শুক্রবার ও অন্যান্য

শুক্রবার।

একটা শব্দ এই দেশের সবচেয়ে কর্মঠ মানুষটিকেও অলস করে ফেলতে পারে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে যে ছেলেটিকে সকাল সাতটায় চোখ ডলতে ডলতে দোকানের শাটারের তালা খুলতে দেখা যায়, সেখানে শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায়ও তার দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। সপ্তাহের অন্যান্য দিনে খুব সকাল থেকে মাছ-আলু-পিঁয়াজ-পালংশাক বলে কর্কশভাবে চিৎকার করতে থাকা ভ্রাম্যমাণ তরকারির বাজারের দোকানদার তথা নানা কিসিমের হকারের কন্ঠ এদিন একটু দেরীতেই শোনা যায়।


শুক্রবার।

একটা শব্দ এই দেশের সবচেয়ে কর্মঠ মানুষটিকেও অলস করে ফেলতে পারে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে যে ছেলেটিকে সকাল সাতটায় চোখ ডলতে ডলতে দোকানের শাটারের তালা খুলতে দেখা যায়, সেখানে শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায়ও তার দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। সপ্তাহের অন্যান্য দিনে খুব সকাল থেকে মাছ-আলু-পিঁয়াজ-পালংশাক বলে কর্কশভাবে চিৎকার করতে থাকা ভ্রাম্যমাণ তরকারির বাজারের দোকানদার তথা নানা কিসিমের হকারের কন্ঠ এদিন একটু দেরীতেই শোনা যায়।

কেউ বিরক্তমুখে কর্মস্থলে যাওয়ার বাস ধরার জন্য রিকশা খোঁজে। আবার কেউ রিকশা খোঁজে বাজার থেকে সকাল সকাল তাজা মাছগুলো সবার আগে কিনে আনতে। কখনো সখনো রিকশা থেকে নামার পর রিকশাওয়ালার শ্রান্ত চেহারায় আবদার শুনতে হয়, “আইজ শুক্কুরবার, পাঁচটা ট্যাকা বেশি দিয়েন।” পরিবার সন্তানাদিকে নিয়ে চারটে ভালো কিছু খাওয়ার ইচ্ছের কথাটা অবশ্য যাত্রীকে বলা হয়ে ওঠে না।

সুয্যি মামা সেভাবে এখনো তেঁতে ওঠেন নি, মাটিতে নিজের ছায়া অতোটা স্পষ্ট নয়। সিগারেটের নীলাভ ধোঁয়া ধূসর আকাশের দিকে উঠতে উঠতে একসময় মিলিয়ে যায়। যদিও তার আগে ফুসফুসে কালি লেপে দিয়ে যেতে ভুল করে না। দিক, আর যা ছিল তার প্রায় সবই পুড়ে কালো হয়ে গেছে, আর এ তো ফুসফুস। স্মৃতি পোড়া ধোঁয়ার রং কেমন হতে পারতো তাহলে ? একেক রকম স্মৃতির জন্য ধোঁয়ার রং একেক রকম, নীল, সাদা, কালো, ধূসর ইত্যাদি। মাল্টিকালারড গ্রাফিক ভিজুয়ালাইজেশনে বরাবর খারাপ আমি, কালার কম্বিনেশন নিয়ে বেশি ভাবতে গেলে মস্তিস্ক সাময়িকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারায়। রং নিয়ে ভাবাভাবি আপাতত বাদ।

ফেরার পথে সিনিয়র এক আঙ্কেল মানে পরিচিত একজন দোকানদার, দেখে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কাছাকাছি যাওয়ার পর অবাক হওয়া স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এতো সকালে ?” বিগলিত হাসির ভান করে উত্তর দিলাম, “এর আগেও তো সকালে আমাকে দেখেছেন।” উনি বললেন, “আগেও দেখেছি ? নাহ, এতো সকালে আগে দেখি নাই। খুব সকালে ওঠো নাকি ?” দ্বিতীয় দফা নিঃশব্দ হাসির রেখা এঁকে বললাম, “সবসময় না, মাঝে মধ্যে। তাছাড়া এখন তো এতোটা সকালও নয়। আটটা প্রায় বেজে গেছে। আপনি তো আরও আগে দোকান খোলেন, সাড়ে সাতটায়।” কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে এবার উনি বললেন, “রুটিন চেঞ্জের দরকার আছে অবশ্য। মাঝে মধ্যে একটু ব্যতিক্রম করা ভালো।” দোকানের শাটার খোলায় মনোযোগ দিলেন তিনি। আর কোনো কথা না বলে হাঁটা দিলাম বাসার দিকে। রাতে ঘুমোই নি শুনলে শক পেতে পারেন।

গলির মধ্যে আসতেই একটু অন্য রকম লাগলো। শেষ মাথায় দুটো উঁচু বিল্ডিং ছাপিয়ে নিজেকে মেলে রাখা ঘোলাটে আকাশের নিচে গলিটা এখন ভীষণ রকমের নির্জন। সকাল থেকেই কিছুক্ষণ পর পর বাতাস বইছে, গলির ভেতরে সে এখন আরেকটু জোরালো। ডান পাশের একটা কাঠের দোতলার বারান্দায় এবং একটা নির্মাণাধীন ভবনের নিচে হলদে ফিলামেন্ট বাল্ব জ্বলছে। ফিলিপস বাত্তি হতে পারে, অথবা অন্য কোন ব্র্যান্ড। ম্লান হয়ে আসা হলদে আলো ছড়ানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করা বাল্ব দুটোর মন খারাপ সম্ভবত। দিনের আলো ফুটছে, এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার বোধেই হয়তোবা। অর্ধেকটা মতো এগোতেই প্রথম একজনকে দেখলাম, শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে আসছেন। এর মাথার পিছনে চুলের অবস্থা দেখে মনে হল, ইনি ঘুম থেকে উঠেই শার্ট-প্যান্ট পরে বাইরে চলে এসেছেন।

বাসার কাছাকাছি যেতেই চোখে মুখে শীতল স্পর্শের ঝাপটা মেরে এক পশলা দমকা বাতাস অবশ করে দিলো প্রায়। তোকে মুক্ত রাখতে গিয়ে, তোকে তোর মতো করে উড়তে দিয়ে নাটাই থেকে অবিশ্রান্তভাবে কেবলি সুতো ছেড়েছি। মরিয়া দৃষ্টিতে আকাশের নীলে তাকিয়ে তোকে খুঁজতে ভালো লাগে না আর, ক্লান্ত লাগে ভীষণ। কখনো কি তোকে বলেছি তোর ভাবনা আমাকে অবশ করে ? না বলে থাকলে আজকে নাহয় জেনে রাখ। ঠিক কোথায় যেতে চাচ্ছিস তুই বলতো ? কোন মিথ্যে নক্ষত্রের আলো ছুঁতে গিয়ে বারবার এতো দূরে সরে যাচ্ছিস ? দেখিস তুই, এমনই মাতাল বাতাসে ভরা কোনো এক বিষণ্ণ সকালে তোর অভিমানী সুতো কেটে দেবো। অন্য কারো ছাদের অ্যান্টেনায় আবার আটকে যাস না যেন। আমি চাই প্রবল বাতাসে উড়তে উড়তে তুই আমাতে আছড়ে পড়। জানি তোর ভার আমি সইতে পারবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *