বয়ঃসন্ধির দিনকাল…(প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য খন্ডগল্প-শেষ পর্ব)




টিপটিপে বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে, পথের ধারে ত্রিপলে ঢাকা ধান স্তুপাকারে রাখা। সবাই রোদের অপেক্ষায়। দুপুরের পরে রোদ উঠবে, ধান শুকাবার ধুম পড়বে তখন। প্যাচ প্যাচে কাদা পায়ে মেখে অবনী স্কুলের দিকে রওনা হলো। চিনা মাটির কাদায় পা আটকে যাচ্ছে, তবুও অদ্ভুত এক আকর্ষন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। আজ কি পূরবীর সাথে দেখা হবে?
স্কুলে পা রেখেই অবনীর মনে হলো আজ সে স্যারের হাতে মার খাবে, চার দিন স্কুলে না আসবার শাস্তি। সায়েম স্যার মানে মূর্তিমান আতংক।
ক্লাসে ঢুকে দেখা গেলো এ আতংক মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, অনেকেই এ কদিন স্কুলে আসেনি। কিন্ত সেরকম কিছুই হলোনা।
টিফিন পিরিয়ডে অবনী কমন রুমের দিকে উঁকি দিলো, পূরবী এক কোনে চুপচাপ বসে আছে। অনেক বড় বড় লাগছে তাকে। গালটা ফোলা ফোলা।

“কি রে বাদাম খাবি?”
পাপনের গলা শুনে পেছনে ফিরে তাকালো অবনী,
– চল অর্জুনগাছের নীচটায় গিয়ে বসি।
স্কুলের দক্ষিন পূর্বকোনে অর্জুনের গাছ, একটুকরো ছালও নেই, অষুধি গাছটা না জানি কি কষ্টে আছে।
গাছের নীচে বিছানো ঘাসের বিছানায় বসতে বসতে পাপন বলো,
“আজ প্রথম বাল কামাইলাম, ইচ্ছা ছিলো দাড়ি মোচ কামামু কিন্ত শরম লাগে তাই হইলোনা।”
কথাটা শুনে অবাক হলো অবনী,
– বাল কামাইলি মানে?
“মানে জিগাস কেন? তোর উঠেনাই? জিনিসের উপরে হালকা চুল?”
– হ্যা, হালকা লোমের মতো!
“হালার এইটারে বলে বিলাইয়ের রুম্বা, সাইজে ব্লেড দিয়া কামাইলে হইবো বাল, ঘন কালো, কালি ফুরাইন্না কলমের আগায় ব্লেড লাগায়া যায়গার মাঝে সাবান ডইলা কামানি দিবি”
– ধুর!কাটলে জায়গা শেষ।
“কাটলে নাহয় কাটবো, আগা কাটা মুসলমান হয়া যাবি। হা হা হা”
অবনীও হাসে।
– তোর মুখে কিছু আটকায়না পাপন, একদম রানাদার মতো।
“রানাদা! ভালো কথা মনে করসোস, সে না নতুন ভি সি ডি কিনসে, সেদিন কইলো স্পেশাল ফিলিম দেখাইবো। যাবি নাকি?”
– স্পেশাল ফিল্ম মানে?
“হালার তোদের ভদ্র পোলাদের এটাই সমস্যা সব বোঝায়া বলতে হয়, স্পেশাল ফিলিম মানে হইলো বি এফ। বিশেষ কাম ফিলিমে দেখায়।”
অবনী মনে মনে উত্তেজনা বোধ করে,
– এইটাও সম্ভব?
“আরে হালায় সব সম্ভব”
– রানাদা কবে দেখাবে?
“ব্যাটারি চার্জ করতে নাকি গঞ্জে পাঠাইসে পরশু, আইজকা তো আইসা পরার কথা। চল আজকে বিকেলে গিয়া রানাদারে ধরি”
অবনী ঘাড় কাত করে সম্মতি দেয়, ঠোঙায় রাখা বাদাম শেষ হবার আগেই টিফিন শেষ হবার ঘন্টা পড়ে। সামাজিক বিজ্ঞানের ক্লাস। মেয়েদের রো’তে মাঝ বেঞ্চে বসে আছে পূরবী, অবনীর দিকে তাকিয়ে হাসলো সে। অবনীর মনে হলো তার ভেতরে যেনো কেউ হাতুরি দিয়ে আঘাত করছে, কেমন যেনো তুফান বয়ে গেলো বুকের ভেতর।

রানাদাদের বাড়িটা পুরনো জমিদার বাড়ি ধাচের। থেকে থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেখলেই বুঝা যায় আগের জৌলুস হারিয়েছে বাড়িটা। গেটের দুপাশে দুটো অশত্থের শেকড় দেয়ালে ফাটল ধরিয়েছে। বাড়িটার দিকে তাকালে কেমন মায়া হয়। ইচ্ছে হয় চুনকাম করে বাড়িটা ধবধবে সাদা করে দিতে। যা আছে তুলসী তলাটাই ঝকঝকে, তুলসীর ফুল ফুটেছে সদ্য। ঘ্রান এসে নাকে লাগে অবনীর। তখন হঠাৎ মনে হয় নিষিদ্ধ একটা কাজ করতে যাচ্ছে সে। অবনীর অস্বস্তি লাগতে শুরু করে।

“রানাদা ঘরে আছো নাকি?”
পাপনের হাঁকে কাকীমা বাইরে এসে দাঁড়ান,
“রানা স্নানে গেছে বাবারা তোমরা একটু ভেতরে এসে বসো”
পাপন নমস্কার দিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে,
“না ঠিক আছে কাকীমা, আমরা বরং ওই নীমতলায় বসি, রানাদা স্নান সেরে আসুক”
নীম গাছটা মার্বেল পাথরে বাঁধানো, বসার অনেকখানি সুন্দর জায়গা মেলে যায়। অবনীর অস্বস্তি কাটেনা।
– না দেখলে হয়না পাপন?
ভুত দেখার মতো চমকে অবনীর মুখের দিকে তাকায় পাপন, কপট বিষ্ময় নিয়ে বলে,
“যাঃ মাইরি, কাপড় তুলে বলে কাছে এসোনা। তোর ভাই বলিহারি,কেসটা কি বল দেখি?”
-না! মানে! কেউ যদি …
“জানতে পারে এইতো? জানাবেটা কে? তুই?”
– বাঃ রে আমি জানাবো কেনো!
“তাইলে চুপ থাক, ঘটি হাতে নিলিই যখন ঘটিতে মাটি ভরতেই হইবো, না দেইখা আমি যামুনা”
পাপন গোঁ ধরে বসে থাকে। অবনী খেয়াল করে আবার সে আগ্রহটা বোধ করছে। অদ্ভুত এক দ্বিধা এসে গ্রাস করলো অবনীকে। মুখ ঘুরিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো সে এমন সময় রানাদা এলেন,
“কি দাদাঠাকুরেরা, এ বেলা কি মনে করে?”
কথাগুলো বলে ভেতরবাড়ির দিকে চেচান রানাদা,
“ও মা, আমার ঘরে জল খাবার কিছু দিয়ো”,”এই আয় তোরা ঘরে আয়”
পাপন আর অবনীর দিকে ঘুরে বলেন রানাদা।
ঘরটা ছিমছাম, তাক ভর্তি বই, রবীন্দ্র নজরুল, শরৎ, শংকর, সমরেশ! অনেকগুলো বই।
“ওই ওদিকে কি দেখস?”
রানাদার কথায় চমকে তাকায় অবনী,
– বই
পাপন হাসে,
“বই দেখে, রানাদার কালেকশনে অভদ্র সাহিত্যও আছে”
রানাদা গায়ে তেল মাখতে মাখতে হাতে কিল পাকায়,
“খুব পাকামো হচ্ছে তাইনা?”
পাপন হিন্দি গানের একটা সিডি হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে বলে,
“তুমিই তো পাকাইলা, নাইলে তো কাচাই থাইকা যাইতাম, যে জন্য আসলাম…”
এটুক বলে থামে পাপন, অবনীর বুক ঢিপঢিপ করে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে, পাপনের কথার রেশ না ধরে সেদিকে তাকান রানাদা,
“কি রে অবনীকান্ত, তোকে অমন লাগছে কেনো?”
পাপন ময়লা দাঁত বের করে হাসে,
“ভয়ে”
রানাদা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করেন,
“ভয়? কিসের ভয়?”
“বুলু ফিলিমের ভয়, হের লাইগাই তো আইলাম আইজকা, আইজকা কিন্ত দেখাইতেই হইবো।”
রানাদা বিকট হাসি দেন,
“ওহো এই কথা!সেক্স হইলো শিক্ষার বিষয়, তয় এডভান্টেজটাই নিতে হইবো ডিসএডভান্টেজ না, এইখানে বুলু দেইখা গরম হইয়া যদি পাড়া প্রতিবেশীদের মা বানায়া ফেলস সেইটা হইবো কু-শিক্ষা। খারাপ জিনিসেও ভালো কিছু থাকে, সেইটা মানুষ নিতে পারেনা আফসোস।”
রানাদা নীল রঙের গেঞ্জি পরে নেন, ততক্ষনে কাকীমা মুড়ি আর গুড় দিয়ে যান।রানাদা সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেন,
“তোরা মুড়ি খা, আমি ক্যাসেট বাইর করি।”
অবনী তখন অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে, আসলেই তো, সকল খারাপ জিনিসের ভেতর থেকে যদি আমরা ভালোটা নিই তাহলেই তো ভালো থাকা যায়। আসলে ভালো থাকাটা হলো নিজের কাছে।
রানাদা টিভি আর ভিসিডি চালু করে বলেন,
“ইন্ডিয়ান মাল লাগাইতেসি, দেখিস তোরা খালি প্যান্ট ভিজাইস না।”
পাপন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়, অবনীও হাসে।
চৌদ্দ ইঞ্চি সাদাকালো টিভিতে তখন পৃথিবীর আদিমতম আনন্দ ফুটে উঠেছে, অবনীর কান গরম হয়ে উঠে, মনে হয় গরম বাতাস বের হচ্ছে কান দিয়ে, চোখগুলোও কি লাল হয়ে যাচ্ছে? কি অদ্ভুত সুন্দর যৌন দৃশ্য, অবনী নিজের নীচের দিকে অস্থিরতা টের পায়। সমস্ত শরীরে উত্তেজনা। ঘরটা শুনশান নীরব, বাইরে যদিও কয়েকটা কাক ডাকছে সেটা কানে আসছেনা কারো। পাপনের হাত তখন নিজের দু পায়ের ফাঁকে। চেপে ধরে বসে আছে।

পরদিন স্কুলে একটু আগেই চলে আসে অবনী, পুরো স্কুল খালি, হালকা বৃষ্টি দিচ্ছিলো, শুরু হলো ঝড়, কালবোশেখি!
স্কুলে কোন রুমেই তালা দেয়া থাকেনা, অবনী হুট করে কমন রুমে ঢুকে গেলো, ভীষন বাতাসে যেনো উড়িয়ে নিয়ে যাবে সব। কড়াৎ শব্দে বাজ পড়লো কোথাও তখন অবনী আবিষ্কার করলো রুমে সে একা নেই, পূরবী বসে আছে এক কোনে, তার দিকে তাকিয়ে হাসছে,
“ভয় পেলে?”
একটু বিব্রত হলো অবনী প্রশ্নটা শুনে,
– হ্যা পেয়েছি, তুমি পাওনি? আমি তো ভেবেছিলাম আমি বোধয় একাই এসেছি স্কুলে।
“আমিও তাই ভেবেছিলাম, মলির কাছ থেকে নোট নেবার কথা ছিলো। বললো সকাল সকাল যেনো চলে আসি, কিন্ত বাইরে যা ঝড়! কখন থামে কে জানে”
– ঝড়ের শুরু হয় থামার জন্য, কোনো ঝড় চীরস্থায়ী হয়না!
“বাব্বাহ!খুব জ্ঞানের কথা হচ্ছে।”
কথাটা বলে হাসিতে ভেঙে পড়ে পূরবী, অবনীর বুকে কেমন যেনো লাগে। বাইরের ঝড় কি তার বুকের ভেতর এই মুহূর্তে বয়ে যাওয়া ঝড়ের চেয়ে বেশী শক্তিশালী? অবনী সম্মোহিতের মতো পূরবীর দিকে এগিয়ে যায়। পূরবীর চোখে তখন খানিকটা বিষ্ময়। বাইরে ঝড়ের শো শো শব্দ, দক্ষিনের জানালার কপাটটা অদ্ভুত আওয়াজ তুলছে, খোলা দরজাটা বার বার এসে বারি খাচ্ছে, অদ্ভুত ছন্দময় মুহূর্ত যেনো স্বেচ্ছায় সম্মোহনের আবেশ তৈরী করলো ছোট্র ঘরটাতে। নতুন যৌবনে পা রাখা তরুন তরুনী যেনো পুতুল, নিজস্ব নিয়ন্ত্রনের উর্ধে।
অবনী তার ঠোঁট রাখলো পূরবীর ঠোঁটে, বাধা দিলোনা পূরবী, নিজেকে ঠেসে ধরলো অবনীর বুকে। নিজের বুকে নরোম অস্তিত্বটা পাগল করে দিল অবনীকে। ধীরে ধীরে মুখ নামালো পূরবীর গালে, ঘাড়ে, বুকে, বুকের মাঝখানে।

বাইরে তখনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে প্রবল বৃষ্টি, নিস্তব্দ স্কুলঘরে তখন দুটি নবীন প্রান একাকার হয়ে যাচ্ছে আদিম আনন্দে।
সে কারনেই যেনো প্রকৃতির এই অসামান্য আয়োজন।

৮ thoughts on “বয়ঃসন্ধির দিনকাল…(প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য খন্ডগল্প-শেষ পর্ব)

  1. খারাপ জিনিসেও ভালো কিছু থাকে,

    খারাপ জিনিসেও ভালো কিছু থাকে, সেইটা মানুষ নিতে পারেনা আফসোস।”

    এই যুক্তিটি ক্ষেত্রবিশেষে খাটলেও সব বিষয়ে খাটে না ।

    ধরুন, মদের ভিতর যেমন বিষ থাকে তেমনি ক্যালরিও থাকে ।তাই বলে ক্যালরির আশায় বিষ মিশ্রিত মদ পান করতে হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *