রায় পরিবারের শত বর্ষের ইতিহাস – [ আমার মা চিত্রা রায়ের জবানীতে ] ( দ্বিতীয় ভাগ)

ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে তিনি তার চাকুরী জীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ ১২ বৎসর এখানে শিক্ষকতা করেন । তাঁর শিক্ষক জীবনের প্রিয় ছাত্র ছিলেন ভারতের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ঐতিহাসিক এবং সমালোচক ডঃ নীহার রঞ্জন রায় । তার নামানুসারেই আমার পিতার নাম নীহার রঞ্জন রায় রাখেন ।


ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে তিনি তার চাকুরী জীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ ১২ বৎসর এখানে শিক্ষকতা করেন । তাঁর শিক্ষক জীবনের প্রিয় ছাত্র ছিলেন ভারতের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ঐতিহাসিক এবং সমালোচক ডঃ নীহার রঞ্জন রায় । তার নামানুসারেই আমার পিতার নাম নীহার রঞ্জন রায় রাখেন ।

১৯১২ সনে তিনি ঢাকা জেলার মনোহরদী থানায় বিবাহ করেন । বিয়ের এক মজার ঘটনা প্রচলিত আছে । কথিত আছে যে শ্রী বিপীন রায় অধিক বয়সে বিবাহ করবেন বলে মেয়ের বাড়ীতে যেয়ে বিয়ে করবেন না । ছেলের বাড়িতে বিয়ে হবে । কন্যা যাত্রীরা সকলে দাবী করলেন যে তাঁরা হাতীতে চড়ে বরের বাড়ি আসবেন । তাই বাধ্য হয়েই পাশের গ্রামের জমিদার বাবুর কাছ থেকে হাতি চেয়ে নিয়ে কন্যা যাত্রীদের আসার ব্যবস্থা করা হয় । বাড়ির কাছাকাছি আসলে পরপর কয়েকটা বাজী ফোটাবার প্রচন্ড শব্দে হাতী সয়ারীদের নিয়েই দ্রুত গতিতে পেছনে দৌড়াতে থাকলে কন্যা যাত্রীদের অনেকেই পড়ে গিয়ে আহত হন কেউ কেউ গাছের ডালে ঝুলে আত্মরক্ষা করেন । পরে বিপীন রায়ের ভগ্নিপতি যিনি জমিদার বাবুর প্রিয় বন্ধু ছিলেন তিনি সাইকেল নিয়ে হাতী নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হন । যাই হোক বিয়ের পরে সংসারের পুরো দায়িত্ব তার উপর এসে পড়ায় ময়মনসিংহ সিটি স্কুলের শিক্ষকতা বাদ দিতে বাধ্য হন ।

তখনকার দিনে গ্রামবাসীদের লেখাপড়ার প্রবনতা মোটেও ছিলো না । প্রায়ি ছিল নিরক্ষর । এই নিরক্ষর মূর্খ গ্রাম বাসীদের সন্তান দের লেখা পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য পাশের গ্রামের এক ধনী লোকের সহযোগীতায় তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । বিদ্যালয়ের নাম ছিলো কান্দিপাড়া আসকর আলী সরকার ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় । দীর্ঘ দিন এই স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি নিরক্ষরতা দূরীকরনের চেষ্টায় ব্রতী হন এবং শিক্ষার আলো দিয়ে এলাকাবাসীর অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন । এখানে উল্লেখ্য যে তখন এই এলাকায় আশে পাশের কয়েক মাইলের মধ্যে তিনি ই ছিলেন ইংরেজি জানা শিক্ষক লোক । তাই এলাকাবাসীর লেখা পড়া সংক্রান্ত অনেক কাক তাঁকে করে দিতে হত ।

পুরুষ শাসিত পরিবারে তিনি ছিলেন কর্তা । সন্তান সংখ্যা ছিলো ৯ জন । ৪ ছেলে ৫ মেয়ের পরিবারের অভ্যন্তরে কর্তৃত্ব করতেন তাঁ বাল্য বিধবা এক বোন । নাম ছিলো কাদম্বীনী দেবী । তিনিই ছেলে মেয়েদের দেখাশুনা থেকে সব কিছু করতেন । মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সিন্দুকের চাবি তাঁর কাছেই ছিলো ।

আমার পিতামহ বিপীন রায়ের জন্মের পূরব থেকেই রায় পরিবারের সচ্ছলতা ওই এলাকায় বিশেষ স্থানের অধিকারী ছিলো । এলাকাটি ছিলো ভাওয়ালের রাজার জমিদারীর অন্তর্গত । চাষ যোগ্য জমি তো প্রচুর ছিলোই । তার উপর ততকালীন সমাজ তান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রামের কৃষক দের মধ্যে সুদে টাকা লগ্নি দেয়াও আয়ের উৎস ছিলো । গ্রাম টি ছিলো দক্ষিন লামকাইন ও উত্তর লামকাইন এই দুই অংশে বিভক্ত । স্বাভাবিক কারনে সমাজ ও ছিলো দুইটি । এর মধ্যে সক্ষিন লামকাইনের সমাজপতি ছিলেন বিপীন রায় । ভাওয়ালের রাজকুমারের মৃত্যু সম্পর্কিত চাঞ্চল্যকর বিখাত মামলা পরিচালনার জন্য টাকার প্রয়োজন হলে রাজার তিন বোন জ্যোতির্ময়ী , কৃপাময়ী কিরনময়ী উক্ত এলাকার একটি তালুক বিক্রি করলে শ্রী বিপীন রায় তৎকালীন ২৬ হাজার টাকা দিয়ে তালুক ক্রয় করেন । এক মহা আড়ম্বর পূর্ণ অনুষ্ঠানের মাআধ্যমে তা দখল করা হয় ।

১৯৩৫ / ৩৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধান মন্তী জনাব ফজলুল হক সাহেব ঋন শালিষী বোর্ড গঠন করলে লগ্নির প্রায় ২ লক্ষ টাকা অনাদায়ো থেকে যায় । এই শোকেই বিপীন রায় অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েন । ১৯৪৩ সালে তিনি মৃত্যু বরন করেন । তাঁর স্ত্রী আজো বেঁচে আছেন ।

( এই লেখাটি মা লেখেন ১৯৮১ সালে বি এড পড়ার সময় । এখন মার ঠাকুমা মানে স্বর্গীয় শ্রী বিপীন রায়ের স্ত্রী আমার মায়ের ঠাকুমা বেঁচে নেই । আমিও আমার বড় মাকে দেখার সৌভাগ্য পেয়েছি )

(ক্রমশ)

৩ thoughts on “রায় পরিবারের শত বর্ষের ইতিহাস – [ আমার মা চিত্রা রায়ের জবানীতে ] ( দ্বিতীয় ভাগ)

  1. অসাধারণ লাগলো লেখাটা।
    অসাধারণ লাগলো লেখাটা। পরবর্তীটা চাই যত দ্রুত সম্ভব।

    —————————————————
    বন্ধু শক্ত হাতে ধর হাল,
    পাড়ি দিতে হবে অনন্ত পথ দূর পারাবার।…….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *