একটুকরো স্বাধীনতা…..

সূর্যটা সবেমাত্র উঠেছে। ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ধীরে ধীরে হাওয়ায় উবে যাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির এখনও জোরালো হয়নি- মনে হয় তাদের ঘুম ভাঙতে আরও দেরী হবে!

বিস্তৃত সবুজ ঘাসে ভরা জগদলপুরের মাঠ। কুয়াশাভেজা মাঠের মাঝখানে বসে হাসছে এক তরুণী। নাম তার আলেয়া। ঘাটে পানি আনার নাম করে মাঠে এসেছে সে! টিনের কলসিটা একপাশে উল্টানো। আলেয়ার সেদিকে খেয়াল নেই, সে হাসিতেই ব্যস্ত!

মাঠে গরু চড়াতে এসে বিপত্তিতে পড়েছে শফি। তার গরুটা হঠাত দড়ি ছিঁড়ে দৌঁড় দিয়েছে! গরু ছুটছে, গরুর পিছে পিছে ছুটছে শফি!!

: খুব হাসি পাইতাসে তর, তাইনা?

ঘাম মুছতে মুছতে বলে শফি। চোখেমুখে রাগের ছটা।


সূর্যটা সবেমাত্র উঠেছে। ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ধীরে ধীরে হাওয়ায় উবে যাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির এখনও জোরালো হয়নি- মনে হয় তাদের ঘুম ভাঙতে আরও দেরী হবে!

বিস্তৃত সবুজ ঘাসে ভরা জগদলপুরের মাঠ। কুয়াশাভেজা মাঠের মাঝখানে বসে হাসছে এক তরুণী। নাম তার আলেয়া। ঘাটে পানি আনার নাম করে মাঠে এসেছে সে! টিনের কলসিটা একপাশে উল্টানো। আলেয়ার সেদিকে খেয়াল নেই, সে হাসিতেই ব্যস্ত!

মাঠে গরু চড়াতে এসে বিপত্তিতে পড়েছে শফি। তার গরুটা হঠাত দড়ি ছিঁড়ে দৌঁড় দিয়েছে! গরু ছুটছে, গরুর পিছে পিছে ছুটছে শফি!!

: খুব হাসি পাইতাসে তর, তাইনা?

ঘাম মুছতে মুছতে বলে শফি। চোখেমুখে রাগের ছটা।

: তোমার দৌঁড়ানি দেইখ্যা না হাইসা পারলামনা শফি ভাই।

হাসতে হাসতেই বলে আলেয়া। ওড়নাটা এগিয়ে দেয় শফির দিকে। ঘাম মুছতে মুছতে শফি আলেয়ার দিকে তাকায়।

: অমন কইরা কি দ্যাখো?

হঠাত যেনো লজ্জা পেয়ে যায় আলেয়া। ওড়নাটা দ্রুত পরিপাটি করে নেয়।

: তরে রে সুন্দরী। তর হাসি দ্যাখলে পরাণডা জুড়াইয়া যায়।

: খালি মিছা কথা না? হাসি দেইখ্যা পরাণ জুড়ায়! ঢং কত!

: কি কইলিরে হারামজাদি? আমি মিছা কই? ঢং করি?

শফি আলেয়ার চুলের মুঠি ধরে টান দেয়। অস্ফুট গোঙানির মত শব্দ করে ওঠে আলেয়া।

: উফ শফি ভাই, ছাড়ো!

শফি চুল ছেড়ে খপ করে আলেয়ার হাত ধরে।

: চল বিয়া করি।

: এত তাড়া কিসের গো শফিভাই? বিয়া তো তোমারেই করুম। আগে পরীক্ষাটা শেষ হইয়া যাক।।

: ঐ বান্দির বেটি, এত পইড়া কি করবি? শহরে যাইয়া চাকরি করবি? সেসব হইবোনা। তর কাম হইলো তিনডা। আমার লগে সংসার করবি, বাচ্চাকাচ্চারে মানুষ করবি, আর রাইতে আমারে সুখ দিবি…..

: অসভ্য কোনহানকার! মুখে কিসুই আটকায়না! ঐ দেখো, বেলা উইঠ্যা গেসে। আমারে ফিরতে হইবো।

শফি আরও শক্ত করে আলেয়ার হাতটা চেপে ধরে।

: আগে ক আমারে বিয়া করবি কবে?

: পরীক্ষাটা হইতে দেও শফিভাই। তারপরে করুম। এখন ছাড়ো। বেলা হইসে।।

: কালকে এইহানে আইবিতো?

: আমুনে। অহন যাইতে দাও।

: বান্দির বেটির এত্তো তাড়া! যা চইলা যাহ!

রাগে হাত ছেড়ে দেয় শফি। আলেয়া একটু কাছে এসে আচমকা শফিকে জড়িয়ে ধরে।

: রাগ কইরোনা গো শফিভাই। কালকে মেলাখন থাকুম তোমার লগে। আইজ যাই।।

উল্টে রাখা টিনের কলসিটা তুলে নিয়ে ফিরে যায় আলেয়া। শফি পেছন থেকে তার চলে যাওয়া দেখতে থাকে।।
___

মাঝরাতে হঠাত চিতকার-চেচামেচিতে আলেয়ার ঘুম ভেঙে যায়! দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখে, তার বাবা রহিমুদ্দীনের মৃতদেহ পড়ে আছে বাড়ির উঠোনে!

: ইয়ে রাসিলা মাল কাহাসে আয়া? কিধার থে ইয়ে?

গর্জে উঠে এক খানসেনা।

: শালে ইয়ে হেডমাস্টার তো বহুত কামিনা নিকলারে! জিন্দেগি দে দিয়া লেকিন সাচ নেহি বাতায়া!

পাশে থাকা আরেক খানসেনা বলে উঠলো।

: পাকড়ো শালিকো! যো রাস হ্যা ইনকি বাদানমে সাব নিকালদো!!!

আলেয়া দৌঁড়োতে থাকে। পিছনে ভেসে আসতে থাকে খানসেনাদের বুটের শব্দ। ক্রমশই সে শব্দ জোরালো থেকে জোরালোতর হয়।

আর পারেনা আলেয়া। ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।।
___

কচুরিপানার পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে শফি। দাদীর কথামতো পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে সে।।

পুকুরে সে একা না, আরও অনেকে ভেসে-ডুবে আছে। সবাই নিশ্চুপ।

শফি চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখে। আলেয়া কেমন আছে? তার কিছু হয়নিতো?
_____

সূর্য উঠে গেছে। পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত। থেমে থেমে আহাজারি শোনা যাচ্ছে। ধীরপায়ে হাঁটতে থাকে শফি।।

আলেয়ার বাসায় গিয়েছিলো সে। নিথর মাস্টারসাহেবের দেহটা ছাড়া আর কিছুই মেলেনি। পথে সে আলেয়ার ছেড়া ওড়নাটা পেয়েছে। যেটা দিয়ে প্রায়শই আলেয়া তার ঘাম মুছে দিতো।।

মাঠের ঘাসগুলো আজ শুকিয়ে গেছে। পাখিদের সাড়াশব্দও নেই। কিছুদূর এগুতেই একটা অর্ধনগ্ন মেয়ের লাশ পায় শফি।

আলেয়া! নিথর দেহটা পড়ে আছে তার মাঠের মাঝখানে, যেখানে তারা দেখা করতে চেয়েছিলো। অনেকটা সময় থাকার প্রতিজ্ঞা করেছিলো শফির সাথে।।
___

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। যা কিছু আছে তাই নিয়ে লড়তে হবে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও লড়তে হবে। মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে।।

লড়বে শফি। আলেয়ার জন্য। তার দাদীর জন্য। জগদলপুরের মানুষের জন্য। স্বাধীনতার জন্য। বাংলাদেশের জন্য।

ঘর থেকে রামদাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শফি। আলেয়ার ওড়নাটা তার গলায় ঝোলানো।।
___

গল্পটা একটা উদাহরণমাত্র। এরকম একটা-দুটা ত্যাগ নয়, লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। তবে আফসোস- আমরা এখন পর্যন্ত এর মূল্য বুঝতে পারিনি, যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারিনি। আদৌ পারবো কিনা জানিনা।

মনে হয় পারবো। স্বাধীনতা যে আমাদের রক্তে মিশে আছে।।

৫ thoughts on “একটুকরো স্বাধীনতা…..

  1. মনে কিছু প্রশ্ন জাগে কেন এ
    মনে কিছু প্রশ্ন জাগে কেন এ ত্যাগ?? হুমায়ুন আজাদ স্যারের মতই বলতে হয়, আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *