হীরক রাজার দেশে…

যারা “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তারা জানেন ব্রেইন ওয়াশের অর্থ কি? ব্যাপারটা সিম্বলিকভাবে ফুটিয়ে তুললেও সত্যজিৎ রায়ের এই একটি চলচ্চিত্র বাংলা চলচ্চিত্র ভাণ্ডারের অন্যতম হীরক খণ্ড। “জীবন থেকে নেওয়া” আরেকটি উদাহরণ।

যা বলছিলাম। ব্রেইন ওয়াশড মানুষ আর ঠিক মানুষ থাকে না। এরা হয়ে যায় চাবি দেওয়া পুতুলের মতো। মালিকের প্রতিটি কথা ও কাজে এরা মাথা নুইয়ে নুইয়ে “জি হুজুর, জি হুজুর” বলে যায়। এর ব্যতিক্রম কিছু বলার বা করার ক্ষমতা এদের থাকে না।


যারা “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তারা জানেন ব্রেইন ওয়াশের অর্থ কি? ব্যাপারটা সিম্বলিকভাবে ফুটিয়ে তুললেও সত্যজিৎ রায়ের এই একটি চলচ্চিত্র বাংলা চলচ্চিত্র ভাণ্ডারের অন্যতম হীরক খণ্ড। “জীবন থেকে নেওয়া” আরেকটি উদাহরণ।

যা বলছিলাম। ব্রেইন ওয়াশড মানুষ আর ঠিক মানুষ থাকে না। এরা হয়ে যায় চাবি দেওয়া পুতুলের মতো। মালিকের প্রতিটি কথা ও কাজে এরা মাথা নুইয়ে নুইয়ে “জি হুজুর, জি হুজুর” বলে যায়। এর ব্যতিক্রম কিছু বলার বা করার ক্ষমতা এদের থাকে না।

পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যুগে যুগে দেশে দেশে শাসক গোষ্ঠী তাদের সুবিধার্থে এইরকম কিছু চাবি দেওয়া পুতুল বানিয়ে ছেঁড়ে রাখে ময়দানে। নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই এমনটা করা হয়। অথবা ভিন্নভাবে ভাবলে, যুগে যুগে এইরকম কিছু চাবি দেওয়া পুতুল মানব সমাজে থাকে বলেই শাসক গোষ্ঠী স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সাহস পায়। কারণ ওরা জানে, যাই করুক “জি হুজুর” বলে মাঠ গরম রাখার লোকের অভাব হবে না।

বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রতিটা দুঃশাসনের মাত্রা সীমাহীন হওয়ার মুহুর্তে এই দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষ করে ছাত্র সমাজ রুখে দাঁড়িয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছিলো, কারণ তারা তাদের ব্রেইনটাকে ওয়াশড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কালের বিবর্তে সেই সোনালি অতীত আজ কেবলই মধুর স্মৃতি। রোমন্থন করে আত্মগরিমা লাভ করা যায় কেবল। শাসক সমাজ যখন দেখেছে এই দেশের ছাত্রসমাজকে কব্জায় রাখতে না পারলে হীরক রাজার রাজত্ব কায়েম রাখা কঠিন হয়ে যাবে, তখনই তারা নজর ফিরালেন এইদিকে। নানান প্রলোভনের পসরা সাজিয়ে ছাত্রসমাজের ব্রেইন ওয়াশের কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করা হয়েছে।

কিন্তু তারুন্যের বৈশিষ্টই হচ্ছে লাগামছাড়া। আর তাই এই ‘১৩ সালে এসেও শাহবাগের মতো একটা গনবিস্ফোরন তৈরি হতে পেরেছিল। তারুণ্য দেখিয়ে দিয়েছিলো তাদের ব্রেইন ওয়াশ করে রাখা সবসময় সম্ভব নয়। সেই আন্দোলনের পরবর্তি গতিধারা নিয়ে অনেকের মনে অনেকরকম মতানৈক্য থাকতে পারে, কিন্তু সুচনার সেই বিস্ফোরণ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

টিকে থাকার জন্য মানুষের একটি সহজাত টেকনিক আছে, যাকে বলা হয় ডিফেন্স মেকানিজম। শাসক সমাজ টিকে থাকার নিমিত্তে তাই টেকনিকে পরিবর্তন আনতে দেরী করেনি। কাটা দিয়ে কাটা তোলার নীতিতে তরুণ সমাজের মাঝেই খুব কৌশলে একটা শ্রেণী তৈরি করে ফেলা হয়েছে যারা ট্রেইনার অব দ্যা ট্রেইনী হিসেবে কাজ করছে। এদের কাজ হচ্ছে তরুণদের আবেগ আর দেশপ্রেমকে পুঁজি করে তাদের মাঝে এই চিন্তাধারা ঢুকিয়ে দেওয়া, কোন অবস্থাতেই এই সরকারের সমালোচনা করা যাবে না। এই সরকার টিকে না থাকলে এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে আর কিছু থাকবে না। আদতে তা সত্যি কিনা সেটা সময় বিচার করবে। কিন্তু এদের চেতনায় কখনও এটা কাজ করে না যে, যেই চেতনার উপর ভিত্তি করে এই সরকার আমাদের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল, স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ দিলে সেই চেতনার জায়গা থেকে সরে যেতে বাধ্য। আর সরে গেলে সেই স্বকীয়তা আর বজায় থাকে না। তাই সমর্থনের অংশটাও অর্থহীন হয়ে যায়। সমালোচনা ব্যক্তি এবং মানুষকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য এবং বাধ্য করে। মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট হচ্ছে সুযোগ পেলেই স্বেচ্ছাচারী হওয়া। কিন্তু নানাবিধ বাঁধার প্রেক্ষিতে মানুষ স্বেচ্ছাচারী হওয়া থেকে বিরত থাকে।

ভুল করা অন্যায় কিছু নয়, বরং অন্যায় হচ্ছে সেই ভুলকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করা। সেটা বরং ভুলের মাত্রাকে আরও বৃদ্ধি করে মাত্র। বরং ভুল স্বীকারের সৎ সাহস মানুষকে আর মহত্বের রাজপথে উঠিয়ে দেয়। একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে। কিছুদিন আগে সমাজকল্যান মন্ত্রীর প্রকাশ্য সভায় ধুমপান নিয়ে সমালোচনা হয় ব্যাপকভাবে। সেই সমালোচনার প্রেক্ষিতে মন্ত্রী মহোদয় চিরাচরিত রাজনৈতিক কালচার অনুযায়ী ভুলকে জাস্টিফাই করার রাস্তায় না হেঁটে উনি উনার ভুল স্বীকার করে বিবৃতি প্রদান করেন। লক্ষ্যনিয় বিষয় হচ্ছে, উনার সেই ভুল স্বীকার করাকে সবাই সাধুবাদ জানায়। এ থেকে শিক্ষণীয় অনেক কিছুই আছে।

কিন্তু আমাদের তেলবাজ সমর্থকদের মাথায় এই জিনিস কখনই ঢুকবে না, এরা নিজেরাও হীরক রাজার অধীনে থাকতে পছন্দ করে এবং সাথে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই প্রবণতা ঢুকিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে। এদের রুখে না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমরা কেউই হীরক রাজার দেশের বাসিন্দা হতে ইচ্ছুক নই…

২৭ thoughts on “হীরক রাজার দেশে…

  1. কিন্তু আমাদের তেলবাজ

    কিন্তু আমাদের তেলবাজ সমর্থকদের মাথায় এই জিনিস কখনই ঢুকবে না, এরা নিজেরাও হীরক রাজার অধীনে থাকতে পছন্দ করে এবং সাথে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই প্রবণতা ঢুকিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে। এদের রুখে না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমরা কেউই হীরক রাজার দেশের বাসিন্দা হতে ইচ্ছুক নই…

    শেষের এই লাইনগুলো থেকে কেউ যদি শিক্ষা নিতে পারে দেশ ও জাতির মঙ্গল হইবেক।

  2. অল্প কথায় চমৎকার বিশ্লেষন
    অল্প কথায় চমৎকার বিশ্লেষন করেছেন আতিক ভাই । তবে একটা যায়গায় একমত হতে পারলাম না । আপনি বলেছেন , মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট হচ্ছে সুযোগ পেলেই স্বেচ্ছাচারি হওয়া । এটা মানতে পারলাম না ।

    1. মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট

      মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট হচ্ছে সুযোগ পেলেই স্বেচ্ছাচারি হওয়া

      ক্ষেত্র বিশেষে কিন্তু কথাটা সত্য। আপনি কমিউনিজমের স্বর্ণযুগের দিকে একটু চোখটা ঘোরান। দেখতে পাবেন ক্রশ্চেভ বা স্ট্যালিন কতটা স্বেচ্ছাচারী হয়ে গেছিল। মুল কমিউনিজমের বারোটা কিন্তু এরাই বাজিয়েছিল। তারপর মনে করেন পাড়ার একটি ক্লাবে সাংগঠনিকভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন কোন এক বড়ভাইকে অনেকদিন সভাপতি হিসাবে রাখলেন। সে যখন বুঝে যাবে তার কোন বিকল্প নাই। তখন সে হয়ে উঠবে স্বেচ্ছাচারি। এর মধ্যে ২/১টা ব্যতিক্রম হয়ত পাবেন।

      আবার মনে করেন এমনিতেই আপনি কাউকে ভাল বাসেন। ছোট ভাইয়ের মত আদর করেন। ছোটখাট ভুলত্রুটি করলে ক্ষমা করে দেন। সে তখন আপনার ভালবাসাকে দুর্বলতা মনে করে বসবে। হয়ে উঠবে স্বেচ্ছাচারি। 😀

    2. রাহাত ভাই, আমি আসলে মানুষের
      রাহাত ভাই, আমি আসলে মানুষের স্বভাবজাত বলতে বুঝাইনি যে মানুষ সহজেই স্বেচ্ছাচারী হয়। বুঝাতে চেয়েছি কোন ধরণের বাঁধার মধ্যে না থাকলে একটা পর্যায়ে মানুষ স্বেচ্ছাচারী হওয়া শুরু করে। এটা মানুষ সহ সকল প্রাণীর জেনেটিক বৈশিষ্ট।

  3. ভুল করা অন্যায় কিছু নয়, বরং

    ভুল করা অন্যায় কিছু নয়, বরং অন্যায় হচ্ছে সেই ভুলকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করা। সেটা বরং ভুলের মাত্রাকে আরও বৃদ্ধি করে মাত্র। বরং ভুল স্বীকারের সৎ সাহস মানুষকে আর মহত্বের রাজপথে উঠিয়ে দেয়।

    এই কথাগুলো তুমি ইসুপগুলের ভুষির মত গুলিয়ে খাইয়ে দিলেও যারা অলরেডি ব্রেইন ওয়াশড এর শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে সংশোধনের বিন্দুমাত্র আশা করা বোকামী।

    অল্পকথায় খুব সুন্দরভাবে সমসাময়িক বিষয়কে উপস্থাপন করেছ।

  4. অনাচার করো যদি,
    রাজা তবে ছাড়ো

    অনাচার করো যদি,
    রাজা তবে ছাড়ো গদি।
    যারা তার ধামাধারি,
    তাদের ও বিপদ ভারি।
    প্রজাগনে শোষন পাপ
    ক্ষমা ছেয়ে তোর নাই মাপ,
    নাই কোন পরিত্রান
    হিরকের রাজা শয়তান।
    দড়ি ধরে মারো টান
    রাজা হবে খান খান।

    অসাধারন একটা সিলেমার কথা মনে করে দিয়েছেন ড.আতিক ভাই।

    1. ধন্যবাদ। অভ্র একটু দেখে শুনে
      ধন্যবাদ। অভ্র একটু দেখে শুনে চালায়েন। আমার নামটা তো একেবারে ইয়ে করে দিয়েছেন।

  5. আরজ গুজার এই যে,
    কিন্তু এদের

    আরজ গুজার এই যে,

    কিন্তু এদের চেতনায় কখনও এটা কাজ করে না যে, যেই চেতনার উপর ভিত্তি করে এই সরকার আমাদের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল, স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ দিলে সেই চেতনার জায়গা থেকে সরে যেতে বাধ্য।

    কথাটিতে কিঞ্চিত নাক গলাইবার চেষ্টা করিতে বাধ্য হইলাম। সরকার আপনাদের সমর্থন পাইয়াচিল না আপনারাই সরকারের সমর্থন পাইয়াচিলেন? আপনাদের এই হামবড়া মনোভাবের কারনেই গনজাগরন মঞ্চ আজ বিভক্ত। এই সরকার-ই আপনাদের তিন পর্দার নিরাপত্তা দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছিল, সমর্থন দিয়া বাঁচাইয়া রাখিয়াছিল সেটা এরই মধ্যে ভুলে গেলেন?

    ভাল তো, ভাল নাহ!

    1. নতুন থিয়োরি পাইলাম। আগে
      নতুন থিয়োরি পাইলাম। আগে জানতাম সরকার জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকে, এখন শুনছি জনগণ সরকারী সমর্থন নিয়ে টিকে থাকে। আপনি তো গণজাগরণের জন্য সেদিন একটা মন্তব্যে ছাত্রলীগকেই মূল ক্রেডিত দিয়া দিলেন। তা আপনাকে একটা চ্যালেঞ্জ দেই, ছাত্রলীগকে বইলেন তো পারলে আরেকটা এরকম গণজাগরণ তৈরি করতে। চারদিকে একটু চোখ কান দিয়েন। সাধারণ মানুষ কি ভাবে সেটা একটু বুঝার চেষ্টা কইরেন। শুধু নিজেরা নিজেরা গ্যাংবাজি করলে দেশের মানুষের পালস বুঝতে পারবেন না। গণজাগরণ থেকে সাধারণ মানুষের সমর্থন কমে গেছে ওইদিনই, যেদিন মানুষ বুঝতে পারছে বা ধরে নিছে এই আন্দোলন ছাত্রলীগ এবং সরকারী সমর্থনে গঠিত আন্দোলন।

  6. “গ্যাংবাজি” শব্দটাকে চমেতকার
    “গ্যাংবাজি” শব্দটাকে চমেতকার মনে হলো।

    গণজাগরণ থেকে সাধারণ মানুষের সমর্থন কমে গেছে ওইদিনই, যেদিন মানুষ বুঝতে পারছে বা ধরে নিছে এই আন্দোলন ছাত্রলীগ এবং সরকারী সমর্থনে গঠিত আন্দোলন।

    তাও ভাল, শেখ হাসিনা একাত্ততা প্রকাশ করার কারনেই মানুষ গনজাগরন মঞ্চ ছেড়েছে -এ কথা বললেও আশ্চর্য হতাম না।

    1. এরকমই ভাববেন সেটাই স্বাভাবিক।
      এরকমই ভাববেন সেটাই স্বাভাবিক। কারণ আপনাদের কাছে আওয়ামী লীগ মানেই শেখ হাসিনা। আমার কাছে তা না। আওয়ামী লীগ মানে ঐ দলের একেবারে মাঠ পর্যায়ের একজন সমর্থক থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিটা নেতা। যাই হোক, আলোচনা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। পোস্টে তো আর ঐ একটা লাইনই লিখি নাই, অন্য বিষয়ে আগ্রহ থাকলে আলাপ করেন।

  7. অনেক লাইন-ই লিখেছেন তা তো
    অনেক লাইন-ই লিখেছেন তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

    লাইনগুলো যেখানে বেলাইনে গেছে বলে মনে হয়েছে সেগুলোর কথাই শুধু বললাম।
    আপনার ভাষ্যমতে আলোচনা অন্যদিকে যাচ্ছে, তাহলে যে দিকে নিয়ে যেতে চান সেদিকেই চলুক।
    আমি ক্ষ্যান্ত দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *