকেই ভুলে গেছে। এজন্যই বললাম- নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙলেন।

  5. আরে আপনি থ্রিলারের বাইরেও
    আরে আপনি থ্রিলারের বাইরেও লিখেন জানতাম না।
    ভালো লেগেছে গল্পটি… :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

    1. ব্যক্তিগতভাবে আমি থ্রিলার
      ব্যক্তিগতভাবে আমি থ্রিলার গল্পের ভক্ত তাই থ্রিলার লিখবার চেষ্টাই করি বেশি। এইবার একটু ভিন্ন ধাঁচের গল্প লিখবার চেষ্টা করলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেমন হবে। আপনাদের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারছি খুব একটা খারাপ হয় নি গল্পটা। :খুশি: উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. ধন্যবাদ নাসির ভাই তবে ইমানে
      ধন্যবাদ নাসির ভাই :ধইন্যাপাতা: তবে ইমানে কইতাসি, আপনার গল্পের ধারেকাছেও যায় নাই আমার গল্পটা।

    1. এই গল্প পড়ে কি মন খারাপ হয়ে
      এই গল্প পড়ে কি মন খারাপ হয়ে গেল নাকি? :ভাবতেছি: আসলে নিজের লেখায় একটু বৈচিত্র্য আনতে চাইছি। নিজের লেখা নিয়ে একটু নিরীক্ষার চেষ্টা করছি এই যা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *