জীবন থেকে নেয়া

আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক, প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আমার বাবার মতো এতো গোঁয়ার এবং দলকানা আওয়ামিলিগার আমার জন্মে আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে উনি স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো দু একটি সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত ছিলেন। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলতে হয়, উনি ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না কিন্তু নিজেদের বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে একটি দল তৈরি করেছিলেন যারা ছোটখাটো স্থানীয় অপারেশন চালিয়েছিলেন। কেউ হয়তো রাজাকারদের সহযোগিতা করেছে তাই রাত্রিতে তাকে একটু কড়কে দিয়ে আশা, কেউ হয়তো শান্তিবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করতে রাজী হয়েছে তাকে গিয়ে সাবধান করে দিয়ে আসা, কেউ হয়তো এলাকার অল্প বয়সী মেয়ে এবং যোদ্ধাদের লিস্ট করছে তাকে গিয়ে ধূম ধাড়াক্কা পিটুনি দিয়ে আসা ইত্যাদি কাজ গুলো স্বপ্রণোদিত হয়ে করতেন। এর জন্য কোন জবাবদিহিতা ছিল না, নিজেরাই খবর সংগ্রহ করতেন আবার নিজেরাই একশনে যেতেন। পাশের গ্রামের সবচেয়ে বড়লোক ছিলেন আইয়ুব রাজাকার, যুদ্ধ শুরুর আগেই তার বাড়িতে হামলা করে দুটো দো-নলা বন্দুক ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, যুদ্ধাস্ত্র বলতে ও দুটোই সম্বল।

যা হোক, এভাবেই একদিন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধের আগেই লেখাপড়া শেষ করেছিলেন বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বছর দুই পর একটি নতুন প্রাইমারী স্কুলে যোগদান করেন তিনি। তখন নিয়োগ দিতেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল যাচ্ছেতাই রকমের তাই প্রথমত, দেশের জন্য কিছু করার প্রতিদান স্বরূপ এবং দ্বিতীয়ত, বীভৎস রকম অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারনে দয়াপরবশ হয়ে বাবাকে চাকরি দেন তিনি।

বাবাকে আমি প্রায়শই মুক্তিযুদ্ধ এবং এর ইতিহাস নিয়ে জিগ্যেস করতাম। আর মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলে তিনি যত না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলতেন তারচাইতে বেশি বলতেন আওয়ামীলীগ আর বঙ্গবন্ধুর কথা। বাপ ছেলে মিলে গল্পে গল্পে কত রাত পার করে দিয়েছি তার হিসেব-নিকেশ নেই। মাঝে মধ্যেই বাপ ছেলেতে মিলে ঝগড়া শুরু হয়ে যেত, বাবার অন্ধ সমর্থন যখন সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তি-পুজার পর্যায়ে চলে যেত তখন আমি আমার মতো করে তাতে হয়তো দ্বিমত করতাম, ঝগড়া টা শুরু হত সেখানেই। বাবা তন্ন তন্ন করে বই ঘেঁটে তার বক্তব্যের সমর্থনে উদ্ধৃতি হাজির করতেন, আমিও আমার বক্তব্য প্রমান করার জন্য জুতসই বই খুঁজে বেড়াতাম। এতে লাভের লাভ হত বই পড়া, বাড়িতে ছোট খাটো একটা তথ্য নির্ভর বইয়ের লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল।

বাবা কেন সরাসরি যুদ্ধে যায়নি সে প্রসঙ্গে কথা বলা দরকার। আমার বাবা ছিলেন আমার দাদীর একমাত্র সন্তান। আবার দাদীর-ও ঐ একটি ছেলে ছাড়া দুনিয়াতে কেউ ছিলনা। দাদা মারা গিয়েছিলেন বাবার আট বছর বয়সে, সে থেকেই মা ছেলের একে অন্যের ছাড়া আর কেউ ছিলনা। যুদ্ধে যাবার কথা বলাতে দাদী রাজী হননি তবে বাড়ি থেকে যদি কিছু করা যায় তাতে তার আপত্তি ছিলনা। বাবা তাই নিজেই একটি দল গড়েন, এলাকাতে থেকে যেটুকু সম্ভব সেটুকুই করার চেষ্টা করেছিলেন।

দীর্ঘদিনের বিরতিতে আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় এলো তখন আনন্দের পরিবর্তে তাঁর চোখে জল দেখেছিলাম, আমি অবাক হয়েছিলাম। তিনি প্রায়ই বলতেন যেন তিনি একটি বার হলেও আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় দেখে যেতে পারেন। সে দিনের সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় তিনি চোখের জল সামলাতে পারেন নি। জয় বাংলা বলে যে চিতকার তিনি সেদিন দিয়েছিলেন তা আজো আমার কানের কাছে বাজে। এই জয় বাংলা-ই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, পেশায় সরকারী চাকুরে হওয়ার কারনে প্রকাশ্য রাজনীতি করা তাঁর জন্য নিষিদ্ধ ছিল আবার স্থানীয় বেশিরভাগ গণ্যমান্য মানুষ জামাত বি এন পিঁর সমর্থক হওয়ার কারনে তাকে সবসময় কোণঠাসা হয়ে থাকতে হত। প্রথম ধাপে আওয়ামীলীগের শাসনামল শেষ হওয়ার পর তাঁর উপর নেমে এসেছিল রাজনৈতিক খড়গ, সামাজিকভাবে বয়কট করা সহ চাকুরীচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয় স্থানীয় এম পি ও থানা জাতীয়তাবাদী দলের সভাপতির যোগসাজশে, বাধ্য হয়ে মেয়াদপূর্তির তিন বছর আগেই রিটায়ার করতে হয় তাকে। যেদিন তিনি চাকুরী ছেড়ে দেন সেদিন তিনি আমাদের এলাকায় প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন

“ এতো দিন তো কইছি ডরে ডরে, এইবার গলা ছাইড়া কমু জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু”

আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নাসিম সাহেব ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধার সনদ বিক্রির দোকান খুলেছিলেন তিনি। বাবাকে কয়েকবার চাপ দিয়েছিলাম, অনেকেই যুদ্ধ না করেও তো মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিচ্ছে, আপনি কমবেশি যা হোক যুদ্ধ তো করেছিলেন তাহলে ও রকম একটা সার্টিফিকেট আপনার নিতে দোষ কোথায়? মুক্তিযোদ্ধার সনদ থাকলে আমাদের চাকুরী প্রাপ্তিতে সুবিধা হবে, আপনি সম্মানী পাবেন, জীবনাবসানের পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে, একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য এটা কি কম সম্মানের? তিনি রাজী হন নি। তিনি বলতেন, যুদ্ধ করেছি দেশ বাঁচাতে, আজ সেই যুদ্ধ যদি আমার ব্যক্তিগত লাভালাভের উপকরন হয়ে যায় তাহলে সেদিনের সে যুদ্ধ ভুল ছিল। সেই সনদ কেনাবেচার হিড়িকে অনেক মানুষ-ই সার্টিফিকেট কিনেছিলেন। সার্টিফিকেট কিনেছিলেন আমাদের গ্রামের নজরুল!
যুদ্ধকালীন সময়ে নজরুল ছিল মৎস্যজীবী। রাস্তার পাশের সরকারী খাল আর খাশ-পুকুরে সারদিন মাছ মেরে বিকেল বেলায় বাজারে বিক্রি করে যা পেত সেটা দিয়েই চলত তার সংসার। অভাবের সংসার এই কয়েকটি টাকা দিয়ে চালানো ছিল কষ্টসাধ্য, অনেকটা লোভের বশীভূত হয়ে নাম লেখান রেজাকার বাহিনীতে। তার সহযোগিতায় এলাকায় রাজাকার বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। দু চার জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন আর বেশ কিছু নারী-র সম্ভ্রম যায় তার কারনে অথচ নাসিম সাহেবের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কারনে সেই নজরুল হয়ে ওঠে বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, মৃত্যুর সময় তার কবরে বাজে রাজনৈতিক বিউগল, একজন রাজাকারের কবর হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। আমার বাবা সেদিনও কেঁদেছিলেন।

আজ আমার বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী। কথা বলতে পারেন না প্রায় আট বছর। আজো তার সামনে প্রতিদিনের সমাচার শোনাতে হয় মনোযোগ দিয়ে, রাজনৈতিক হালচালের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হয় আমার মতো করে, আজো আওয়ামীলীগের সুনাম করলে গর্বে বুক ভরে উঠে তার, আজো আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসেন তিনি, আজো তার কাছে আওয়ামীলীগ মানে অতিমানবীয় কিছু একটা, আজো রাজাকার জামাতের প্রতি তার সমান ঘৃণা, আজো দলকানা আওয়ামিলিগার হিসেবে এলাকায় তার সমান পরিচিতি।

আওয়ামী পরিবারের একজন সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত।

৭ thoughts on “জীবন থেকে নেয়া

  1. আওয়ামী পরিবারের একজন সন্তান

    আওয়ামী পরিবারের একজন সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত।

    এই আওয়ামী লীগ যদি ৭৫ পূর্ব বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ হত তাহলে নিশ্চয় আরও গর্বিত হতে পারতেন।

    1. আওয়ামীলীগ তো এখনও আওয়ামীলীগের
      আওয়ামীলীগ তো এখনও আওয়ামীলীগের জায়গাতেই আছে।
      পাল্টে গেছি আমরা, পাল্টে গেছে আমাদের নৈতিকতা।
      নষ্ট নৈতিকতার দায় বহন করতে হচ্ছে একটা মুক্তিকামী দলকে।
      এর দায় কি শুধু দলের?
      আমরা কি শুধু দায় এড়িয়েই মুক্তি পাব?

  2. আপনার বাবাকে স্যালুট
    আপনার বাবাকে স্যালুট ।

    ধিক্কার সেই মন্ত্রীদের যারা যাচাই না করে রাজনৈতিক সুপারিশ ও ব্যাক্তিগত লোভে রাজকারদের মুক্তিযোদ্ধা সম্মানে ভূষিত করে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছিল ।

    1. ধন্যবাদ।
      আওয়ামী রাজনীতিকে খুব

      ধন্যবাদ।

      আওয়ামী রাজনীতিকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।
      ব্যক্তি জীবনে অনেক নামকরা মন্ত্রী এম পি দের সাথেও উঠাবসার স্মৃতি আছে।
      নোংরা রাজনীতির পূতিগন্ধ বিবেককে দংশন করেছিল বলেই আজ এই স্বেচ্ছা নির্বাসন।
      যারা দেশ সেবার নাম করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে তারাই এখন দেশপ্রেমিক,
      আমরা যারা সুস্থ রাজনীতির জন্য হা পিত্যেশ করছি তারাই প্রত্যাখ্যাত।
      খুব কম দলই আছে যাতে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আছে তবে মন্দের ভাল বলতে ঐ একটাই আওয়ামীলীগ।
      দশের চাপে ভগবান অস্থির, শেখ হাসিনাকে যথেষ্ট পরিমান পথভ্রষ্ট করেছে তার চারপাশের লোকেরা।
      এই লোকেরা সর্বতভাবে সুযোগ সন্ধানী অথচ এদের ছাড়া আওয়ামীলীগ এক পা চলতে পারেনা।
      শেখ হাসিনার ব্যর্থতার দায় এই সব লোকের জন্য।
      এদেরকে পরিহার করে চলতে পারলেই আগেকার আওয়ামীলীগ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

  3. যারা দেশ সেবার নাম করে অবৈধ

    যারা দেশ সেবার নাম করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে তারাই এখন দেশপ্রেমিক,
    আমরা যারা সুস্থ রাজনীতির জন্য হা পিত্যেশ করছি তারাই প্রত্যাখ্যাত।
    খুব কম দলই আছে যাতে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আছে তবে মন্দের ভাল বলতে ঐ একটাই আওয়ামীলীগ।
    দশের চাপে ভগবান অস্থির, শেখ হাসিনাকে যথেষ্ট পরিমান পথভ্রষ্ট করেছে তার চারপাশের লোকেরা।
    এই লোকেরা সর্বতভাবে সুযোগ সন্ধানী অথচ এদের ছাড়া আওয়ামীলীগ এক পা চলতে পারেনা।
    শেখ হাসিনার ব্যর্থতার দায় এই সব লোকের জন্য।

    অপ্রিয় সত্য ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *