অতএব সুশীল হইতে হইলে………

পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা একেকজনকে একেক রকমের রুজি দিয়া পাঠাইয়া দিয়াছেন। কেউ একজন কোন এক পণ্য বিক্রয় করিয়া খাইবে আবার অন্য কেউ সেই পণ্য কিনিয়া খাইবে- এ রকমটিই বিধান। কেউ দুধ বেচিয়া মদ খাইবেন আবার কেউ মদ বেচিয়া দুধ কিনিয়া খাইবেন, ইহাও হইতে পারে। দুনিয়াটা এইরুপ ভাবে বিকি-কিনির নিয়মে চলিতেছে, ভবিষ্যতেও এইরুপ ভাবে চলিবার ব্যত্যয় ঘটিবার কোন সম্ভাবনা নাই। নিত্য নতুন পণ্য সামগ্রী উদ্ভাবিত হইতেছে, ক্রেতাগন-ও সে পণ্য ক্রয় করবার নিমিত্তে অহোরাত্র হুমড়ি খাইয়া পড়িতেছেন। নিত্য নতুন পণ্য সামগ্রী-র তালিকায় যে সকল নিত্য নতুন নাম যুক্ত হইতেছে তাহাদের মধ্যে “মাথা”র নাম প্রণিধানযোগ্য। এখন মাথা বেচাকেনার ব্যবসায় বড় লাভজনক বাণিজ্য বলিয়া পরিগণিত হইতেছে।

এ বাণিজ্য বড় লাভজনক বাণিজ্য। কোনমতে নামের সাথে একখানা ডিগ্রী লাগাইতে পারিলেই আপনি এ বাণিজ্যের জন্য কিঞ্চিৎ উপযুক্ত হইতে পারিয়াছেন বলিয়া মনে করা যাইতে পারে।ইহার জন্য বিশেষ কিছুর প্রয়োজন এমনটি ভাবিবার কোন কারন নেই, আপনাকে শুধু সুশীল হইতে হইবে।

সুশীল হইবার বিশেষ কিছু তরিকা আছে। প্রথমে আপনাকে এই সকল তরিকা মাফিক কিছু পূর্ব প্রস্ত্রতি সারিয়া লইতে হইবে। আসুন তরিকা গুলো দেখিয়া আসি।

তরিকা নম্বর একঃ

আপনি আসলে কি কহিতে চাহিতেচেন তাহা খোলাসা করিয়া বলিতে পারিবেন না। আপনাকে এক্ষেত্রে অত্তাধিক কৌসুলি হইতে হইবে। আপনি কোন বিশেষ শ্রেণীর সমর্থক হইলেও তা কোনক্রমেই মুখ ফুটিয়া প্রকাশ করিতে পারিবেন না। আপনার কথা হইতে বিজ্ঞ শ্রেণীর পাঠক-দর্শক বুঝিয়া লইবেন আসলে আপনি কি বলিতে চাহিতেছেন কিন্তু আপনার বয়ানকৃত বক্তব্য এমন হইবে যে আপনার কথাতে সরাসরি পক্ষপাতিত্তের দোষারোপ করা চলিবে না।

তরিকা নম্বর দুইঃ

আপনাকে আপনার বক্তব্যে এমনভাবে বিশেষ কোন সম্প্রদায় বা দলকে কটাক্ষ করিতে হইবে যেন সে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের গাত্রদাহ শুরু হইয়া যায় কিন্তু আপনি কোনক্রমেই বিচলিত হইতে পারিবেন না। আপনি অনড় হইয়া রহিবেন কিন্তু আপনার কিছু অনুসারী গুণগ্রাহীরা আপনার পক্ষ হইতে লড়াই চালাইয়া যাইবেন। আপনি মাঝেমধ্যেই প্রতিপক্ষকে উপর্যুক্ত যুক্তি তুলিয়া ধরিয়া দলকানা সাব্যস্ত করিবার প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইবেন কিন্তু কোনক্রমেই আপনাকে কেউ দলকানা বলিয়া গালমন্দ করিলে গায়ে মাখিবেন না বরঞ্চ আপনি যে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি দলকানাদের চোখে মুদ্রিত ও কর্ণে প্রবিষ্ট করাইবার প্রচেষ্টা চালাইতেছেন তাহা অত্যন্ত সুচারুভাবে আপনার বক্তব্যে ও লেখনীতে প্রকাশ করিতে থাকিবেন ।আপনার জিত হইবেই।

তরিকা নম্বর তিনঃ

কোন না কোনভাবে সর্বত্র রাজনীতিকে টানিয়া আনিয়া সেইটা লইয়া ত্যানা প্যাচাইতে না পারিলে সুশীল হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করা দুরহ ব্যাপার। তাই যে যাহাই বলুক না কেন আপনাকে তাহার মধ্যে নাক গলাইয়া রাজনীতিকে টানিয়া আনিতেই হইবে। তাহার পর, কেন ইহা এমন হইল্, কেন এমন হইলো না, ইহা হইলে কি হইত, ইহা না হইলে কি হইত না ইত্যাদি জাতীয় বিশ্লেষণমুলক বক্তব্য দিয়া পরিবেশ গরম করিয়া তুলিতে হইবে। এইখানে একটা উধাহরন দেওয়া যাইতে পারে। ধরুন, আপনি পাতে বসিয়াছেন, প্রকাণ্ড ইলিশের মাথা পাত জুড়িয়া শোভা পাইতেছে। হটাত, একটা হুলো বেড়াল লম্ফ মারিয়া আসিয়া ইলিশের মস্তক লইয়া ভো-দৌড়। এক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য কি হইবে? আসুন দেখিয়া লই, আপনি প্রথমেই এই বলিয়া শুরু করিবেন “ এ ক্ষেত্রে আমি বেড়ালের বিশেষ দোষ দেখিতে পাইতেছি না। দীর্ঘকাল মৎস্য বিহীন জীবনযাপন করিয়া অবশেষে বেচারা চৌর্যবৃত্তিতে প্রবৃত্ত হইতে বাধ্য হইয়াছে। এখন বেড়াল-সমাজ মাছ তো দূরে থাকুক কাঁটা পর্যন্ত জুটাইতে পারিতেছে না।এ ক্ষেত্রে চুরি না করিয়া উপায় কি? তাহার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরিয়া সরকার পার্শ্ববর্তী দাদাদের খুশি করিতে গিয়া দেশের মানুষকে অভুক্ত রাখিয়া টন কে টন ইলিশ মাছ তাহাদের হস্তে তুলিয়া দিতেছে। বেড়াল পাইলে চুরি করিবেনা তো কি করিবে?

তরিকা নম্বর চারঃ

প্রত্যেক ক্ষেত্রে একটি করিয়া কুমিরের বাচ্চা সংগ্রহে রাখিবেন। লক্ষ্য রাখিবেন, যেন এই কুমিরের বাচ্চাটি সদাজাগ্রত হয় এবং একেকটি বিষয়ের জন্য উপযুক্ত ও সর্বস্বীকৃত হয়। বিষয়ের মিল রাখিয়া সেগুলোকে গর্ত হইতে টানিয়া আনিবেন, দেখানো শেষ হইলে আবার সযত্নে গর্তে লুকাইয়া ফেলিবেন কিন্তু কোনক্রমেই হারাইয়া ফেলিবেন না।এ ক্ষেত্রেও উদাহরন দিতে হইবে? ধরুন, কেহ সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে মানুষ খুনের কথা পাড়িতেছেন অমনি আপনি ফেলানির “কুমিরের বাচ্চা” লইয়া শোরগোল তুলিয়া ফেলিবেন। কেহ আবার ছাত্র রাজনীতি ও তাদের সহিংসতার কথা পাড়িলেই সাথে সাথে বিশ্বজিতের “কুমিরের বাচ্চা” উচাইয়া দেখাইবেন। আবার, কোনকালে কোন পত্রিকার কোন এক কোনায় কি এক সংবাদ কবে প্রকাশিত হইয়াছিল তাহা সংগ্রহে রাখিবার অভ্যাস রাখিতে হইবে। এরকম শত শত কুমিরের বাচ্চা আর হাজার হাজার উদ্ধৃতি সংগ্রহে না রাখিতে পারিলে সুশীল হইবার চেষ্টা না করাটাই মঙ্গলজনক।

তরিকা নম্বর পাঁচঃ

আপনি যথা সম্ভব গলা ফুলাইয়া কথা বলিবার চেষ্টা করিবেন এবং প্রমান করিবার চেষ্টা করিবেন যে তা আপনার স্বাধীনতার অংশ বিশেষ। আপনি অন্যকে কৌশলে যদি কটাক্ষ করিয়াও থাকেন তবে তাহা জোর গলায় অস্বীকার করিবেন কিন্তু অন্য কেউ যদি আপনার দিকে চোখ তুলিয়া তাকায় তবে তাকে আই সি টি আইনের জুজু দেখাইবেন, ব্যক্তি আক্রমণকারি রুপে সাব্যস্ত করিবেন, দলকানা হিসেবে চিহ্নিত করিবেন, দালাল বলিয়া গালি দিতে ইচ্ছে করিলে একচোট বলিয়াও ফেলিতে পারেন।

সুশীল হইবার আরও অনেক অনেক তরিকা আছে, একেক তরিকার আবার হাজার হাজার পীর। তাই পীর হুজুরের তরিকা ও তাদের একনিষ্ঠ মুরিদদের দেখানো পথে দীর্ঘকাল পথ চলার অভ্যাস করাটাই সুশীল হইবার একমাত্র মোক্ষপথ। তাই হুজুরের পথ ধরুন, তাদের দেখানো পথে চলুন। কে জানে, ভবিষ্যতে আপনিও হয়তো আপনার পীরের চাইতে বড় সুশীল হইতে পারিবেন।

৯ thoughts on “অতএব সুশীল হইতে হইলে………

  1. আপনার ইঙ্গিত বুঝতে
    আপনার ইঙ্গিত বুঝতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি ।
    স্বীকার করতেই হবে আপনার লেখার হাত ভালো ।
    এই হস্ত চমৎকার পোস্ট প্রসব করার ক্ষমতা রাখে ।
    ধন্যবাদ !

    1. ধন্যবাদ।
      এই হস্ত চমৎকার পোস্ট

      ধন্যবাদ।

      এই হস্ত চমৎকার পোস্ট প্রসব করার ক্ষমতা রাখে ।

      প্রসব বেদনায় আমি যে সময় জর্জরিত সে সময়ে আপনার এরুপ সান্তনাবানী সত্যিই আরও বারংবার প্রসব করিবার উৎসাহ যোগাইতেছে।

    1. প্রভুত জ্ঞান লাভ যখন করিতে
      প্রভুত জ্ঞান লাভ যখন করিতে পারিয়াছেন তখন মনে হইতেছে, আপনাকে দিয়েই হইবে।

  2. সুশীল হৈবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু
    সুশীল হৈবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এত তরিকা মানা আমার পক্ষে বোধহয় সম্ভব হবে না ।মাফ করুন, আমি একটু বেশি বুঝে ফেললাম কি না!

  3. সুশীল হইবার আরও অনেক অনেক

    সুশীল হইবার আরও অনেক অনেক তরিকা আছে, একেক তরিকার আবার হাজার হাজার পীর। তাই পীর হুজুরের তরিকা ও তাদের একনিষ্ঠ মুরিদদের দেখানো পথে দীর্ঘকাল পথ চলার অভ্যাস করাটাই সুশীল হইবার একমাত্র মোক্ষপথ। তাই হুজুরের পথ ধরুন, তাদের দেখানো পথে চলুন। কে জানে, ভবিষ্যতে আপনিও হয়তো আপনার পীরের চাইতে বড় সুশীল হইতে পারিবেন।

    পীর ধরতে হলে কি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে হবে? আমি এই রকম পীরের মুরিদ হতে চাই, পিলিজ লাগে আমারে একটু হেল্পান।

Leave a Reply to কষ্টে আছে আইজুদ্দিন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *