জিরো আওয়ার্স প্রোগ্রাম

সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দ ,
আমি আজ বসে আছি বাসের প্রথম সারির এই কর্ণারের সিটটিতে । গাড়ি চলছে ঘন্টায় চল্লিশ কিলোমিটার বেগে । বাসের স্বচ্ছ জানালা ভেদ করে আসা রোদ আমার নীল জিন্স আর কালো টিশার্টের তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রিতে পৌছে দিয়েছে প্রায় । আমার নাকের ডগা নিশ্চয়ই চিকচিক করছে আর , আর আমার কপালের ঘাম ফোটায় ফোটায় নিচে পরছে ।
আজ আমি শ্রান্ত ।
না না , আমি কোনো কাহিনি শোনাতে আপনাদের সাথে যোগ দেইনি । না কোনো গল্প , না কোনো অভিজ্ঞতা । আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের কিছু সংক্ষিপ্ত চিত্‍কার আজ বেতার তরঙ্গের ঢেউয়ের মাঝে ছরিয়ে দেব ।

সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দ ,
আমি আজ বসে আছি বাসের প্রথম সারির এই কর্ণারের সিটটিতে । গাড়ি চলছে ঘন্টায় চল্লিশ কিলোমিটার বেগে । বাসের স্বচ্ছ জানালা ভেদ করে আসা রোদ আমার নীল জিন্স আর কালো টিশার্টের তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রিতে পৌছে দিয়েছে প্রায় । আমার নাকের ডগা নিশ্চয়ই চিকচিক করছে আর , আর আমার কপালের ঘাম ফোটায় ফোটায় নিচে পরছে ।
আজ আমি শ্রান্ত ।
না না , আমি কোনো কাহিনি শোনাতে আপনাদের সাথে যোগ দেইনি । না কোনো গল্প , না কোনো অভিজ্ঞতা । আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের কিছু সংক্ষিপ্ত চিত্‍কার আজ বেতার তরঙ্গের ঢেউয়ের মাঝে ছরিয়ে দেব ।
শ্রোতাবন্ধুরা , এই সবুজের নীড়ে পাখিদের গান আর নদীর কলতান শোনার জন্য এরকমই একটা বাসে যখন এসেছিলাম , ঘন্টা ত্রিশেক আগে , তখন আমি একা ছিলাম না । আমার পাসে কোনো অপরিচিত লোক বসে ছিলো না । জানালার বাইরের বাতাস , গাছপালা আর ধুলোবালিগুলো এত নির্জিব ছিলো না ।
বন্ধুগন , সেটা ছিলো একটা ফাল্গুনের সন্ধ্যা । যান্ত্রিক শহরে বৈশাখ বা মাঘের সাথে ফাল্গুনের তেমন পার্থক্য না থাকলেও সন্ধ্যাটা আমার কাছে শত বসন্তের শ্রেষ্ঠ সন্ধ্যা । আমি আমার বন্ধুর দোকানে বসে ছিলাম । ও এসেছিলো ওর কম্পিউটারের জন্য কিছু টুলস কিনতে । আমি নিতান্ত বোকা বলেই সেদিন খেয়ালই করিনি যে ও আমার প্রতিটা নড়াচরা লক্ষ্য করছে । ওকে সেদিন আমি দেখেছিলাম , ওর চেহারা , ওর উচ্চতা আর ওর সৌন্দর্য । বেশ ভালো করেই । এটা হতে পারতো আমার আর দশটা মেয়ে দেখার মতই , কিন্তু হয়নি কারন সপ্তাহ খানেক পর যখন আমি উত্তরা যাচ্ছিলাম এবং বাসে আমার পাসের সিটটা খালিও ছিলো , ও শাহবাগ থেকে বাসে উঠেছিলো । আমাকে দেখে আমার পাসেই বসে পরলো ।
বন্ধুগন , সেই বাসের শব্দ , নগরীর যানযট , হেলপার আর যাত্রিদের কোলাহল এবং সবকিছু ছাপিয়েও ওর প্রতিটা শব্দ অলংকারের মত ঝন ঝন করছিলো আমার কানে । সেই প্রথম আলাপেই মনে হয়েছিলো যে আমরা যেনো হাজার বছরের পরিচিত ।
সেই থেকে শুরু । এরপর ঢাকার অলিতে গলিতে , রিকশায় , বাসে বাদুরঝোলা হয়ে অথবা উদ্যানে ঘুরে শহর চষে বেরিয়েছি আমরা ।
বন্ধুরা , ও খুব কথা বলতো , ঘুরতেও খুব ভালোবাসত । লাজুক ছিলাম আমিই । অবাক চোখে ওর কথার ফুলঝুরি দেখতাম । রাস্তায় বা পার্কে শিশু দেখলেই ও ছুটে যেত । বলত দেখো কি সুন্দর ।
প্রিয় শ্রোতামন্ডলী , সেদিনও সূর্য পূর্ব দিকেই উঠেছিল , আর দশটা দিনের মতই ঢাকা ছিল কোলাহলপূর্ণ । আকাশও মেঘলা ছিলো না , ঝিরি ঝিরি বাতাসও বইছিলো না । তবু সেদিনের প্রতিটা মুহুর্ত আমার স্বৃতিপটের চিরস্থায়ী স্বৃতিতে অম্লান হয়ে আছে । ও খুব সেজেগুজেও আসেনি সেদিন । আর দশটা কথার মতই বললো ভালোবাসি । আরো বললো আমি একটা ভিতুর ডিম । সেইজন্য ওকেই নাকি বলতে হয়েছে । আমার আর কোনো কথাই বলতে হয়নি । ও নাকি জানে যে আমিও ওকে ভালোভাসি ।
বন্ধুরা , ভালোবাসা কি জিনিস আমি ঠিক জানতাম না , বুঝতামও না , কারন আমার জীবনটা ছিলো সাদা কালো । কিন্তু এরপর আমি বুঝতে শুরু করলাম । সেদিনের পর থেকে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সূখি পুরুষ ।
বন্ধুগন , দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিলো । ওর পছন্দের যায়গা ছিলো রেললাইন । রেল লাইনের উপর দিয়ে হাত ধরে হাটা আর পথশিশুদের সাথে গল্প করা । ও সব সময় সাথে চকলেট রাখতো । পথশিশুদের মুখে হাসি দেখলে ওর মুখটা উজ্জল হয়ে উঠতো ।
শ্রোতামন্ডলি , প্লানটা ছিলো আমারই । ওকে বল্লাম চলো ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসি ! ও আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলো । কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক করে গতকাল সকালে যখন আসবো ও হটাত্‍ করেই বললো যে আজকে কি না গেলেই নয় ! আমি বেশ বিরক্ত আর অবাক হয়ে বল্লাম , তুমি কি অসুস্থ ? ও বললো দিনটা যেন ওর কাছে ভালো ঠেকছে না । আমি হেসেই উরিয়ে দিলাম । আমার হাসি দেখে ওও হাসলো । কিন্তু হাসিটা কেমন যেনো অন্যরকম ছিলো ।
বন্ধুরা , এরকম একটা বাসেই আময়া ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলাম । সারাদিন ভবঘুরের মত ঘুরলাম । বন্দর থেকে দূরে , অনেক দূরে নদী , ধানক্ষেত আর মাটির রাস্তার পাসের গাছগুলোর ছায়ায় হাটতে হাটতে টেরই পাইনি সূর্য কখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে ।
আমরা ফিরতে শুরু করলাম । ততক্ষনে গ্রামের সব দস্যি ছেলেগুলো কুপির আলোয় পড়তে বসেছে । ও আমার বাহুটা শক্ত করে ধরে হাটছিলো । গ্রাম প্রায় পেরিয়ে এসেছিলাম । শহরের ল্যামপোস্ট তখনও বেশ দূরে । হাটছিলাম মফস্বলের আধাপাকা ইট সিমেন্টের গলি দিয়ে । চাঁদ তখনও ওঠেনি ।
বন্ধুগন , ওরা ছিলো চারজন , চারটে দুপেয়ো হায়েনা । আমার কিছুই করার ছিলো না । যখন ও প্রথম চিত্‍কারটা দিলো , আমি জ্ঞানশুন্য মানুষের মত মারতে গেলাম । পিছন থেকে ভারি কিছুর আঘাতে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম । আমার পাঁচটি ইন্দিয়ের সবগুলোই অবশ ছিলো শ্রবণিন্দ্রীয় ছারা । ওর অস্পষ্ট গোঙ্গানিগুলো আমার কানে আসছিলো । ও কাঁদছিলো । ওর কান্নার সূর বহু দূরের কোনো যন্ত্রনাদায়ক সূরের মত আমার কর্ণকুহরে ভেসে আসছিলো ।
এরপর কিছু মনে নেই । আজ দুপুরে আমি যখন নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিস্কার করলাম , তখন ও নেই । আমি ভাবতে পারছিলাম না । ওকে ওর ভাই এসে নিয়ে গেছে ।
বন্ধুগন , আমি কাঁদতে চাইনা । আমি ভুলতেও চাইনা । আমার এই কান্না-হাসির হাহাকার বেতার তরঙ্গে ছরিয়ে দেবো বলে এসেছি । আমার এ স্বৃতি সময়-স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চাই ।
বন্ধুরা , বেচে থাকুন , সুস্থ থাকুন , ভালো থাকুন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *