পথিক

আমি হাঁটছি। এক বছর, পাঁচ বছর, নাকি অনন্তকাল? জানি না। জানতে চাই না। শুধু জানি আমি হাঁটছি। হেটে চলেছি। আমার পায়ে ফোস্কা পড়ে রক্ত জমাট বেধেছে। কালচে রক্ত। নাকি আগে থেকেই কালচে ছিলো? জানি না। আমার বিষাক্ত রক্ত, দূষিত রক্ত। পৃথিবীর পথে পথে আমি ঘুরে বেড়াইচ্ছি অবিরাম। ক্লান্তি? নেই। ছিলো না কোন কালে। ভরাট গলায় আমার আবৃত্তি হয় না। “আমি ক্লান্ত প্রাণ এক!”- বলা হয় না। বনলতা সেনের দেখা আমি পাই নি।


আমি হাঁটছি। এক বছর, পাঁচ বছর, নাকি অনন্তকাল? জানি না। জানতে চাই না। শুধু জানি আমি হাঁটছি। হেটে চলেছি। আমার পায়ে ফোস্কা পড়ে রক্ত জমাট বেধেছে। কালচে রক্ত। নাকি আগে থেকেই কালচে ছিলো? জানি না। আমার বিষাক্ত রক্ত, দূষিত রক্ত। পৃথিবীর পথে পথে আমি ঘুরে বেড়াইচ্ছি অবিরাম। ক্লান্তি? নেই। ছিলো না কোন কালে। ভরাট গলায় আমার আবৃত্তি হয় না। “আমি ক্লান্ত প্রাণ এক!”- বলা হয় না। বনলতা সেনের দেখা আমি পাই নি।

আমি গন্ধ পেয়েছি। অদ্ভুত গন্ধ। পচা, মৃত গন্ধ। কর্পূরের গন্ধের সাথে সালফারের গন্ধ, ফিনাইলের গন্ধ মেশানো। রক্তের গন্ধ। স্মৃতি আচ্ছন্ন করা গন্ধ। প্রতি নিঃশ্বাসে আমি এই গন্ধ পাই। আমি ঘোরাচ্ছন্ন হয়ে হাঁটি। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে আমি ছুটে বেড়াই। গন্ধ বাড়তে থাকে। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না। আমি হাটু ভেঙে পড়ে যাই। আমার হাঁটা থামে না। আমি হাঁটি। হাটতে থাকি। ক্লান্তিহীন, বিষণ্ণ হাঁটা। আমার পা ভারী হয়, আমি হাঁটা থামাই না। আমার তেষ্টা পায়, আমি পানি খাই না। আমার রক্ত ঝরে, আমি হাটতে থাকি। আমার কোন গন্তব্য নেই। আমি বিরতিহীন।

মাঝে আমি “আমি”কে দেখতে পাই। আমার মতো। নাক-মুখ-চোখ আমার মতো না, আমার মতো খাটো না। আমার মতো লম্বা না। তারা আমার মতো না, আমি তাদের মতো না। তবুও তারা আমার মতো। তারাও হাটে। হাটতে হাটতে বড়ো হয়, বুড়ো হয়। একটু একটু করে। তারা মরে না। আমরা মরি না। আমরা হাটতে থাকি।

মাঝে মাঝে স্মৃতি মনে পড়ে। একটা ঘরের স্মৃতি। উষ্ণ একটা ঘর। অন্ধকার একটা ঘর। অথচ কি আলো! স্বর্গের জ্যোতি সে ঘরে। মা! আমি ঘরে যেতে চাই।

চাইলেই ঘরে যাওয়া যায় না। আমি ঘরে যেতে পারি না। আমরা ঘরে যেতে পারি না। আমরা স্বাধীনভাবে হাঁটি। কিন্তু আমাদের ঘর বলে কিছু নেই। আমাদের ঘরে যাওয়া বারণ! এই ঘর থেকে একবার বের হওয়া আর যাওয়া যায় না। আমি, আমরা ঘরে ফিরতে পারি না।

বলছিলাম যে, ঘর। আমার ঘরে ছিলো না মিথ্যে আসবাব। ভালোবাসা ছিলো, আদর ছিলো। বন্ধন ছিলো। এখন কিছু নেই। আমি হাঁটি। হাটতে থাকি।

সেদিনের কথা মনে পড়ে। ঘুমাচ্ছিলাম। নতুবা শুয়ে ছিলাম। হটাৎ ভূমিকম্পের প্রলয়ে এলোমেলো আমার জীবন। আমি তলিয়ে গেলাম। কালো জলে। নোনা জলে। আমার শরীর ভেসে গেছিলো রক্তে। মায়ের কেমন লাগছিলো বোঝা যাই নি। বুঝতে পারার কথাও না। নিজের কষ্টটাই ভালোমত বুঝতে পারি না। খালি মনে আছে, আমি তলিয়ে গিয়েছিলাম। অন্ধকার জগতে।

এরপর? এরপর থেকেই আমি হাঁটছি। রাস্তায়, ডাস্টবিনে আমি আমাদের দেখি। আমার মতো “মানুষ”দের সংখ্যা বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। আমরা হাটতে থাকি। হেটে চলি। অক্লান্ত। পিশাচী গন্ধ নিয়ে। আমাদের শরীর থেকে মৃত্যুর গন্ধ আসে। রক্ত ঝরে। আমরা বড়ো হই, বুড়ো হই। মরি না। মৃতের মৃত্যু নেই।

আমি এক নিঃসঙ্গ ফিটাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *