আমার ভালোবাসার যত কথা।

কখনো ভাবিনি ইস্টিশনের প্রথম পোষ্টটি দিবো একটি ভালোবাসার গল্প। যাই হোক গল্পটি কয়েকদিন আগে লিখে ড্রাফট করে রেখেছিলাম। আজ হঠাত চোখে পড়লো তাই পোষ্ট করে দিলাম। এটা আমার প্রথম পোষ্ট ভুলভ্রান্তি গুলো ধরিয়ে দিবেন দয়া করে।


কখনো ভাবিনি ইস্টিশনের প্রথম পোষ্টটি দিবো একটি ভালোবাসার গল্প। যাই হোক গল্পটি কয়েকদিন আগে লিখে ড্রাফট করে রেখেছিলাম। আজ হঠাত চোখে পড়লো তাই পোষ্ট করে দিলাম। এটা আমার প্রথম পোষ্ট ভুলভ্রান্তি গুলো ধরিয়ে দিবেন দয়া করে।

তখন আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। গায়ে ঢাবি ছাত্রের তকমা লাগিয়ে ছবিরহাটে ঘুরে বেড়ানো ছিলো আমার অন্যতম প্রধান কাজ। বিধাতা বোধহয় আমার এই সুখে খুশি ছিলেননা তাই হঠাৎ একদিন এমন একটা খবর শুনালেন যে খবরটা আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। বাবা হারানোর শোক কাটিয়ে যখন ঢাকায় ফিরলাম তখন আমার মানিব্যাগে ৪৭৮ টাকা ছিলো। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলামনা। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে কি লাভ? তাই নিজেকে ছোট করতে চাইলামনা। এদিকে আমার পকেটে যে টাকা ছিলো তা দিনদিন ফুরিয়ে আসছিলো। চিন্তাগ্রস্ত মুখ নিয়ে ছবিরহাটে বসে আছি। হঠাৎ পিছন থেকে একটা মেয়ের ডাক শুনলাম।

-আরে আপনি এখানে?

মেয়েটিকে চিনতে খুব কষ্ট হয়নি আমার। একে একদিন পাব্লিক বাসে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে দিয়েছিলাম। সেদিন ওর সাথে আমার কোন কথা হয়নি।

=হ্যাঁ আমি, কেমন আছেন?
-ভালো।
=তো হঠাৎ এদিকে আসলেন কি মনে করে?
-বসে বলবো?
= ওহ সরি হোয়াই নট?
-আসলে এখানে এমনিতেই ঘুরতে আসছি।
=ও আচ্ছা।
-আচ্ছা আপনার নামটা যেন কি?
=জনি।
-ও আচ্ছা। আচ্ছা আপনি কি সবসময়ই কম কথা বলেন?
=কই নাতো।
-আমার নাম জানতে চাইবেননা?
=ও হ্যাঁ বলুন।
-লাবনী, ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে পড়ি। মাইলস্টোন কলেজ।
=ও আচ্ছা। আজ আমায় উঠতে হবে।
-আচ্ছা আপনার নাম্বারটা দিনত।

নাম্বারটা দিয়ে বাচালটার হাত থেকে কোনমতে বাঁচলাম। বাসায় এসেও কিছু ভালো লাগছেনা পকেটে টাকা শেষ আমি জানিনা আমার কাল সকাল কিভাবে শুরু হবে।

মাথাটাও ব্যাথা করছে তাই না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছি। উঠলাম রাত নটায় ফোনের চিল্লানিতে আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। রিসিভ করলাম,

-হ্যালো কে?
=লাবনী।
-ও হ্যা বলুন।
=কি করছেন?
-এইত মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম।
=মানে? এই অসময়ে কেউ ঘুমায়?
-হুম, ঘুমালামতো।
=আসলে আপনার কি হয়েছে বলুনত।
-কিছুনা।
=বলবেননা সেটা বললেই পারেন। রাখছি।
-অধিকার খাটাচ্ছেন?
=হুম অধিকার খাটাচ্ছি।
-কেন?
=ভালো লাগছে তাই।
-ওকে কাল ছবির হাট আইসেন সব বলবো।
=সত্যি?
-হুম।
=এই আমার প্রেমে পড়ে যাননাইত আবার?
-মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন। অসভ্য কোথাকার।
=আররেহ মজা করলাম। এত চেতার কি আছে?
-না কিছু নাই।
=ওকে কাল এসে ফোন দিবো।
-ওকে।
=বাই, টাটা।

শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম নিজেকে কিভাবে হালকা করা যায়। কিন্তু কোনভাবে হালকা হতে পারছিনা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম লাবনিকে মনের দুঃখ গুলো বলে হালকা হবো। নাহ দুঃখ আর চিন্তা মাথায় নিয়ে বেশিক্ষন জেগে থাকা ঠিক না। তাতে দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কোন লাভ হয়না। তাই দুঃখের সময় দুঃখ ভোলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঘুমানো।

সকাল ১১টা।
আমি শাহবাগে হাটছিলাম। হঠাৎ লাবনীর নাম্বার থেকে ফোন এলো।

-এই কোথায় আপনি?
=এইত শাহবাগে। আপনি?
-ছবির হাটে আসেন।
=অদ্ভুতত, এই সময় কেন? আমার ক্লাস আছে।
-আমারো ক্লাস ছিলো কিন্তু এখান থেকে গিয়ে ক্লাস করা পসিবল না। তাই আজ আপনার ক্লাস থাকলেও মিস দিতে হবে কারন আমি মিস দিয়ে এখানে এসেছি।
=ওকে আসছি।
-ওকে।
**************************************************************************

-বলেন কি সমস্যা?
=কি বলবো?
-মন টন খারাপ কেন?
=আসলে তেমন কিছুই নয়। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
-স্বাভাবিক ব্যপারটাই শুনতে চাচ্ছি।
= ওকে বলছি। আমি একটা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে। আমার আব্বুই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন আমাদের ফ্যমিলিতে। কিন্তু আব্বু কয়েকদিন আগে মারা গেছেন। আমিই আমার বাবার একমাত্র ছেলে। দেশে যা ব্যবসা আছে তা আমি দেখতে হলে আমার পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি ব্যবসা না দেখি পড়াশুনার খরচ চালানো মোটামুটি ইম্পসিবল। এই মুহূর্তে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। আপনি ভাবতে পারেন কেন আমি আপনাকে কথাগুলো বলছি। আসলে আপনি আমার অপরিচিত। হয়ত আজি আমাদের শেষ দেখা তাই আপনার কাছে কথা গুলো হালকা হওয়ার চেষ্টা করছি। বন্ধুদের সাতে শেয়ার করিনা কারন তারা সিম্পেথি দেখাবে। যা আমি চাইনা।
-কি আর করবেন? পড়াশোনা করবেন।
=কিভাবে?
-টিউশনি করবেন?
=সিম্পেথি?
-হুম।
=ও, আসলে আমি টিউশনি খুজছি দেখি কি হয়।
– রাগ করলেন? আসলে আমি যদি এখন বলি আমি আপনাকে সিম্পেথি দেখাচ্ছিনা তাহলে আপনি বিশ্বাস করবেননা। আমি কি করছি সেটা আমার মাঝেই গোপন থাকুক।
=হুম।

৪দিন পর।
*************************************************

হঠাৎ লাবনীর কল।
-এই কোথায় আপনি?
=এইত ছবির হাট।
-ওকে।
=ওকে মানে?
-কিছুনা।

হ্যা আমার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে লাবনী। কলেজ ড্রেস পড়া উজ্জ্বল শ্যামলা মেয়েটি রোদের মধ্যে হেটে মুখটা লাল হয়ে আছে। কালো মেয়েদের এই এক সুবিদা মুখ লাল হলেও কেউ বুঝতে পারেনা। কিন্তু লাবনীর মুখ যে লাল হয়ে আছে তা এক পলক দেখলেই বুঝা যায়। অবশ্য এর জন্য বোধহয় ওর মুখের ঘামাচি গুলো দায়ি। যাই হোক, লাবনীর গায়ে কলেজ ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ দেখে বুঝতে বাকি রইলোনা আজও কলেজ ফাকি দিয়েছে।

-চলো।
=কোথায়?
-তোমাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসবো।
=শর্ত আছে।
-কোন শর্ত মানবোনা।
=আমিও যাবোনা।
-তাড়াতাড়ি বল।
=আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, আজ কলেজ শেষে আপনার সাথে কথা আছে।
-পারবোনা।
=যাবোনা।
-আমি গেলাম।
=এক কদম এগিয়ে দেখেননা।
-কি করবা?
=ঠেং ভেঙ্গে রেখে দিবো।
-চলনা প্লিজ।
=ওকে। চলেন।

রিকশায় করে ওর কলেজের সামনে গেলাম। রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে চাইলাম আর তখনি ঘটলো বিপত্তি।

-ফরমালিটি দেখাও? মানি ব্যাগ পকেটে রাখো।
=দেখাতে হয়।
-তাই?
=হুম।
-আচ্ছা গেলাম, দুপুরে দেখা হচ্ছে। চলে এসো।
=আপনি তুমি গড়মিল করে ফেলতেস।
-খুব বেশি সমস্যা?
=নাহ এখনো খারাপ লাগছেনা। ভবিষ্যত জানিনা।
– আসবাত? প্লিজ।
=ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারিনি।
-ওকে গেলাম।

ও চলে গেল আর আমি তাকিয়ে রইলাম কলেজ গেটে। নাহ পাগলিটাকে জানানো উচিত ছিলো আজ বিকেলে আমাকে হেটে আসতে হবে। আপাতত মানিব্যাগের অবস্থা যেই তাতে অন্তত সৌখিনতা মানায়না।

দুপুরে খেয়ে-দেয়ে হাটা শুরু করলাম লাবুর কলেজের দিকে। একটু আগেই রওনা দিলাম কারন সৌখিনতার একটা লিমিট আছে আর আমি সেটা খুব ভালো করেই জানি। তাই অন্তত এই বিষয়ে এই সময় লিমিট ক্রস করার চেষ্টা করলামনা। পকেটে যখন টাকা থাকে তখন হাটতে যতটা কষ্ট লাগে,যখন টাকার অভাবে খাওয়া-দাওয়া বন্দের উপক্রম হয় তখন বোধহয় হাটতে ততটা কষ্ট লাগেনা। আর এই অভাবের দিনে আর যাই হৌক অন্তত ফুটানি দেখানো চলেনা। হাটতে হাটতে লাবনীর কলেজের সামনে চলে এসেছি। ওর কলেজ ছুটি হয়ে গেছে গেইটের বাইরে আমার জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি যাওয়ার সাথে সাথেই কাছে এসে বললো চল।
-কোথায়?
=যেখান থেকে এসেছো সেখানে।
-আচ্ছা চলো।
=হেটেই যাবে নাকি? আমার খুব খিদা লাগছে হেটে যেতে পারবোনা।
-লাবনি আমার অবস্থা তুমি ভালো করেই জানো।
=জানিত, রিক্সা নাও।
-কিন্তু।
=যা বললাম তাই করো।
-হুকুম?
=হ্যা হুকুম।

দুজনে রিকশায় চড়ে বসলাম। রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। নিরবতা ভেঙ্গে লাবুই কথা বললো।
-খাওয়া-দাওয়া করেছ?
=হুম করেছি।
-আমি খাইনি।
=জানি। এখন করে নাও। ব্যাগেত আছেই খেয়ে নাও।
-তুমি কেমনে জান ব্যাগে আছে?
=বড়লোকের মেয়েদের ব্যাগে থাকাটাই স্বভাবিক।
-আপসুস…….. আমি বড়লোকের মেয়ে না। এই শোন, আন্টি কেমন আছে?
=ভালো।
-বাড়িতে কথা হয়েছে?
=আম্মুই ফোন দিয়েছিলো। টাকার কথা বলার সাহস পাইনি।
-আম্মু তোমাকে ফোন দেয়?
=এই যে ম্যাম আম্মুটা আমার। আপনার আন্টি। আর মোবাইল এন৭৩ হলেই যে এর ভেতর টাকায় ডিম পাড়বে এটা ভাবা ঠিকনা। মোবাইলে ব্যালেন্স ছিলোনা।
-কেন? আম্মুত আম্মুই। আমি আম্মুই বলবো।
=বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছেনা?
-করছি দেখেই হচ্ছে।
=করোনা তাহলেই হয়।
-সম্ভব না।
=যা খুশি কর। আমরা এসে গেছি।
-কিন্তু আমার যে খাওয়া শেষ হয়নি।
=ছবিরহাটে নেমে খাবে পিচ্ছিদের মত।
-শোননা রিকশায় আমরা কিছুক্ষন বসি।
=ওকে। বস।

****************************************************

লাবুর খাওয়া দাওয়া শেষে ওই রিকশা ভাড়া দিয়ে আমরা হাটছি। হাটতে হাটতে একটু সামনে গিয়েই গাছের ছায়ায় বসে পড়লাম। বসে আমিই নীরবতা ভেঙ্গে কথা বললাম।

-জ্বী ম্যাম বলেন।
=কি বলবো?
-যাহা বলিতে আসিয়াছেন।
=ও হ্যা। কাল থেকে সপ্তাহে তিনদিন আমার বাসায় যাবে তুমি।
-কেন?
=আমাকে পড়াতে।
=মানে? পাগল টাগল হয়ে গেছ নাকি?
-পুরাই, যাবে ব্যাস শেষ।
=আমি যাবোনা।
-মাইর খাবা। আমি ফেইল করলে তোমার খবর আছে, সামনে পরীক্ষা।
= কি পড়াতে হবে?
-তুমি কোন সাবজেক্টে ভাল?
=আমি সব সাবজেক্টেই কাঁচা।
-ওকে বাংলা পড়াবা।
=কখন যেতে হবে?
-সকালে যাবে পড়া শেষ করে আমাকে কলেজে নিয়ে আসবে।
=এটাও কি আমার ডিউটির মধ্যে পড়বে ?
-হুম।
=আচ্ছা যাবো।
-শোন।
=কি?
-খামটা রাখো।
=কি আছে এতে?
-অন্তত এই প্রশ্ন করোনা। রাতে খুলে দেখো।
=আচ্ছা।
-চল আমাকে দিয়ে আসবে।
=তুমি একাই যাওনা।
-এই কথা বলতে লজ্জা লাগেনা? আমি কি একা আসছি।
=আচ্ছা চলো।

রিকশা চলছে এগিয়ে আর রিক্সায় চড়ে আমরাও। ওর কয়েকটা চুল মুখের সামনে এসে পড়ে আছে খুব ইচ্ছে করছিলো এগুলোকে একটু সরিয়ে দিতে। কিন্তু আমি তা পারিনা শত হলেও আমি ভদ্র ছেলে। হঠাৎ নিরবতা ভেঙ্গে ওই কথা বললো।

-তোমাকে আর যেতে হবেনা। মহল্লা এসে গেছি পোলাপান খুব খারাপ।
=আচ্ছা ঠিক আছে আমি গেলাম।
-শোন, কাল চলে এসো কিন্তু আর আম্মুকে জানিয়ে দিও তুমি টিউশনি পাইছ।
=আচ্ছা জানাবো।
– রাতে ফোন খোলা রেখ।
=আচ্ছা।
-আচ্ছা যাও।
=শোন।
-কিছু বলবে?
=চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে নাও। এর সৌন্দর্য অন্যকেউ না দেখলেই আমার ভালোলাগবে।
-আচ্ছা।

চলে আসছি আর ভাবছি আম্মুকে একটা ফোন দিয়ে জানাতে হবে একটা টিউশনি পেয়েছি। না টিউশনি নয় সিম্পেথি। মাঝে মাঝে অভাবের তাড়নায় মানুষ সিম্পেথকেই আকড়ে ধরে। হায়রে মানুষ। ভাবতে ভাবতে কেন জানি হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকালাম। হ্যা লাবু রিক্সার পিছন দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কপালে ওর চুল গুলো নেই………………………………………..

রাত ১১টা, হলের পোলাপানের জন্য রাত এগারটা সন্ধ্যা হলেও আমার মত চকলেট বয়ের জন্য ইহা অবশ্যই সেহরি খাওয়ার সময়ের চেয়ে সামান্য কিছু কম নয়। আজকাল হলের পোলাপান গুলা যা ফাজিল হয়েছেনা একটাও রাত ২টার আগে ঘুমাবেনা। কিন্তু আমার হৃদয়ে ধিরিম ধিরিম করে যেই ড্রাম বাজছে মনে হয় আর কিছুক্ষন গেলেই অক্কা পাবো। তার উপর কাল লাবুর বাসায় যেতে হবে সকালে। আর যাই হৌক সিম্পেথি কুড়ানোতে আলসেমি করলে চলেনা। যাইহোক, আমার রুমম্যাট গুলা তাস খেলতে অন্য রুমে গেছে এই সুযোগে আমি দরজা আটকিয়ে বালিসের নিচে রাখা লাবুর দেয়া খামটা খুললাম। ইয়াল্লা খামের ভিতর একহাজার টাকার নোট দুইটা সাথে একটা সাদা কাগজ। সাদা কাগজ বললে ভূল হবে কাগজের ৫০% কালো কালির লেখা দখল করে নিয়েছে।

জনি,
তোমাকে তুমি বলে সম্মোদন করলাম। হয়ত আমার সে অধিকার নেই তারপরো করলাম। আসলে অধিকার কেউ কাউকে দেয়না এটা করে নিতে হয়। জনি খুব সোজা করে বললে এই চিঠি লেখার উদ্দেশ্য হলো তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই যে আমি তোমার সাথে যে আচরন করি তা মন থেকেই করি। আমি কোনরুপ সিম্পেথি দেখাচ্ছিনা। আমি তোমাকে আমার টিউটর হিসেবে রাখছি নিজ স্বার্থেই। জানিনা সেদিন ছবির হাটে তোমার চোখে কি দেখেছিলাম আমি। কিন্তু তোমার উপর কত স্পিডে ক্রাশ খাইছি আমি নিশ্চিত তা রিখটার স্কেলেও মেপে বের করা যাবেনা। এখন আমি যদি বলি আমি তোমাকে ভালোবাসি তাহলে তুমি হয়ত এক সপ্তদশি বালিকার আবেগ হিসেবেই ধরে নিবে তাই তোমায় আমি সে কথা বলছিনা। তবে মনে রেখো তোমাকে আমার ভালো লাগে। এই সপ্তাদশি কন্যাই একদিন তোমার মনের রাজ্য শাসন করবে। যাক এসব ফাও কথা, কাল যখন আমার বাসায় আসবে আমার জন্য দুটো ঘাস ফুল এনো। কি পারবেনা?

ইতি,
সপ্তাদশি কন্যা।

চিঠিটা পড়ে আমার মাথা পুরাই হ্যাং হয়ে আছে। আসলে এটা এত তাড়াতাড়ি হজম করার ক্ষমতা আমার নাই তাই আপাতত চিঠিখানা স্থান পেলো আমার ট্রাংকে। আর কাল সকালে যে আমাকে সিম্পেথি কুড়াতে যেতে হবে সে কথা মাথায় রেখেই আপাতত মোবাইল খানা বন্ধ করে একটা ঘুম দিলাম।

সকাল ৬টা, হলের পোলাপানের জন্য এটা মাঝরাত হলেও জীবনের প্রয়োজনে আমাকে বিছানা ছাড়তে হলো। উঠেই মোবাইল খুললাম। সাথে সাথে লাবনীর কল।

-ঐ কুত্তা সারারাত মোবাইল বন্ধ রাখছত কেন?
=হোয়াট?
-মোবাইল বন্ধ রাখছত কেন?
=আরে সকালে তোমার বাসায় যেতে হবে তাই ভেবেইত……………
-আমি সারারাত তোরে কল দিছি।
=ওহ সরি।
-সরি বলে কাজ নাই। আমার কিটক্যাট না আনলে বাসায় বাইন্দা রাখুম।
=ওকে।

ভাবনায় পড়ে গেলাম। মোটামুটি ওর ব্যবহারে আমি স্তম্ভিত। নাহ একে আমি পড়াবোনা। এত সাক্ষাত দজ্জাল মাইয়া। যাভাবেই হউক টাকাটা ওকে পৌছাতে হবে তারপর ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাচি কইয়া পালামু। গরিব হতে পারি ফকিরত নয় শরীরে আছে রক্ত আছে ব্লাড ব্যাংক। আছে কিডনি আছে হসপিটাল। চলার টাকার অভাব হবেনা।

****************************************************************

সকাল ৮টা।

লাবনি কটেজ।
আমার সামনে বসে আছে সপ্তাদশি কন্যা। পিঙ্ক কালারের ফ্রগ পড়া মেয়েটার দিকে তাকানোর রুচি আমার নেই। দুজনেই নীরব। ভেবেছিলাম নীরবতা হয়ত আমিই ভাংবো কিন্তু না সেই ভাংলো।

-আমার চকলেট?
=এই নাও।
-যাও তোমার সকল অপরাধ মাপ করে দিলাম। ও হ্যা এখন কিছু ফরমালিটি আছে দাদু আসবে তোমার সাথে কথা বলবে।
-পাঠাও।

রফিক সাহেব আমার সামনের চেয়ারটায় বসে আছে। লাবু তার পেছনেই। রফিক সাহেব লাবুকে চা বানিয়ে আনার কথা বলে পাঠিয়ে দিলেন।

-তুমি লাবনীকে পড়াবে?
=এখনো ঠিক ডিসিশন নেইনি।
-ও আচ্ছা। আমি তোমাকে কিছু কথা বলি যা তোমাকে ডিসিশন নিতে হেল্প করবে।
=জ্বী বলুন।

লাবনীর বাবা মা আলাদা থাকে। ওর বয়স যখন ৭ বছর তখন থেকেই সে আমার কাছে। ওর বাবা মা কারোই মেয়েটাকে দেয়ার মত সময় নেই। ওর মা কেনাডায় আর বাবা ফিনল্যন্ডে থাকে। যখন থেকে ওর বাবা মা আলাদা হয়ে গেছে তখন থেকেই মেয়েটার ভিতর একটা চাপা ক্ষোভ কাজ করছে হয়ত। তাইত মাঝে মাঝে সে অ্যাবনরমাল আচরন করে সেটা অবশ্য ৫মিনিটের বেশি সময়ের জন্য নয়। যা তা বলে ফেলে সবাইকে। ওকে আমি ডাক্তার দেখাতে পারি কিন্তু দেখাইনা কারন ওকে অসুস্থ ভাবতেই আমার খারাপ লাগে। তো, আমার কথা এখানেই শেষ এবার তুমি ডিসিশন নাও।

=আচ্ছা ঠিক আছে।

লাবনী চা নিয়ে আসলো আর রফিক সাহেব ছলছল চোখ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

-টাকাটা দিবেনা?
=কোনটা?
-যেটা আমায় আর পড়াবেনা বলে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছ?
=নাহ, আমি তোমাকে পড়াবো।
-মাপ করে দাওনা প্লিজ।
=হেই পিচ্ছি এসব কি হচ্ছে?
-বল মাফ করেছ।
=এটাত তোমার ভুল নয় সমস্যা অন্য জাগায়।
-আচ্ছা তুমি চা খাও আমি রেডি হয়ে আসছি কলেজে যাবো।
=আচ্ছা।

রিকশা চলছে এগিয়ে। বুড়া রিক্সা ওয়ালাটা আস্তে আস্তে চালাচ্ছে। আর চারপাশে বহু আওয়াজের মধ্যেও সব কিছুকে কেমন নীরব মনে হলো। নিরবতা ভাংলো লাবুই,

-এই ছেলে আমার ঘাস ফুল কই?
=মনে ছিলোনা।
-স্বাভাবিক, যা ঝাড়ি খাইছ সকাল সকাল।
=বিনিময়ে আমি ছুড়ে দিলাম আমার মুখের হাসি।
-জনি গ্রামের বাড়ি যাবে কবে?
=জানিনা।
-আমাকে নিয়ে যাবে তোমার সাথে?
=কি বল তুমি যাবে?
-ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমার আম্মু কখনো আমাকে মুখে তুলে খায়িয়ে দেয়নি।
=আচ্ছা নিয়ে যাবো।
-এই কলেজ এসে গেছি।
=ও হ্যা যাও।
-রাতে ফোন খোলা রেখো।
=আচ্ছা।
-আম্মুকে আমার সালাম দিও।
=ওকে তুমি যাও।
-বাই……………………..

ফুটফাতে হাটছি আর ভাবছি, আসলে লাবুর কিসের অভাব।আমি বুঝেছি আসলে ওর কিসের অভাব। নাহ আমি একে ছেড়ে যেতে পারিনা। সে সাহস আমার নেই………………………………..

***************************************************************************
আজ ১৩ই ফেব্রুয়ারি। আমার আর লাবুর প্রথম দেখা হওয়ার তারিখটা ঠিক মনে নেই। তবে অফিসিয়ালি ছবিরহাটে যেদিন পরিচয় হয়েছিল সেই দিনটা খুব ভালো ভাবেই মনে আছে। আজ থেকে এক মাস ৭দিন পূর্বে। ৬ই জানুয়ারি, লাবুর ইচ্ছে ছিলো এই মাসের দিনটিতে আমায় নিয়ে ঘুরবে কিন্তু আমার বাধায় সেই ইচ্ছা পুরন হয়নি। তাই ওর ইচ্ছা আগামিকাল যেন ওকে আম্মুর কাছে নিয়ে যাই। আমি বলেছি সেটা সম্ভব নয়। আর সে বলেছে সে এটা সম্ভব করেই ছাড়বে।

আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি। আজ নাকি ভ্যালেন্টাইন না কি দিবস? কলেজ লাইফে খুব হই হুল্লোড় করে পালন করতাম দিনটা। সকাল বেলাই হলের একটা ছেলে জানিয়ে গেলো আমার গেস্ট ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছে। ধুর কচু এই সকাল বেলা গেস্ট তাও আবার আমার এত্ত সকালে। গেস্ট গুলারো আজকাল কমনসেন্স যেন কোনদিকে উড়ে গেছে। যাই হোক বিরক্তিকর মুখ নিয়ে রুম থেকে আসলাম। এসে ত আমি যা দেখলাম তা দেখার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলামনা। লাবনি একটা গোলাপি শাড়ি পড়ে এসেছে।

-তুমিত এতক্ষন ঘুমাওনা আজ এত ঘুমাচ্ছ যে?
=তুমি এত সকাল বেলা এখানে কেন?
-একটা প্রশ্নের উত্তর যে কিভাবে আরেকটা প্রশ্ন হয় আমার মাথায় আসেনা।
=তোমার মাথায় আসা লাগবেনা। বল কেন আসছ?
-যাও ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে আস।
=পারবোনা।
-জনি, আমি কিন্তু মাঝে মাঝে অ্যাবনরমাল হয়ে যাই কোন কারন ছাড়াই।
=ওকে যাচ্ছি।
-হুম যাও।
=তুমি কি এতক্ষন এখানে থাকবে নাকি?
-না। আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি।
=গাড়ি?
-হ্যা দাদুর গাড়ি নিয়ে এসেছি।
=ওকে।

সকাল সাড়ে আটটা…………..
কিছুই বুঝতেসিনা। আমার মন বলছে পাগলিটা আজ আমার বাড়ি যাবেই। তাই আম্মুকে ফোন দিলাম।

-আম্মু আজ বাড়ি আসবো।
=তাই? কখন আসবি?
-এখন আসব।
=আচ্ছা আয়।
-আম্মু।
=কি?
-ইয়ে মানে আমার সাথে একজন মেহমান আসবে।
=আচ্ছা নিয়ে আয়।
-আম্মু, মেহমানটা কে জিজ্ঞেস করলেনা?
=ও হ্যাঁ কে রে?
-লাবনি, আমার ছাত্রী। তোমাকেত আগেই সব বলেছি।
=আচ্ছা নিয়ে আয়। ও কি আমার হাতের রান্না খেতে পারবে?
-খেতে না পারলে খাবেনা। আমি কি আনতে চাইছি নাকি? আসে কেনো?
=আচ্ছা আমি তোর আপুকে খবর দিতেসি। তোরা তাড়াতাড়ি আয়।

যাক বাবা আম্মুকে এত সহজে মানাতে পেরেছি আমার আব্বু সহ চোদ্দ পুরুষের কপালে ভাগ্য। রেডি হয়ে বের হয়ে আসলাম হল থেকে। এসে দেখি লাবু দাঁড়িয়ে আছে।

-আসেন। আসেন। । মহিলাদের সাজতেওত এতক্ষন লাগেনা।
=সরি।
-আচ্ছা গাড়িতে ওঠ।
=ওকে।
-আমরা কোথায় যাচ্ছি?
=ধানমন্ডি।
-কেন?
=এত কথা বলতেস কেন?
-আচ্ছা ঠিক আছে।

ধানমন্ডি নন্দন মেগা শপের সামনে দাড়িয়ে আছে গাড়ি। লাবু কি যেন ব্যারেল বক্কর কিনবে। আমাকে যেতে বলেছে আমি যাইনি। আধ ঘন্টা পর কি যেন হাবি যাবি কিনে গাড়িতে উঠালো।

-কি কিনেছ এগুলা?
=এইত হাল্কা কিছু খরচপাতি।
-দেখি আইটেম কি কি?
=গরুর মাংস,চিংড়ি, এইগুলা।
-কেন বাড়িতে পার্টি আছে বুঝি?
=নাহ তোমাদের বাড়ির জন্য।
-কি?
=হ্যা।
-দেখ লাবনি আমি গরিব হতে পারি ফকিরনা। আর আমি আমার ফ্যামিলি থেকে টাকা আনিনা তাই আমার এই বেশ। আমি তোমার আচরনে খুব কষ্ট পেলাম। ড্রাইবারকে গাড়ি থামাতে বল আমি নেমে যাবো।
= আরেহ আমিত দুষ্টামি করলাম এগুলুত বাসার জন্য।

লাবুর চোখ বলে দিচ্ছে সে মিথ্যা কথা বলছে। আমি কিছু বললামনা। লাবুর বাসায় গিয়ে এগুলো রেখে আমরা চললাম আমার বাড়িতে।

-আচ্ছা আম্মুকে জানিয়েছ আমি যে আসছি?
=নাহ।
-আম্মু কিছু মনে করবেনা?
=আম্মুরা কিছু মনে করেনা।
-আচ্ছা আমাকে কিভাবে পরিচয় করিয়ে দিবে?
=কিভাবে আবার তুমি আমার ছাত্রী।
-ও আচ্ছা।

দাউদকান্দি আসতে বেশি সময় লাগলোনা। বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। পুরা বাড়ির মানুষ গাড়ির সামনে হাজির। আমি এই জিনিসটাকেই ভয় পাচ্ছিলাম। আমি নেমে লাবনিকে নিয়ে সোজা ঘরে চলে গেলাম। বাড়ির গেইট লক করে দিলাম যাতে কেউ উকিঝুকি মারতে না পারে। এই জিনিসটা আমার বিরক্ত লাগে। আম্মু আসলো, লাবু আম্মুকে দেখে পা ধরে সালাম করতে যাচ্ছিলো। আম্মু ওকে জড়িয়ে ধরে বললো বেচে থাক মা বেচে থাক। এই কথা বলে আম্মু রান্না ঘরে গেলো। আপু আসলো।

-কিরে তুই নাকি আজকাল বড় হয়ে গেছিস?
=হলে ক্ষতি কি?
-তা উনি কে?
=আমার লাবন্য।
-তোর লাবন্য?
=(লাবু) কেন আমি কি ওর যোগ্য না?
-এমা আমি কি সে কথাই বললাম নাকি? ওইত তোমার যোগ্য না।
=এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাকনামি হচ্ছে? যাও এই পেইনটাকে নিয়ে এখান থেকে যাওনা আপ্পি।
-কি? আমি পেইন?
=আমি ওর দিকে তাকিয়ে আমার মুখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝালাম যাতে চুপ থাকে।

আপু ওকে নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। পরিচয় পর্বটা একদম বাজে হইছে কি বলতে কি বলে ফেললাম। দ্যাত নিজেই নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছি। কিছুক্ষনের মধ্যেই আম্মু খাওয়া দাওয়া রেডি করে নিয়ে আসলো। খাওয়ার ম্যেনু দেখেত আমি অবাক। সব বড় লোকের খাবার। যাক সবাই খেতে বসলাম।

আপু- এই যে মশাই আপনাকে কি হাত ধুয়িয়ে দিতে হবে?
আমি- জ্বিনা আপনি হাত না ধোয়ালেও হবে।
আম্মু- তোরা থামবি। লাবনিকে খাওয়া দে।
লাবু- আম্মু আমিত এটা আশা করিনি। আমি আপনার হাতে খাবো।

আমি পুরাই থান্ডারড ওর এমন কথায়। আম্মুও হয়ত অবাক হয়েছে। কিন্তু সামলে নিয়ে আম্মু বললো ঠিক আছে মা আমি তোমাকে খায়িয়ে দিচ্ছি। এই একটা কথায় আম্মু যেন ইম্প্রেসড। আমি তাকিয়ে আছি লাবুর দিকে। লাবু খাচ্ছে আর কাঁদছে। হয়ত আপু বুঝবেনা ও কেন কাদছে কিন্তু আমিত জানি ও কেন কাঁদছে। এটাই যে ওর জীবনের একমাত্র অভাব।

খাওয়া দাওয়ার পর ও আপুর সাথে কোথা থেকে যেন ঘুরে এলো। অনেক গুলো ছবিও উঠিয়েছে ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে……………………

বিকাল পাঁচটা, আমরা ছবির হাটে হাটছি।

-জনি আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইলে দিবে?
=কি চাও বলনা।
-আম্মুকে। দিবে?
=সব কিছুই তোমার কাছে।
-আমি চাইলে দিবে?
=আপত্তি নেই…………

আমরা পাশা পাশি হাটছি। মাঝেই আমাদের অবাধ্য আঙ্গুল গুলি পরস্পরের আঙ্গুল গুলোকে স্পর্শ করছে। কোন দিক থেকে যেন একটা গান ভেসে আসছে ……..

এই পথ যদি না শেষ হয়,
তবে কেমন হবে তুমি বলত………….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *