অপেক্ষা…

অফিস শেষ করে প্রতিদিনের মত গুলিস্তান মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে হিমেল।চাকরীর বেতন পুরোটাই সে মায়ের হাঁতে তুলে দেয়।এরপর মা হাত খরচের জন্য যা দেয় সেই থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে গতমাসে একটা ভালো দামী ফোন কিনে।এতো বড় অফিসে চাকরী করে,ভাল একটা ফোন না হলে কি চলে।তাছাড়া এখন ইন্টারনেট,ফেসবুকের যুগ।অফিসের অবসরে বিনোদন হিসেবে ফেসবুক এখন সবচেয়ে বেশি আধুনিক এবং স্মার্ট বিনোদন।বাসে উঠেই ফোনে গান ছেড়ে দিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে ফেসবুকে লগইন করে।


অফিস শেষ করে প্রতিদিনের মত গুলিস্তান মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে হিমেল।চাকরীর বেতন পুরোটাই সে মায়ের হাঁতে তুলে দেয়।এরপর মা হাত খরচের জন্য যা দেয় সেই থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে গতমাসে একটা ভালো দামী ফোন কিনে।এতো বড় অফিসে চাকরী করে,ভাল একটা ফোন না হলে কি চলে।তাছাড়া এখন ইন্টারনেট,ফেসবুকের যুগ।অফিসের অবসরে বিনোদন হিসেবে ফেসবুক এখন সবচেয়ে বেশি আধুনিক এবং স্মার্ট বিনোদন।বাসে উঠেই ফোনে গান ছেড়ে দিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে ফেসবুকে লগইন করে।

আজ তিনদিন হল মেয়েটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করছে।অথচ এখনো কথা হয়নি।আর যেন অপেক্ষা করতে পারছেনা হিমেল।কিন্তু মনের ভিতর একটা অচেনা ভয়।কিভাবে শুরু করবে,এই চিন্তায় যেন আরও বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ছে। যদি মেয়েটা রেগে যায় অথবা রিপ্লাই না দেয়,তাহলে বেপারটা বেশ লজ্জার হবে!কি করবে ভেবে পায়না। ভাবতে ভাবতে বাসের মধ্যেই কখন যে হিমেল ঘুমিয়ে পড়ে টের পায়নি।

আজ তিনদিন ধরে সফিক একবেলা,শুধু দুপুরে ভাত খায়।গতকাল এক জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে।চাকরি হলে সাতদিন পর ডাকযোগে জানাবে বলেছে।ঢাকা ভার্সিটি থেকে অনার্স পাশ করার পর থেকে প্রায় ছয় মাস হয়ে গেলো।এবং এই ছয় মাসে সফিক ২০বার চাকরীর ইন্টারভিউ দিয়েছে।চাকরী হলে প্রতিবারই ইমেল অথবা ডাকযোগে জানাবে বলেছে।কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন চিঠি বা ইমেইল সে পায়নি।প্রেমিক যেমন প্রেমিকার চিঠির আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে,শফিকও তেমনি করে প্রতিবার অপেক্ষা করেছে।ইন্টারভিউ বোর্ড কখনোই কথা রাখেনি,তাই চিঠিও আসেনি।তাইতো এখন আর অপেক্ষা করেনা।

সময় সন্ধ্যা।আজিজ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।পকেটে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট।পাশের দোকান থেকে তেহারির গন্ধ নাকে এসে লাগছে।না এখন খাওয়া যাবেনা।গন্ধ খেয়েই রাত পার করতে হবে।আগামীকাল টিউশুনির টাঁকা যদি না পায় তবে এই পঞ্চাশ টাকাই আগামীকালের ভরসা।নয়তো একবেলা খাবারও জুটবে না।না খেয়ে থাকতে হবে।সফিক ফুটপাতের ধারে রাস্তায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে।আকাশের বুকে এখনো পরিপুর্ন অন্ধকার নেমে আসেনি।

শাহাবাগের জ্যামে হিমেলের ঘুম ভেঙে যায়।দ্রুত চোখ মেলে দেখে সে গাড়িতে।বুক পকেটে হাত দিয়ে মোবাইলের অস্তিত্ব টের পেয়ে স্বস্তি ফিরে পায়।হঠাৎ মনে পরে যায় ফেসবুকের সেই মেয়েটির কথা।দ্রুত স্ক্রিন আনলক করে দেখে সেই মেয়েটির এসএমএস!শুধু মাত্র একটি ‘হ্যালো’ অথচ হিমেলের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি ওর সকল কথা জেনে গেছে।এবং ওর উপর এই জন্য মোটেও বিরক্ত নয়।বরং মেয়েটা ওকে ভালোবাসার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে।

খুব গরম পড়েছে।জানালাটা খুলে দিয়ে হিমেল জানালার দার ঘেসে কি রিপ্লাই দিবে তাই ভাবছে।এমন সময় জ্যাম ক্লিয়ার হয়ে গেছে।গাড়ির চাকা ঘুরছে।হঠাৎ জানালা দিয়ে একটি ছোট হাত কোত্থেকে যেন এসে চোখের পলকেই থাবা দিয়ে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেলো।গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে।আশেপাশের যাত্রীরা সবাই এই ঘটনায় হই হুল্লোড় করছে।কিন্তু কেউ বাসটাকে থামাতে বলছে না।কেউ নেমে গিয়ে ছিনতাইকারীকে ধরার চেষ্টা করার কথা বলছেনা।হিমেল যেন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার এতো প্রিয় একটা জিনিস।সবচেয়ে বড় কথা এই প্রথম একটা মেয়েকে তার এতো ভালো লেগেছে।তাকে পেয়েও যেন…

সফিক শাহাবাগের দিকে এগোচ্ছে।ছবিরহাট যাবে।জাকিরের দোকান থেকে বাকিতে এক কাপ বিস্বাদ গুরের চা খেয়ে হলে ফিরবে।হঠাৎ দেখে একটি ছেলে প্রানপনে ছুটে আসছে তারদিকে।পিছনে কিছু মানুষ ছেলেটিকে তারা করছে।কিছু বুঝতে না বুঝতেই অন্ধকারে দৌড়ের মাঝেই তরিঘরি করে একটা ফোন ওর হাঁতে গুজে দিয়ে ছুটে যেতে লাগলো।দ্রুত পিছনে তাকিয়ে দেখে পিছনের লোক গুলি ছেলেটাকে ধরে ফেলেছে।এবং খুব মারধর করছে।ফোনটা ওর হাঁতে গছিয়ে দিয়েও নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে পারলো না।

সফিক আরও খানিকটা সামনে এগিয়ে এসে ফোন হাঁতে দাড়িয়ে আছে,ছেলেটার ফিরে আসার অপেক্ষায়।কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেলো ছেলেটা আসলো না।সফিক কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।সারাদিনের ক্লান্ত শরীরে আর দাড়িয়ে থাকতে পারলো না।

যাক ভালোই হয়েছে।ক্ষুধার পেটে রাতে ঘুমানো কষ্ট।আজকের রাতটা অন্তত মোবাইলে গেম খেলে ভালভাবেই কেটে যাবে।তাছাড়া নেট কানেকশন থাকলে মেইলটাও সকালে চ্যাক করা যাবে।হলে ঢুকে নেট আছে কিনা চ্যাক করার জন্য ফোনের স্ক্রিনে টাচ করতেই দেখে ফেসবুকের চ্যাট বক্স।কিন্তু নেট কানেকসন নাই।বুঝা গেলো কাভার খুলে সিমটা খুলে ফেলা হয়েছে।সফিক হলের ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে ব্রাঊজ করা শুরু করলো।

একটা মেয়ের বেশ কয়েকবার ‘হ্যালো, হ্যালো এবং রিপ্লাই দেননা কেন, খুব মুড নিচ্ছেন,ফেবুতে মুড নিলেই পার্সোনালিটি হাই হয়ে যায়না’ টাইপ এসএমএস ছাড়া তাদের অতীতের আর কোন কনবার্সেসন পাওয়া গেলো না।স্যতরাং বুঝা গেলো ফোনের মালিক নতুন ফেসবুকার এবং মেয়ে ফেবু বন্ধুটিও সদ্য পরিচিত অথবা এখনো পরিচয় হয়নি।
যাক, ভালোই হল।অনেকদিন পর ফেসবুক,তাও আবার সাথে ফেবু বন্ধু ফ্রি!খারাপ না।
সফিক মেয়েটিকে রিপ্লাই দিল।সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি একটি ভ্যাংচির ইমো প্রদর্সন করলো।সফিক ভাবল বাহ!ভাল তো?

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই মেইল চ্যাক করে দেখে কেমন যেন এক অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।স্বপ্ন দেখছিনা তো?চাকরিটা শেষ পর্যন্ত হয়েই গেলো!সফিকের আনন্দে লাফিয়ে উঠার কথা।কিন্তু কেন জানি সেই বোধ কাজ করছে না।

এইদিকে সাতদিন হয়ে গেলো মেয়েটির সাথে সফিকের প্রতিরাতে চ্যাট হয়।এবং খুব দ্রুত ওদের সম্পর্কটা অন্যদিকে মোড় নেয়।আগামীকাল সফিকের সাথে রমনায় দেখা করার কথা।
ফেসবুক আইডিটা হিমেল নামের একজন ভদ্রলোকের।প্রোফাইলের ছবিটাও তার।কি করবে বুঝতে পারছেনা।সফিক এই কয়দিন খুব ঘোরের মধ্যে ছিল।তাই একবারও মাথায় আসেনি যে ফেসবুক ইনফোতে লোকটার পুর্ন ঠিকানা দেওয়া আছে।এবং সে চাইলেই ফোনটা ফিরত দিতে পারতো।অথচ এই বোকামীর জন্য সে নিজের অজান্তেই একটা মেয়ের সাথে মিথাচার করে আসছে।
তবে এটাও সত্যি।এতো অল্প সময়ে সফিক নিজেও মেয়েটার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।সিগারেটের পকেট থেকে দুইদিন আগের অর্ধেক খাওয়া পুরনো সিগারেটটা জ্বালিয়ে উদাস মনে টানতে থাকে।

আজিজ মার্কেটের ভিতর ঢুকলেই কেমন জানি দম বন্ধ বন্ধ লাগে।এমনিতে নিতু একা একা কখনোই এই মার্কেটে আসেনা।সবসময় বাবার সাথে আসে।আজ প্রথমবার বিশেষ একটা কাজে একা একাই এসেছে।আগামীকাল সকালে হিমেলের সাথে তার প্রথম দেখা হবে।কিছু একটা উপহার না নিয়ে গেলে কেমন দেখায়!তাছাড়া ভালোবাসার মানুষটিকে সারপ্রাইজ দিতে কার না ভালো লাগে!আজিজ মার্কেট থেকে অনেক ঘুর ঘুরে খুব পছন্দ করে একটা পাঞ্জাবী কিনে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকল।জিবনানন্দের কবিতা সমগ্র বইটা হিমেলের জন্য কিনতে হবে।

বইয়ের দোকানে ঢুকেই নিতু একটা বড় ধরনের ধাক্কা খেল।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।দ্রুত এক পাশে এসে ফোনটা বের করে হিমেলের প্রোফাইল পিকচারটা বের করে মিলিয়ে দেখছে।হ্যা এটাইতো হিমেল। একেবারে হুবুহু!নিতু কি করবে বুঝতে পারছেনা।লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।শরীরে ঘাম দিচ্ছে।হিমেল ওকে দেখলেই চিনে ফেলবার কথা।কিন্তু মিতু আজকে দেখা দিবে না।ও মানসিকভাবে প্রস্তুত না।হিমেল বাস্তবেও এতোটা স্মার্ট !সত্যি,ভাবতেই কেমন জানি একটা ভালো লাগা কাজ করছে।

নিতু ভেবে পাচ্ছেনা,হিমেলের পাশে শাড়ি পড়া মেয়েটা কে?হঠাৎ দেখল মেয়েটা খুব ইমোশন নিয়ে ধীরে ধীরে হিমেলের হাত ধরে পাশাপাশি দুইজনে মনোযোগ দিয়ে বই খুজতেছে।নিতুর আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু।রাগে কষ্টে অপমানে চোখে জল এসে গেলো।সারা শরীরে একধরনের কাপুনি অনুভব করলো নিতু।হঠাৎ উন্মাদিনীর মত হাতের শপিং ব্যাগটা খুব জোড়ে ছুড়ে মেলল হিমেলের পায়ের দিকে।এইরকম আকস্মিক ঘটনায়, বই ঘরের দোকানদার, হিমেল, হিমেলের নব বিবাহিতা বউ সবাই খুব অবাক হল।কেউ কিছু বুঝার আগেই এক মুহুর্ত দেরি না করে নিতু বেড়িয়ে পড়লো।সবার আগে ফেসবুক আইডিটা চির তোরে ডি-এক্টিভ করলো।

সারারাত ফেসবুকে নিতুকে না পেয়ে মনের মাঝে একটা চাপা ভয় এবং হতাশ হলেও সকাল বেলা ফুরফুরে মেজাজেই শাহাবাগ মোড়ে আসলো সফিক।ফুলের দোকানে তাজা ফুল দেখে দশ টাঁকা দিয়ে একটা বিশাল সাইজের গোলাপ ফুল কিনে রমনার দিকে হাঁটা ধরল।দশটার সময় নিতুর আশার কথা।তারপর দুইজন মিলে আইস্ক্রিম কিনে খাবে।শিশু পার্কে যাবে।কিছুক্ষনের জন্য দুইজন সেই ছোটবেলায় ফিরে যাবে।আরও কত মজার মজার প্ল্যান।সফিক খুব দ্রুত পা চালাচ্ছে।
নিতু কেন এখনো আসছেনা। ফেসবুক আইডিও নাই।কোনদিন ফোন নাম্বারটাও নেওয়া হয়নি।সফিক বুঝতে পারছে না কিছুই।বেলা এখন ১টা বাজে,এমন তো হবার কথা না?

এতো কষ্টের পর এতদিনে একটা চাকরী পেয়েছে সফিক।এর মাঝে আবার নিতু এলো জীবনে।ভেবছিল নিতুর কাছে সকল ভুলগুলো ঠাণ্ডা মাথায় খুলে বলবে।এরপর ওর ভালোবাসার কথা বলবে।এবং ছন্নছাড়া জীবনটা এবার গুছিয়ে নেবে।
পার্কের দক্ষিন প্রান্তে ফুল হাঁতে একটি পাথরের বেঞ্চিতে সফিক বসে আছে।গাঁয়ে নিতুর অনুরোধে পরে আসা,বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা সাদা পাঞ্জাবী।

১৩ thoughts on “অপেক্ষা…

        1. আশা করছি জয়ের কাছ থেকে ভালো
          আশা করছি জয়ের কাছ থেকে ভালো উত্তরই পাবেন। ও এই বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট কিনা… 😀 :ভেংচি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *