কবিগান, কবিয়াল ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি

কবিগান মুলত লোকসঙ্গীত যা এখন বিলুপ্ত। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কবিগানের উৎপত্তি ধরা হয়। আবহমান গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অংশ এই কবিগান। কবিগান দুটিদলের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। একজন গানের মাধ্যমে অন্যদলকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় অথবা আক্রমন করে যে এই কাজটি করে তাকে কবিয়াল বা সরকার। কবিয়ালরা একধারে গায়ক ও কবি। কবিগানের আসর বসাত তৎকালীন রাজা, জমিদার বা প্রভাবশালী কেও। তবে এই আসরে সর্বপ্রথমেই আক্রমন করে গান গাওয়া হত না। প্রতিযোগিতা শুরু হত বন্দনা বা গুরুভক্তি সঙ্গিতের মাধ্যমে। বন্দনা অংশটি সরস্বতী, গনেশ, স্রোতা ও জনতার উদ্দেশে গাওয়া হত। কবিয়ালরা ইচ্ছামত গান গাইতে পারতেন। বন্দনার পর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গান গাওয়া হত। তারপর সখী সংবাদ”, “বিরহ”, “লহর” ও “খেউড় বিষয়ে চারটি গান গাওয়া হত। সর্বশেষ মুল প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

ওইসময়ে একাধিক কবিয়াল তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেগযোগ্য হল হরু ঠাকুর (১৭৪৯–১৮২৪), নিতাই বৈরাগী (১৭৫১–১৮২১), রাম বসু (১৭৮৬–১৮২৮), ভোলা ময়রা ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। এরা সবাই কলকাতার বিখ্যাত কবিয়াল ছিল। অন্যবাংলায়ও বেশকিছু নামকরা কবিয়াল বা সরকার ছিল বলহরি দে (১৭৪৩–১৮৪৯), শম্ভুনাথ মণ্ডল (১৭৭৩-১৮৩৩), তারকচন্দ্র সরকার (১৮৪৫–১৯১৪), রমেশচন্দ্র শীল (১৮৭৭–১৯৬৭), রাজেন্দ্রনাথ সরকার (১৮৯২–১৯৭৪)। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ভোলাময়রা। ভোলাময়রা আবার আরেক নামকরা কবিয়াল হরু ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন।

তবে এসব কবিয়ালদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ছিল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। তিনি পর্তুগিজ কিন্তু জন্ম ছিল কলকাতাতেই। তার পিতা পর্তুগিজ বনিক ছিলেন সেই সুবাধে কলকাতাতে তিনি ব্যাবসা করতেন। কিন্তু অ্যান্টনি কবিগানের উপর দুর্বল হয়ে পরেন। তার তীব্র ইচ্ছা হয় কবিয়াল হওয়ার কিন্তু সমস্যা ভাষার। তিনি পণ্ডিত দিয়ে সংস্কৃত ও বাংলা ভালভাবে রপ্ত করতে সমর্থ হন। শুরু করেন কবিয়ালের জীবন। আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেন। লোকমুখে শোনা যেত তার সাথে যখন ভোলাময়রার প্রতিযোগিতা হত তখন সেখানে উৎসবভাব বিরাজ করত। অ্যান্টনিফিরিঙ্গির ভালো নাম হ্যান্সম্যান এন্টনি। তাকে নিয়ে অনেক আগে একটি চলচিত্র নির্মিত হয় যাতে এন্টনির ভুমিকায় অভিনয় করেন উত্তম কুমার। কিছুদিন আগে কলকাতায় নির্মিত হয় জাতিস্মর যা এন্টনির জীবন অবলম্বনে তৈরি। কিন্তু সেখানে যা দেখানো হয়েছে তা সবই সঠিক নয় কারন এন্টনির সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া গেছে তা অতি সামান্য। যেখানে তার জন্ম ও মৃত্যুনিয়ে এখনো কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি।

কবিয়ালরা মুলত মুখে মুখে গান বাঁধত যার ফলে কবিগান গুলো লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয় নি। একটা কবিগানের নমুনা এখানে দেয়া হল ঃ

ময়মনসিংহের মুগ ভালো, খুলনার ভালো কই।

ঢাকার ভালো পাতাক্ষীর, বাঁকুড়ার ভালো দই।।

কৃষ্ণনগরের ময়রা ভালো, মালদহের ভালো আম।

উলোর ভালো বাঁদর পুরুষ, মুর্শিদাবাদের জাম।।

রংপুরের শ্বশুর ভালো, রাজশাহীর জামাই।

নোয়াখালির নৌকা ভালো, চট্টগ্রামের ধাই।।

দিনাজপুরের কায়েত ভালো, হাবড়ার ভালো শুঁড়ি।

পাবনা জেলার বৈষ্ণব ভালো, ফরিদপুরের মুড়ি।।

বর্ধমানের চাষী ভালো, চব্বিশ পরগণার গোপ।

গুপ্তিপাড়ার মেয়ে ভালো, শীঘ্র-বংশলোপ।।

হুগলির ভালো কোটাল লেঠেল, বীরভূমের ভালো বোল।

ঢাকের বাদ্য থামলেই ভালো, হরি হরি বোল।

সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, বাংলাসাহিত্যর ইতিবৃত্ত , বাংলাপিডিয়া, দৈনিক জনকণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *