মালা বাপ্পি

রাত সাড়ে বারোটা , এতো রাতে বাস অনেকটাই ফাকা থাকে । বাস নাকি আরও পনের মিনিট পর ছাড়বে । বাসের সামনের দিকের জানালার পাশের একটা সিট বেছে নিল জিবরান । আকাশটা আজ তারাময় , তারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে আগামীকাল কাঠ ফাটা রোদ উঠবে । বাসের জানালা দিয়ে জিবরান তারাময় আকাশ দেখছে । আসলে সে ‘তারাময়’ শব্দটা নিয়ে চিন্তা করছে । এই শব্দটা তার পছন্দ হচ্ছে না । সে আরও ভালো একটা বিশেষণ খুঁজছে । পাশের সিটের শিশুসূলভ কন্ঠস্বরটি জিবরানের খোঁজাখুজিতে ব্যাঘাত ঘটাল । সে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে অনুমান করল বাচ্চাটার বয়স বছর দশেকের বেশী হবে না । বাচ্চাটা আর আট দশটা বাচ্চার মতো না , সে একজন পথশিশু অথবা শিশু শ্রমিক । এরই মাঝে জিবরান আবার বাচ্চাটার কন্ঠস্বর শুনতে পেল ,

: ভাই , আপনেরে হেই কহনতে জিগাইতাসি , কয়ডা বাজে ।
– সরি , আমি খেয়াল করি নাই । সাড়ে বারোটা বাজে ।
: খেয়াল করলেন না কই ? কতোক্ষণ ধইরা ত আমার দিকেই ফ্যালফ্যালাইয়া চাইয়া আছেন ।
– ও আচ্ছা , সরি । তোর বয়স কতো রে ?
: নয় বচ্ছর । ক্যা , বয়স দিয়া কী করবেন ?
– কিছুই করব না । তুই এতো রাতে বাসে কী করিস ?
: মালা বেইচ্চা আইলাম । এহন বাইত যাই ।
– মালা কী ?
: আরে ভাই , ফুলের মালা চিনেন না ? রাস্তাঘাটে মাইনষে যে বেলী ফুল , বকুল ফুলের মালা বেচে দেহেন না ?
– ও আচ্ছা । এখন বুঝলাম । কিন্তু তুই এতো অল্প বয়সে মালা বিক্রি করিস কেন ? তাছাড়া বাচ্চাদের তো এতো রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা ঠিক না ।
: ঐ মিয়া , মালা না বেচলে খামু কী ? আপনে আমারে খাওয়াইবেন ?
– তোর বাসায় কে কে আছে ?
: আগেই কইয়া দেই , বাপে মায়রে ছাইড়া গেসে গা । কিল্লিগা গেসে এডি আমি কইতারি না । মায় মাইনষের বাইত কাম করে । তাও সংসার চলে না । এল্লিগা আমি মালা বেচি ।
– ও আচ্ছা । কোথায় মালা বিক্রি করিস ?
: দয়াগঞ্জে ।
– এতো দূরে কেন ? তুই থাকিস কোথায় ?
: মিরপুরে থাহি । যারতে মালা কিনি , হ্যায় কইসে দয়াগঞ্জে বেচতে ।
– বেচা কেনা কেমন ? লাভ হয় ?
: এহেকদিন এহেক রহম । তয় বেশী লাভ হয় না ।
– আচ্ছা । এই নে আমার মোবাইল নাম্বার । আগামীকাল সকাল নয়টায় আমাকে কল দিস । আমি তোর লাভের ব্যবস্থা করে দিবো । আমিও মিরপুরে থাকি । আমার নাম জিবরান ।

জিবরানের কথা শেষ না হতেই বাস মিরপুর এক নাম্বারে পৌছে গেল । বাচ্চা ছেলেটি বাস থেকে নেমে গেল । তবে নামার আগে আশ্বাস দিয়ে গেল আগামীকাল সে কল দিবে । জিবরান নামবে বার নাম্বারে । সে বাসের জানালা দিয়ে আবার আকাশ দেখায় মগ্ন হল । সে এখন মনে মনে ভাবছে , বাচ্চা ব্যবসায়ীর নামটা তো জানা হল না । এটা তো ঘোড় অন্যায় হয়ে গেল ।

পরদিন সকাল নয়টায় জিবরানের ঘুম ভাঙ্গল মোবাইলের রিংটোনের শব্দে । অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে । জিবরান কল রিসিভ করার পর ঐ প্রান্ত থেকে আসল একটি শিশুর কন্ঠস্বর ,

: হ্যালো , জিবরান ভাই ?
– হ্যা , কে বলছেন ?
: আরে ভাই , আমি বাপ্পি ।
– কোন বাপ্পি ?
: আমারে চিনলেন না ? আমি মালা বাপ্পি ।
– মালা বাপ্পি আবার কেমন নাম ? তোমাকে কী আমি চিনি ?
: কাইলকা রাইতে না আপনে আপনের নাম্বার দিয়া কইলেন আপনেরে ফোন দিতে । আপনে আমার লাভের ব্যবস্থা করবেন ।
– ও আচ্ছা , রাতে তোর নাম জিজ্ঞেস করতে ভূলে গিয়েছিলাম । তাই চিনতে পারি নি । তুই এখন কোথায় আছিস ?
: আমি তো ভাই দয়াগঞ্জে আছি । মালা বেচতাসি । আপনে কই ?
– আমি বাসায় , ঘুমাচ্ছিলাম । তুই শাহবাগ জাদুঘরটা চিনিস ?
: হ ভাই , চিনি ।
– তুই জাদুঘরের গেইটের সামনে আয় । আমি আসতেসি ।
: ভাই , এহন তো ব্যবসার সময় । এহন শাহবাগে আইলে মালা বেচুম কেমনে ? আর মালা না বেচলে খামু কী ?
– আজকে তোর সব মালা আমি কিনব । তুই জাদুঘরের গেইটে আয় তো ।
: আইচ্ছা ভাই , আইতাসি ।

জিবরান জাদুঘরের গেইটের উল্টো দিকের একটা চায়ের দোকানে চা হাতে সিগারেট টানছে আর ভাবছে , বাপ্পির নাম বাপ্পি ‘মালা বাপ্পি’ বলল কেন ? বাপ্পি আসলে ওরে জিগ্যেস করতে হবে । তাছাড়া ও কল দিল কার মোবাইল দিয়ে এইটাও জিগ্যেস করতে হবে । এখন এগারটা বাজে , বাপ্পি এখনো আসছে না কেন ! জিবরান আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিল । সিগারেটটা ধরানোর সময় বাপ্পি চায়ের দোকানটার সামনে দিয়েই জাদুঘরের গেইটের দিকে গেল । জিবরান বাপ্পিকে ডাক দিলো ,

– বাপ্পি , এই বাপ্পি , এদিকে আয় ।
: আপনে যে আমারে শাহবাগে আনাইলেন , আমার ত ব্যবসায় লস হইল । হেই ট্যাহা কী আপনে দিবেন ? এম্তেও ত হরতালের ঠ্যালায় ব্যবসা ভালা চলতাসে না ।
– তুই চিন্তা করিস না । আজকে তোর সবগুলো মালা আমি কিনব ।
: আইচ্ছা , ঠিক আসে । আমার লাভের ব্যবস্থা করবেন ক্যাম্তে , হেইডা কন ।
– সেটা পরে বলব । তার আগে তুই বল , কার মোবাইল দিয়ে কল দিয়েছিলি ?
: লোডের দোহান আছে না । ঐ লোডের দোহানতে কল দিসিলাম । এক মিনিট কথা কইয়া দোকানদাররে আমার দুইডা ট্যাহা দিতে হইসে ।
– ও আচ্ছা । সমস্যা নেই । আমি তোর ঐ দুই টাকাও দিয়ে দিব । এখন আমার সাথে টিএসসিতে চল ।
: টিএসসি কী ?
– গেলেই দেখবি । আমি যা যা বলি তা মন দিয়ে শুনতে থাক । তুই শাহবাগ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ফুল বিক্রি করবি । মাঝে মাঝে সোহরাওয়ার্দিতেও ঢুকতে পারিস ।
: আইচ্ছা । কিন্তু ভাই , সোহরাওয়ার্দি আর নিউ মার্কেট কোন দিকে ?
– তোকে আমি সব চিনিয়ে দিব । এই যে ডানদিকের বিল্ডিংটা দেখছিস , এইটা চারুকলা । এর গেইটের সামনেও মালা বিক্রি করতে পারিস । আর বাদিক দিয়ে ঢুকলেই সোহরাওয়ার্দি উদ্যান । এইখানেও তোর ব্যবসা জমবে ভালো ।
: ভাই , উদ্যান কী ?
– উদ্যান মানে পার্ক ।
: ও আইচ্ছা । ভাই , সামনের ঐ মূর্তিডা কীয়ের ?
– ঐটা মূর্তি না । ঐটা ভাস্কর্য , রাজু ভাস্কর্য । তুই এখন অতো কিছু বুঝবি না । পড়ালেখা করলেই সব বুঝতে পারবি । শুধু এতটুকু জেনে রাখ , এই ভাস্কর্যের আশেপাশেই তুই মালা বিক্রি করবি । এইটাই টিএসসি ।
: ঠিক আসে ভাই । কিন্তু পড়ালেহার কথা যে কইলেন , হেইডা করনের সময় কই ?
– হবে , এখন সময় হবে । আগে তো তোর ব্যবসায় লাভ হতো না । তাই দেরী করে বাসায় ফিরতি । কিন্তু এখন এই টিএসসিতে তোর ব্যবসায় লাভ হবে । তাই সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে পারবি । কিন্তু বাসায় ফিরার আগে তোকে স্কুলে ক্লাস করে যেতে হবে ।
: কোন স্কুল ?
– তোর মতো যেসব শিশু সারাদিন তাদের কাজকর্মে ব্যাস্ত থাকে বা অর্থের অভাবে পড়াশুনা করতে পারে না । তাদের জন্যে আমার কিছু বন্ধুবান্ধব একটা স্কুল খুলেছে । সেই স্কুলে সন্ধ্যায় ক্লাস নেয়া হয় । এমনকি তারা কোন টাকা পয়সাও নেয় না , একদম ফ্রী । উল্টো ওরা প্রতিদিন তোদের মতো শিশুদের সন্ধ্যার নাস্তার ব্যবস্থা করে । কী , যাবি না স্কুলে ?
: স্কুলে তো যাইতে মন চায় । কিন্তু আমার ব্যবসার কী হইব ?
– আরে গাধা , কী বল্লাম তোকে ? এখন এখানে সন্ধ্যার আগেই তোর সব ফুলের মালা বিক্রী হয়ে যাবে । তারপর সন্ধ্যায় স্কুলে এক ঘন্টা ক্লাস করে বাসায় ফিরবি । বুঝা গেসে ?
: যদি কোনদিন সন্ধ্যার আগে সব মালা বেচতে না পারি ?
– যেদিন এমন হবে সেদিন যেই মালাগুলো বিক্রি করতে পারবি না সেই সবগুলো মালা আমি কিনে নিব । এইবার খুশী ?
: তাইলে ঠিক আছে । স্কুলে যামু ।
– হুম , মন দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে কিন্তু ।

সেদিনই বাপ্পিকে আমাদের স্কুলে ভর্তী করে দিলাম । ছেলেটা খুবই পরিশ্রমী ছিল , পড়াশুনাতেও ভালো ছিল ।

– বাবা , তারপর বাপ্পি চাচ্চুর কী হল ?
: এরমধ্যেই হঠাত্‍ একদিন খবর পেলাম বাপ্পির মা মারা গেছে । ছেলেটার যাওয়ার কোন জায়গা নেই । ততোদিনে আমার সাথে তোর মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে । আমি ভালো বেতনের চাকরিও করছিলাম । তাই আমি আর তোর মা ঠিক করলাম বাপ্পীকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসব । ওকে ক্লাস ফাইভে ভর্তী করে দিব । যেই ভাবা , সেই কাজ । ছেলেটা ফাইভে বৃত্তি পেল , এইটে বৃত্তি পেল । এসএসসি , এইচএসসিতে গোল্ডেন পেল । কতো করে বললাম , বুয়েটে বা মেডিকেলে পরীক্ষা দে । না সে শুনবেই না । তার একটাই কথা , ‘জীবরান ভাই , আপনে চারুকলায় পড়সেন । আমিও চারুকলায় পড়মু ।’ আমিও আর বাধা দিলাম না ।
– বাবা , আমি ভেবেছিলাম বাপ্পি চাচ্চু তোমার ভাই ।
: শোন রিয়া , আমার কোন ভাই বোন ছিল না । মা বাবা ছিল না । আমার নানু আমাকে বড় করেছে । একদিন সেও চলে গেল । আমি চাই নি আরেকটি শিশু আমার তো একাকিত্বকে বরণ করে নেক । তাই আমি বাপ্পিকে আমার ভাই হিসেবে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম । আটারবছর আগের সেই ‘মালা বাপ্পি’ আজকে বাংলাদেশ প্রথম সারির ফটোগ্রাফারদের মধ্যে একজন । আমি গর্বিত সে আমার ভাই । মা , তোকে আজকে এসব কথা বল্লাম কারণ , তুই প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছিস । তোর এসব জানা দরকার । আমি চাই না তুই কখনো বাপ্পিকে খাটো করে দেখ । সে তোর চাচ্চু এবং সে তোকে যথেষ্ট স্নেহ করে । আশা করি তুই তাকে সর্বদা সম্মান করবি ।
– আচ্ছা বাবা , তুমি এ নিয়ে কোন টেনশান করো না । তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি ?
: বল ।
– চাচ্চুর গার্লফ্রেন্ড আছে । আমি আর মা মেয়ে দেখেছি । মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে । চাচ্চু সম্ভবত লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না । তুমি চাচ্চুর সাথে কথা বলে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো ।
: তাই নাকি ? তোর চাচ্চু কোথায় ? ডাক দে দেখি । বাপ্পি , এই বাপ্পি ।
– বাবা , চাচ্চু বাসায় নেই ।
: ও আচ্ছা । ও বাসায় আসলে ওকে বলিস আমার সাথে দেখা করতে ।
– আচ্ছা বলব ।
: মা , এখন তুই যা ।

জিবরান আপন মনেই ভাবছে । সে বাপ্পিকে চিনে বাপ্পির বয়স যখন নয় বছর তখন থেকে । আজকে বাপ্পির বয়স ত্রীশ ছুই ছুই করছে । জিবরান কখনো ভাগ্যকে বিশ্বাস করে না । তবে আজ তার খুব ইচ্ছে করছে ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে । কারণ তার ধারণা বাপ্পির জন্যে তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে । এই ভাবনাটা আরো প্রকট হয় যখন জিবরান বাপ্পির সাথে তার জীবনের প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টের যোগসূত্র খুঁজে পায় ।

বাপ্পির সাথে দেখা হওয়ার পরেই জিবরান চাকরিটা পেয়ে যায় । বাপ্পির সুবাদেই সেই পথশিশুদের স্কুলে জিবরানের সাথে পরিচয় হয় সেজুতির । এরপর জিবরান সেজুতিকেই বিয়ে করে ঘরে তুলল । বাপ্পির মা মারা যাওয়ার পর বাপ্পি জিবরানদের বাড়িতে এসে উঠল । আর তখনই জিবরান সুসংবাদটা পেল যে , সেজুতি মা হতে যাচ্ছে । কিছুদিন পরেই ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল রিয়া । জিবরান মনে মনে হাসছে , কারণ বাপ্পির সাথে পরিচয় হওয়ার আগের অতীতটা ছিল তার জন্যে বিষাদময় । তবে গত বিশ বছরের স্মৃতিগুলো বড়ই মধুর । হঠাত্‍ বাপ্পির ডাকে কল্পনার জগতে ফিরে আসল জিবরান ।

– ভাই , আমারে নাকি ডাকসেন ?
: হ্যা , শুনলাম ইদানিং প্রেম ট্রেম করছিস ।
– ভাই , এইসব আপনেরে কে কইসে ?
: তোর ভাবি আর ভাতিজি মেয়ে পছন্দ করেছে । একদিন বাসায় নিয়ে আসিস । আর মেয়ের বাড়ির ঠিকানাটা আমাকে দিস । এখন যা ।
– ঠিক আসে ভাই , দিমু নে ।

এই ছেলেটা বড়ই অদ্ভুত । সে আমার সাথে তর্ক করেছে মাত্র একবার । তাও সেটা তার চারুকলায় ভর্তী নিয়ে । এর আগে বা পরে কখনোই সে আমার সাথে তর্কে জড়ায় নি । এমনকি আমার চোখের দিকেও কখনো তাকায় না । ছেলেটা খুব বেশী সহজ সরল । একদিন ওকে বলতে হবে , ‘তুই তো আমার ভাই । এতো সংকোচ কিসের ?’ জিবরান আবার মনে মনে হাসছে । কারণ সে জানে তার সামনে বাপ্পি সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখবে । একটা সময় ছিল , যখন জিবরানও নিজেকে গুটিয়ে রাখত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *