একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি

ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির । যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে তৈরী হয় এই কমিটি । গণ আদালত সৃষ্টি করে গোলাম আজমের মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাধ্যমে একটা মাইলফলক সৃষ্টি করে তারা ।

ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির । যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে তৈরী হয় এই কমিটি । গণ আদালত সৃষ্টি করে গোলাম আজমের মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাধ্যমে একটা মাইলফলক সৃষ্টি করে তারা ।
নির্মুল কমিটির বিনির্মানে পুরোভাগে ছিলেন আম্মা জাহানারা ইমাম । দেশের বিশিষ্ট্য শিল্পী , সাহিত্যিক , বুদ্ধিজীবি , সাংবাদিক , মুক্তিযোদ্ধাসহ ছাত্র শিক্ষক সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণে , সমর্থনে সৃষ্টি হয় নির্মুল কমিটির । একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি নিয়ে অসংখ্য ব্লগপোস্ট আছে । আজকে বরং কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করা যাক ।

পেছনের কথা

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধর্ম ও দেশ রক্ষার নামে জামায়াতে ইসলাম , মুসলিম লীগ এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ নিকৃষ্টতম মানবতাবিরোধী অপরাধ করে । আওয়ামী লীগ , কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর এই বিভত্‍স নির্যাতনের শুরু হলেও ক্রমেই তার ব্যাপ্তি পুরো দেশে ছড়িয়ে পরে । নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর চেয়েও ভীতিকর , ঘৃণ্য নাম ছিলো রাজাকার , আল বদর , আল শামস বাহিনী । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই শুরু হয় দালাল নিধন কার্যক্রম । শেখ মুজিব দেশে ফিরে দালাল আইন আদেশ জারী করেন ১৯৭২ এর ২৪ জানুয়ারী ।
১৯৭৩ এর ১১ ফেব্রুয়ারী দালাল মন্ত্রী ইসহাকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড শিরোনামে খবর পাওয়া যায় বাংলার বাণী পত্রিকায় ।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ ক্ষমাসংক্রান্ত প্রেসনোটে বলা হয়, ‘ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, ঘরবাড়ি অথবা জাহাজে অগ্নিসংযোগের দায়ে দন্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না।’ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তার ছিল মোট ৩৭ হাজার ৪৭১ জন। তাদের দ্রুত বিচারের জন্য সরকার সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ’৭৩-এর অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৮৮৪টি মামলা নিষ্কপত্তি হয়। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর প্রায় ২৫ হাজার ৭১৯ জন আসামি ছাড়া পায়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক থাকা প্রায় ১১ হাজার আসামির বিচার চলছিল। এ ছাড়া ৭৫২ জনের সাজাও হয়। এদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড হয়েছিল ।
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫ নং ধারায় বলা হয়, ‘যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সব ক’টি অভিযোগ থাকবে। ধারাগুলো হলো: ১২১ (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা), ১২১ ক (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র), ১২৮ ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা), ৩০২ (হত্যা), ৩০৪ (হত্যার চেষ্টা), ৩৬৩ (অপহরণ),৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ) ৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ),৩৬৮ (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা), ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৩৯২ (দস্যুবৃত্তি), ৩৯৪ (দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত), ৩৯৫ (ডাকাতি), ৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি),৩৯৭ (হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি), ৪৩৫ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন),৪৩৬ (বাড়িঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার), ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৩৬ (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন) অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান। এসব অপরাধী কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।’
৭৫ এর ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করেন জিয়াউর রহমান । ১৯৭৬ এর ১৮ জানুয়ারী নাগরিকত্ব ফিরে পাবার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করতে বলা হয় সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে ।

১৯৭৮ সালে গোলাম আজম বাংলাদেশে ফিরে আসে । গোলাম আজমের শাস্তি দাবি করে ১৯৭২ সালেই শহীদ পরিবারগুলো । ১৯৮১ সালে জামাত প্রথম প্রকাশ্যে দাবি করে যে একাত্তরে তাদের অবস্থান সঠিক ছিলো । এর পরেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে প্রথম আন্দোলন করে । সে সময় স্বৈরশাসক এরশাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠে জামাত । ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা শুরু করে তারা । ১৯৮৮ – ৮৯ এও জামাত বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয় । কিন্তু তত্‍কালীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দেয়ায় তা স্তিমিত হয় । বরং মুল দুইটি রাজনৈতিক দল জামাতকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মিত্রশক্তি ভেবে ভুল করে ।
১৯৯১ এর ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলাম নিজেদের আমির ঘোষণা করে । এর প্রতিক্রিয়াই মূলত শুরু হয় ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির অগ্রযাত্রা ।
কবির চৌধূরী , শাহরীয়ার কবির , কাজী মুকুল , আহমদ শরীফ , সুফিয়া কামালসহ অনেক বিশিষ্ট্য ব্যাক্তির সাথে একত্রিত হয়ে শুরু হয় নির্মুল কমিটির পথ চলা ।
বিচারপতি কে এম সোবহান , সাইফ ইমাম জামী , অজয় রায় , একে খন্দকারসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ।

১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সহ ৭০ টি সমমনা দল প্রথম বারের মতো নির্মুল কমিটির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে । তৈরী হয় সমন্বয় কমিটি । জাহানারা ইমাম হন সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক।

এপ্রিল মাসের বারো তারিখ নির্মুল কমিটির পদযাত্রায় একাত্মতা ঘোষণা করে ১০০ জন সাংসদ, যাদের ৮৮ জনই আওয়ামীপন্থী।

১৯৯১ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় গণ আদালত। গোলাম আজমের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় গণআদালত মোকদ্দমা নং ১/১৯৯২।
বাংলাদেশের গণমানুষের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, কবি শামসুল হক, ড. আনিসুজ্জামানের উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে অত্র গণআদালতে এই মামলার সূত্রপাত।
এই মোকদ্দমায় বাদীপক্ষ ছিলো বাংলাদেশের গণমানুষ, অভিযোগকারী
এবং আসামী পক্ষ জনাব গোলাম আযম ; পিতা : মওলানা গোলাম কবির
সাকিন : পাকিস্তান
অভিযোগকারীর পক্ষে কৌসলিবৃন্দ :
১. এডভোকেট জেড আই পান্না
২.এডভোকেট শামসুদ্দিন বাবুল
৩. এডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা
গোলাম আজমের পক্ষে গণ আদালত কর্তৃক নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন এডঃ নজরুল ইসলাম।
জনাব গোলাম আযম, পিতা মরহুম মওলানা গোলাম কবির একজন পাকিস্তানী নাগরিক। বহুদিন ধরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে, ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অন্তর্গত মগবাজার এলাকায় ১১৯ নম্বর কাজী অফিস লেনে অবস্থানরত। গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে হানাদার তথা দখলদার বাহিনীকে সর্বোতভাবে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ত্রিশ লক্ষ নিরীহ নিরস্ত্র নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যা এবং দুই লক্ষ নারী অপহরণ ও ধর্ষনের সহায়তা করে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন। উক্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তি কমিটি, আল বদর, আল শামস গঠন করে তাদের এবং তার অনুগত রাজাকার বাহিনী দিয়ে সাহায্য করে পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক দুই লক্ষ নারীকে অপহরন, ধর্ষণ এবং শ্লীলতাহানিতে প্ররোচিত করে হীন অপরাধ সংগঠন করিয়েছেন, উক্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার অনুগত আল বদর, আল শামস এবং রাজাকার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত করিয়েছেন এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে গণহত্যার উস্কানি, প্ররোচণা এবং সাহায্য দান করেছেন এবং তার উক্ত কার্যের ফলে বাংলাদেশের ত্রিশ লক্ষ নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছে, উক্ত সময়ে অভিযুক্ত গোলাম আযম তার গঠিত ও অনুগত আল বদর, আল শামস ও শান্তি কমিটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীহ পরিবার পরিজনের উপর সশস্ত্র ধ্বংসযজ্ঞ অভিযান পরিচালনা করে, উক্ত সময়ে অভিযুক্ত গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়ানোর লক্ষ্যে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে এবং এই দেশের শিল্প-সাংস্কৃতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয় এবং আজো এই দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে বিকৃত করা এবং শিক্ষা শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রসমূহ ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত করেছে, অভিযুক্ত গোলাম আযম ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান না করার জন্য বিদেশী দেশসমূহকে প্ররোচিত করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, অভিযুক্ত গোলাম আযম বিদেশী নাগরিক হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংবিধান বিরোধী ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচার চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর অভিযুক্ত গোলাম আযম তার নিজস্ব অনুগত বাহিনী আল বদর, আল শামস এবং রাজাকার বাহিনী দিয়ে লুটতরাজ এবং নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ঘরে অগ্নিসংযোগ করে অসংখ্য জনপদ ধ্বংস করেছে, ১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের অপহরণ ও হত্যা করে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ সংঘটন করে।
গোলাম আজম অনুপস্থিত থাকায় তার পক্ষের কৌশলী এই বিচারে অংশ নেয় এবং তাকে অভিযোগ পরে শোনানো হয়। যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার সম্পাদন করা হয়ঃ

১. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে ত্রিশ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যা এবং দু’লাখ নারী অপহরন ও ধর্ষণের সহায়তা করে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন ?
২. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আল বদর, আল শামস গঠন করে এবং তার অনুগত রাজাকার বাহিনী দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে দু’লাখ নারী অপহরণ এবং ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানিজনক অপরাধ সংঘটন করতে সাহায্য করেছেন ?
৩. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি পাকিস্তানী বাহিনীকে গণহত্যার উস্কানি এবং প্ররোচনা দান করেছেন?
৪.অভিযুক্ত গোলাম আযম কি আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে তাদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীহ পরিবার পরিজনের উপর সশস্ত্র ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করেছেন?
৫. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে বিদ্বেষ এবং সহিংসতা ছড়ানোর লক্ষ্যে ধর্মের নামে বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের নামে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং এই দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে ?
৬. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি তার নিজস্ব অনুগত বাহিনী আল বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনী দিয়ে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ করে অসংখ্য জনপদ ধ্বংস করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন?
৭. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে এই দেশে ১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে তার অনুগত বাহিনী আলবদর ও আলশামস দিয়ে বুদ্ধিজীবি হত্যা সংঘটন করেছেন?
৮. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করেছে?
৯. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারকার্য চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন?
১০. অভিযুক্ত গোলাম আযম কি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তার অনুগত আলবদর, আলশামস বাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী দিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন?.

এ মামলায় গোলাম আজম এর বিরুদ্ধে পনেরো জন সাক্ষী দেয়। তারা হলেন
১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান
২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ।
৩। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড, মেঘনাদ গুহ ঠাকুরতা।
৪। বাংলাদেশের বিখ্যত উপন্যাসিক, কবি এবং নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক
৫। সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির
৬। খ্যাতনামা লেখিকা মুশতারি শফি
৭। প্রকৌশলী ফজলুর রহমান এর পুত্র সাইদুর রহমান
৮। সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার এর পুত্র অমিতাভ কায়সার
৯। হাসিনা বানু
১০। মাওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ
১১। আলী জাকের
১২। ডা: মোশতাক হোসেন
১৩-১৫ নং সাক্ষীগণ অন্যান্য সাক্ষীদের সমর্থন করেন।

রায়

গণআদালত উপরে বর্ণিত সাক্ষ্য প্রমানাদি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে ১-৬ এবং ৯-১৫ নং সাক্ষীগণ পন্ডিত এবং সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ৭/৮ নং সাক্ষীদ্বয় শহীদ পিতার পুত্র। তাদের সাক্ষ্য এত সহজ-সরল এবং এমন প্রত্যয়ী যে, তাদের সাক্ষ্য বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক করে না। আমরা সাক্ষীদ্বয় প্রদত্ত সাক্ষ্য সত্য এবং দাখিলকৃত প্রদর্শনীসমূহ অকাট্য বিবেচনা করের সর্বসম্মতভাবে অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে বলে মনে করি এবং আনীত প্রতিটি অভিযোগের প্রত্যেক অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করছি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশে উপরোক্ত অপরাধ দৃষ্টান্তমূলক মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। যেহেতু গণ আদালত কোন রায় কার্যকর করে না, তাই বাংলাদেশ সরকার কে এ রায় কার্যকর করার অনুরোধ করা হলো।
২৬-০৩-১৯৯২

এভাবেই শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অংশ। যা পূর্ণতা পেয়েছে ফেব্রুয়ারি ‘১৩ এর গণজাগরণ এ। নির্মুল কমিটির অগ্রজপ্রতিম সহযোদ্ধারা থেকেছেন আমাদের বন্ধু হয়ে, অভিভাবক হয়ে। আম্মা নেই প্রায় বিশ বছর। তার হাতে গড়া তার সংগঠন তার অসম্পূর্ণ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠার সাথে।
জয় বাংলা হোক আমাদের সকলের প্রাণের ধ্বনি
গোলাম আজম সহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
২০১৪ হোক আমাদের দায় মুক্তির বছর।

৩৩ thoughts on “একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি

  1. এই পোস্টে অনেকখানি অংশ বাংলা
    এই পোস্টে অনেকখানি অংশ বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে উদ্ধৃতি দেয়া। তথ্য এবং অন্যান্য সহযোগিতার জন্যে ইউরিডাইস কে ধন্যবাদ। এছাড়া ডন মাইকেল কর্লিওনি ও তারিক লিংকন ভাইকেও ধন্যবাদ।

    1. সর‍্যি!! ভাই তোরে হেল্প করতে
      সর‍্যি!! ভাই তোরে হেল্প করতে পারলাম না বলে… কোথায়ও খুঁজে পাইলাম না লিস্টটি!! অনেক ভাল একটা কাজ করেছিস… শেয়ার দিলাম, প্রিয়তে নিলাম!
      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow: :bow:

    2. খুজেছি অনেক কিন্তু পাইনি। বাট
      খুজেছি অনেক কিন্তু পাইনি। বাট আমি এখনও হাল ছাড়িনি, উচ্ছাস। চেষ্টা চালিয়ে যাব লিস্টটা যোগাড় করবার। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল আজো কেন কেউ অনলাইনে সংরক্ষন করেননি, সেটা ভেবে একটু অবাক লাগছে, কষ্টও লাগছে…

      একটা চমৎকার কাজ করবার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ধইন্যাপাতা: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল: ও :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

  2. আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়

    আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ধর্ম ও দেশ
    রক্ষার নামে জামায়াতে ইসলাম , মুসলিম লীগ
    এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ নিকৃষ্টতম
    মানবতাবিরোধী অপরাধ করে ।
    আওয়ামী লীগ , কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দু
    সম্প্রদায়ের উপর এই বিভত্স নির্যাতনের
    শুরু হলেও ক্রমেই তার
    ব্যাপ্তি পুরো দেশে ছড়িয়ে পরে । নয় মাসের
    যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর চেয়েও ভীতিকর ,
    ঘৃণ্য নাম ছিলো রাজাকার , আল বদর , আল
    শামস বাহিনী । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই
    শুরু হয় দালাল নিধন কার্যক্রম । শেখ মুজিব
    দেশে ফিরে দালাল আইন আদেশ
    জারী করেন ১৯৭২ এর ২৪ জানুয়ারী ।
    ১৯৭৩ এর ১১ ফেব্রুয়ারী দালাল
    মন্ত্রী ইসহাকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড
    শিরোনামে খবর পাওয়া যায় বাংলার
    বাণী পত্রিকায় ।
    ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ
    ক্ষমাসংক্রান্ত প্রেসনোটে বলা হয়, ‘ধর্ষণ,
    খুন, খুনের চেষ্টা,
    ঘরবাড়ি অথবা জাহাজে অগ্নিসংযোগের
    দায়ে দন্ডিত ও অভিযুক্তদের
    ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য
    হইবে না।’ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে ৩১
    অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তার ছিল মোট ৩৭
    হাজার ৪৭১ জন। তাদের দ্রুত বিচারের জন্য
    সরকার সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
    গঠন করে। ’৭৩-এর অক্টোবর পর্যন্ত দুই
    হাজার ৮৮৪টি মামলা নিষ্কপত্তি হয়।
    বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর প্রায়
    ২৫ হাজার ৭১৯ জন আসামি ছাড়া পায়। কিন্তু
    সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক থাকা প্রায় ১১
    হাজার আসামির বিচার চলছিল। এ ছাড়া ৭৫২
    জনের সাজাও হয়। এদের মধ্যে কয়েকজনের
    মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। বাকিদের যাবজ্জীবন
    কারাদন্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড
    হয়েছিল ।
    সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫ নং ধারায় বলা হয়,
    ‘যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত
    ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য
    অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের
    বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
    রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত
    ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সব
    ক’টি অভিযোগ থাকবে। ধারাগুলো হলো:
    ১২১ (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
    চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা), ১২১ ক
    (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর
    ষড়যন্ত্র), ১২৮ ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা), ৩০২
    (হত্যা), ৩০৪ (হত্যার চেষ্টা), ৩৬৩
    (অপহরণ),৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ)
    ৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ),৩৬৮
    (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা), ৩৭৬
    (ধর্ষণ), ৩৯২ (দস্যুবৃত্তি), ৩৯৪
    (দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত), ৩৯৫ (ডাকাতি),
    ৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি),৩৯৭
    (হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ
    দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি), ৪৩৫ (আগুন
    অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের
    সাহায্যে ক্ষতিসাধন),৪৩৬ (বাড়িঘর ধ্বংসের
    উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য
    ব্যবহার), ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৩৬
    (আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের
    সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন)
    অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান। এসব
    অপরাধী কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।’
    ৭৫ এর ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল
    করেন জিয়াউর রহমান । ১৯৭৬ এর ১৮
    জানুয়ারী নাগরিকত্ব ফিরে পাবার জন্য
    মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করতে বলা হয়
    সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম
    আজমকে ।

    যারা বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধিদের মাফ করে দিয়েছিল তাহলে আবার কেন বিচার করা হয়। তাদের দেখানো উচিত এটা।

    পোস্ট স্টিক করা হোক, ছোট হলেও ঐসব পাবলিকের যারা দ্বীধায় ভোগে তাদের জন্য উপকারী হবে।

  3. অনেক কিছু জানার আছে এখান
    অনেক কিছু জানার আছে এখান থেকে। সবাইকে পোস্টটা শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছি। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. ধন্যবাদ আপনাকে, এমন তথ্যবহুল
    ধন্যবাদ আপনাকে, এমন তথ্যবহুল পোস্ট দেয়ার জন্য। এই ব্যাপারটাই অনেক কিছুই জানা ছিলনা, আজ জানলাম।। প্রিয়তে জায়গা দিলাম… 🙂

  5. অসাধারন একটা তথ্যপূর্ণ পোস্ট।
    অসাধারন একটা তথ্যপূর্ণ পোস্ট। এতো দারুন, তথ্যপূর্ণ একটা পোস্টের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ… :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: । লেখাটা প্রিয়তে নেবার সঙ্গে শেয়ারও দিলাম…

  6. প্রিয়তে নিলাম , বঙ্গবন্ধু
    প্রিয়তে নিলাম , বঙ্গবন্ধু সবাইকে সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেছিলেন বলে যারা প্রচার করেন তাদেরও শাস্তি হওয়া উচিত । শাস্তি চাই ।

  7. সত্যি অনেক কিছু জানার আছে।
    সত্যি অনেক কিছু জানার আছে। :থাম্বসআপ: :bow: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল: :তালিয়া:
    —————————————————
    বন্ধু শক্ত হাতে ধর হাল,
    পাড়ি দিতে হবে অনন্ত পথ দূর পারাবার।…….
    https://www.facebook.com/sbuchchhwas

  8. আমি এই পোস্ট নিয়ে কিছু বলব না
    আমি এই পোস্ট নিয়ে কিছু বলব না এটা নিয়ে বলতে হলে অনেক কিছু বলতে হবে। এই পোস্ট সেই সব নষ্ট ভদ্রলোকদের মুখে থু। যারা একসময় মুক্তিযুদ্ধ কে পাশ কাটিয়ে উপেক্ষা করে ব্যক্তি স্বার্থের কারণে ইতিহাস কে বিকৃত করেছিল। আজ তাদের জন্য এই জাতীয় লেখা গুলো একেকটা উত্তর যে সবাই দায়িত্ব এড়িয়ে যায় না। দেশপ্রেমের কোন বয়স নাই, সীমা নাই। বোধের জায়গা থেকে কাজ করলে কোন কিছুই কোন বিষয় না। Hat’s off Orfiyas.

  9. বিশাল তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট। এসব
    বিশাল তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট। এসব যুগগান্তকারি সময়োপযোগি পোস্টের কল্যাণেই ইতিহাস জীবিত থাকবে। এরূপ পোস্ট লেখকগণই ইতিহাসকে ধরে রাখবে। অসংখ্য ধন্যবাদ পোস্টের জন্য…….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *