চাকরী থেকে রিজাইন দেওয়ার পর

জীবনে প্রথম চাকরীর ইন্টারভিউ যখন দেই তখন মাত্রই মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রথম কোথাও সিভি ড্রপ করলাম আর সেখান থেকেই ফোন দিল; পুরাই ভাবে উঠে গেলাম। আমাদের ব্যাচে আমরা ২৮ জন ছিলাম। সবার মাঝে আমিই প্রথম ইন্টারভিউ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। তাই ভাবটা একটু বেশিই ছিল। চাকরি তো পরের ব্যাপার। যেহেতু পাবলিক ভার্সিটির ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলাম তাই জানতাম আজ হোক কাল হোক কোথাও না কোথাও চাকরি হবেই। এত টেনশন করার কি আছে? (টেনশন কি জিনিস সেটা অবশ্য অনেক পরে বুঝেছিলাম।)


জীবনে প্রথম চাকরীর ইন্টারভিউ যখন দেই তখন মাত্রই মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রথম কোথাও সিভি ড্রপ করলাম আর সেখান থেকেই ফোন দিল; পুরাই ভাবে উঠে গেলাম। আমাদের ব্যাচে আমরা ২৮ জন ছিলাম। সবার মাঝে আমিই প্রথম ইন্টারভিউ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। তাই ভাবটা একটু বেশিই ছিল। চাকরি তো পরের ব্যাপার। যেহেতু পাবলিক ভার্সিটির ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলাম তাই জানতাম আজ হোক কাল হোক কোথাও না কোথাও চাকরি হবেই। এত টেনশন করার কি আছে? (টেনশন কি জিনিস সেটা অবশ্য অনেক পরে বুঝেছিলাম।)

যেই কোম্পানিতে আবেদন করেছিলাম তখনো জানতাম না যে সেটা জামায়াতে ইসলামির কোম্পানি। প্রথমে একটা লিখিত পরীক্ষা দিলাম। সেটাতে প্রথম হবার পর এক সপ্তাহ পরে ভাইভার জন্য ডাকল। ভাইভা দিতে গিয়ে বুঝলাম যে ইহা আদর্শ জামায়াতি প্রতিষ্ঠান। তারা ভেবেছিলেন যেহেতু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্র তার মানে অবশ্যই শিবির করি। আমাকে প্রশ্নও করা হয়েছিল যে যদি ভার্সিটিতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝে মারামারি লাগে তাহলে আমি কোন দলের সাপোর্ট করব। আমি কি কম চিজ নাকি। আমিও বলেছিলাম- “I hate student politics. Its just waste of time. Nothing else.”

ভেবেছিলাম চাকরি হবে না। কিন্তু এক সপ্তাহ পর ফোন দিয়ে জানাল আপনাকে আমরা সিলেক্ট করেছি। আমি নিজেই অবাক। শিবির বিরোধী কথা বলার পরেও আমাকে ডাকে কিভাবে? সমস্যা বাঁধল অন্যখানে। আমি ভাইভা দিয়েছিলাম International Markenting Department (IMD)-তে কিন্তু আমাকে অফার করল Production Department-এ জয়েন করতে। না করে দিলাম। কারন আমি জানি আমাকে দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা ফ্যাক্টরিতে বন্দী জীবন কাটানো সম্ভব হবে না।

প্রথম চাকরিতে জয়েন করি বিসিএস লিখিত পরীক্ষা দিবার ঠিক এক সপ্তাহ পর। কোম্পানিটা অনেক পুরাতন। এক নামে সবাই চিনে। যেই ডিপার্টমেন্ট এ জয়েন করেছিলাম সেটা ছিল নতুন একটা ডিপার্টমেন্ট। তাই খুশি ছিলাম যে অনেক কাজ করা যাবে এবং পারফরমেন্স দেখানোও যাবে। নিয়োগের সময় এমডি স্যার অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বললেন। কিন্তু কাজ শুরু করার ১৫ দিন পরেই বুঝে গেলাম নামি কোম্পানি হলেই তার পলিসি ভাল হবে সেটা কোন কথা নয়। আমাদের সাথে কিছু কমিটমেন্ট করা হয়েছিল। দেখলাম সেগুলো সবই কথার কথা ছিল। কোম্পানি পুরাতন কিন্তু তার ভিতরের পরিবেশ সুবিধার না। থাকতে চাইলে অনেক কম্প্রোমাইজ করে থাকতে হবে। মাত্রই পাশ করে এসেছি। রক্ত অনেক গরম। পরিবার চালানোর টেনশনও মাথায় নাই। এত কম্প্রোমাইজ করতে কি মন চায় নাকি? দিলাম রিজাইন। এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রিজাইন লেটার নিয়ে বললেন তোমাকে ৩ দিনের ছুটি দিলাম। মাথা ঠান্ডা করে আস। আমিও চলে গেলাম সেন্ট-মারটিন। তিন দিন পরে অফিসে ফিরে বললাম-

“স্যার, আগে মাথা গরম করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখন সাগরের বাতাস খেয়ে মাথা ঠান্ডা হয়েছে। ভেবে দেখলাম, কোনভাবেই এত কম্প্রোমাইজ করে চাকরি করা সম্ভব না আমার পক্ষে। সরি।“

স্যার বুদ্ধিমান মানুষ। আমার রিজাইন লেটারটা ড্রয়ার থেকে বের করে সেটাতে সই করে দিয়ে বললেন-

“Best of Luck. প্রথম চাকরি ছেড়ে দেওয়াটা অনেক সাহসের ব্যাপার। তোমার সেই সাহস আছে দেখে ভাল লাগলো। আশা করছি জীবনে অনেকদূর যেতে পারবে।“

স্যারের সাথে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলাম।

এর পর ৪ মাস বেকার ছিলাম। এই ৪ মাসে আমি প্রথমবারের মত উপলব্ধি করতে পারি একজন বেকারের মানসিক যন্ত্রণা কিরকম হতে পারে। আমি খুব একটা খারাপ ছিলাম না। বাসায় ছিলাম। বিসিএস এর ভাইভার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সময় কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু “আমি এখন বেকার” এই অনুভূতিটা সবসময় মাথায় ঘুরত। বন্ধুরা যখন ফোন করে বলত যে “দোস্ত অমুক কোম্পানিতে জয়েন করসি” তখনকার মন খারাপের অনুভূতিটা কেমন হত সেটা শুধু সেই জানবে যে কি না সেই পরিস্থিতি পার করে এসেছে।

সরকারী হিসাবে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা মাত্র ২ লাখ। কিন্তু আসল সংখ্যাটা যে আর বেশি সেটা সবাইই জানে। সরকার নিজেও জানে কিন্তু স্বীকার করতে চায় না। আমি মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে এই ২ লক্ষ বেকার কিভাবে তাঁদের অবসর সময়টুকু কাটায় সেটা ভেবে। আমাদের পাশের দেশ ভারতে আত্মহত্যার হার সবথেকে বেশি এবং যারা আত্মহত্যা করে তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত বেকার কিংবা ছাত্র যারা চাকরি পাবে কি না সেই অনিশ্চয়তার কারনে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কতটা হতাশাগ্রস্ত হলে একটা মানুষ তার জীবনকে ঘেন্না করতে পারে সেটা কি কেউ চিন্তা করে। আমাদের দেশে আত্মহত্যার হার হয়ত কম কিন্তু মাদকাসক্ত কিংবা শিক্ষিত সন্ত্রাসীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। সরকার চাইলেও কিন্তু এর দায় কখনোই এড়াতে পারবে না। হাজার কোটি টাকা চুরি না করে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিলে আজ দেশটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত সেটা চিন্তা করতেই অবাক হয়ে যাই।

চার মাসের বেকার জীবনের পর একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে জয়েন করি। নামেই ছিল বহুজাতিক অথচ বেতন কাঠামো ছিল দেশীয় কোম্পানির থেকেও খারাপ। কিন্তু পরিবেশটা ছিল অসাধারন। একদম নতুন একটা কোম্পানি, নতুন একটা ডিপার্টমেন্ট, নতুন নতুন সব লোক। মনের মত সব কাজ। আমি অনেক অস্থির প্রকৃতির ছেলে। ঘুরতে পছন্দ করি। আর আমার চাকরিটাই এমন যে প্রতি মাসেই ৪-৫ দিন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সায়েন্টিফিক সেমিনার কিংবা মিটিং করতে যেতে হয়। অসাধারন সময় কাটিয়েছি সেখানে। অনেক পরিশ্রম করেছি, অনেক সময় দিয়েছি। কিন্তু শিখেছিও অনেক। সেই শিক্ষা, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন দেশের একটা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে জব করছি।

বহুজাতিক কোম্পানিটিতে ছিলাম ১ বছর ৪ মাস। খুব ভাল সময় কাটিয়েছি সেখানে। প্রথম চাকরি হিসাবে আমি সেটাকেই ধরি। যত যাই বলি না কেন, চাকরি যে টাকার জন্যই করি এটা আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারব না। তাই সেখানে আর থাকি নি। এরপর থেকেই বর্তমান কোম্পানিতে আছি। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মা কোম্পানিগুলোর একটি হওয়াতে এখানকার পলিসি কিংবা বেতন কাঠামো অপেক্ষাকৃত ভাল। কিন্তু তারপরেও আগের কোম্পানিটাকে অনেক মিস করি। হাজার হলেও ফার্স্ট জব বলে কথা।

১৬ thoughts on “চাকরী থেকে রিজাইন দেওয়ার পর

  1. বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী বেকার
    বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী বেকার নাকি ডাক্তার আর ইঞ্জিরা। :মানেকি:
    বেকার থাকার দুর্ভাগ্য কখনও হয়নি। আমার স্বভাবই হচ্ছে যতো টাকাই ইনকাম করিনা কেন, মাস শেষে শূন্য। তাই টাকার পেছনে ছুটা বন্ধ করেছি। তবে জীবন থেকে এটুকু শিখেছি, টাকা না থাকলে অনেক আপনজনও বাজে ব্যবহার করছে ছাড়ে না। তাই টাকার দরকারও আছে।

    ধুর এসব কি লিখছি? কিসের পোস্টে, কি মন্তব্য… আপনার সফলতা কামনা করছি। :ফুল:

    1. ইঞ্জিনিয়ার বেকার বাংলাদেশে
      ইঞ্জিনিয়ার বেকার বাংলাদেশে অনেক আছে কিন্তু ডাক্তার কিন্তু নাই রে ভাই। ডাক্তার হওয়ার এইটাই মজা। টাকা না থাকলে অনেক আপনজনই দাম দেয় না রে ভাই সেইটা বুঝতে পাএরেছি। হায় টাকা, হায় চাকরি, হায় স্ট্যাটাস। :মনখারাপ:

  2. নতুন চাকরিতে আপনার
    নতুন চাকরিতে আপনার পার্শ্ববর্তী ডেস্কে কোন সুন্দরী তরুণী থাকলে তাকে আমার পক্ষ থেকে একটা ‘হ্যালো’ জানাবেন… :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে:

    ওহ.. আপনার জন্যেও শুভ কামনা।

    1. হে হে, চাকরিতে সুন্দরী
      হে হে, চাকরিতে সুন্দরী রমণীদের অভাব নাই। আপনের দাওয়াত থাকল। একদিন অফিসে এসে চা-নাস্তা খেয়ে যাবেন আর সুন্দরীদের সাথে একটু পরিচিত হয় যাবেন। :চোখমারা: :চোখমারা: :চোখমারা:

  3. বেকার থাকার যে কী কষ্ট তা
    বেকার থাকার যে কী কষ্ট তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।আর টাকা না থাকলে পরিবারের কোন সিদ্বান্ত নেওয়ার অনুমতি থাকে না।

  4. বেকার সময় কাটানোর সুযোগ খুবই
    বেকার সময় কাটানোর সুযোগ খুবই কমই হয়েছে। তবে দুইবার স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে বুঝেছি কিছু করার মত না থাকলে নিজেকে খুবই এই সমাজে অর্থহীন মনে হয়। আর টাকা যে কত বড় একটা জিনিস (!) সন্ন্যাসবাসের সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

    তবে কর্মক্ষেত্রে কারো প্রেমে পইড়েন না, জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাবে। সে যদি আপনার বসও হয়, তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

    1. তবে কর্মক্ষেত্রে কারো প্রেমে

      তবে কর্মক্ষেত্রে কারো প্রেমে পইড়েন না, জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাবে।

      কুনু চান্স নাই বস। আমার এক কলিগ কাম দোস্ত এই ভুল করেছিল। তাঁর নিজের জীবন কেমন তেজপাতা হয়ে গিয়েছিল সেটা দেখেছি। সো, এই ভুল হপে না।

  5. আপনার ডানাভাঙা সময়টার কথন
    আপনার ডানাভাঙা সময়টার কথন ভালো লাগলো! :ভেংচি:
    তবে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক মানে পায়ের নিচে শর্ষে থাকলে বাঁধাধরা জীবন মেনে নেয়া কষ্টকর। আফটার অল, জীবন আর জীবিকা তো এক জিনিস নয়।

    1. তবে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক মানে

      তবে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক মানে পায়ের নিচে শর্ষে থাকলে বাঁধাধরা জীবন মেনে নেয়া কষ্টকর।

      সমস্যা তো সেখানেই রে ভাই। রক্তে আমার অস্থিরতার বীজ, কিভাবে যে মুক্তি পাব জানি না। অবশ্য মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছাও নেই।

  6. বেকারত্বকে তো আমার কাছে
    বেকারত্বকে তো আমার কাছে যেকোনো মরণব্যাধির চেয়েও ভয়ানক বিভীষিকাময় মনে হয়… #-o :হয়রান: :হয়রান:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *