এক মুঠো ভালবাসা

এখন মধ্যরাত। উপবন ট্রেনের জানালা দিয়ে আমি কালো নীলাভ মিশেল আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। ট্রেনের সাথে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে মধ্য আকাশের চাঁদ। ট্রেনের ঝকঝক শব্দ আর জানালা দিয়ে ছুটে আসা শীতল বাতাসের মিশ্রণ এক মায়াময় সুর সৃষ্টি করছে। অন্য যতোবার রাতের ট্রেনে আমি চড়েছি, ততবারই গভীর ঘুমে হারিয়ে গিয়েছি। কি এক অদ্ভুত কারনে ট্রেনে আমার ঘুম ভালো হয়। হয়তো ঝকঝক শব্দ আমার প্রিয় শব্দগুলোর একটি বলে। কিন্তু এবার আমার চোখে ঘুমের লেশমাত্রও নাই। বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা কেউ একজন আমার জন্য ফেইসবুক খুলে অপেক্ষা করছে। কখন গ্রীন সিগন্যাল এ তার নীল প্লাটফর্মে আমি উপস্তিত হবো।. . . . . . . .

গ্রাম থেকে উঠে আসা নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে আমি। মেধা ভালো ছিলো বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্থানে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। থাকি হোস্টেলে। দুটি টিউশনি করিয়ে কোন রকমে চলছি। ভোগ বিলাসের লেশমাত্রও এ জীবনে পাইনি। তাই নিরন্তন সংগ্রাম করে বেড়ে উঠা জীবনের কাছে অনেক কিছুই বিলাসিতা মনে হয়। যা অন্য অনেকের কাছে খুবই সিম্পল।
ফেইসবুক আমার কাছে বখাটেদের আড্ডা খানা মনে হতো। যা অকর্মা ও বাজে টাইপের ছেলেমেয়েদের কাছে খুব ভালো মানিয়ে যায়। সবসময় ভেবে এসেছি যেমন করেই হউক আমাকে ভালো কিছু করতেই হবে। বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটানো ছাড়া বিকল্প কোন চিন্তা আমার মাথায় কখনোই আসেনি। সেই জন্যে আমার কোন ফেইসবুক আইডি ছিলো না। যার জন্য প্রায়ই ফ্রেন্ডস এবং রুমমেটরা আমাকে সেকেলে, ক্ষ্যাত বলে বিদ্রুপ করতো। হাঁসাহাসি করতো। আমি নিরবে মেনে নিতাম।

রুমমেটেদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করে আজ প্রথম ফেইসবুকে একাউন্ট করেছি। আবশ্য রুমমেট অর্নব জোর করে খুলে দিয়েছে। আমি পাশে বসে আছি। অর্নব কয়েকজনকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্টও পাঠিয়েছে।
দুদিন পর অনিচ্ছাকৃত ভাবে বসলাম। অনেকক্ষণ ঘাটাঘাটি করছি, কিছুই বুঝিনা। আমার কাছে বিরক্তিকর লাগছে। বেড়িয়ে যাবার আগে একটি স্নিগ্ধ শীতল হাসিমাখা মুখ ভেসে উঠলো কম্পিউটারের স্কিনে। আমি অপলক তাকিয়ে রয়েছি। নামটিও চমৎকার “লাবিবা আদিবা”। দেখেই বুকের বেতর কেমন জানি শীতল একটু ছোঁয়া অনুভূত হলো। কিছু না বুঝেই রিকুয়েস্ট পাঠালাম। এক সপ্তাহ পর আবার বসলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে আদিবার বন্ধু হবার নোটিফিকেশন। আমি উপলব্ধি করছি নিজেকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। অনেক সুখী মনে হচ্ছে। আমি নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছি।
হাই, হ্যালোর সূচনায় আদিবার সাথে চ্যাট করছি। একদিন, দুইদিন। প্রায় প্রতিদিন। চ্যাট করার মাত্রা বেড়ে গেছে অনেক বেশী। এখন ফেসবুক আমার কাছে ফালতু কিছু মনে হয়না। মনে হয় আমি আমার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। আদিবার সাথে যখন আমি চ্যাট করি তখন আমার আর তার পৃথিবী গভীর ঘুমে হারিয়ে যায়। তখন আমাদের মনে হয় এই পৃথিবীতে আর কোন মানুষ নেই। শুধু আমি আর আদিবা। মাঝে মাঝে রুমমেটেদের কর্কশ চেঁচামেচিতে আমার পৃথিবীতে এলিয়েন এর আগমন বার্তা মনে হয়।
ঃ কিরে ব্যাটা এখনো ঘুমাছ নাই ক্যান? রাইত বাজে তিনটা। প্রত্যেক রাইতে কি শুরু করস?
ঃ এইতো ঘুমিয়ে যাবো। আর একটু।
ঃ আর একটু, আর একটু রাখ। ঘুমাইতে দে। কি এক ফেইক আইডি নিয়া সারাদিন পইরা থাকস?
আমি রুমমেটদের বুঝাই, নানান ভাবে বুঝাই, এটা ফেইক আইডি না। ওরা বলে,
ঃ কোনটা ফেইক আর কোনটা রিয়েল খুব ভালো কইরা চিনি। তর চিনান লাগবো না। দয়া কইরা এখন ঘুমাইতে দে।
এক রাশ হতাশা নিয়ে আমি অনিচ্ছা সত্যেও ঘুমাতে যাই।

ট্রেন হাওয়ার বেগে ছুটে চলেছে। জানালা দিয়ে দূরের বাড়িগুলোয় জ্বলতে থাকা বৈদ্যুতিক বাতিগুলোকে মনে হচ্ছে আকাশের তাঁরাগুলো যেন মাটিতে নেমে এসেছে। যেন মনে হচ্ছে মাটিতে হেলান দিয়ে তাঁরা ঘুমায়। আমি আদিবার কথা চিন্তা করছি। সেই সোনালী দিনগুলির কথা আমার খুব বেশী মনে পরছে। . . . . . . . .

আদিবার সাথে ফেইসবুকের চ্যাট রুমের ছোট্ট ঘরের আড্ডা থেকে ভয়েস কলের শব্দ তরঙ্গে আমার পৃথিবী ছড়িয়ে গেছে। এখন রুমমেটরা বলেনা আদিবা ফেইক। চলতে থাকা কথার তরঙ্গ আর চ্যাট রুমের আড্ডার ভালো লাগা, কখন যে ভালবাসায় ডানা মেলেছে আমরা বুঝতেই পারিনি। আমার মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই কথা ভেবে যে, আদিবা আমার মতো এমন নিন্মবিত্ত ছেলের প্রেমে কেন পড়লো? যে ছেলেটার একটা স্যামফোনি ব্যান্ডের কম দামি স্মার্টফোন কেনার টাকা পর্যন্ত হয়না। যা দিয়ে তার সাথে চ্যাট করবে। যাকে পরের কম্পিউটারের আশায় বসে থাকতে হয়, কখন তাদের কাজ শেষ হবে ভেবে। এমনটিও নয় যে, আমি আমার আর্থিক দৈন্যদশার কথা তার কাছে গোপন করেছি। এই এক বছরে আমার সবকিছুই জানা হয়ে গেছে আদিবার। ওর বাবার অঢেল টাকা। থাকেন ইংল্যান্ডে। শুনেছি সিলেট তাদের প্রাসাদের মতো মস্তবড় বাড়ি। থাকে শুধু আদিবা, তার মা আর বড় ভাই।

আজ আমার জন্মদিন। রাত বারোটা এক মিনিটে আদিবা আমাকে উইস করেছে। আমার জন্মদিনের কথা আমার নিজেরই মনে ছিলোনা। বারোটা এক মিনিটে আদিবা আমাকে অবাক করে দিয়ে যখন সেলিব্রেট করলো তখন মনে হলো জীবনে এতো বেশী খুশি কখনো হইনি। রাতের সেই আনন্দের লেশ সকাল পেরিয়ে যাবার পরেও কাটছে না। মাথার মাঝে আদিবার চিন্তা ঘুরাফেরা করছে।
গোসল শেষে রেডি হচ্ছি ক্লাসে যাবো। বিছানায় অযত্নে পরে থাকা সস্তা ফোনটাই রিং হচ্ছে। অপরিচিত নাম্বার। কল রিসিভ করে শুনতে পেলাম এস. এ. পরিবহনে আমার নামে পার্সেল এসেছে। কিছুই বুঝতে পারছিনা কে আমাকে পার্সেল পাঠাবে? গিয়ে দেখি আদিবার পার্সেল।
মেয়েটা স্যামসাং ব্যান্ডের গ্যালাক্সি ফোন পাঠিয়েছে। আমাকে একবারও বলেনি ফোনের কথা। আদিবাকে কল দিলাম,
ঃ হ্যালো। কেমন আছ আদিবা?
ঃ হুম। ভালো। তুমি?
ঃ ভালো। তুমি আমাকে পার্সেল পাঠিয়েছ বলনি কেন?
ঃ পার্সেল পেয়েছ? এটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ। তোমার বার্থডে গিফট।
মুহুর্তের মাঝে আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। বুকের ভিতর থেকে উষ্ণ নিশ্বাস বেরোনোর সাথে লক্ষ করলাম চোখের কোনায় ভারী একফুটা জল। জীবনে প্রথম কোন বার্থডে গিফট পাওয়ার আনন্দে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি।
ঃ কি হলো কথা বলছো না কেন? এই মারুফ কথা বলো। গিফট পছন্দ হয়নি?
আমি নিরবতা ভেঙ্গে বললাম,
ঃ পছন্দ হবে না কেন? অনেক পছন্দ হয়েছে। এতো টাকা খরচ না করলেও পারতে।
ঃ আমি টাকা খরচ করতে যাবো কেন? আব্বু পাঠিয়েছে। আব্বুকে তোমার কথা বলেছি। তুমিতো জানো আব্বু আমাকে অনেক ভালবাসে। আমি যা বলি তাই করে।
আমি জানি আদিবা অনেক জিদি একটা মেয়ে। যা বলে তাই করে। হয়তো জিদের কাছে হেরে তার ফ্যামিলি আমাকেও মেনে নিবে।

কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি বিভিন্ন উপলক্ষে আদিবা আমাকে গিফট পাঠায়। কারনে অকারণে পাঠায়। আমি অনেক নিষেধ করার পরও পাঠায়। আমার অনেক লজ্জা হচ্ছে তাকে কখনোই কিছু দিতে পারিনি বলে। আমার মনে হচ্ছে সে আমাকে করুণা করছে। আমার অসচ্ছলতাকে দয়া দেখাচ্ছে। এখন গিফট পেয়ে আমি আর আনন্দিত হইনা, লজ্জিত হই।

ট্রেনের জনালা দিয়ে এখন আর চাঁদটাকে দেখা যায়না। বাহিরে আবছা অন্ধকার। রেললাইনের পাশ দিয়ে জেগে উঠা ছোট বড় গাছের সাথে ছুটে চলা ট্রেনের বাতাসের ধাক্কায় একধরনের মায়াময় শব্দের সুর সৃষ্টি করছে। এর আগের প্রতিবারই অন্ধকার ঝোপঝার এবং মায়াময় শব্দের আড়ালে অদৃশ্য-অলৌকিক কিছুর অস্তিত্ব খোঁজার জন্য আমার চোখ ব্যাকুল হয়ে থাকতো। যদিও অলৌকিক কিছুর প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল না কোন কালেই। আজ আমার মাথা কোনকিছুই অস্তিত্ব খোঁজার কাজ করছে না। মাথার মাঝে কেবল ডিজিটাল স্কিনে আদিবার লাবণ্যময় হাসি, শব্দ তরঙ্গে ভেসে আসা দুষ্টুমি মাখা কথার আলপনা খেলা করছে। ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে তার সাথে আমার দেখা হওয়ার দিনটিকে . . . . . . .

ঃ মারুফ আমি ঢাকায় আসছি। আজই তোমাকে বিয়ে করবো।
ঃ কি বলছো পাগলের মতো! বিয়ে করবা মানে?
ঃ হ্যাঁ আজই করবো। আজ না করতে পারলে কোন দিনও তোমকে পাবো না। আব্বু ইংল্যান্ড থেকে চলে এসেছেন। আমাকে নিয়ে যাবে। বলেছে ওখানে তার এক বন্ধুর ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিবে।
ঃ কি বলছ? এখন কিভাবে সম্ভব? তুমিনা বললে আমার কথা তোমার আব্বুকে বলেছ?
ঃ বলেছিলাম। কিন্তু তোমার সবকিছু শুনে এখন রাজি হচ্ছে না। আমাকে স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে দিয়েছে, ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবেই। আমি আর কিচ্ছু জানিনা। আমি তোমার কাছে আসছি।
আদিবা ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিলো। আমার মাথা কারেন্টের শক খাওয়ার মতো ঝিমঝিম করছে। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। আদিবাকে ফোন দিলাম। রিং হচ্ছে। ফোন ধরছে না। আবার দিলাম, ধরছে না।

হল গেটের সামনে আদিবা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আস্তে আস্তে আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আদিবার মুখে কোন হাসি নেই। পাঁচ ছয় ঘন্টা জার্নি করার স্পষ্ট ছাপ চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। তবে চেহারার লাবণ্য একটুও কমেনি। ছবির সেই হাসি মাখা দুষ্টামি চাহনির মেয়েটির চেয়ে আদিবা অনেক বেশী সুন্দর। এমন ভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন মনে হচ্ছে অনেক বছর ধরে আমাদের সামনাসামনি কথা হয়, দেখা হয়। তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না আজই আমাদের প্রথম দেখা। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি বললাম,
ঃ কেমন আছ?
ঃ হুম ভালো। তোমাকে বারবার ফোন দিলাম রিসিভ করনি। তারপর থেকে ফোন বন্ধ করে রেখেছ। কেন?
ঃ আমি তখন রাস্তায় ছিলাম। আর আব্বু বারবার ফোন দিচ্ছিলো তাই বন্ধ করে রেখেছি।
আমি আর কিছু বলতে পারছি না। প্রিয় মানুষকে প্রথম দেখার আনন্দ বিষাদময় হয়ে আমাকে মানুষিকতাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। চুপচাপ অন্যদিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রয়েছি।
ঃ মারুফ চুপ করে থেকো না। কিছু একটা বল। আমার হাতে সময় নেই। সব কিছু ছেড়েছুড়ে তোমার কাছে চলে এসেছি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবোনা।
আদিবার চোখে মুখে বিষন্নতার ছায়া স্পষ্ট হয়ে আছে। এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে যেন মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পরবে।
ঃ আদিবা শান্ত হও। পাগলামি করোনা। তুমি জানো এখন আমার ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। এই মুহুর্তে কিভাবে সম্ভব!
আমি আদিবাকে সবকিছু খুলে বললাম। আমার ফ্যামিলির কথা বললাম, আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা বললাম, আমার মনে হতে লাগলো আবেগের তাড়নায় কোন ভুল করতে যাচ্ছি কিনা।
ঃ আমি কিচ্ছু জানিনা। আমি শুধু তোমাকে চাই।
ঃ প্লিজ বুঝতে চেষ্টা করো। বাবা মা আমাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখে। গ্র্যাজুয়েশন কম্পলিট করে বড় একটা চাকরী করবো। অগোছালো সংসারটাই হাল ধরবো। তাছাড়া তুমি আমার অবস্থা জানো। আমি নিজেই চলতে পারিনা। প্লিজ তুমি আমাকে আর কিছুদিন সময় দাও। পরীক্ষার শেষেই কোন একটা কাজ জোগাড় করে নিবো।
ঃ তোমার কিচ্ছু করা লাগবেনা। আমার একাউন্টে লাখ দুয়েক টাকা আছে। আব্বু প্রতি মাসে আমাকে যে টাকা পাঠাতো আমি সেখান থেকে জমিয়েছি। তোমার চাকরি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের চলে যাবে।
ঃ আদিবা তুমি আমাকে করুণা করছো? আমার অসচ্ছলতাকে দয়া করছ? আর কত তোমার কাছে আমাকে ছোট করে রাখবে?
ঃ আমি তোমাকে ছোট করছি, দয়া দেখাচ্ছি? আমার ভালবাসাকে তুমি করুনা বলছ? আমি তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে বিয়ে করতে চাওয়া কি তোমার কাছে করুণা মনে হয়? দয়া মনে হয়? বললেই হয় আমাকে বিয়ে করতে চাওনা। ঠিক আছে আমি চললাম। ভালো থেকো। আমার ভালবাসা যদি তোমার কাছে করুণা মনে হয় তবে আর তোমাকে করুণা করবো না।
আমি আদিবার দিকে তাকাতে পারছিনা। মাটির দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারছি ও কাঁদছে। পাশাপাশি চোখের সামনে বাবা মায়ে নিরন্তন কঠোর পরিশ্রম করা মুখখানি ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা। আদিবার চলে যাওয়ার দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে রয়েছি। পিছন থেকে ডাকার শক্তি টুকুও পাচ্ছিনা।

রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের মিষ্টি আলোয় সিলেট
স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে ট্রেন থামলো। যাত্রীরা সবাই হুড়াহুড়ি করছে কার আগে কে নামবে চিন্তা করে। আমার এতো তাড়াহুড়ো নেই। সবার শেষে ট্রেন থেকে নেমে যখন প্লাটফর্মে পা রাখলাম তখন এক পশলা সোনালী রোদ এসে গায়ে আচড়ে পরলো। মনে হচ্ছে জীবনে প্রথম সিলেটে আসার অভ্যর্থনা রোদের কাছ থেকে পেলাম।
আমি প্লাটফর্মের বুক মাড়িয়ে হাঁটছি। বুকের ভেতরে হারানো ভালবাসা মানুষটির শহরে এসে কেমন যেন নিজেকে উদভ্রান্তের মতো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একটু খুঁজলেই তাকে পাবো। আমি চার দিকে চোখ মেলে তার অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করছি। তাকে দেখার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছি। আমি জানি তাকে পাওয়া অসম্ভব। হয়তো সে এখন ইংল্যান্ডের কোন এক শহরে অতীতের ভুলগুলোর জন্য নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পাচ্ছে। হয়তো ভাবছে কি পাগলামিটাই না করেছিলাম ছন্নছাড়া একটা মানুষের কাছে ছুটে গিয়ে।
আমি মেইন গেইট লক্ষ করে হাঁটছি। গেইটের কাছাকাছি আসতেই দেয়ালের আড়াল থেকে হুইল চেয়ারে করে এগিয়ে আসা একটি তরুণী মেয়ের দিকে চোখ স্থির হয়ে পরেছে। ফেইস কেমন যেন পরিচিত পরিচিত। পিছন থেকে চেয়ারটিকে একটা ছেলে ঠেলে নিয়ে এগিয়ে আসছে। সব অবিশ্বাসকে দূরে ঠেলে আমার মস্তিষ্ক কাঁপিয়ে, চোখের ক্যানভাসে ধরা পরেছে আদিবার ছবি। কি করবো আমি কিছু বুঝতে পারছি না। বারবার দেখছি আর মনে মনে প্রশ্ন করছি সত্যিই কি আদিবা?
হ্যাঁ আদিবাই। কিন্তু তার হুইল চেয়ারে বসে থাকাটা আমার অবিশ্বাস্য লাগছে। আদিবা আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। আমার মতো তার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ঃ তুমি?! এই অবস্থা কিভাবে?
আমি স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। অবাক এবং কষ্টের মিলিত যন্ত্রণা বুকের মাঝে চেপে বসেছে। আদিবা ঠোঁটের কোনায় জোর করে হাসি ফুটিয়ে বললো,
ঃহুম আমি। কেন? খুব খারাপ অবস্থায় কি আছি? তুমিতো এমনটাই চেয়েছিলে। আমাকে যাতে সবাই করুণা করে।
আমার নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হচ্ছে। কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমি বললাম,
ঃ প্লিজ বলো কিভাবে হলো।
ঃ বলে কিইবা হবে? মানুষের কাছে আমার এই প্রতিবন্ধি জীবনটার কথা এতো বার বলেছি যে আর বলতে ভালো লাগেনা। তোমার কথা বলো। তুমি কেমন আছ?
ঃ কি জানি। হয়তো ভালোই আছি। অথবা ভালো থাকার জন্য নিজের সাথে যুদ্ধ করছি।
ঃ খুশি হলাম তুমি ভালো আছ শুনে।
ঃ প্লিজ বলোনা তোমার এই অবস্থা কিভাবে হলো?
ঃ তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেয়ার পর বাসে করে ফিরছিলাম। আমি বসা ছিলাম বাসের সামনের দিকে। সিলেটের কাছাকাছি আসার পর বিপরিত দিক থেকে আসা ট্রাকের সাথে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আমি আর কিচ্ছু জানিনা। দুদিন পরে নিজেকে হসপিটালের বেড়ে আবিষ্কার করি।
নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার অপরাধে অপরাধী। আমি আদিবার কাছে গিয়ে বললাম,
ঃ তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আমার জন্যে তোমার আজ এ অবস্থা। সেদিন যদি তোমাকে ফিরিয়ে না দিতাম তাহলে তোমার এ অবস্থা হতো না।
ঃ আরে তোমার জন্য হবে কেন? এটা আমার ভাগ্যে ছিলো। শুধু শুধু নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন? বাদ দাও এসব। তোমার কথা বল। সিলেটে কেন?
ঃ একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে আমার চাকরি হয়েছে। পোষ্টিং সিলেটে। আজই জয়েন্ট করতে হবে। তুমি যাচ্ছ কোথায়?
ঃ ঢাকা যাচ্ছি। পা দেখাতে। ওখানে ভাইয়ার পরিচিত একজন ডাক্তার আছেন।
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার বয়সী ছেলেটিকে দেখিয়ে বললাম,
ঃ উনি কে?
ঃ আমার বড় ভাই।
আমি হাত বাড়িয়ে পরিচিত হলাম। আদিবার দিকে ফিরে বললাম,
ঃ তোমার হাজব্যান্ড কোথায়?
আদিবা আবার জোর করে ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটিয়ে বললো,
ঃ আমার এই জীবনটাকে করুণা করে বিয়ে করতে চায়নি!
আমার নিজের ভেতরে কেমন যেন এক অদ্ভুত আনন্দ ফুটে উঠেছে। কারো কষ্ট দেখার আনন্দ নয়। প্রিয় মানুষটার কাছে একটু ভিড়ার অবস্থা কল্পনা করার আনন্দ।
ঃ তুমি চলে আসার পর একটা দিনও আমি শান্তিতে কাটাতে পারিনি। এই তিনটা মাসের প্রত্যেকটা মুহুর্ত আমার বিবেক আমাকে যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে কষ্ট দেয়ার অপরাধবোধ আমাকে ছিন্নভিন্ন করছে। তোমার নাম্বারে অনেক ট্রাই করেও বন্ধ পেয়েছে। ফেইসবুকে প্রতিদিন তোমাকে মেসেজ করেছি। কোন রিপ্লাই পাইনি। ভেবেছিলাম আমার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা পোষণ করে তুমি ইংল্যান্ড চলে গেছ।
ঃ তোমার প্রতি আমি কোন ঘৃণা পোষণ করিনি। সময়ের প্রতি আমার ঘৃণা। আমি ভুল সময়ে তোমার কাছে গিয়েছিলাম বলে। ভালবাসা এবং করুণার পার্থক্য শিখতে নয়। এক্সিডেন্টের পর আমার ফোনটিও হারিয়ে গিয়েছিল। তাই সেই নাম্বারটি বন্ধ। তাছাড়া এখন আমি আর ফেইসবুকে বসি না। বসে কিইবা হবে। যার জন্যে বসা হতো, সেই মানুষটাই আমার জীবনে নেই।
আমাদের কথার বলার সুযোগ করে দিতে আদিবার বড় ভাই অন্যদিকে চলে গেলেন। আমি আদিবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত দুটো আমার হাতে তুলে নিলাম,
ঃ প্লিজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার জন্য তোমাকে আজ হুইল চেয়ারের জীবন বেছে নিতে হয়েছে। তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে কোন দিন আমি আমার বিবেকের কাছে ক্ষমা পাব না।
ঃ কি আশ্চর্য। তুমি ক্ষমা চাচ্ছ কেন? তুমিতো আমার এ অবস্থার জন্য দায়ী না। এটা আমার ভাগ্যে ছিলো। প্লিজ উঠে দাঁড়াও। আমার ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে। যেতে হবে।
ঃ আমিও তোমার সাথে যাবো।
ঃ কি পাগলামি করছ! তুমি যাবা মানে?
ঃ হ্যাঁ। আমি যাবো। আমি তোমাকে আর হারাতে চাইনা।
আমার চোখ যাপসা হয়ে আসছে। আমি লক্ষ করছি আদিবার চোখের কোনায়ও জল টলমল করছে।
ঃ আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তোমার করুণা করতে ইচ্ছে হলো? আমি অনেক ভালো আছি। আমাকে করুণা করার প্রয়োজন নেই।
ঃ আমি করুণা করছি না। আমি তোমাকে ভালবাসি। এই তিন মাসে আমি বুঝতে পারছি তোমাকে হারানোর কষ্ট। তোমাকে ফিরিয়ে দেয়ার কষ্ট। প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিওনা। আমি তোমাকে আজও অনেক ভালবাসি।
ঃ না। আমি বেশ ভালো আছি। কারো সাথেই আমার এই অপয়া জীবনটাকে জড়াতে চাইনা। আমি যাচ্ছি।
আদিবা হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলো। কষ্টের যন্ত্রণা বুকের ভিতর এমন ভাবে চাপা দিয়ে রেখেছে যে আশপাশে কে আছে আমার কোন খেয়ালই নেই। আমি ছুটে গিয়ে আদিবার পা জড়িয়ে ধরে বললাম,
ঃ প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো আদিবা। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। প্লিজ ক্ষমা করো। আমি তোমাকে ভালবাসি।
আমি আদিবার পা জড়িয়ে ধরে হাঁটুর উপরের অংশের শাড়িতে মুখ গুঁজিয়ে কাঁদছি। আমি বুঝতে পারছি আদিবাও কাঁদছে। সেইসাথে তার হাতের আঙ্গুলগুলি আমার মাথার চুলের মাঝে মায়াময় ভালবাসার জাল বুনে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *