জালের ওপারে দেখে এলাম তাদের….

সকালে উঠেই দৌঁড় লাগালাম ছেলেগুলোকে দেখতে। রাহীর পরিবারের সাথে কথা বলে, যোগাযোগ করলাম উল্লাসের পরিবারের সাথে। তারা আসছেন জেনে রওনা হলাম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।

জেল গেটে তখনো পৌঁছায়নি তাদের কেউ, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পরে অন্যদিকে গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিছু পরে রাহীর বাবা কল করে জানালেন তারা এসেছেন। গিয়ে দেখলাম উল্লাসের পরিবারের কেউই আসেনি। চেয়েছিলাম দুই পরিবারকে একসাথে নিয়ে তাদের দুইজনকে একই সাথে দেখা করবো। অগত্যা রাহীর পরিবারের সাথেই গেলাম ভেতরে।


সকালে উঠেই দৌঁড় লাগালাম ছেলেগুলোকে দেখতে। রাহীর পরিবারের সাথে কথা বলে, যোগাযোগ করলাম উল্লাসের পরিবারের সাথে। তারা আসছেন জেনে রওনা হলাম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।

জেল গেটে তখনো পৌঁছায়নি তাদের কেউ, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পরে অন্যদিকে গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিছু পরে রাহীর বাবা কল করে জানালেন তারা এসেছেন। গিয়ে দেখলাম উল্লাসের পরিবারের কেউই আসেনি। চেয়েছিলাম দুই পরিবারকে একসাথে নিয়ে তাদের দুইজনকে একই সাথে দেখা করবো। অগত্যা রাহীর পরিবারের সাথেই গেলাম ভেতরে।

৩০০ টাকায় ভিআইপি(!) ননস্লিপ টিকেট কেটে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ঐ মুহুর্তে রাহীর বাবা জানালেন রাহী সাড়ে তের হাজার টাকা চেয়েছে। বেশ অবাকের সুরেই জানতে চাইলাম এতো টাকা কিসের জন্য? তিনি বললেন তাকে বলা হয় নাই কেন। অপেক্ষা করছিলাম রাহীর জন্যে, বেশ খানিকক্ষণ পরেই সে এলো। সাথে আরেকজন আসলো, তার পরিচয় জানতে চাইলে সে জানালো সে ঐ ওয়ার্ডের ইনচার্জে আছে এবং সে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার আসামী।

দুই জালের মাঝখান দিয়ে ছেলেটিকে ভালোভাবে দেখতে পারছিলাম না, এরপরেও মোটামুটি যতটুকু দেখা যায় তারই মাঝে দেখছিলাম আর যতটা সম্ভব সাহস দেবার চেষ্টা করছিলাম। বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম চার দেয়ালের ঐ জগতে বাঁচতে হবে সাহস নিয়ে, ভোদাই হয়ে নয়।

যাবতীয় কথাবার্তা শেষ করে, তার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। আর তখনই দেখলাম উল্লাসের বাবা এবং তার সাথে কয়েকজন জেল গেটে দাঁড়িয়ে আছেন এবং ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে, বিস্তারিত জানালাম কিভাবে কি করতে হবে। পরক্ষণেই ভাবলাম ভেতরে আবারো যাওয়াটা দরকার। তাই তাদের সাথে নিয়ে ভেতরে গেলাম, ডেকে পাঠালাম তাকে সেই ভিআইপি(!) টিকেট কেটে। সে এলো, তার সাথে ঐ ইনচার্জও এলো। উল্লাসের সাথে যাবতীয় কথা সেরে, সাহস জুগিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে বের হয়ে এলাম।

ভাবছেন ভিআইপি টিকেটের পাশে ঐ রকম আশ্চর্য বোধক চিহ্ন কেন দিচ্ছি? আসলে ঐ ৩০০ টাকার এক টাকাও সরকার পাবে কিনা জানিনা। কেননা ঐ টিকেটের কোন রশিদ নেই, শুধুমাত্র একটি চিরকুট; যেখানে তাদের নাম আর ওয়ার্ড নাম্বার দেয়া আছে। এখন কথা হলো কেন রাহী সাড়ে তের হাজার টাকা চেয়েছে। টাকা রাহী চায়নি, চেয়েছে এক জেল পুলিশ। তাদের মেডিকেল সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য এই টাকা, অথচ রাহী এবং উল্লাসের পরিবার মিলে ২৪ হাজার টাকা গতকালকেই দিয়ে দিয়েছিলো। যেহেতু ঐ টাকার ভাগ এই জেল পুলিশ সাহেব আর ইনচার্জে পায়নি তাই তারা একটু উদ্যোগী হয়েছে। পরে যাকে দেয়া হয়েছিল তার সাথে যোগাযোগ করে ব্যাপারটি সমাধান করা হয়।

যতটুকু তাদের দেখেছি গতদিনের চাইতে বর্তমানে তারা অনেকটা স্বাভাবিক। উল্লাস চশমা ছাড়া চোখে দেখতে পায় না, অথচ ছেলেটার চশমার বামপাশের ডাঁটটি ভাঙ্গা। জাতশুয়োরের বাচ্চা শিবিরের আঘাতে ভেঙ্গেছে সেটা। তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। তারা পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে এবং এই সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাদি ইতোমধ্যেই অনেকটা সম্পন্ন হয়েছে, বাকী রয়েছে তাদের এডমিট কার্ড এবং রেজিস্ট্রেশন কার্ড হাতে পাওয়া। আগামীকালকেই এগুলো পৌঁছে যাবে সকালের মধ্যেই। এখানে এও উল্লেখ্য বিনামূল্যে পৌঁছুবে না, বেশ ভালো একটা এমাউন্ট নিবে স্বঘোষিত অনুমোদনকারী(!) তারই ভাষ্যমতে ওর অনুমোদন ছাড়া তারা পরীক্ষা দিতে পারবে না। যদি এই মামলা না হতো আর ছেলেগুলো মাম্মি-ড্যাডি টাইপ না হতো তাইলে ঐ অনুমোদনকারীরে বলতাম, এই ফাডা স্যান্ডেল পইরা তুই আমার বালের অনুমোদন দিবি? ব্যাটা হাবিলদার হইয়া জেল সুপারের ভাব নেস? শুধুমাত্র ছেলেগুলোর কথা ভেবেই চেপে রেখেছিলাম নিজেকে।

কারাগার থেকে এবার দৌঁড়ালাম কোর্ট বিল্ডিং-এ, উদ্দেশ্য রাহীর উকিল এই ব্লগেরই ব্লগার ব্রহ্মপুত্র ভাইয়ের সাথে দেখা করা। সেখানে পৌঁছে জানতে পাই তিনি ইতোমধ্যেই আজকে পুনঃরায় জামিন শুনানির আবেদন করেছেন। উল্লাসের পরিবার যেহেতু গতকাল অন্য একটি উকিল নিয়োগ করেছিল এবং উল্লাসের দায়িত্ব যেহেতু উনাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি তাই উল্লাসের জন্য চাওয়া হয়নি। তবে আজ থেকে রাহী এবং উল্লাস উভয়ের জন্যই লড়াই করবেন ব্লগার ব্রহ্মপুত্র। স্বাভাবিকভাবেই এই মামলায় তাদের পক্ষে উকিল পাওয়া বেশ দুরূহ, তবে যেই সহানুভুতি, মানবতা আর ন্যায্য বিচার পাওয়ার জন্য ব্লগার ব্রহ্মপুত্র লড়াই করছেন তাই উনার জন্য রইল অশেষ শ্রদ্ধা। সেই সাথে আইন ও সালিশ কেন্দ্রকেও জানাতে হয় শ্রদ্ধা।

বিকালে যখন রাহীর জামিন শুনানি হলো, সেখানে পুলিশের ভুমিকা বেশ সন্দেহজনক মনে হলো। আচমকাই ছেলেগুলোর জন্য দশদিনের জামিন আবেদন কেন করলো তারা ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে জামিন আবেদনে দেখলাম কেউ তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে কিনা এই ব্যাপারটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে উল্লেখ করেছে। রাহী জামিন পায়নি আজকেও এবং রিমান্ডের জন্য দেয়া হয়নি। রিমান্ড এবং জামিনের শুনানি আগামী ১৩ তারিখ দেয়া হয়েছে। আশা করছি ঐ একইদিনে উল্লাসের জামিন শুনানিও হবে।

সারাদিন এইসকল দৌঁড়াদৌঁড়িতে থেকে বেশকিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। মায়ের মন কি জিনিস তা রাহীর মায়ের অবস্থা না দেখলে বোঝানো সম্ভব না। বর্তমানে তিনি পাগলপ্রায়, যাকেই পাচ্ছেন তাকেই তিনি বোঝাচ্ছেন তার ছেলের কথা। এমনকি কারাগারে সামনে মোবাইল জমা রাখে যেই দোকানদার থেকে শুরু করে জেলের হাবিলদারগুলো, কোর্ট বিল্ডিং-এ উকিল,পুলিশ থেকে শুরু করে খুচরা দোকানদারদের তিনি ডেকে ডেকে বলছিলেন, “ভাইয়া ও ভাইয়া। আমার ছেলের বয়স তো এখনো ১৭ হয় নাই, বাচ্চা ছেলে সে এখনো। তারে কেন জেলে রাখলো? ভাইয়া কিছু একটা করেন না।আমার ছেলেটারে এনে দেন না ভাইয়া।” খালি চোখের জল ঝরাচ্ছেন আর ছুটোছুটি করছেন। বারবার রাহীকে দেখতে চাইছেন, নিজের হাতে ছেলের জন্য ভাত রান্না করে এনেছিলেন খাওয়াবে ভেবে। কালকে টাকা খসানোর সময় তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলো, এই পরিমাণ টাকা দিলে নাকি তিনি তার ছেলেকে সরাসরি দেখতে পারবেন, ছেলে কোন রুমে কি অবস্থায় আছে সেটাও দেখতে পারবেন, নিজ হাতে খাইয়ে দিতে পারবেন। তাইতো গর্ভধারিনী মা তার নাড়ী ছেড়া ধনের জন্যে নিজ হাতে খাবার রান্না করে নিয়ে গেছেন। এইসব যখন শুনছিলাম তখন নিজেকে সামলে নেয়া বেশ কষ্টকর হচ্ছিল। আইনের পোশাক পরে বে-আইনী কাজ করলে তখন তাকে শাস্তি পেতে হয় না অথচ লিখলে পরে জেলের মাঝে পঁচতে হয়!!! রাহীর মায়ের দূর্বলতার সুযোগ বেশ ভালোভাবেই নিচ্ছে তারা এবং এটা নিঃসন্দেহে আগামীতেও নিবে, তাই ভাবছি সামনে থেকে আন্টিকে আসতে বারণ করবো।

উল্লাসের বাবা আমাকে বারবার বলছিলো আমরা যেনো এইসব নিয়ে না লিখি। একপর্যায়ে তিনি স্পষ্ট করে আমার নাম এবং ইস্টিশন ব্লগের নাম উল্লেখ করে অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই তাদের উদ্দেশ্যে বলি, যারা ঘরে বসে টিপাটিপি করছো আর এইসকল উল্টা-পাল্টা সংবাদ সরবরাহের মহান দায়িত্ব নিয়েছো, পারলে পকেটের টাকা খরচা করে রাহী এবং উল্লাসের জন্য দৌঁড়াদৌঁড়ি করো। তখন প্রমাণিত হবে তোমরা তাদের শুভাকাঙ্খী নইলে তোমরা “দ্য গ্রেট চুতিয়া”। এখন কোথায় ঐ পরিবারগুলোকে সাহস দিয়ে তাদের পাশে থাকবো তা না, উল্টা বালের ডর লাগাইতেছো তোমরা। নূন্যতম লজ্জাবোধ থাকলে আগামীতে এইসকল কাজ করা থেকে বিরত থাকবা।

ফেসবুক এবং অনলাইনে দেখলাম এই মামলার বেশ কিছু নথিপত্র উন্মুক্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আমি অনুরোধ করবো এসব সরিয়ে ফেলতে। এইসকল কাগজ আমার কাছেও আছে এরপরেও প্রকাশ করি নাই। ঐ সকল কাগজ পত্রে তাদের বিস্তারিত ঠিকানা দেয়া আছে। বর্তমানে জাত শুয়োরের বাচ্চাদের কারণে ছেলেগুলো এখন জেলে পঁচে মরছে এবার কি তাদের পরিবারকে পঁচাতে চান? আপনাদের কি এইটুকু জ্ঞানবুদ্ধি নাই জাত শুয়োরের বাচ্চাগুলো কতবড় নৃশংস!!! আজকের পর থেকে যদি ঐ পরিবারের কিছু হয় স্পষ্টতই সেসবের জন্য দায়ী থাকবেন যারা এসব প্রকাশ করেছেন এবং নির্ঝর মজুমদার যিনি সরবরাহ করেছেন।

পরিশেষে এটাই বলার তাদের পরিবারকে এই ব্যাপারে কেউ যেন বারবার বিরক্ত না করেন। ইতোমধ্যে বহু শুভাকাঙ্খী তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করছেন জেনে খুশি হয়েছি, সেই সকল শুভাকাঙ্খীদের বলবো আপনাদের যাবতীয় জিজ্ঞাসা ইস্টিশন ব্লগে এসে করুন। এখান থেকেই আপনাদের উত্তর যতটুকু সম্ভব দেয়ার চেষ্টা হবে। দয়া করে রাহী, উল্লাসের পরিবারকে বিব্রত করবেন না, এমনিতেই তারা ব্যাপক মনোকষ্টেই আছেন। আশা করি ব্যাপারটুকু স্বাভাবিকভাবে নিবেন।

*** সঠিক এবং আসল তথ্য ছাড়া রাহী এবং উল্লাস সম্পর্কে কিছু বলা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানালাম আপনাদের সকলকে। কেননা আমাদের সকলের তথ্য বেশ ভালোভাবেই আমলে নিচ্ছে প্রশাসন।

১১ thoughts on “জালের ওপারে দেখে এলাম তাদের….

  1. অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা সুমিত ভাই
    অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা সুমিত ভাই ।আমাদের হয়ে আপনি যা করছেন তার ঋন শোধ হবার নয় ।

    আইনের পোশাক পরে বে-আইনী কাজ করলে তখন তাকে শাস্তি পেতে হয় না অথচ লিখলে পরে জেলের মাঝে পঁচতে হয়!!!

    ঠিক বলেছেন ।আমাদের কারাগারের অবস্থা খুবই নাজুক ।রাহী আর উল্লাসের পরিবার যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হোন সেজন্য যতটুকু সম্ভব প্রচেষ্টা করবেন আশাকরি ।

  2. আমি সচলায়তনে একটি লেখায়
    আমি সচলায়তনে একটি লেখায় মামলার চারটি কাগজ পোস্ট করেছিলাম। এই লেখাটি পড়ে সেখান থেকে বাবা-মা’র নাম আর সব ঠিকানা মুছে দিয়েছি।

  3. ভাইয়া, আইনের মার প্যাচ বুঝিনা
    ভাইয়া, আইনের মার প্যাচ বুঝিনা । রাহী আর উল্লাস কে ফেরত নিয়ে আসেন । ষাকায় আছি । বের হতে পারিনা । অন লাইনের এই মানুষ গুলাকেই আপন লাগে । নিয়ে আসেন ভাইয়া…

  4. আমি আরও একজন উকিলের কথা বলতে
    আমি আরও একজন উকিলের কথা বলতে চাইছিলাম যিনি সুব্রত শুভ দাদা দের হয়ে মামলা লড়েছিলেন। কিন্তু এখন যখন ব্রহ্মপুত্র ভাই মামলাটা দেখছেন তাহলে চলুক। রাহী আর উল্লাস আমাদের মাঝে ফিরে আসুক এই প্রার্থনাই করি।

    —————————————————
    বন্ধু শক্ত হাতে ধর হাল,
    পাড়ি দিতে হবে অনন্ত পথ দূর পারাবার।…….

    1. যাই করছি শুধু স্বাধীনতা আর
      যাই করছি শুধু স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কন্ঠগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, নিজের জন্য, আগামীর একটা সুন্দর অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *