প্রসঙ্গ রাতারগুল: পিকনিক স্পট নাকি সংরক্ষিত বন

রাতারগুল জলাবন: বন নাকি ট্যুরিস্ট স্পট
প্রকল্প ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার। বন বিভাগের প্রকল্প- যাতে তথাকথিত উন্নয়ন ঘটবে রাতারগুল জলাবনের। আপনার, আমার মতো ফুলবাবুদের ঘোরার জন্য আরো একটি জায়গা তৈরি হবে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে- সরকারের রাজস্ব বাড়বে, এতে আপনার আমার খুশি হওয়ারই কথা। তবে কেন ভ্রুকুটি! এর জন্য একটু জানা প্রয়োজন রাতারগুল সম্পর্কে, আর এই উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে।

রাতারগুল জলাবন: বন নাকি ট্যুরিস্ট স্পট
প্রকল্প ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার। বন বিভাগের প্রকল্প- যাতে তথাকথিত উন্নয়ন ঘটবে রাতারগুল জলাবনের। আপনার, আমার মতো ফুলবাবুদের ঘোরার জন্য আরো একটি জায়গা তৈরি হবে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে- সরকারের রাজস্ব বাড়বে, এতে আপনার আমার খুশি হওয়ারই কথা। তবে কেন ভ্রুকুটি! এর জন্য একটু জানা প্রয়োজন রাতারগুল সম্পর্কে, আর এই উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে।
পৃথিবীতে মোট ২২ টি ফ্রেশ ওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট বা মিষ্টি পানির জলার বন আছে। তার মধ্যে অন্যতম হল সিলেটের রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে রাতারগুলের অবস্থান। গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের এই গাছগাছালি বছরের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি সময় থাকে পানির নিচে। এটাই এই জঙ্গলকে আলাদা করেছে দেশের আর দশটা জঙ্গল থেকে। ১৯৫২ সালে সংরক্ষিত বন ও ১৯৭৩ সালে রাতারগুল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। ৩৩১ একর আয়তনের এই চিরসবুজ বনে জারুল, হিজল আর করচ গাছের প্রাধান্য। আর প্রাণ বৈচিত্র্যের হিসেবে মোট ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সাথে রয়েছে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও নয় প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে এই জঙ্গলে (সূত্র আইইউসিএন)।
রাতারগুলের উপর প্রথম আঘাত আসে ২০১২ সালে ভারতে সারি নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণে। মেঘালয়ের মন্ডু লেসকা বাঁধ প্রকল্পের দরুণ কমতে থাকে রাতারগুলের প্রাণদায়িনী নদী সারি- গোয়াইন নদীর প্রবাহ। স্থানীয় মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায় ২০১২ ও ২০১৩ সালের বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ অন্য বছরগুলোর তুলনায় কম ছিল। এখন দ্বিতীয় ধাক্কা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ইকোট্যুরিজম প্রজেক্ট। মোট ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার সিংহভাগ খরচ হচ্ছে নির্মাণ ও পূর্ত খাতে- ৪ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা। সম্পদ সংগ্রহ ও ক্রয় বাবদ ৫৮ লক্ষ টাকা, মেরামত সংরক্ষণ ও পুণর্বাসন খাতে ৩৩ লক্ষ টাকা, সরবরাহ ও সেবা খাতে ২৫ লক্ষ টাকা, আর বেঁচে থাকা ৩০ লক্ষ টাকায় বনায়ন। ২০১২ সাল থেকে রাতারগুলে পর্যটকদের আনাগোণা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ পরিবেশবাদীরা বন বিভাগের সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরালো করার দাবি তোলেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দপ্তর ‘রাতারগুল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য স্থাপন ও উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হিজল করচ বরুণ গাছের পাশাপাশি বেত, বাঁশ, মুর্তার সংযোজন রাতারগুলকে জলার বন হিসেবে অনন্য করেছে। ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭০ এরও বেশি প্রজাতির পাখি ও প্রায় ১০ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে এই বনে। এই সম্পদ রক্ষায় জলার বনকে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্যে রূপান্তর ও উন্নয়ন করা প্রয়োজন।

প্রথম খটকা লাগে ‘বাঁশ, বেত, মূর্তার সংযোজন’। বন্যপ্রানী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর চতুর্থ অধ্যায় (রক্ষিত এলাকা) এর ১৪.১ ধারার (ড) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন এলিয়েন ও আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ প্রবেশ করাইতে পারিবেন না। এ ব্যাপারে আমার মতামত না নিয়ে বিশেষজ্ঞ মন্তব্যটাই তুলে ধরলাম। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একে ফজলুল হক একটি প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাতারগুলে বন বিভাগ বাঁশ, বেত ও মূর্তার যে প্ল্যান্টেশন করেছে তা ঐ বনের মৌলিকত্ব ধ্বংস করে দেবে। বন রক্ষার্থে বাঁশ, বেত ও মূর্তা লাগানো হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে এগুলোর কারণে অন্যান্য গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যহত হতে পারে। এক সময় পুরো বন মৃতপ্রায় হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ বন বিভাগ নিজেই আইন ভেঙে বসে আছে!
দ্বিতীয় খটকা ‘জলার বনকে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্যে রূপান্তর ও উন্নয়ন করা প্রয়োজন’ অংশটুকু নিয়ে। এর অর্থ বন বিভাগ কী নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছেন? যে বনকে ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা রক্ষায় বন বিভাগ ব্যর্থ। অবশ্য প্রকৃতিবিদ ফিলিপ গাইন তো বলেই দিয়েছেন, ‘যেখানে বন বিভাগ আছে, সেখানে বন নেই!’ সে প্রসঙ্গে আমার মত চুনোপুঁটির কথা বলা সাজে না! তবে রাতারগুলের বন সংরক্ষণের উদাহরণ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রেদোয়ান চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন তার একটি লেখায়। তিনি লিখেছেন- ‘কোন এক ছাত্রনেতা রাতারগুল বনবিট কার্যালয় থেকে দরপত্রের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকায় দুই বছরের জন্য জলমহাল ইজারা নিয়েছিলেন অর্থাৎ বন বিভাগকে অবহিত করেই খৈয়ারখালে বাঁধ দিয়েছিলেন। বন বিভাগের লোকজন যে বনকে এখনো শুধুমাত্র সম্পদ আহরণ ও বিক্রির জায়গা হিসেবেই দেখেন তা তার প্রমাণ’। তিনি আরো যোগ করেছেন, একটি খালে যে কেউ একজন ইচ্ছা করলেই বাঁধ দিতে পারেন না, ১৯৭৩ সংরক্ষিত ঘোষিত একটি বনের জলমহালের প্রবেশখালে বাঁধ দেয়ার অনুমতি দেয়ার এখতিয়ার বন কর্মকর্তা রাখেন না…..।’ অর্থাৎ সংরক্ষিত বনের মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের কালিমাও মাখতে হচ্ছে বনের রক্ষকদের। তারা কীভাবে বনের অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষা করবেন, তা নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, রাতারগুল জলাবনে বন বিভাগের কর্মকর্তা- কর্মচারীর সংখ্যা ৩ জন। অর্থাৎ অপ্রতুল জনবল নিয়ে চলছে বন রক্ষার কাজ। নতুন পরিকল্পনায় বন প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানোর কোন উল্লেখ আছে কী না, সেটা জানা নেই!

সে যাই হোক, বন বিভাগের এই ঘোষণার পরপর বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র একটি দল ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট সেখানে যায়। তাদের সেই সফরে ছিলেন সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাপা সহ-সভাপতি সুলতানা কামাল, বাপা’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল। তারা সেই সফরেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘বাস্তবতার নিরিখে এই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়নি। রাতারগুল জলার বন, আমরা কোন রূপান্তর চাইনা, চাই সংরক্ষণ দৃঢ় হোক’। তারা মনে করেন রাতারগুলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা প্রাকৃতিকভাবেই হবে এবং এ ক্ষেত্রে বন বিভাগকে শুধু নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটে বাপা ও ইউকে- বাংলাদেশ এডুকেশন ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে ‘রাতারগুল: জলাবনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা’ শিরোনামে আয়োজিত এক সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত-এর উপস্থিতিতেই রাতারগুল রক্ষায় ১২ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে ছিলো- রাতারগুল সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজন, বনবিভাগ থেকে আলাদা করে সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা, সীমানা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে বনের প্রকৃত আয়তন পরিমাপ, বনের দখলিকৃত জায়গা উদ্ধার করে ‘বাফার জোন’ তৈরি, বনের কোর জোন সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত রাখা, সর্বসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বনের অভ্যন্তরের জলাধার সংস্কার করে শুকনা মৌসুমেও পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা, বর্ষাকালে পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক নৌযান রাখা, বনের উপর নির্ভরশীল স্থানীয়দেরকে বনরক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং বিকল্প কর্মসংস্থান করে দিতে হবে, পর্যটনের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ প্রতিরোধ, সামাজিক বনায়নের নামে বনের বাফার জোনে ক্ষতিকর কোন উদ্ভিদ রোপন না করা এবং প্রজননকালে মাছ ধরা বন্ধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো।
এসবকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলেছে বন বিভাগের প্রকল্প। গত সপ্তাহের (এপ্রিল ২০১৪ এর প্রথম সপ্তাহ) পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বনের মধ্যবর্তী রাঙাকুড়ি এলাকায় তৈরি হচ্ছে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এক্ষেত্রে বন বিভাগের যুক্তি, বনকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে! পাশে বন বিভাগের বিট কর্মকর্তার কার্যালয়। সেখানেও উঠছে আরেকটি পাকা দোতলা ভবন- বিশ্রামাগার। কাজ প্রায় শেষের পথে। টাওয়ার-বিশ্রামাগারে যেতে বনের ভেতর ১৫ ফুট চওড়া এক কিলোমিটার লম্বা রাস্তাও নির্মাণ করা হবে। আর বন ঘিরে দেওয়া হবে কাঁটা তার দিয়ে।
৫০ ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার দিয়ে যদি জঙ্গল রক্ষা করতে হয়, তাহলে বনপ্রহরীর আর কী প্রয়োজন? কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞ বলছেন, ওয়াচ টাওয়ারের ফলে বন্যপ্রাণী শিকারীদের আগে থেকেই দেখা সম্ভব হবে, ফলে তারা আর শিকারে আসতে পারবে না। দূর থেকে আরো সহজ হবে পর্যবেক্ষণ। আর গবেষণা আর বন্যপ্রাণী গণনার কাজেও ওয়াচ টাওয়ার কাজে আসবে! এভাবে দেশের বন্যপ্রাণী রক্ষা হয় বলেই দেশের জীববৈচিত্র্যের আজ এই হাল!
এক কিলোমিটার লম্বা পাকা রাস্তা- ১৫ ফুট চওড়া! জঙ্গলের মধ্যিখান থেকে তৈরি এই রাস্তা আসলে আরেকটি বাঁধের সৃষ্টি করে পানি প্রবাহের বাঁধা সৃষ্টি করবে। এমনটা কেবল আমি একলাই চিন্তা করছি না- একই চিন্তা করেছেন প্রাণ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ গবেষক পাভেল পার্থও। তিনি বলেন, রাতারগুলে জলার বন। জারুল হিজল করচের বন। সেখানে মিষ্টিপানির সরবরাহ থাকতে হবে। ভারতে সারি নদীতে বাঁধ দেওয়ায় পানি প্রবাহ কমে গেছে বনে। সেখানে যদি বন বিভাগ নতুন করে জলাভূমির বনে রাস্তা নির্মাণ করে তাহলে জলের প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হবে।
কাটাতারের বেড়া প্রসঙ্গে আসি এবারে- প্রাকৃতিক বনে কাটাতারের বেড়া দিয়ে শিকারীদের জঙ্গল থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা করছে বন বিভাগ। জঙ্গলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি করে জঙ্গলের প্রাণীদের পালাবার রাস্তাটুকুও আটকে দিতে চায় বন বিভাগ। ব্যাপারটা অবশ্য নতুন নয়। বরগুণার টেংরাগিরি সংরক্ষিত অভয়ারণ্যে খাঁচার ভেতরেই সব জীব বৈচিত্র্য! এখানেও হয়তোবা সেটা করারই পরিকল্পনা করছে বন বিভাগ। তবে মূল ব্যাপারটা হলো- জঙ্গলে খাবারের অভাব দেখা দিলে পশু পাখিরা পানিতে ভেসে অন্য কোথাও গিয়ে খাবারের যোগাড়টুকু করে নিতে পারে। একটা খাঁচায় আটকে গেলে সে সুযোগটাও আর থাকে না। আর জঙ্গল ঘিরে দেওয়ার অর্থ জঙ্গলের সীমা রেখা নির্ধারণ করে দেওয়া। সারি গোয়াইন নদীর মতো পলি বয়ে আনা প্রবাহ থেকে কালের আবর্তে জঙ্গলের ভূমি বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার নয়। এ ব্যাপারে পাভেল পার্থ মনে করেন, প্রাকৃতিক বনকে তার মতো করে বেড়ে উঠার সুযোগ দিতে হবে। কাঁটাতারে ঘিরে ফেলা হলে বনকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখা হবে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, বন বিভাগের দাবি- এগুলো করলে নাকি পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত রাখা যাবে! পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়ার কাজে নেমে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করতেই নাকি এসব ব্যবস্থা। বাপা’র সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম এ ব্যাপারে সোজাসাপ্টা বলেই দিয়েছেন- ‘এখন বন রক্ষার স্বার্থে ব্যয়বহুল পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আর বিশ্রামাগার করতে হচ্ছে। এসব যখন ছিল না, তখন কি বন সুরক্ষা হয়নি? আমরা বনকে বনের মতোই রাখার পক্ষপাতী। স্থায়ী অবকাঠামো হলে রাতারগুল আর বন থাকবে না। হয়ে যাবে ট্যুরিস্ট স্পট!’ এ ব্যাপারে আরো চাঁছাছোলা বক্তব্য প্রকৃতিকর্মী রেজু আযমের- ‘সব যদি ট্যুরিস্ট আর পিকনিক স্পটই বানাতে হয়, তাহলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের আর কী দরকার? একটা পিকনিক ডিপার্টমেন্ট বানালেই হয়’!
বন বিভাগ ইকো ট্যুরিজমের কথা বলছে! ইকো ট্যুরিজমের কোথায় ইটের দালান বানিয়ে এসির হাওয়া খাওয়া যায়, ইঞ্জিন নৌকায় ঘুরে জঙ্গলের নিঃশব্দ পরিবেশ নষ্ট করার কথা বলা হয় আমার জানা নেই। ইকো ট্যুরিজম হয় স্থানীয় মানুষকে উন্নয়নের অংশীদার করে- তাদের গাছ চোর উপাধি দিয়ে নয়! দিনের পর দিন যাদের চোর বলে আসবেন, সেই অভাবী গ্রামের লোকেরা জঙ্গল রক্ষা করবে- এমন আশা করাটা বাড়াবাড়ি। সংরক্ষণ কাজের সাথে গ্রামের লোকদের সংশ্লিষ্ট করাটা এখন তাই বাধ্যতামূলক। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান তাই বলে। বাংলাদেশে জঙ্গল সংরক্ষণে কমিউনিটি ম্যানেজমেন্টের কোন বিকল্প নেই। গ্রামের মানুষগুলোকে যদি বোঝান যায়, জঙ্গল টিকে থাকার উপরেই নির্ভর করছে তার ভবিষ্যৎ, তার গ্রামের ভবিষ্যৎ, তাহলে কেন তারা সাহায্য করবে না?
আর ইকো ট্যুরিজমের মূল কথাই হলো- প্রকৃতিতে কোন চিহ্ন ফেলে রেখে আসা যাবে না। অর্থাৎ প্রকৃতিতে যতোটা সম্ভব কম প্রভাব ফেলে বেড়ানোর প্রক্রিয়াই ইকোট্যুরিজম। এখন বিবেচনার ব্যাপার- বন বিভাগ কিভাবে ইকো ট্যুরিজম করছে রাতারগুলে! ইকো ট্যুরিজম বা সাধারণ ট্যুরিজম- কোনটাতেই আমার আপত্তি নেই। শুধু সমস্যা হলো আমাদের পর্যটকরা এখনো সভ্য হয়ে ওঠেনি। তাদের এখনো বলে দিতে হয় চকোলেট, চিপসের প্যাকেট যেখানে সেখানে ফেলতে হয় না। জঙ্গলে গিয়ে চিৎকার করতে হয় না। মাইক বাজিয়ে গান শুনতে হয় না। আর যদি ভুলেও তাদের আপনি বলে ফেলেন এই কথাগুলো- তাহলে তাদের কাছ থেকে কিছু কটু কথা অপনাকে শুনতেই হবে ইটের জবাবে পাটকেল হিসেবে।
আর সব জঙ্গলেই বা কেন ট্যুরিজম অবকাঠামো গড়তে হবে? আমরা কী ভুলগুলো থেকে আসলেই শিক্ষা নিতে ভুলে যাই? বাংলাদেশে কোন জঙ্গল অক্ষত আছে পর্যটন অবকাঠামো তৈরির পর। বিশ্বাস না হলে তাকিয়ে দেখুন গাজীপুরের দিকে, শাল বাগান বললেও বোধ হয় বাড়াবাড়ি হয়ে যায়! তাকিয়ে দেখুন লাউয়াছড়ার দিকে। আর্থিক দিক দিয়ে লাউয়াছড়া বেশ লাভবান হচ্ছে। অথচ যতো মানুষ ঢুকছে, ততোই সরে যাচ্ছে জঙ্গলের পশুপাখিগুলো। তাই ভাবতে হবে এখনই, দেশের পরিবেশ রক্ষাটাই কী মূল লক্ষ্য, নাকি পর্যটন?

বাংলাদেশের প্রকৃতিবিদরা বলছেন, ইতোমধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকরা রাতারগুলের যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে। বনবিভাগের এই পদক্ষেপগুলো রাতারগুলকে প্রাকৃতিক বন থেকে বিনোদন স্পট হিসেবে পরিণত করে ফেলবে। বাপা’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল মনে করেন, এই জঙ্গলের জন্য যদি কোন উদ্যোগ নিতে হয়, তবে সেটা হতে হবে জঙ্গলকে রক্ষার জন্য এবং এই জঙ্গলের উন্নতির জন্য। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই জঙ্গলকে শিক্ষামূলক ও গবেষণার জন্য ব্যবহার করা, জনগণের প্রবেশাধিকার এবং জঙ্গলের সম্পদ ব্যবহার হবে গৌণ চিন্তা। বন বিভাগের নেওয়া এই উদ্দ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, এই প্রকল্প কোনভাবেই রাতারগুলকে রক্ষার জন্য হচ্ছে না। এটা পুরোটাই পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ানোর কথা মাথায় রেখে হচ্ছে, পর্যটক নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করে নয়। ইতোমধ্যেই তিনি সর্ষের কিছু ভুতও তুলে ধরেছেন- প্রকল্পে কম্পিউটার কেনার যে দাম ধরা হয়েছে, তা বাজার মূল্যের তিনগুণ। প্রকল্পের দু’টো ফ্রিজ কেনা হচ্ছে ২ লক্ষ টাকায়, ৫ লক্ষ টাকার এয়ার কুলার, ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা কন্সাল্টেন্সি ফি, বাংলো ও পার্ক ইন্সপেকশন ৮০ লক্ষ টাকা, ৩০ লক্ষ টাকার ওয়াচ টাওয়ার, ১৫ লক্ষ টাকায় ৭টি ইঞ্জিন বোট, ২০ লক্ষ টাকা বক্স কালভার্ট, ২০ লক্ষ টাকা জেটি, ২০ লক্ষ টাকা রাস্তা তৈরি- এমন সব উদ্ভট খরচের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন একটি সাক্ষাৎকারে। তিনি আরো যোগ করেছেন, জঙ্গল প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়, যদি ঠিকভাবে এলাকা সংরক্ষণ করা যায়, জঙ্গল আর তার বাসিন্দার অবস্থা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো অবস্থায় থাকবে। জঙ্গলের মধ্যে কোনরকম বাংলো, অফিস, ইঞ্জিন বোট, কংক্রিট জেটি, পাকা রাস্তার প্রয়োজন নেই। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. এ জেড এম মঞ্জুর রশীদও স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, রাতারগুলের এখনকার অবস্থা বিবেচনায় কোনভাবেই রাতারগুলকে ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত করার কথা চিন্তাতেও আনা যায় না। রাতারগুলের বিপন্ন অবস্থার জন্য তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, দূর্বল ব্যবস্থাপনা সেই সাথে আশেপাশের গ্রামের মানুষের নির্বিচারে বনের সম্পদ আহরণকে দায়ী করেন। তিনি জঙ্গলকে পুরোপুরি সংরক্ষিত করে, জঙ্গলে ঢোকার পথ গুলো নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের যাতায়াতে বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা বলেন। সেই সাথে ব্যাপক গণ সচেতনতা, জীববৈচিত্র্য এখনকার অবস্থা জরিপ, আর সেই সাথে নতুন চারা গাছগুলোকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়ার কথাও জানান তিনি।

শেষ করবো ড. রেজা খানের বক্তব্য দিয়েই। বাংলাদেশের এই কৃতী বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এখনো দেরি হয়নি। বনায়নের সুযোগ যখন রয়েই গিয়েছে, তখন খালি কিছু জায়গায় বরুণ, ভুই ডুমুর, নল-খাগড়া, হোগলা, ঢোল কলমি গাছ লাগিয়ে অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব। আর জঙ্গলের উঁচু জায়গাগুলোতে জবা, কেওড়া, বিভিন্ন ধরণের ডুমুর লাগিয়ে প্রজাপতি, পাখিদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের বন বিভাগ বলে কথা- হয়তো সেখানে আবার বনায়নের নামে রেইনট্রি, ইউক্যালিপ্টাস শোভা পাবে।

সময় এখন ভাববার। দেশের তাবৎ ভ্রমণ লেখক, পর্যটক, ব্যাকপ্যাকার, ট্রেকার, প্রকৃতিকর্মী, সংরক্ষণকর্মী সবাই এক হয়ে আসুন, একবার ভাবি- আমাদের বিলাসিতার জন্য কী দেশের একমাত্র জলার বনকে বলি দেবো?
(এই লেখাটি তৈরি করতে গিয়ে প্রচুর পত্রিকা ঘাটতে হয়েছে। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রথম আলোর উজ্জ্বল মেহেদি, সকালের খবরের দেলোয়ার জাহান, নিউ এজ, ঢাকা ট্রিবিউন ও অন্যান্য আরো অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে। বিশেষত বাংলানিউজ২৪.কমের সেই প্রতিবেদককে, যার চূড়ান্ত মূর্খ রিপোর্টগুলো আমাকে বাধ্য করেছে কিছু লেখার জন্য।)

১৪ thoughts on “প্রসঙ্গ রাতারগুল: পিকনিক স্পট নাকি সংরক্ষিত বন

    1. কয়লা বিদ্যুৎ টাই খালি
      কয়লা বিদ্যুৎ টাই খালি দেখতেসেন….. মংলার জয়মনির গোলে গিয়া দেখেন এনার্জি প্ল্যান্ট ক্যামনে বড় হইতেসে দিন দিন।

  1. এইবার মার্চ মাসেই তাপমাত্রা
    এইবার মার্চ মাসেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি। জুন জুলাইয়ে কি হবে ভাবতেই শিউড়ে উঠছি। সাথে সরকারের ১০০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুতের ভেলকি শুরু হয়ে গেছে এখনই। যেখানে সারা বিশ্ব সোচ্চার হচ্ছে বনভূমি ধ্বংসের বিপক্ষে সেখানে আমরা রাতারগুলের মতো একটি ব্যতিক্রমধর্মী বোনকে ধ্বংসের পায়তারা করছি। হয়ত দেখা যাবে এই প্রজেক্ট থেকে সংশ্লিষ্ট সরকারী লোকজন টুপাইস কামাবে এই ধান্দাতেই এইসব কাজ কাড়বার। কিন্তু টুপাইস কামাতে গিয়ে একটা বন যে নষ্ট হয়ে যেতে পারে সেই খেয়াল নাই। হায় কবে আমরা একটু মানুষ হবো?

    চমৎকার পোস্টের জন্য ধন্যবাদ। পোস্টটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি সবাইকে। আমাদের দুর্বল কণ্ঠের হলেও, প্রতিবাদ জারী থাকুক।

    1. বন শেষ হয়ে গেলে সমস্যা নেই-
      বন শেষ হয়ে গেলে সমস্যা নেই- পিকনিক স্পট তো ঠিকই রয়ে যাবে- যেমনটা আছে গাজীপুরে গজারী বাগানে। (শাল আর গজারী একই গাছের দুই রূপ। শাল গাছের পাতা, ডাল পড়ে গিয়ে যে গাছ হয় সেটা গজারী। একটা গজারীকে শাল হওয়ার জন্য যে সময় দিতে হয়, সেটা আমরা দেই না। তার আগেই গজারী আমাদের ঘরের দরজা বা আলমিরা হয়ে বসে থাকে।)

    1. ধন্যবাদ। শুধু পড়ে লাভ নেই-
      ধন্যবাদ। শুধু পড়ে লাভ নেই- অ্যাক্টিভ সিটিজেন হয়ে এর প্রতিবাদ জানাতে হবে। প্রয়োজনে রাস্তায়, জঙ্গলে।

  2. রাতারগুলে যাওয়ার সৌভাগ্য
    রাতারগুলে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এত চমৎকার একটা বন এইভাবে ধ্বংস হতে চলেছে ভাব্লেই খারাপ লাগে। আপনাকে ধন্যবাদ এই সময়োপযোগী পোষ্টের জন্য। কই ডুব মারেন কয়দিন পর পর? আপনাকে তো পাওয়াই যায় না।

  3. আপনি সম্পূর্ণ ভিন্নধারার
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আপনি সম্পূর্ণ ভিন্নধারার লেখক। আপনি আপনার কলম বন্ধ করবেন না। চালিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *