হিমাংশু কথক

সেদিন ভার্সিটি যাচ্ছি । আমাদের ক্যাম্পাস বনানীতে । সৈনিক ক্লাবের কাছে ডিওএইচএসের সামনের গলি টা দিয়ে হেটে যাচ্ছি । রাস্তার পাশে অনেক গুলো কার মেকানিক শপ , কিছু শস্তা হোটেল আর অনেক গুলো চা সিগারেটের দোকান । কাকলীর মোড়ের এই দিকটায় নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকদের আনাগোনা । বেশীর ভাগই দিনমজুর টাইপের লোকজন । বনানীর ঝলমলে প্রাচুর্যের পাশে নোংরা দারিদ্র্য । এ যেন আলোর নিচে আধার । তো হেটে যাচ্ছি ক্যাম্পাসের দিকে । হঠাৎ সিগারেটের তৃষ্ণা পেল ভীষন । একটা চা সিগারেটের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে একটা চা আর সিগারেট নিলাম । এখানকার চা ভীষন মিষ্টি । জীবনের সব তিক্ততাকে এই মিষ্টি দিয়ে মধুর করার পরিকল্পনা যেন । হঠাৎ আমার পাশ থেকে এক লোক বলে উঠলো – ” কি ভাই লাগবে নাকি ? ”
নতুন কিছু নয় । ২ বছর ধরে যতবার এই রাস্তা দিয়ে গেছি ততবার ই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি । বরাবরের মতই কোনো উত্তর না দিয়ে মুখে উদাস ভাব ফুটিয়ে তুলে পাশের রেল লাইনের দিকে চেয়ে রইলাম । আমার উদাসীনতায় উত্তর পেয়ে আমার উপর সম্পুর্ণ আগ্রহ হারিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোক টার দিকে এগিয়ে গেল ।
এই ব্যাক্তি টি অতীব সজ্জন । স্যুটেড বুটেড পুরোদস্তুর সাহেব । তার কাছে গিয়ে আবার সেই একি প্রশ্ন । আমি তাদের কথোপকোথন শুনতে চাই নি , তবু এই রকম চটকদার বাক্যালাপ কানে না এসে পারে না ।
লোক ঃ লাগবে নাকি ভাই ?
সাহেব ঃ কি লাগবে ?
লোক ঃ ভালো মেয়ে ছেলে আছে । কম দামে হইয়া যাইব ।
সাহেব ঃ কোত্থেকে ধরে নিয়ে আসা হয় এইসব মেয়েগুলোকে ?
লোক ঃ ভাই, সব স্কুলের মেয়ে । কিছু গার্মেন্টস এর মেয়ে । সব টাটকা । ফ্রেশ । মজা পাইবেন , চলেন যাই ।
সাহেব ঃ(রাগান্বিত) আমাকে দেখে কি তোর মাগীপাড়ার খদ্দের মনে হয় ? রাস্তা ঘাটে ভদ্রলোকদের আটকে এসব অফার দিস শরম করে না ?
লোক ঃ লজ্জা শরম আপনেগোর লিগা । আমাগোর লজ্জা পাইলে বউ বাচচা লয়া না খাইয়া থাহা লাগবো এই শহরে ।
সাহেব ঃ বেশ্যার দালালী করস , বউ এ কিছু কয় না । তোর তো সংসার ই টিকার কথা না ।
লোক ঃ ভাই আমাগোর সংসার আপনেগোর মত পাতলা না , গরীবি আগুনে পুইড়া আমাগোর সংসার শক্ত হইয়া গেছে , আপনেগোর মত কাচা মাটি নাই যে কেউ আইয়া ঘাও দিলেই ঝুরা ঝুরা হইয়া যাইব ।
সাহেব ঃ (এবার চায়ের স্টলের সকলকে উদ্দেশ্য করে) দেখছেন মাগীর দালালের কি ফিলসফি ।
লোক ঃ এত বেশি কথা কন ক্যা ? গেলে যাইবেন না গেলে না , আপনের চেয়ে বড় বড় সাহেবেরা গাড়ি তে আহে, তারপর মুহে রুমাল চাপা দিয়া বড় দালানে ঢুহে । সাহেব হইছেন দেইখা যে রসের টান থাকব না এইডা কেমন কথা ?

তারপর লোকটা হাল্কা বাকা একটা হাসি দিয়ে আম গাছটার নিচে দাঁড়ানো ভাঙ্গা গাড়ি টার দিকে হাটতে শুরু করলো । হাসিটার মাঝে কি যেন একটা ছিল , সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠল । সিগারেট শেষ হয়ে ফিল্টার টা পুড়ছে । ফেলে দিয়ে উঠলাম । পাশের রেল লাইন দিয়ে একটা ইন্টার সিটি ট্রেন হুশ করে বের হয়ে গেল । পায়ের নিচে মাটিটা কেপে উঠলো, একটু বেশী কাপলো কি ? জানি না ।

লেখকের আরো লেখা পড়তে https://www.facebook.com/rifat.rayhan.359?ref=tn_tnmn

১ thought on “হিমাংশু কথক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *