৫৭ ধারার বলি রাহি-উল্লাস, তুঘলকি কান্ডে ডিজিটাল প্রশাসন।

১) দুটো ছেলেকে বেধড়ক পেটানো হচ্ছে। ৫০/৬০ জন পুনঃবয়স্ক মানুষের মত আকৃতির কিছু জীব গুরুতর (!) অভিযোগের ভিত্তিতে নাবালক বাচ্চাগুলোকে শায়েস্তা করছে। বাংলা চলচ্ছিত্রের শেষাংশের মত হুইসেল-সাইরেন বাঁজিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয় পুলিশ। ছেলে দুটোর কাছে অস্ত্র আছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হলো। তারপর শুরু হলো অস্ত্র উদ্ধারের পালা। ছেলে দুটোকে সার্চ করা হলো। শার্ট-গেঞ্জী, প্যান্ট খোলার পরও অস্ত্র না পেয়ে হতাশ হয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু ধ্বজাধারীরা তখনও উম্মত্ব। চিৎকার করে তারা জানান দিচ্ছে অন্তর্বাস খুললেই অস্ত্র পাওয়া যাবে। করিৎকর্মা পুলিশ অন্তর্বাস খুলে নিলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে অভিযোগকারীরা। দেখেন স্যার দেখেন স্যার কত্তবড় ধর্ষণের অস্ত্র লইয়া ঘুরতাছে পোলা দুইডা! বলে ছেলে দুটোর পুরুষাঙ্গকে দেখিয়ে দেয় অভিযোগকারীরা। ধর্ষণের অস্ত্র সহ ছেলে দুটিকে থানা নেওয়া হলো। ধর্ষণের অস্ত্র রাখার অপরাধে, যৌনানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হলো। এখানেই শেষ নয়, ছেলে দু’টির জামিনে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ রিমান্ড চাওয়া হলো ৩ (তিন) দিনের।
পড়ে হাস্যকর লাগছে না বিষয়টি? এমনই হাস্যকর ঘটনা ঘটেছে ব্লগার রায়হান রাহি এবং উল্লাস দাসের ক্ষেত্রে।

২) মেধাবী ছাত্র রায়হান। চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুলের গোল্ডেন বয়। গোল্ডেন এ+ পেয়ে ভর্তি হয় নগরীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কলেজে। লেখালেখির হাত চমৎকার। নিয়মিত লিখে ইষ্টিশন ব্লগে। যে কোন অন্যায় অসঙ্গতি নিয়ে লিখতেন নিঃসংকোচে। ফেলানী ইস্যুতে ভারতীয় পণ্য বর্জণ করার আন্দোলন করতে চেয়েছিলো ছেলেটি। সে লেখায় আমার সাথে বিতর্ক হয়েছিলো অনেকবার। ফেলানী, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ, শাহবাগ, জামাত শিবির বিরোধী বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ছিলো ছেলেটি। ছেলেটি ব্লগে জামাত-শিবির যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলেও ব্যক্তিগত জীবনে সে নাস্তিক বা ইসলাম বিদ্বেষী ছিল না। ইস্টিশন ব্লগে যে কেউই ছেলেটির ব্লগ পড়ে দেখতে পারেন। একটি লাইনও পাওয়া যাবে না ইসলাম ধর্ম বিরোধী। সেই ছেলে এবং তার বন্ধু উল্লাসকে প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত-শিবির কর্মীরা প্রকাশ্যে মারধর করে চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে। প্রবেশপত্র আনতে কলেজে গেলে উৎপেতে থাকা চক্রান্তকারীরা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাদের মারধর করে। মারধর করেই শান্ত হয় নি হায়েনারা। আহত ছেলে দুটোকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে রাস্তায় এনে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলবার ব্যবস্থা করে। ছেলে দুইটির ভাগ্য ভাল! টহল পুলিশ এসে যাওয়ায় কিছুটা বিরতি হয়
মারধরের। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ছেলে দুটোকে গ্রেফতার করে পুলিশ কিন্তু ছেলে দুটোকে হত্যার চেষ্টাকারীদের টিকিটিও স্পর্শ করেনি। শুরু হয় ধর্ম অবমাননাকর পোষ্ট খোঁজা। পুলিশ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে রাহিকে ফেসবুক ওপেন করতে বাধ্য করে। ফেসবুক খোলা হল কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না। হতোদ্যম হয়ে পুলিশ ব্লগ পড়ে দেখলো। না সেখানেও কিছু পাওয়া গেল না! কিন্তু জড়ো হওয়াদের দাবী মহানবী (সঃ)-কে অপমান করা হয়েছে, ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। পুলিশ মহাদেয় এবার রাহির ফেসবুক ইনবক্সের ম্যাসেজ জনসম্মুখে তুলে ধরলেন। ইনবক্সের ব্যক্তিগত কথোপকথন এবং জিজ্ঞাসাকে ধর্ম অবমানা, নবী অবমাননা বলে মহা উল্লাসে পুলিশ ছেলে দুটিকে থানা হেফাজতে নিয়ে গেলো। চক্রান্তকারী, হত্যার চেষ্টাকারীদের বশে গিয়ে ইনবক্সের কথোপকথনকে ধর্ম অবমাননা সাজিয়ে জনৈক “শিবেন বিশ্বাস” ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে ছেলে দুটোর বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০১৩) এর ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করে। অভিযোগে অভিযোগকারী উল্লেখ করেন যে, “….. তখন ১নং আসামী কাজী মাহমুদুর রহমান প্রঃ রায়হান প্রঃ রাহি তাহার ব্যবহৃত ঝণগচঐঙঘণ-ঢ চখঙজঊ ড-৩৫ মডেলের মোবাইল-এ সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুক-এ তাহার আইডি (কাজী রায়হান রাহি) খুলিয়া ইনবক্সের মন্তব্যগুলি উপস্থিত জনসাধারণের সামনে উপস্থিত করিলে দেখা যায়, কাজী রায়হান রাহি, ফারাবি সফিউর রহমান নামক ফেইসবুক আইডি এর সহিত ফেইসবুকে ম্যাসেজ আদান প্রদানকালীন লিখেন যে, “এমনকি কোন নারীর যদি অন্তত বিশ বছর বয়সে স্বামী মারা যায়, সে আর একবার বিয়ে করে। আয়েশার ক্ষেত্রে কি হয়েছিলো” উক্ত ধৃত ১নং আসামী এরূপ ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে বিদ্রুপ করিয়া কুরুচীপূর্ণ অসংখ্যক ম্যাসেজ লিখেন” এই হচ্ছে রাহির বিরুদ্ধে অভিযোগ। হ্যা হবেন না, ম্যাসেজ লিখে ইসলাম অবমাননা করেছে রাহি! ইনবক্সে ধর্ম অবমাননা!
প্রযুক্তি এবং আইন বিষয়ে দক্ষ না করে ৫৭ ধারার অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের হাতে। আনাড়ি এই প্রশাসন যথেচ্ছ ভাবে এই ধারার প্রয়োগ করেছে এবং করবে। ব্লগ লিখার কারণে মামলা হয়েছে, পোষ্ট দেওয়ার কারণে মামলা হয়েছে, লাইক দেওয়ার কারণে মামলা হয়েছে এবার হলো ইনবক্সে ম্যাসেজ থাকার অপরাধে!

৩। গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর ১৩২৫ খ্রীষ্টাব্দে তাহার পুত্র জুনা খাঁন মুহাম্মদ বিন তুঘলক উপাধি ধারণ করিয়া মসনদে উপবেশন করেছিলো। মুহাম্মদ বিন তুঘলক চিরাচরিত শাসন পদ্ধতিতে কিছু ব্যতিক্রম ঘটানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শাসন পদ্ধতির উন্নতিকল্পে প্রবর্তিত তাহার সমূদয় পরিকল্পনা সুষ্ঠ হলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না। ঐতিহাসিক বারনী “মুহাম্মদ বিন তুঘলকের এরূপ পাঁচটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে গেছেন। সেগুলো হল ১) অতিরিক্ত কর ধার্য, ২) রাজধানী স্থানান্তর, ৩) তাসমুদ্রা প্রচলন, ৩) খোরসান অভিযান ও ৫) কোরচিল অভিযান।
মুহাম্মদ বিন তুঘলক দোয়াব প্রদেশের কর্ষনযোগ্য ভূমিতে অন্যান্য অঞ্চলের ভূমির চেয়ে দ্বীগুণ বেশী কর ধার্য করেন। শাসন কার্যের সুবিধার্থে দিল্লী থেকে দেবগিরিতে রাজধানীতে স্থানান্তর করেন। আর্থিক সংস্কার সাধন করতে তাম্রমুদ্রার প্রচালন করেছিলেন এবং খোরসান, ইরান, ট্রান্সঅক্সিয়ান ও কোরাচিল বিজয় করবার জন্য অভিযান করেছিলেন। কিন্তু সুলতানের সকল ইচ্ছাই ব্যর্থ হয়েছিলো। তার ব্যর্থতার কারণ হিসাবে ঐতিহাসিক বাদাউনী তাকে “বিপরীতের সংমিশ্রন” বলে অভিহিত করেন। সবগুণে গুনান্বিত সম্রাট হওয়া স্বত্বেও তার ভাগ্যে ছিল শোচনীয় ব্যর্থতা। বুদ্ধিমত্তা ও মেধায় তিনি ছিলের যুগের অগ্রবর্তী। যুগাগ্রবর্তী হওয়ায় জনসাধারণ সুলতানের কর্মকান্ডের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্দি করতে পারে নাই। যার ফলে জনসাধারণ তার ইচ্ছার বা উদ্দেশ্যে কার্যকরীকরণে কোন সহযোগিতা করে নাই। ফলতঃ তার আমলে সকল ভালো কাজ আমাদের কাছে আজ “তুঘলকি কান্ড” হিসাবে পরিচিত।

যুগাগ্রবর্তী অনেক পদক্ষেপ, অনেক আইন, অনেক ইচ্ছা আজ আমাদের দেশে অপব্যবহৃত হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের উদ্দেশ্যে আর ইনবক্সে ম্যাসেজ থাকার অপরাধে ৫৭ ধারার মামলা ২০১৪ সালকে ১৩২৫-১৩৫২ খ্রীষ্টাব্দের শাসনামলে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস শুধু লিপিবদ্ধ থাকবার বিষয় নয়। রাষ্ট্র ও সরকার যত দ্রুত বিষয়টি অনুধাবন করবে তত দ্রুত “তুঘলকি কান্ডের” অবসান ঘটবে এ বাংলায়।
তুঘলকি মামলায় আটক রাহি ও উল্লাসের মুক্তি চাই।

১২ thoughts on “৫৭ ধারার বলি রাহি-উল্লাস, তুঘলকি কান্ডে ডিজিটাল প্রশাসন।

  1. এই হচ্ছে রাহির বিরুদ্ধে

    এই হচ্ছে রাহির বিরুদ্ধে অভিযোগ। হ্যা হবেন না, ম্যাসেজ লিখে ইসলাম অবমাননা করেছে রাহি! ইনবক্সে ধর্ম অবমাননা!

    হাস্যকর এবং চরম দুঃখজনক!

    এই লজ্জা রাখি কোথায়!

  2. ব্রহ্মপুত্র ভাই, ছেলে দুইটার
    ব্রহ্মপুত্র ভাই, ছেলে দুইটার কি অবস্থা? জামিনে বের হয়ে এলেও ওদের একটু সাবধানে থাকতে বলবেন। এক্সিডেন্ট হতে সময় লাগে না। এভাবে কাউকে ট্রাপে ফেলতে দেখলে খুবই দুঃখ লাগে।
    রাহি আর উল্লাসের পরিবারের প্রতি সমবেদনা।

  3. বন্ধু ব্রহ্মপুত্র,
    তোমাকে

    বন্ধু ব্রহ্মপুত্র,
    তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না । কিন্তু আর কেউ না জানুক আমিতো জানি এই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে কী পরিমাণ চাপ তোমাকে নিতে হচ্ছে । একজন প্রফেশনাল আইনজীবীর বাইরেও একজন মানবিক মানুষ হিসেবে তুমি যা করছো তা কজনই বা করে !!! উল্লাসের আইনজীবী তো ভয়ে মামলাই নিলো না ।

    তোমার লেখার মাধ্যমে বিষয়টা আরও ক্লিয়ার হলো । চুলচেরা বিশ্লেষণসহ একটা পোস্ট দেবে বলে আমি মনে করি । আর কেউ না মনে রাখুক রাহী – উল্লাস যেন তোমাকে মনে রাখে যে, তাদের বিপদে তুমি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলে ।

  4. ভাই ছেলেগুলোর জন্য আপনি যা
    ভাই ছেলেগুলোর জন্য আপনি যা করলেন, এটা আমাদের পক্ষে করা অনেক কঠিন হয়ে যেত। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *