‘…তখন যদি বিরোধী দলের কপাল খোলে’

টপাটপ বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটলো। একটার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটা এসে হাজির হল। কোন ঘটনাই খুব বড় সড় গোছের কিছু না। তারপরও খবরের আকালের এই বাজারে এসব ছোট খাট ঘটনাও চায়ের আড্ডার উপাদান হয়ে উঠলো। প্রায় একেবারে নিস্তরঙ্গ হয়ে যাওয়া জীবনে কিছুটা কিছুটা স্পন্দন আনলো। বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে খবর আসা বেশ অনেকদিনই হল বন্ধ আছে। যা আসছে সেখানে কোন নতুনত্ব নেই—সেই পুরনো কিসসা, ধরপাকড় আর জামিন আর নয়তো কমিটি পুনর্গঠন। আর কখনও ‘আন্দোলন করব’— জাতীয় হুমকি দেয়ার চেষ্টা–এই সার। দেশি চ্যালা চামুণ্ডারা যখন খুব বেশী কিছু করতে পারেন না, তখন উদয় হন বিদেশে অবস্থানকারী রাজপুত্ররা। মাঝে মাঝে তথ্য দেন, ইতিহাস শোনান। গ্রীষ্ম কাল আসি আসি করছে, ফলে এই দাবদাহে হরতাল, মিছিল করতে লোক পাওয়া যাবে না, একথা বিরোধী দলও জানে। ফলে সেধরনের খবর আপাততঃ পাওয়া যাবে না। তাহলে উপায়? বলছি।

‘লাখো কণ্ঠে…’ নিয়ে কয়েকদিন বাজার বেশ গরম থাকলো। মুক্তিযুদ্ধ, চেতনা—এসব ব্যাপারকে আবার আলোচনায় আনার চেষ্টা হল। খুব একটা কাজে দিল না। ঘটনাটা একটা ইভেন্ট হিসেবেই থেকে গেল। আর সেই এভেন্টের পক্ষ, বিপক্ষ থেকে শুরু করে নব্বই কোটির হিসাব—হেন আলোচনা নাই যা হল না। কিছুদিন আলোচনা শেষে যখন সবাই বেশ নেতিয়ে গেছেন এমন সময় অবশেষে ইভেন্টটা হল। আলাপ আলোচনাও মোটামুটি শেষ হল। পায়ের নীচে পদদলিত জাতীয় পতাকার ছবি সম্বলিত পোস্ট আর কলামে ভরে উঠলো কয়েক দিন। এই ইভেন্টের উদ্দেশ্য নিয়েও চলল চেঁচামেচি। কিছু আলোচনা হল, কি কারণে এই আয়োজন। এরপর শুরু হয়ে গেল এর সাফল্য নিয়ে আলোচনা। আগের বার গিনেস বুক দুই দিনের মাথায়ই জানিয়ে দিয়েছিল ফলাফল। এবার এখনও জানায়নি। ঘটনা কি? কেউ খোলাসা করছে না। ফলে এই বিষয়টাও আলাপ আলোচনায় নতুন খোরাকের যোগান দিল। এবং যথারীতি অলস সময় কাটতে লাগল।

হঠাৎ করে প্রথম প্রেসিডেন্ট বিতর্ক গজাল। কেন, কি উদ্দেশ্য কাজটা করা হল, ঠিক বোঝা গেল না। কাজটা সুচিন্তিত না হঠকারী সে ব্যাপারটাও খুব পরিস্কার হচ্ছে না। একদল চেষ্টা করছে বিতর্কটাকে টানতে। প্রশ্ন উঠানো হচ্ছে, ২৭ থেকে শুরু করে ১৭ই এপ্রিল প্রেসিডেন্ট তবে কে ছিল। আবার শোনা যাচ্ছে হাইকমান্ড নাকি বলে দিয়েছে এ নিয়ে মুখ না খুলতে। ফলে বিতর্ক ডালপালা ছড়াবে না এখানেই সমাপ্তি বোঝা যাচ্ছে না। তবে ব্র্যান্ড হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ আর কাজে দিচ্ছে না। নেতৃত্ব দানকারী দল, ঘোষকের দল, এসব বলে ভোট টানা ইদানীং কষ্টকর হয়ে গেছে। ফলে সেই পুরনো, ব্যলট বাক্স ছিনতাই ফর্মুলাতে ফেরত যাওয়া হয়েছে। একজন কমিশনারও ‘নাকে খত’ এর কথা মনে করিয়ে নিজের নিরপেক্ষতার পরিচয় দিলেন। সব মিলিয়ে আলোচনার বিষয় হিসেবে টপিকটা খারাপ না। আড্ডার জন্য তো অবশ্যই মোক্ষম টপিক।

একই সময়ে যোগ হল মুসা ইব্রাহিম। খুব আকর্ষণীয় না হলেও চলল কিছুদিন ঘ্যান ঘ্যান প্যান প্যান। সে উঠেছে? না ওঠেনি? ব্লগ, ফেসবুকে তাঁর পক্ষের লোকও যেমন আছেন, বিপক্ষের লোকেরও তেমন অভাব নেই। ফলে দ্রুতই খেলা জমে উঠলো। কোথায় কোন নথিতে নাম থাকা উচিৎ, কে তাঁকে সার্টিফিকেট দিয়েছে, কে তাঁর সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছে—কাহিনী এগিয়ে চলল। সেখানে রাজনিতিও এসে বাসা বাঁধল। ফলে দলীয় বাহিনীরা ঝাপিয়ে পড়ল। খুব জমজমাট না হলেও আলাপ শুরু হয়ে গেল। চায়ের চুমুকের সঙ্গে যোগ হল, ‘সত্যি কি উঠেছিল? কাকে বিশ্বাস করবো?’

লীগের নিজেদের ভেতর মারামারি আজকার আর খবর না। টেন্ডার ছিনতাই তো একেবারেই জমে না। লাশ পড়লে একটু চোখ ছোঁয়ায় অনেকে। তাই পিটুনিতে মৃত্যুর খবর, টপিক হিসেবে খুব একটা খারাপ না। যদিও নিদারুণ মৃত্যু, তারপরও খবরটা কেমন যেন ধামাচাপা পড়ে গেল। ‘লীগ তো প্রায়ই এমন করে, এ আর নতুন কি খবর’—মার্কেট পেল না। ফলে দুইএকদিন পত্রিকায় ছবি সহ আসলো বটে তবে তা আলোচনার মধ্যমণি হল না। দুএকটি গরম গরম স্ট্যাটাস পড়ল। ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি হল—‘কত মহান দল ছিল এই ছাত্রলীগ’। ব্যাস—এতেই ক্ষান্ত। বিরোধী দলের কেউ কেউ চেষ্টা করছেন, ব্যাপারটাকে একটু আলোচনায় রাখতে। তবে যারা এব্যাপারে উৎসাহী—তাঁদের নিজেদের ইতিহাস যেহেতু খুব পরিচ্ছন্ন না—ফলে তাঁরা আলোচনায় খুব আগ্রাসী ভুমিকা নিতে পারছেন না। তারপরও—আলোচনা চলতে পারে। ‘কি হাল এদেশের ছাত্র রাজনীতির!’

এখন বাজার মাতাচ্ছে গণজাগরণ। এবার একটু অন্যভাবে। এবার আর চেতনা জাগাতে আসেনি, শিরোনামে এসেছে নিজেদের মাঝে কামড়া কামড়ি করতে যেয়ে। পুলিশ কিছু আদর যত্ন করেছে। আর সেই আদরের ছবি নিয়ে নিউজ হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে মার খাওয়ায় এক পক্ষ দারুণ খুশী। সেই পক্ষে কিন্তু কেবল হেফাজত কিংবা বিএনপি জামাত নেই। আছেন ভাগ বাটোয়ারায় ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষও। খেলা বেশ জমে উঠেছে। রাজনৈতিক দল খুলবে খুলবে ভাব। তাঁর জন্যই এই নাটক না পেছনে সত্যিই কোন নৈতিক অবস্থান আছে, বোঝা যাচ্ছে না। তবে গণজাগরণ যেভাবে এর আগে বিক্রি হয়ছে তাতে তাঁদের ওপর আবার ভরসা রাখা লোকের সংখ্যা খুব বেশী হবে এমনটা অনেকেই মনে করছেন না। ফেসবুক আর ব্লগে এই আলোচনাটা বেশ জায়গা করে নিয়েছে। কারণ গণজাগরণ তাঁর সুখের সময়ে যাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়েছিল সেই ধাক্কা খাওয়া পক্ষ এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিলেন। ব্লগে এবার তাঁদের সুযোগ হাতের সুখ মিটিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার।

সবগুলো খবরেরই রয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ। সময়টা খারাপ কাটছে না। বিশেষ করে অলস সময় গুলো। কাটাবার জন্য যদিও সবগুলোই বেশ চটকদার তথ্য। সবগুলো নিয়েই যথারীতি বাজারে গরম গরম আলাপ আলোচনা হল। তারপরও সবগুলোই দ্বিতীয় শ্রেণীর খবর। সবাই অপেক্ষা করে আছে ভারতের নির্বাচনের জন্য। আসল খবর আসবে সেখান থেকে। নির্বাচনের পরে কংগ্রেস যদি ক্ষমতায় না আসে, তখন হয়তো বিএনপির কপালে শিকে ছিঁড়বে। কংগ্রেস যেভাবে আওয়ামীদের কোলে করে রেখেছে বিজেপি হয়তো সেভাবে রাখতে চাইবে না। কিংবা মার্কিন চাপ সহ্য করে যেভাবে কংগ্রেস আওয়ামীদের পক্ষে থেকেছে নতুন সরকার তেমনভাবে হয়তো চাপে থাকতে চাইবে না। হয়তো কিছুটা নুয়ে পড়তে পারে। তখন হয়তো এই সরকারের ওপর থেকে আশীর্বাদের হাত উঠে যেতে পারে।

বিরোধী শিবিরে যে স্থবিরতা, তাঁর অন্যতম একটি কারণ তাঁদের অক্ষমতা। সেখান থেকে যে নতুন কোন নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁর অন্যতম কারণ ধরা হচ্ছে ভারত ভিত্তিক এই প্ল্যানিং। নিজেদের যে মেরুদণ্ড নেই এই কথাটা তাঁরা আর প্রচারে আগ্রহী না। গদিতে বসার ক্ষেত্রে যে তাঁদের একমাত্র ভরসা কূটনীতিকরা সেই সত্যটি বিএনপি বুঝে গেছে। তাই জনগণকে নিয়ে আন্দোলনের কথা মুখে বললেও সেপথে আর পা বাড়াবে না। তাই এখন অপেক্ষা ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের। বিজেপির কপালে শিকে ছিঁড়লে, যদিবা এদেশের বিরোধী দলের কপাল খোলে।

[ছবি সূত্র ইন্টারনেট]
https://www.facebook.com/ahmad.z.sani

১৫ thoughts on “‘…তখন যদি বিরোধী দলের কপাল খোলে’

  1. বিএনপি নিজেদেরকে চাঙ্গা করার
    :নৃত্য: :থাম্বসআপ: বিএনপি নিজেদেরকে চাঙ্গা করার জন্য বিভিন্ন কলা-কৌশল ব্যাবহার করছে বর্তমানে। কিন্তু কতদূর সফল হবে তা বলা যায়না। হয়তো ওরা আর কখনোই উঠে দাড়াতে পারবেনা!!!

    1. উপজেলা নির্বাচন দেখে কি তাই
      উপজেলা নির্বাচন দেখে কি তাই মনে হয়? বিএনপি পজিটিভ ভোট এ না লীগের প্রতি নেগেটিভ ভোটে জিতবে

  2. খেলা ভালো, কিন্তু বেশী লেখা
    খেলা ভালো, কিন্তু বেশী লেখা ভালো না… এটা আওয়ামী লীগ মনে রাখলেই ভালো করবে। ভালো লাগলো আপনার বিশ্লেষণ।

  3. তাই এখন অপেক্ষা ভারতের

    তাই এখন অপেক্ষা ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের। বিজেপির কপালে শিকে ছিঁড়লে, যদিবা এদেশের বিরোধী দলের কপাল খোলে।

    হুম্মম… এই কথাটাতে চিন্তার খোরাক আছে।

    আর দারুণ একটা চিন্তাশীল লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!

  4. যাইহোক,ফেসবুক ধরার পর পত্রিকা
    যাইহোক,ফেসবুক ধরার পর পত্রিকা ছেড়ে দিয়েছি । জরুরি সব খবর নানারকম রং চড়িয়ে ফেসবুকেই পাওয়া যায় । এই ভালো ।

    1. ‘চিমটি মাটি ছোঁয়া’– আমার
      ‘চিমটি মাটি ছোঁয়া’– আমার অবস্থাও অনেকটা একই। তবে পত্রিকায় লেখার কারণে– নিজের লেখাটা অন্ততঃ পড়ি– এই যা।

Leave a Reply to ডার্ক ম্যান Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *