খবরের আকালে আর কতদিন?

আকালটা শুরু হয়েছে নির্বাচনের পর থেকেই। বিএনপি কিছু একটা করবে মনে হচ্ছিল। দেশবাসী বেশ কিছুদিন অপেক্ষাও করল। এরপর সময় পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীর বোঝা হয়ে গেল, বিএনপির দৌড়। কূটনীতি পাড়ায় দৌড়ঝাঁপ ছাড়া আর তেমন কিছু করণীয় তাঁদের নেই। করণীয় অবশ্য আগেও ছিল না। জামায়েতের কাঁধে চেপে হরতাল আর কেবল একটি ভাঙ্গা রেকর্ড ‘দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে’। ব্যস এই পর্যন্তই। আর মাঝে মাঝে নেত্রীর প্রেস রিলিজ পাঠ করে শোনানো। মানব বন্ধন আর বিক্ষোভ সমাবেশের যেহেতু কোন মার্কেট নাই তাই সেগুলো বললাম না। বড় কিছু নেতার কারাবরণ একটু মার্কেট পেয়েছিল কিন্তু তাঁর প্রতিবাদে যা হোল তা দেখে দেশবাসী বুঝে গেল, এবারও তেমন কিছু হবে না। তাই আর ওসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। আর যেহেতু বিরোধীদলের কর্মকাণ্ড ‘ভালো হচ্ছে না কিন্তু’– জাতীয় কিছু কথায় সীমাবদ্ধ থাকলো। তাঁদের প্রতিবাদ ধাঁচের কর্মসূচীতে যখন নেতা কর্মীদের আকাল দেখা গেলো, তখন সরকারও বুঝে গেল যাকে ইচ্ছে চালান করা যায়। সরকারও তাই নির্ভয়ে যাকে খুশী জেলে পুড়ছে, রিমান্ডে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে ছাড়ছে, আবার ধরছে।
অনেকদিন এভাবেই পেরোনোর পরে এখন দলটির শখ হয়েছে কমিটি পুনর্গঠনের। সে নিয়েও প্রতিদিন কিছু না কিছু খবর আসছে। বলাই বাহুল্য, খবরগুলো দলের জন্য খুব ভালো না। ফলে দলে নতুন প্রাণ এনে দেবার বদলে ‘কমিটি গঠন’ হয়ে উঠেছে এক বিষফোড়া। এসব সমস্যার কিভাবে সমাধা হবে? নেত্রী কাকে নেতৃত্বে আনবেন, কাকে বাদ দিবেন? যাদের বাদ দিবেন, তাঁদের আবার কিভাবে খুশী করবেন কিংবা কোন কোন নতুন মুখ আনবেন? তবে বিএনপির জন্য এই মুহূর্তে খুশীর খবর হচ্ছে, তাঁদের দলের অভ্যন্তরে কি ঘটছে সে ব্যাপারেও কারো খুব বেশী আগ্রহ নেই। শুধু কি দেশবাসী? বিএনপির নিজেরও এ নিয়ে খুব বেশী চিন্তা নেই। হাব ভাবে মনে হচ্ছে, ‘মাপ চাই’ বলে সরে যেতে পারলে বাঁচে। খোকা সাহেব শুরু করেছেন, বাকীরা কি করে দেখা যাক।
সমস্যায় পড়েছে আওয়ামীরাও। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। নিজের ইচ্ছে মত সংসদ নির্বাচন করল। এরপর নিজের ইচ্ছেমত বিরোধী দল বানাল। এরশাদ সাহেবকেও বেশকিছুদিন দৌড়ের ওপর রাখল। অবশ্য এখনও রেখেছে। মঞ্জুর হত্যা মামলার রায় কখন আসবে, সে নিয়ে সাসপেন্স খুলছে না। তবে সমস্যা আসলে এসবের কোনটাতেই না। মূল সমস্যা হয়ে গেছে মিডিয়া নিয়ে। মিডিয়ায় নিজেদের আনবার কোন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। যদিও প্রতিদিন কিছু না কিছু বলে হেডলাইনে আসছে তবে সে আসাটা কেন যেন পানসে টাইপের আসা। জনগণ গোগ্রাসে গিলছে না। তাঁরা নিজেরাও বুঝে পাচ্ছে না কি এমন বললে, গুরুত্ত্ব সহকারে হেডলাইনে আসা যায়। কি এমন করলে তাঁদের কথা পাবলিক গোগ্রাসে গিলবে, সে চিন্তায় তাঁদের ঘুম হারাম হওয়া অবস্থা।
ওদিকে বিএনপি কোন আন্দোলন ও করছে না। উপজেলা নির্বাচনেও এসেছে। ‘নাকে খত’ এর কথা বলে উস্কে দেয়ার চেষ্টা হল। কাজে দিচ্ছে না দেখে তারাও ভাবনায় আছে আর কি করে ওদের উস্কানি দেয়া যায়? নতুন আর কোন নেতাকে জেলে ঢোকানো যায়? কিংবা গুম? ‘গুম’ আইডিয়া কিন্তু খারাপ না। তবে ছোট নেতায় হবে না। ছোট নেতার গুম কেউই কাভার করে না। লাশ পাওয়া গেলে একটু রিপোর্টার পাঠায়, ব্যাস। ফলে গুম দিয়ে মিডিয়ায় আসতে চাইলে একটু বড় সর নেতাকে ইনভল্ভ করতে হবে। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ? খারাপ হয় না তবে একটু রিস্কি। আজ হোক কাল হোক উনারাও তো আবার ক্ষমতায় আসবেন। তখন তা আবার উল্টো খেলা শুরু হয়ে যাবে। তাই ভেতরে ভেতরে সব দলই এই একটা ব্যাপারে আঁতাত করে রাখে, বিশেষ করে বড় নেতাদের ব্যাপারে—জেল, জরিমানা যাই করুক না কেন, একেবারে শেষ করে দেয়া হয় না।
টক শোর বাজারও ইদানীং খারাপ যাচ্ছে। সেই পুরনো লোকগুলোর ঘ্যানঘ্যানানি আর বোধহয় পাবলিক খাচ্ছে না। নতুন কিছু মুখ আনা হচ্ছে। তবে ঠিক সেই ম্যাজিক আসছে না। পাবলিক গোগ্রাসে গিলছে না। অনেকটা ‘দেখতে হয় তাই দেখা’। ‘সাগর রুনি’ নিয়ে যেমন হয় আর কি। বর্ষপূর্তি করতে হয়, তাই করা। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে খবরগুলো মানুষ প্রথমে একটু গিলেছিল, এখন আর গিলছে না। ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল এসব নিয়েও খুব একটা ভাবছে না কেউ। অনেকটা রাখাল বালকের মতো অবস্থা। কিছু না হতেই ‘বাঘ’ বলে চিৎকার করে অস্থির করে দেয়া বিরোধী দল এখন আর কাউকে বিশ্বাস করাতে পারছে না এবার সত্যিই অনিয়ম হয়েছে। প্রথম দিকের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের পরিমাণ কিংব সুষ্ঠু হয়ে থাকলে সেব্যাপারে সঠিক কথা বললে আজ হয়তো অনিয়মের কথা মানুষ বিশ্বাসকে করানো যেত। দেশবাসী তাই ‘কিছু তো অনিয়ম হবেই’ বলে অন্য খবর গুলো পড়ছে।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাঙ্গালি এই অবস্থাটা খুব একটা উপভোগও করছে না। রাজনৈতিক কামড়া কামড়ির খবর পরে সে যত মজা পায় ক্রেমিয়ার খবর জেনে তেমন মজা সে পাচ্ছে না। মালয়েশিয়ান প্লেনের খবর পড়ছে তবে গোগ্রাসে না, মজা নিয়েও না। আপাততঃ কিছুটা নজর ভারতের নির্বাচনের দিকে। কে যেতে। তারপর তাঁরা বাংলাদেশের ওপর আশীর্বাদের হাত রাখবে না তুলে নেবে? রাখলে বিএনপির কি হবে? না রাখলে বিএনপি কতটা কি করতে পারবে? সব মিলিয়ে গোগ্রাসে গেলার মত খবর আসতে বোধহয় আরও মাস দুয়েক লাগবে। ততোদিন ‘সমুদ্রের ব্লক বণ্টন’, ‘বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি’ কিংবা ‘জাতীয় সঙ্গীতের জন্য ইসলামী ব্যাংকের চাঁদা’–এইসব দিয়েই কাজ চালাতে হবে। কিন্তু এভাবে কতদিন?

৫ thoughts on “খবরের আকালে আর কতদিন?

  1. কিছুদিন পর খবরে খবরে সয়লাব
    কিছুদিন পর খবরে খবরে সয়লাব হয়ে যাবে ।কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়বেন,ভেবেও কূল পাবেন না । :ভেংচি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *