নারীর যৌনতা, যৌনতায় নারী এবং যৌন হয়রানি

নগ্নতা! আমাদের দেশের মানুষের কাছে প্রকাশ্যে গা সহা হয়নি। কিন্তু তাই বলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড! প্রতিটি যুবক তাঁর যৌবনের অধিকাংশ সময় নগ্ন নারীর ছবি এবং কথা ভেবে কাটিয়ে দিলেও রাস্তা ঘাটে কোনো নারীর ‘অশালীনতা’ মেনে নিতে পারবে না। কেউ কেউ তো পারলে অশালীনতার প্রতিবাদে মেয়েকে ধর্ষন করেই ফেলে। ইন্টারনেট ও কেবল নেটওয়ার্কের কল্যানে সারাদিন আইটেম কন্যার নগ্ন উরুর মাঝে ডুবে থাকলেও দেশি মেয়ের খোলা পিঠ দেখলেই জাত গেল, ধম্ম গেলো কতশত শাপসাপান্ত। পুজিবাদি বিশ্বে নারীর নগ্নতা মুনাফার টার্মকার্ড হয়েছে। কিন্তু তাই বলে পুজির বাইরে যেয়ে মেয়েরা নিজেদের শরীরের অধিকারই বা কতটুকু পেয়েছে?


নগ্নতা! আমাদের দেশের মানুষের কাছে প্রকাশ্যে গা সহা হয়নি। কিন্তু তাই বলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড! প্রতিটি যুবক তাঁর যৌবনের অধিকাংশ সময় নগ্ন নারীর ছবি এবং কথা ভেবে কাটিয়ে দিলেও রাস্তা ঘাটে কোনো নারীর ‘অশালীনতা’ মেনে নিতে পারবে না। কেউ কেউ তো পারলে অশালীনতার প্রতিবাদে মেয়েকে ধর্ষন করেই ফেলে। ইন্টারনেট ও কেবল নেটওয়ার্কের কল্যানে সারাদিন আইটেম কন্যার নগ্ন উরুর মাঝে ডুবে থাকলেও দেশি মেয়ের খোলা পিঠ দেখলেই জাত গেল, ধম্ম গেলো কতশত শাপসাপান্ত। পুজিবাদি বিশ্বে নারীর নগ্নতা মুনাফার টার্মকার্ড হয়েছে। কিন্তু তাই বলে পুজির বাইরে যেয়ে মেয়েরা নিজেদের শরীরের অধিকারই বা কতটুকু পেয়েছে?

কয়েকবছর আগে ভারতীয় মডেল মধু সাপ্রে। বিজ্ঞাপনের নগ্ন মডেল হওয়ার জন্য নারীবাদিসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষদের বিক্ষোভের শিকার হয়েছিলেন। ওই একি বিজ্ঞাপনে নগ্ন মডেল হয়েছিলেন মধু সাপ্রে ও মিলিন্দ সুমন। পৃথকভাবে এবং একত্রে-অথচ মিলিন্দের নগ্নতা নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা ছিল না, গেল গেল রব ছিল না। যেন নগ্ন হওয়ার অধিকার পুরুষের একচেটিয়া। তারা তো রাস্তা ঘাটে অর্ধনগ্ন হয়ে এমনিতেই ঘুরে বেড়ায়, লুঙ্গি পড়া, গামছা পড়া, খালি গা পুরুষদের আমরা অহরহ দেখি- শালীনতার কোনো দায় নেই তাদের। শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই শালীনতা কোথায় কোথায় বিপন্ন হয়!

মানুষ কোথায় কার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা প্রতিটা ব্যাক্তিরই থাকা উচিত। যৌন নিগ্রহ এবং ধর্ষন এই স্বাধীনতাকেই তছনছ করে। মনের ইচ্চা অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়ার যে অভ্যাস মানবসভ্যতা গড়ে তুলেছে, তা কি শুধু কয়েকজন হিংস্র ও লপমট পুরুষের একচেটিয়া অধিকার হয়ে থাকবে? ঐ লম্পটরা অপরাধী গোত্রের। কিন্তু বাদবাকি সমাজের এ বিষয়ে চরম উদাসীনতা ও যৌণ দুষ্ককর্মের বলি মেয়েদের প্রতি সহানুভুতিশীলতা আরও বড় অভিশাপ। আর পুলিশ ও প্রশাসনে আসীন বিবেকহীন বাস্তুঘুঘুরা আশ্চর্যভাবে যৌণ অপরাধীকে আড়াল করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।

কথা হলো, রাবন যদি সীতার শ্লীলতাহানি করেও থাকে, এমনকী ধর্ষনও তাতে সীতা কেন ভিকটিমাইজ হবে? অথচ সীতা অপহরনের শিকার হয়েও তাঁর প্রতি রামের সন্দেহ যত দ্রুতগামী ছিল, রাবনের লালসা ততটা না! ধর্ষিত হলে মেয়েদের উলটো সমাজ থেকে, পরিবার থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়! আর ধর্ষনের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করলে পুলিশ , প্রশাসন, সমাজ, রাজনৈতিক দল-সবাই ধর্ষনকারীকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও প্রোটেকশন দেবে। এ কোন সমাজে বসবাস করছি আমরা?

সাধারনভাবে ধরে নেওয়া হয় ক্ষমতাবান অর্থবান পুরুষরা পেটে দু এক পেগ পড়লে একটু আধটু ফষ্টি নষ্টি করবেই। তাদের এই ফষ্টি নষ্টির মধ্যেও আছে সমাজের প্রশ্রয়। কিন্তু যেসব মেয়েরাও এসব নোংড়ামীর শিকার তাদের কিন্তু প্রশয় দেয়না সমাজ। তাদের একঘরে করে। আবার ধর্ষন করে। শেষে পাথর ছুড়ে মারে। আর যে সব মেয়ে প্রতিবাদ করে তাদের অবস্থাও সঙ্গীন হয়। রোজকার ঘটনাই দেখুন। বাসে ভিড় হলে কতগুলো লোক এসে মেয়েদের গায়ে গা ঘষবে। হাত চালাবে। প্রতিবাদ রোজই কোনো না কোনো মেয়ে করে। তখন অন্য পুরুষরা ঐ গা ঘষা লোকগুলোর সমর্থনে গলা চড়াবে-‘আপা সিএনজি বা ট্যাক্সিতে করে যান না’। যেন মেয়েরা শখ করে বাসে চড়েছে। কিছু লোক ভাবে এসব মেয়েরা বানিয়ে বলছে। কোনো ছেলে কি এত খারাপ হতে পারে!

মেয়েরা একটু আধটু ফষ্টিনষ্টি মেনে নেবে নীরবেই, সহযোগীতা করবে। এটাই কর্মসূত্রে বাইরের পৃথিবীতে আসা মেয়েদের সম্বন্ধে দেহবাদি পুরুষদের ধারনা। প্রতিবাদ করলেই বলে, আরে কত সতী জানা আছে। কিন্তু বাস্তবে ‘সতীপনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সতীত্ব একটা চাপিয়ে দেয়া ভুয়ো ধারনা। একজন মানুষ কার সঙ্গে বা কতজনের সঙ্গে কী সম্পর্ক গড়ে তুলবে সেটা তা ব্যাক্তিগত ব্যাপার। একাধিক পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক থাকতেই পারে কোনো মেয়ের, তাঁর মানে এই নয় যে অফিসের বসের যৌণ হয়রানী সে উপভোগ করবে। এটা পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার, ব্যাক্তির সাথে মানসিক সম্পর্কের ব্যাপার। সব স্বাভাবিক মেয়েই অপছন্দের পুরুষের যৌন অত্যাচারে অপমানিত বোধ করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্তবোধ করে। তা সে একপুরুষে নিষ্ঠই হোক আর একাধিক পুরুষে।

বিনা মজুরির শ্রম ও প্রজননের জন্য এই সমাজের মেয়ে দরকার, দরকার ধর্ষনের জন্য কিন্তু তাদের স্বার্থ রক্ষার দায় এ সমাজ তো নেয়ই না উপরন্তু নারীর অস্থত্বই বিপন্ন করে তোলে। একুশ শতকে পা রেখেও নারীর ব্যাক্তিসত্তা ও সামাজিক অস্তিত্বের উপর চলতে থাকা এই আঘাতকে যে সমাজ যথেষ্ট সিরিয়াসলি নিতে ব্যার্থ হয় সে সমাজকে ধিক্কার জানাই। মানসিকতার আমুল পরিবর্তন না হলে কোনো দিনই লিঙ্গ সাম্য আসবে না। পাঠ্যসুচির মধ্য দিয়ে ছোট থেকেই তৈরি করা দরকার লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজের উপযুক্ত নতুন প্রজন্ম। আর দরকার সরকার পুলিশ ও প্রশাসনে বসে থাকা বাস্তুঘুঘুদের মগজ ধোলাই ও সংশোধন।

১৯ thoughts on “নারীর যৌনতা, যৌনতায় নারী এবং যৌন হয়রানি

  1. অসাধারণ লিখেছেন মিতু । এমন
    অসাধারণ লিখেছেন মিতু । এমন স্পষ্ট করে সোচ্চার কন্ঠে এসব কথা নারীদেরকে আরো বেশি বেশি বলতে হবে ।

    1. ধন্যবাদ দুলাল ভাই। আসলে এইসব
      ধন্যবাদ দুলাল ভাই। আসলে এইসব লেখার প্রসংসা পেলে আশান্বিত হই এই ভেবে যে সব শেষ হয়ে যায়নি

  2. অব্যর্থ অষুধটাই প্রয়োগ করতে
    অব্যর্থ অষুধটাই প্রয়োগ করতে হয় এসব ভূত তাড়াতে। যুগ যুগ ধরে সেই অষুধটাই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর চাইতে কোন ভালো অষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি।
    সেই অষুধ হলো-
    মাইর
    প্রতিবাদ ট্রতিবাদ করে কোন লাভ নাই, অসুস্থ মানসিকতার উপযুক্ত প্রতিবিধানও ওইটা।

  3. লালন ফকির মিনতি করে সিরাজ
    লালন ফকির মিনতি করে সিরাজ সাইয়ের পায়
    স্বামী মারিলে লাথি নালিশ করিব কোথায়
    স্বামী মোর প্রানপতী
    কি দিয়ে রাখব রতি
    কেমনে হব সতী
    চরণে………..

    ভাল লিখেছেন ++++++

  4. বড্ড ক্লান্ত লাগে আজকাল এসব
    বড্ড ক্লান্ত লাগে আজকাল এসব পড়লে। কখনও কি চেঞ্জ হবে এসব? নাকি এইরকমই মানুষের স্বাভাবিক চরিত্র?????

    1. আমিও অতিষ্ঠ হয়ে গেছি এসব
      আমিও অতিষ্ঠ হয়ে গেছি এসব দেখতে দেখতে। মাঝে মাঝে মনে হয় এইসব লিখে টিখে কি হবে! তারপর ভাবি হাল ছাড়া যাবে না সমাজের , ব্যাক্তির, রাষ্ট্রের চরিত্র না বদলানো পর্যন্ত

  5. নারী অধিকার ও নির্যাতিত
    নারী অধিকার ও নির্যাতিত নারীদের নিয়ে আপনার লেখাগুলোকে স্টেনগানের বুলেট মনে হয়।

    1. েখন এই বুলেট সমাজের বুকে
      েখন এই বুলেট সমাজের বুকে লাগলেই হয় :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

  6. নারীরা যে নির্যাতীতা হচ্ছে সে
    নারীরা যে নির্যাতীতা হচ্ছে সে ব্যাপারে কোন দ্বিমত । আর এর থেকে বের হয়ে আসতে পারে একমাত্র নারীরা নিজেই। লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু পাঠ্যবই বা বই না বরং বাস্তবিক জীবনকে ব্যবহার করতে হবে । আমাদের পাঠ্যবই বা সাহিত্যের একটা বড় অংশই নারীকে নিচু করে অথবা শৃঙ্খলার আবদ্ধে বেঁধে গড়ে উঠেছে । তাই এ ক্ষেত্রটিকেও ব্যাপক পরিবর্তনের আওতায় আনতে হবে । । ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *