রূপচাঁদ পক্ষী ও সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি

আমার বসতবাটির অতি সন্নিকটে একখানি মধ্যমাকৃতির বাটিকা বিদ্যমান। উক্ত বাটিকার পশ্চাতেই ভুষূন্ডীর ময়দান, রাত্রিকালে চতুর্দিক বড়ই নিরব থাকে। বাটিকামধ্যে একখানি বটবৃক্ষ দন্ডায়মান। উহার নিম্নদেশে একখানি কোটর আমি সদা পরিচ্ছন্ন করিয়া রাখি। কোটরমধ্যে বসিয়া আমি রাত্রিকালিণ গঞ্জিকাসাধনা করিয়া থাকি। অদ্য নিশীথে রাত্রিকালীণ আহারাদী সমাপ্ত করিয়া গঞ্জিকার পুটুলিখানি পাকড়াইয়া উক্ত স্থানে হাজির হইয়া দেখি, সিড়িঙ্গে চেহারার জনৈক বৃদ্ধ দিব্বি আসন পাতিয়া বসিয়া আছে।

পুছিলাম, “মহাশয়ের পরিচয়”

জবাব আসিলো, “আমি পক্ষী”

কহিলাম, “মহাশয়কে তো জ্বলজ্যান্ত মানুষ রূপেই পরিলক্ষিত হইতেছে, পক্ষীর বিষয়াদি কিবা?”


আমার বসতবাটির অতি সন্নিকটে একখানি মধ্যমাকৃতির বাটিকা বিদ্যমান। উক্ত বাটিকার পশ্চাতেই ভুষূন্ডীর ময়দান, রাত্রিকালে চতুর্দিক বড়ই নিরব থাকে। বাটিকামধ্যে একখানি বটবৃক্ষ দন্ডায়মান। উহার নিম্নদেশে একখানি কোটর আমি সদা পরিচ্ছন্ন করিয়া রাখি। কোটরমধ্যে বসিয়া আমি রাত্রিকালিণ গঞ্জিকাসাধনা করিয়া থাকি। অদ্য নিশীথে রাত্রিকালীণ আহারাদী সমাপ্ত করিয়া গঞ্জিকার পুটুলিখানি পাকড়াইয়া উক্ত স্থানে হাজির হইয়া দেখি, সিড়িঙ্গে চেহারার জনৈক বৃদ্ধ দিব্বি আসন পাতিয়া বসিয়া আছে।

পুছিলাম, “মহাশয়ের পরিচয়”

জবাব আসিলো, “আমি পক্ষী”

কহিলাম, “মহাশয়কে তো জ্বলজ্যান্ত মানুষ রূপেই পরিলক্ষিত হইতেছে, পক্ষীর বিষয়াদি কিবা?”

তিনি কহিলেন, “ঘোর কলিকাল, যুব সমাজ উচ্ছন্নে গিয়াছে। বলি ওহে মর্কট, কদ্যপিও কি পক্ষীর নাম কর্ণগোচর হয় নাই?”

কহিলাম, “দেখুন মহাশয়, আজি অদ্যপ্রহরেও গঞ্জিকা সেবন করি নাই, যে পক্ষীকে মনুষ্যরূপে ভ্রমিব। পংখবিহীন মনুষ্যকন্ঠী পক্ষীর দর্শন আমার উর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষেও কেহ পায় নাই। আপনার পরিচয় কিবা, কিয়ৎমাত্র বিলম্ব না করিয়া প্রকাশ করুন। রাত্রি অনেক হইয়াছে, আমি সাধনা করিব”

মহাশয় কহিলেন, “মানির মান রাখিয়া বাক্যবর্ষন কর হে বারবণিতা সন্তান, আমি রূপচাঁদ পক্ষী”

ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিয়া গেল, কঠোর কন্ঠে কহিলাম, “ঢের হইয়াছে আপনার ঢপ, এবার গাত্রোত্থান করুন। রূপচাঁদ পক্ষী গতাসু হইয়াছেন আজি দ্বিশত বর্ষ হইয়া আসিলো। পঞ্চভূত ঢূঁড়িয়াও তাঁহাকে মিলিবে না, আপনি একটি শঠ”

তিনি মৃদু হাস্যে কহিলেন, “তব হস্তে গঞ্জিকা দেখিতেছি। কল্কিসজ্জা করিয়া মুখগ্নি কর হে শাখামৃগ, আমি প্রমাণ করিয়া দিব, আমিই আদি ও আসল পক্ষী”

বুঝিলাম বৃদ্ধের বড় বাড় বাড়িয়াছে, ফ্রড করিয়া গঞ্জিকা সেবনের মতলব। ঘুঘু দেখিয়াছ ফন্দ দেখ নাই। কিয়ৎমাত্র বিলম্ব না করিয়া কলকি প্রস্তুতপূর্বক অগ্নিসঞ্চার করিয়া উঠিতে পারিলাম না, বৃদ্ধ ছিনাইয়া লইয়া দম দিলো। আহঃ আহঃ সে কি দম, বৃদ্ধের দমদর্শনে আমারই বিভূতি বোধ হইল। বুঝিলাম, পাইলাম উহাকে পাইলাম। স্বয়ং রূপচাঁদ পক্ষী বিনে এ বিভূতি কদ্যপিও মিলিবে না।

ষষ্টাঙ্গ প্রণাম করিয়া কহিলাম, “গুরুদেব, আমি আপনার একলব্য। অদ্যবধি কোথা গুপ্ত রহিয়াছিলেন?”

পক্ষী মৃদু হাস্যে কহিলেন, “গতাসু হইয়াছিলাম, কৈলাশ শৃঙ্গে ভোলানাথের পদতলে ঠাঁই মিলিয়াছিলো। তাঁহার স্নেহধন্য হইয়া, তাঁহার প্রসাদে মত্ত ছিলাম।”

শুধাইলাম, “আজি তবে কিরুপে পষীলেন?”

তিনি কহিলেন, “আজি আসিয়াছি ভোলানাথের দূতরূপে। আ্মি তদন্ত নিমিত্তে প্রেরিত হইয়াছি”

পুছিলাম, “কিরূপ তদন্ত, গুরুদেব?”

তিনি কহিলেন, “সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি”

আশ্চর্য হইয়া পুছিলাম, “উহা কৈলাশে কি ঘটাইয়াছে?”

কহিলেন, “ কাহিনীবিস্তার শ্রবণ কর তবে,

মহেদেবের গঞ্জিকার স্টক শেষ হইয়া আসিতেছিল, ভৃঙ্গীকে পাঠাইয়াছিলেন স্পটে মাল আনিতে। আমি মানা করিয়াছিলাম, এ ভৃঙ্গী ভাং পাইলে সব বিস্মৃত হইবে, শুনিলেন না। সপ্তদিবস প্রতীক্ষায় কাটিয়া গেল। সর্বশেষ কলকি চলিতেছিলো, এমতে ভৃঙ্গী হন্তদন্তে হাজির হইলো। মহাদেব তো তৃতীয় নয়নে ভস্মই করিয়া দিতেন, ভৃঙ্গী করজোড়ে কহিলো, প্রভু, সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি। তৃতীয় নয়ন আপনা আপনি বুজিয়া গেল”

এই বলিয়া পক্ষী মহাশয় আরেকখানি বিভুতি দম মারিয়া লইলেন।

আমি পুছিলাম, “ততঃকিম, ততঃকিম?”

কহিলেন, “ভৃঙ্গী যাহা কহিলো, তাহা এরূপে,

ভৃঙ্গী ধরণীতে নামিয়া শুনিলো বঙ্গদেশে নাকি গঞ্জিকা বাম্পার ফলিতেছে। তথা নাকি আবালবৃদ্ধবণিতা লাইনে আসিয়া ছিন্নবস্ত্র প্যাঁচাইতেছে। তথা নাকি ইতিহাস প্রতিমূহুর্তে বদলাইতেছে। প্রথম পর্বতারোহী উবিয়া যাইতেছে। সদ্য নাকি জনৈক নির্বাসিত স্বঘোষিত রাজপুত্র ছিন্নবস্ত্র প্যাঁচাইয়া কহিয়াছে তাহার পিতাই বঙ্গদেশের প্রথম রাজা। সে ভাবিলো গঞ্জিকা সেবন বিনা এরূপ ছিন্নবস্ত্র কিরূপে প্যাঁচাইবে।

সে বঙ্গদেশে আসিয়া এক তরুণে জিজ্ঞাসিলো, লাইনে কিরূপে আসিতে হইবে? তরুণ পুছিলো, কিসের লাইনে আসিতে চান? বিদ্যুৎ বিলের লাইন, চতুর্চক্রশকটের লাইন, নাকি চরম উদাসের লাইন? ভৃঙ্গী বিভ্রান্ত হইয়া কহিলো, এদেশে ছিন্নবস্ত্রের এত প্রকার লাইন? তরুণ মৃদু হাসিয়া কহিলো, ছিন্নবস্ত্রের কথা পূর্বে কহিবেন তো, আপনি অনলাইনে গমন করুন, সেথা মুখপুস্তকে প্রবেশ করিতে হইবে। ভৃঙ্গী কষ্টেসৃষ্টে অনলাইনে আসিয়া মুখপুস্তকে প্রবিষ্ট হইলো।

আচ্ছা অনলাইন কি হয়, বাপু? আর মুখপুস্তক গ্রন্থখানিই বা কি?”

কহিলাম, “অনলাইন হইতেছে, আসনে অনড় বসিয়া লাইন মারফতে এক আশ্চর্য্য দর্শনশাস্ত্র চর্চাকেন্দ্র। ইহা এমনই শাস্ত্র, যাহা চর্চিত হইতে হইতে ছিন্নবস্ত্ররূপ ধারণ করে। আপনি বুঝিবেন না, মহাদেব স্বয়ং বুঝিবেন কিনা আমি সন্দিহান।

মুখপুস্তক হইতেছে ছিন্নবস্ত্র দর্শনের প্রধানতম শাস্ত্রগ্রন্থ। ইহা সদা পরিবর্ধনশীল, গঞ্জিকাই ইহার চালিকাশক্তি বলিয়া আমি ধারণা করিয়াছি। আপনি কহেন, ততঃকিম। আমি গঞ্জিকা প্রস্তুত করি”

পক্ষী পুণরায় আরম্ভ করিলেন,

“ যাহা হউক, ভৃঙ্গী মুখপুস্তকে প্রবিষ্ট হইয়া স্বনাম ঘোষনা করিবামাত্র কতিপয় ব্যক্তি উচ্চকন্ঠে উচ্চকিত হইয়া উঠিলো। একপক্ষ কহিলো, তুমি ভৃঙ্গী হইলে অনলাইনে কিরূপে, আর ভৃঙ্গী বলিয়া কেহই নাই। অপরপক্ষ কহিলো, তুমি একেশ্বরবাদের বুকে কুঠারাঘাত করিতেছ, তোমাকে কুপানো হইবেক। ভৃঙ্গী ঘাবড়াইয়া কহিলো, ওগো আমি কেবলই নিরীহ ভৃঙ্গী, মহাদেবের তরফে গঞ্জিকা ক্রয় করিতে আসিয়াছি।

অচম্বিতে হয়রান নামধারী এক একেশ্বর পুরোহিত ঘোষনা করিলো, সে স্ক্রিনশট মারিয়াছে। ইহা একটি ফেক নিক। উক্ত নিক হইতে গোষ্ঠানুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছে। ইহার নামে সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধিতে মোকদ্দমা করিয়া প্রত্যাঘাত করা হইবেক। ভৃঙ্গী কিছু বুঝিবার পূর্বেই কোটাল আসিয়া তাহাকে ফাটকে পুরিয়া দিল।

আচ্ছা, স্ক্রিনশট কাহাকে বলে? নিকই বা কি বস্তু? আর উক্ত অনুবিধিই বা কিরূপ?”

আমি দীর্ঘঃশ্বাস ত্যাগিয়া কলকি গুরুদেবের হস্তে হস্তান্তর করিয়া কহিলাম,

“ স্ক্রিনশট হইতেছে শাস্ত্রালোচনা কেন্দ্রে উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। কেন্দ্র হইতে কেহ পিছলাইয়া পলায়নরতঃ হইলেই, তাহার সূক্ষ্মশরীরকে আবদ্ধ করিয়া রাখা হয়। ইহাকে স্ক্রিনশট বলে। নিক হইতেছে স্বরূপ গোপনকরতঃ ভিন্নরূপের অবতার।

আর উক্ত অনুবিধি হইতেছে অজরূপে জন্ম লওয়া কতিপয় বরাহনন্দনের প্রতি রাস্ট্রপ্রধাণের প্রদেয় বর। এ একপ্রকার ব্রহ্মাস্ত্রবিশেষ।“

পক্ষী এক বিভূতিদম টানিয়া কহিলেন,

“ আহঃ আহঃ কত রঙ্গ এ বঙ্গদেশে। সত্যযুগের ন্যায় বরাহনন্দন অজরূপে জন্ম লয়। মানবসকল অবতার লয়। সূক্ষ্মশরীর আবদ্ধ করা হয়। সকলই গঞ্জিকার লীলা। যাহা হউক, কাহিনী আর বিশেষ নাই। তিন দিবসের সময় সূচক লইয়া ভৃঙ্গী মর্তে আসিয়াছিলো। ঘটনাপরাম্পরায় বিমূঢ় হইয়া আত্মবিস্মৃত হইয়াছিল। ষষ্ঠ দিবসে হুঁশ ফিরিলে সর্বশক্তিবলে ফাটক ফাঁড়িয়া বাহির হইয়া কামরূপ হইতে গঞ্জিকা ক্রয়পূর্বক সপ্তম দিবসে কৈলাশ পঁহুছিল।

মহাদেব সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি শুনিবামাত্র সেই যে সমাধিতে প্রবেশ করিলেন, তাঁহাকে আর কেহ টলাইতে পারিলাম না। অদ্য আমি সকলের পরামর্শে মর্তে আসিয়াছি তদন্তমারফত সকল তথ্য সংগ্রহের নিমিত্তে।“

আমি কহিলাম, “গুরুদেব অদ্য গঞ্জিকা সেবন করুন। আগামীকল্য হইতে তদন্ত আরম্ভ করা যাইবে”

পক্ষী সম্মত হইয়া আরেকবার বিভূতিটানে নিমগ্ন হইলেন।

২ thoughts on “রূপচাঁদ পক্ষী ও সপ্তপঞ্চশৎ অনুবিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *