রায় পরিবারের শত বর্ষের ইতিহাস – [ আমার মা চিত্রা রায়ের জবানীতে ] ( তৃতীয় ভাগ)

আমার পিতার নাম আগেই উল্লেখ করেছি শ্রী নীহার রঞ্জন রায় । তিনি ১৯২০ সালে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার অন্তর্গত লামকাইন গ্রামের রায় পরিবারে তৎকালে জন্ম গ্রহন করেন । ৯ ভাই বোনের মধ্যে নীহার রায় দ্বিতীয় । বাড়ীতেই তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন । পরে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে চতুর্থ শ্রেনীতে ভর্তি হন । ছাত্র জীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বলে অতি সহজেই শিক্ষক দের মনোযোগ আকর্ষণ করেন । নির্ধারিত বছর অসুস্থতার জন্য ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিতে না পারলেও পরবর্তী বৎসর ১৯৩৮ সনে দুইটি বিষয়ে লেটার মার্ক সহ কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন । এরপর তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা গমন করেন এবং জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন । ১৯৪০ সালে তিনি প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । উচ্চতর শিক্ষার আশা নিয়ে তিনি ১৯৪০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক শ্রেনীতে ভর্তি হন । ১৯৪২ সালে সাবসিডিয়ারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । ১৯৪৩ সালে স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবার কথা । কিন্তু তখন সারা দেশে ভারত বর্ষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দাবানল জ্বলে উঠেছে । ১৯৪২ সনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ” ভারত ছাড়” আন্দোলনের মহা বিক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয় এবং স্বাভাবিক কারনেই পরীক্ষাও অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে যায় ।

ইতিমধ্যে ১৯৪৩ সনে তদানীন্তন রাজকীয় ভারতীয় বিমান বাহিনীতে অপারেটর হিসাবে প্রশিক্ষন নিয়ে তিনি উড়িষ্যার বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত চন্ডীপুর নামক স্থানে ৫৯০ নং এ এস ই দায়িত্ব প্রাপ্ত হন । এখানে তিনি দক্ষতার সাথে দীর্ঘ ১৪ মাস দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৪৪ সালের শেষের দিকে রামু ও কক্সবাজার বদলী হন । এখানে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা কালীন সময়ে তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন । ১৯৪৪ সালে তিনি দুইটি জাপানী বোমারু বিমান ভূ মধ্য সাগরে ভূ পতিত করে কর্তৃপক্ষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ১৯৪৩ সালে তাঁর পিতৃ বিয়োগ ঘটে । এতো বড় শোক ও তাঁকে কর্তব্য কর্ম থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি । এখান থেকে বদলী হয়ে বোম্বের বেলগাঁ জেলায় এবং ১৯৪৫ সালে নতুন দীল্লি তে বদলি হন । ১৯৪৬ সালে যুদ্ধ শেষ হলে স্বেচ্ছায় চাকুরী থেকে অবসর নেন ।

১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি তদানীন্তন বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে চাকুরী লাভ করেন । দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি এই বিভাগে চাকুরী করেন । ১৯৫০ সালে ব্যপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরে এদেশ থেকে অনেক হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায় । আমাদের পরিবারে এক মাত্র আমার পিতা ছাড়া সকলে ভারতে চলে যায় । ফলে আমার পিতা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন । চাকুরী জীবনে তিনি নানা আয়গা ঘুরে বেরিয়েছেন । ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার বাইমহাটী গ্রামে ততকালীন কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা স্বর্গীয় জগদীশ মিত্রের জ্যেষ্ঠা কন্যার সাথে পরিনয় সূত্রে আবদ্ধ হন । চাকুরী জীবনের অস্থায়ী বাস পিতৃ ভিটায় আত্মীয় স্বজন হীন অবস্থায় ১৯৬৭ সালে তিনি বাইমহাটী গ্রামে একটি বাড়ি করেন । তার পর থেকে আমরা বাইমহাটির বাসিন্দা ।

(ক্রমশ)

২ thoughts on “রায় পরিবারের শত বর্ষের ইতিহাস – [ আমার মা চিত্রা রায়ের জবানীতে ] ( তৃতীয় ভাগ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *