ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কঃ মানবিক সম্পর্কের উন্নততর রূপ আজ বাণিজ্যের বিষে নীল

হ্যামলক পান করে বিষাক্ত হয়েছিলেন গ্রীক দার্শনিক শিক্ষাগুরু সক্রেটিস। জীবন দিয়ে কুসংস্কারের বিষবাস্প থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন গোটা মানবসভ্যতাকে। শিক্ষাগুরুর ধারাবাহিকতায় প্লেটো-এরিস্টটল জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আরো বিকশিত করেছেন। গ্রীস দেশে পীথাগোরিয়ান ছাত্র- শিক্ষকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে গণিত-দর্শন শাস্ত্রকে যেমন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন একইভাবে ভাববাদী চিন্তাকে পরাস্ত করেছেন।


হ্যামলক পান করে বিষাক্ত হয়েছিলেন গ্রীক দার্শনিক শিক্ষাগুরু সক্রেটিস। জীবন দিয়ে কুসংস্কারের বিষবাস্প থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন গোটা মানবসভ্যতাকে। শিক্ষাগুরুর ধারাবাহিকতায় প্লেটো-এরিস্টটল জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আরো বিকশিত করেছেন। গ্রীস দেশে পীথাগোরিয়ান ছাত্র- শিক্ষকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে গণিত-দর্শন শাস্ত্রকে যেমন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন একইভাবে ভাববাদী চিন্তাকে পরাস্ত করেছেন।

পরাধীন ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বাঙ্গালীকে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক শিক্ষক স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন সাহিত্য ও বিজ্ঞানুরাগী, দেশপ্রেমিক ছাত্র বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাথ সাহা এবং আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।

“অধ্যাপনা বলতে বিদ্যা বিক্রয় বোঝায় না বিদ্যাদানের কাজকে বলে অধ্যাপনা। বিদ্যাদান করলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, তা আরও বেড়ে যায়”-এই চেতনা ধারন করে একদিন আচার্য রায় প্রেসিডেন্সী কলেজকে সাধনপীঠের মর্যাদা দিয়েছিলেন।

যে দেশ ছাত্র-শিক্ষকের রক্তস্নাত লড়াই বাংলা ভাষা-স্বাধীন বাংলা এনে দিয়েছে, সে দেশ আজ ছাত্র- শিক্ষককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়া হয়েছে কার স্বার্থে? আমাদের শিক্ষকই ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী যিনি বৃটিশদের শিক্ষা সংকোচনের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন। পরাধীন ভারতবর্ষে সূর্যসেন, প্রীতিলতাসহ অজস্র শিক্ষকরা ছাত্রদের স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, পাকিস্তান বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন কালে ছাত্রদের
চেতনাকে শাণিত করার দায়ে আইয়ুবের গুণ্ডাবাহিনী এন.এস.এফ এর আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবু মাহমুদ। মর্যাদা নিয়ে কিভাবে বাঁচতে হয় তা আমরা শিখেছি আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে। কিন্তু শাসকশ্রেণী আজ এই ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্ককে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সংকট মোকাবেলায় সরকারের কাছ থেকে বর্ধিত বরাদ্দ আদায়ের পরিবর্তে বরাবরই ছাত্রদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। নাইট কোর্স চালুর প্রয়োজনও একই কারণে। এ সংক্রান্ত কাজে শিক্ষকরাও ব্যবহৃত হচ্ছেন।

ছাত্র- শিক্ষক মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিগত দশক ধরে বহুবার ছাত্র বেতন-ফি বৃদ্ধি ও নাইট কোর্স চালু করা হলেও শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। বরং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে মারাত্মকভাবে। মাছে- ভাতে বাঙ্গালির দেশে যে স্কুল শিক্ষক দেড় বছর পর একটুকরা ইলিশ মাছ খায় সেই শিক্ষকের জীবন যন্ত্রণায় ছাত্ররা চোখের জল ফেললেও এই রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী তাদের ন্যায্য আন্দোলন দমনের জন্য বারবার বৃষ্টির মতো লাঠিচার্জ করেছে। এমন ঘটনা আমরা বহুবার পত্রিকার পাতায় দেখেছি।

একটা জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। শাসকশ্রেণী সবসময় এই যুক্তি করে সবচেয়ে কম খরচে পড়ে এখানকার ছাত্ররা (!), অথচ তারা ভেবে দেখেনা সবচেয়ে কম মজুরি পায় এদেশের শ্রমিক, ফসলের দাম সবচেয়ে কম পায় এদেশের কৃষক আর সবচেয়ে কম বেতন পায় এদেশের শিক্ষক। রাষ্ট্র সামরিক-বেসামরিক আমলা ও সেনাবাহিনীর পেছনে লক্ষ- কোটি টাকা খরচ করতে পারলেও শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ যত্সামান্য। একটা জাতির শিক্ষকদেরকে এই অবস্থায় রেখে জাতি কখনও সামনে এগোতে পারেনা। তাই আমরা সবসময়ই শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদার দাবি করে এসেছি। কিন্তু সে দাবি ছিল সবসময়ই উপেক্ষিত। কিন্তু আজ শিক্ষকদের এই দূরাবস্থার সুযোগ
নিয়ে নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে উপরি আয়ের সুযোগের কথা বলে শিক্ষকদের বাণিজ্যিকীকরণের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনরত সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের উপর শিক্ষক নামধারী ক্যাডারদের হামলা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আর এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখে কাপড় বেধে ৩জন সহকারী প্রক্টরসহ ৪জন শিক্ষক কি ভূমিকায় নেমেছেন তা পত্রিকায় এসেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের প্রত্যাশা থাকে এদেশের শিক্ষকদের। আজ শিক্ষকদের যে একাংশ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পক্ষে যুক্তি করছেন তাঁদের অতীতটা কেমন ছিল? তাঁদের বেশিরভাগই তো এদেশের মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। জনগণের রক্তে-ঘামে- শ্রমে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়েই তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে যারা নীতি নির্ধারণী জায়গায় এসেছেন তারাই যখন আজ সেই সুবিধা সংকোচনের পক্ষে এমনভাবে যুক্তি করেন যা রবীন্দ্রনাথের সেই কথাকে মনে করিয়ে দেয়,

“ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে,
ধ্বনির কাছে ঋণি সে যে পাছে ধরা পড়ে”।

Occupy Wall Street Movement এ এক মার্কিন তরুন “Why is there always money for war but not for Education?”-প্লাকার্ড লিখে যেমন মিছিলে শামিল হয়েছিল তেমনি দেশের উচ্চশিক্ষাকে জনগণের দুয়ারে পৌছে দেবার জন্য, শিক্ষকদের যাপিত জীবন উন্নত ও মর্যাদাকর করার জন্য ছাত্র-শিক্ষকের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প কখনোই বাণিজ্যিক কোর্স চালু
বা ফি বৃদ্ধি হতে পারে না। ছাত্র শিক্ষকের সম্মিলিত লড়াইয়ের মাধ্যমেই তা কেবল আদায় করা সম্ভব।

একদিন ড. জ্জোহা যেভাবে ছাত্রস্বার্থের
পক্ষে জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হয়ে বুকে বুলেট শুষে নিয়েছিলেন
তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান
আন্দোলনেও শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে ক’জন শিক্ষক ছাত্রদের পাশে দাড়িঁয়েছিলেন সেই সকল ড. জ্জোহার উত্তরসূরীদের নানাভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। তাঁদের বিরুদ্ধে একদল শিক্ষক নির্লজ্জভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছে। এই কি আমাদের শিক্ষকসমাজের চরিত্র?

১ thought on “ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কঃ মানবিক সম্পর্কের উন্নততর রূপ আজ বাণিজ্যের বিষে নীল

  1. তাঁদের বিরুদ্ধে একদল শিক্ষক

    তাঁদের বিরুদ্ধে একদল শিক্ষক নির্লজ্জভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছে। এই কি আমাদের শিক্ষকসমাজের চরিত্র?

    জ্বি, বর্তমানের দলবাজ ও দালাল শিক্ষকদের চরিত্র এরকমই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *