খুশিকরণ বটিকা

স্টেশনে ঐ একটিমাত্র ডাক্তার।

স্টেশনে ঐ একটিমাত্র ডাক্তার।

অজপাড়াগাঁয়ের ধারে এক জরাজীর্ণ স্টেশন। স্টেশনে কয়েকটি মাত্র দোকান, তাহার একটি দোকানে এই ডাক্তার চেম্বার খুলিয়া বসিয়াছেন। ডাক্তার বলিতে যে খুব হোমরাচোমরা কেউ তাহা নহে, ডিগ্রীর ভাঁড়ারটা খুব বড় নহে কিন্তু আশেপাশের দশ গ্রাম মিলিয়া ঐ একটি মাত্র ডাক্তার। ডাক্তার বলুন বা কবিরাজ কিম্বা ফকির জাতীয় যা কিছু তাহা ঐ একটি মাত্র লোক! ঔষধপত্র, গাছগাছড়া এমনকি ঝাড়ফুঁক, যাহার যেমনটি খুশি তাহার জন্য তেমনটি ব্যবস্থা রহিয়াছে। ডাক্তারের সম্বল বলিতে একটি মাত্র বাক্স, বাক্সটির বয়স সম্ভবত ডাক্তারের বয়সকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হয়। এই সম্বলকে পুঁজি করিয়া সেই মান্ধাতার কাল হইতে ডাক্তার সাহেব মানুষের সেবা করিয়া আসিতেছেন, মানুষ-ও তাহার সেবা লইয়া দিব্যি বাঁচিয়া বর্তিয়া রহিয়াছেন। কেহ যদি ইচ্ছা পোষণ করেন তো তাহাকে সম্মিলিত ব্যবস্থাপত্র-ও ডাক্তার সাহেব দিয়া থাকেন, রোগ ভাল না হইয়া যাইবে কোথায়?

তাহার ডিসপেনসারিতে আজ রোগী নাই। ভাঙ্গা বাক্সখানা টেবিলের উপর রাখিয়া তাহার উপর মাথা খানা দিয়া তিনি ঝিমাইতেছিলেন, এমন সময় এক লোক আসিয়া হাজির হইলো। লোকটির চেহারা উস্কুখুস্ক, জরাজীর্ণ পোশাকের নীচে হাড় জিরজিরে শরীরখানা দরিদ্রতার অন্যতম সাক্ষী হইয়া টিকিয়া রহিয়াছে। বয়স খুব বেশি নয় কিন্তু তাহার কঙ্কালসার শরীরের ঝুলেপড়া চামড়াগুলো বড় রকম করিয়া চোখে বিঁধিতেছে। লোকটি কয়েক ক্রোশ দূর হইতে আসিয়াছে তাই সে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাঁপাইতে লাগিল, ক্ষনকাল কোন কথা কহিতে পারিল না। ডাক্তার সাহেব তাহাকে পাশের জলের কলশি দেখাইয়া জলপানের নির্দেশ করিলেন। লোকটি জল খাইয়া শান্ত হইলো।

ঃ কি হইয়াছে রে তোর?- ডাক্তার জানিতে চাহিলেন। লোকটি আশেপাশে একটু চোরের মতো চাহিয়া দেখিল। তারপর যথাসম্ভব ডাক্তারের কানের কাছে মুখ নিয়া আসিয়া কহিল
ঃ ডাক্তার সাহেব, আমি বড় বিপদে পড়িয়াছি। আমাকে আপনি বাঁচান।

ডাক্তার লোকটির মুখের উৎকট দুর্গন্ধে দমবন্ধ করিয়া ফেলিলেন। ওয়াক থুঃ করিয়া একদলা থুতু লোকটির মাথার উপর দিয়া বাইরে নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন
ঃ আগে বলবি তো কি হইয়াছে।
ঃ ডাক্তার সাহেব, আমার বিবি আমাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে বলিয়া মনস্থ করিয়াছে। আমি তাহাকে এখন আর আগের মতো খুশি করিতে পারিতেছি না। অবশ্য, দীর্ঘকাল হইতেই এমনটি চলিতেছে, ইদানিং তা একবারেই শেষ হইয়া আসিয়াছে। আজ সকালে ঝাড়ুপেটা করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছে এক্ষন একারনেই আপনার শরণাপন্ন হইয়াছি।

ডাক্তার গম্ভীর মুখে চিন্তা করিতে লাগিলেন। কি চিকিৎসা দেওয়া যাইতে পারে তাহা ক্ষনকাল ভাবিয়া দেখিয়া বাক্স খানা টানিয়া লইয়া জিগ্যেস করিলেন

ঃ তোর নাম কি?
ঃ আজ্ঞে, আইজুদ্দিন।
ঃ বয়স?
ঃ চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ হইবে। ঠিক বলিতে পারি না তবে যুদ্ধের পর পরেই জন্মাইয়াচি বলিয়া সকলে জানে।

ডাক্তার একটা শিশি বাহির করিয়া তাহা হইতে পাঁচ খানা বড়িসদৃশ গোল গোল বস্ত একটি কাগজের প্যাকেটে ভরিলেন। প্যাকেটের গায়ে কয়েকটি কলমের দাগ টানিয়া কয়টি করিয়া কখন কখন খাইতে হইবে তাহা নির্দেশ করিলেন। প্যাকেট খানা লোকটির হাটে তুলিয়া দিয়া কহিলেন

ঃ পাঁচ খানা বড়ি দিলাম। এক্ষন দুই খানা বড়ি একসাথে খাইয়া নে। বাড়ি প্রবেশ করিয়া এক খানা খাইবি আর তোর বউকে খুশি করিতে যাইবার আগে আরেক খানা। বাঁকি এক খানা তুলিয়া রাখবি, পরে আরেকবার খুশি করিবার ইচ্ছে করিলে তখন ওটা কাজে লাগিবে। এইবার কড়ি ফ্যাল।

লোকটি দুইটা বড়ি খাইয়া বাঁকি তিনটি পকেটে পুরিল। ডাক্তারের টাকা পরিশোধ করিয়া স্টেশন ছাড়িয়া গ্রামের পথ ধরিল। কিছুদূর যাইতেই তাহার চোখে পড়িল এক অষ্টাদশী তরুণী এক বাড়ির বারান্দা ঝাড়ু দিতেছে। তাহার পোশাক দেখিয়াই বলিয়া দেওয়া যাইতেছে যে সে কাজের মেয়ে। তবে তাহার শরীর খানা দেখিবার মতন, সে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকাইয়া রহিল। মেয়েটি হয়তো খানিকটা ভ্রষ্টা ছিল, লোকটিকে এভাবে তাকিয়া থাকিতে দেখিয়া ইঙ্গিতে কাছে ডাকিল। দুটো বড়ির কাজ তখন শুরু হইয়া গিয়াছে, সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়েটিকে অনুসরণ করিয়া গৃহে প্রবেশ করিল। তরুণীকে খুশি করা তখনও শেষ হয় নাই এমন সময় বাড়ির মেয়েটি আসিয়া দেখিয়া ফেলিল। হন্তদন্ত হইয়া কাজের মেয়েটি দাঁড়াইয়া পড়িল আর “ দাড়াও, দেখাচ্ছি মজা” বলিয়া মাকে নালিশ জানাইতে যাইবার উদ্ধত হইতেই তরুণীটি মেয়েটিকে ধরিয়া ফেলিল। লোকটিকে ইঙ্গিতে জানাইল যে মেয়েটি যদি তাহার মাকে নালিশ করিয়া দ্যায় তবে তা খারাপ হইবে তাই মেয়েটি যেন কিছু না কহিতে পারে তাহার জন্য তাহাকেও একটু খুশি করিয়া দেওয়া হোক। এইবার লোকটি আরেক খানা বড়ি খাইয়া মেয়েটিকে খুশি করিয়া দিল। বাড়ি হইতে বাহির হইবার প্রাক্কালে এইবার স্বয়ং বাড়ির গিন্নি পথরোধ করিয়া দাঁড়াইলেন, মেয়েটি এইবার লোকটির কানে কানে কহিল যে যদি এই কথা মা তাহার বাবার কানে তোলে তাহা হইলে তা নির্ঘাত খারাপ কিছু হইবে সুতরাং তাহার মা যেন বাবার কানে কথা না তুলিতে পারে তাহার জন্য মা-কেও খুশি করিয়া দেওয়া হোক। লোকটি এইবার আরেক খানা বড়ি খাইয়া লইল। লোকটি ভাবিয়াছিল, শেষ বড়িটা হয়তো বাঁচিয়া যাইবে এবং বাড়িতে গিয়া আর বউয়ের ঝাঁটার তাড়া খাইতে হইবে না কিন্তু ভাগ্য-বিড়ম্বনা আর কাহাকে বলে? বাড়ির শাশুড়ি যেন কেমন করিয়া জানিয়া ফেলিয়াছে তাই মা-র অনুরোধে শাশুড়ির জন্য শেষ বড়িটাও শেষ করিতে হইলো।

ক্ষণকাল পরে উপায় না দেখিয়া ডাক্তারের কাছে আসিয়া লোকটি হুমড়ি খাইয়া পায়ের উপরে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল। ডাক্তার হতভম্ভ হইয়া গেলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া যাহা জানিতে পারিলেন তাহা শুনিয়া তাঁর ডাক্তারি বিদ্যার উপর বিশ্বাস আরও চতুর্গুণ বাড়িয়া গেল। এতদঞ্চলে অব্যর্থ ঔষধ একমাত্র তিনিই জানেন এই গর্বে তাহার বুক খানা আড়াই হাত প্রসারিত হইয়া উঠিল। তিনি আরও খুঁটিনাটি জানিবার জন্য জিগ্যেস করিলেন

ঃ তা কোন বাড়িতে এই কাণ্ডটি ঘটাইয়া আসিয়াছ?

লোকটি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া একটি বাড়ি দেখাইয়া দিল। ডাক্তারের কেমন যেন মাথা গুলাইয়া উঠিল, হটাত তাহার চোখের সমুখে অসংখ্য জোনাকি পোকার আলো ঝিলমিল করিতে লাগিল। তিনি জ্ঞান হারাইয়া পড়িয়া গেলেন। লোকটি ভয় পাইয়া গেল কিন্তু অন্য আর কেউ না থাকিবার কারনে তাহাকেই জলের ব্যবস্থা করিয়া ডাক্তারের চোখে মুখে ঝাপটা মারিতে হইলো।
ক্ষনকাল পর ডাক্তারের চেতনা ফিরিয়া আসিলে লোকটি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করিল

ঃ আপনার কি হইয়াছে ডাক্তার বাবু?

ডাক্তার বাবু কোন উত্তর করিলেন না। টলিতে টলিতে হাঁটিয়া তাহার বাক্স খানার কাছে গিয়া তাহা হইতে শিশিটি বাহির করিলেন। শিশি হইতে এক খানা বড়ি লইয়া তাহা লোকটির হাতে দিয়া কহিলেন

ঃ বাড়ির সবাইকে যখন খুশি করিয়া আসিয়াছ তখন আমি বাদ থাকিব কেন? এই লও একটা বড়ি, এবার আমাকেও খুশি করিয়া যাও।

২৭ thoughts on “খুশিকরণ বটিকা

  1. হাসতে হাসতে পেটে ব্যাথা ধরে
    হাসতে হাসতে পেটে ব্যাথা ধরে গেলো আইজুদ্দিন ভাই ।
    আপনার গল্পের ডাক্তার এবং রোগী দুজনেই মারাত্মক রসিক!

    1. আগে ডাক্তারটিকে খুজিয়া
      আগে ডাক্তারটিকে খুজিয়া দেখুন।
      তাহাকে পাওয়া গেলে বটিকার সন্ধান-ও নিশ্চয় পাওয়া যাইবে।
      শুনেছি, এখনো ঐ স্টেশনের ধারেই তাঁর চেম্বার।
      প্রয়োজন হইলে সেখানে যোগাযোগ করিতে পারেন।

        1. সম্ভবত পুরোটা না পড়িয়া
          সম্ভবত পুরোটা না পড়িয়া মন্তব্য করিতেছেন।

          ডাক্তার গম্ভীর মুখে চিন্তা করিতে লাগিলেন। কি চিকিৎসা দেওয়া যাইতে পারে তাহা ক্ষনকাল ভাবিয়া দেখিয়া বাক্স খানা টানিয়া লইয়া জিগ্যেস করিলেন
          ঃ তোর নাম কি?
          ঃ আজ্ঞে, আইজুদ্দিন।
          ঃ বয়স?
          ঃ চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ হইবে। ঠিক বলিতে পারি না তবে যুদ্ধের পর পরেই জন্মাইয়াচি বলিয়া সকলে জানে।

          পড়িয়া দেখুন, আইজুদ্দিন খাইয়াছে।

          1. ওহ! তাহলে আপনিই সেই
            ওহ! তাহলে আপনিই সেই ……….! সরি বস, আপনাকে আসলে চিনিতে পারি নাই। মুরিদানদের দয়া দক্ষিনায় বেশ বেঁচে বর্তে আছেন দেখছি।

          2. মুরিদানদের দয়া দক্ষিনায় বেশ

            মুরিদানদের দয়া দক্ষিনায় বেশ বেঁচে বর্তে আছেন দেখছি।

            খুব দুর্বোধ্য ঠেকিতেছে।
            আর আমিই সেই, তাহা কিভাবে বুঝিলেন?
            গল্পের আইজুদ্দিন আর লেখক আইজুদ্দিন কে এক করিয়া গুলাইয়া ফেলিয়াচেন।
            খুব আফসোস!

  2. বড়ি গলাধঃকরন না করিয়াই খুশি
    বড়ি গলাধঃকরন না করিয়াই খুশি হইয়া গেলুম। পাগল লাড়িয়ে যাও………… :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:

    1. ইন্নানিল্লাহ। আপনি মরহুম
      ইন্নানিল্লাহ। আপনি মরহুম মানুষ। বেহেস্তে গিয়া আঙ্গুর বেদানা খাইবেন। তা না, এখানে আইসা হাসতে হাসতে পেটে ব্যাথা ধরাইয়া ফেললেন। এইডা কুনু কাজের কাম হইলো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *