বন্দিনী

পাঠ ১:

দমকা বাতাস, আকাশে আচমকা আলোর ঝলকানি, দাম্ম্ম….. করে বজ্রপাতের শব্দ।। মনে হয় আজ রাত কোন অনাকাঙ্ক্ষিত তুমুল বর্ষণের প্রতিক্ষায়, সেই বর্ষণ হয়তো কোন সদ্য সাবালিকা মেয়ের মনকে করে তুলবে শীতল স্পর্শ পাওয়ার জন্য উষ্ণ।। কেউ হয়তো আজ রাতেরই জন্য এতটা দিন অপেক্ষায়, একটি কবিতা বা উপন্যাস লেখার হাত পড়বে সাদা কাগজের পাতাটিতে।। কোন যুবক এই রাতে হয়তো তার যৌবনের বাঁধ মেলে ধরবে কল্পনায় তার প্রিয়ার সম্মুখে।। এমন অনেক কিছুই হয়তো অনেকের অতৃপ্ত মনের বাসনায় যা কল্পনাকেও হার মানায়………. আর ভাবতে পারছেন না মিসেস কল্প, খুব কষ্ট হচ্ছে কেন জানি!! ঘরের আলোটাও নিভু নিভু প্রায়।। ছোট্ট একটি মোম আর কত লড়বে প্রকৃতির বাতাসকে প্রতিকূলে রেখে।



পাঠ ১:

দমকা বাতাস, আকাশে আচমকা আলোর ঝলকানি, দাম্ম্ম….. করে বজ্রপাতের শব্দ।। মনে হয় আজ রাত কোন অনাকাঙ্ক্ষিত তুমুল বর্ষণের প্রতিক্ষায়, সেই বর্ষণ হয়তো কোন সদ্য সাবালিকা মেয়ের মনকে করে তুলবে শীতল স্পর্শ পাওয়ার জন্য উষ্ণ।। কেউ হয়তো আজ রাতেরই জন্য এতটা দিন অপেক্ষায়, একটি কবিতা বা উপন্যাস লেখার হাত পড়বে সাদা কাগজের পাতাটিতে।। কোন যুবক এই রাতে হয়তো তার যৌবনের বাঁধ মেলে ধরবে কল্পনায় তার প্রিয়ার সম্মুখে।। এমন অনেক কিছুই হয়তো অনেকের অতৃপ্ত মনের বাসনায় যা কল্পনাকেও হার মানায়………. আর ভাবতে পারছেন না মিসেস কল্প, খুব কষ্ট হচ্ছে কেন জানি!! ঘরের আলোটাও নিভু নিভু প্রায়।। ছোট্ট একটি মোম আর কত লড়বে প্রকৃতির বাতাসকে প্রতিকূলে রেখে।। দেয়াল ঘরিটির টিক টিক আওয়াজটা মাঝে মাঝে ভেসে আসছে মিসেস কল্প’র কানে।। স্বল্প আলোয় ঘরিটার সময়ও দেখা যাচ্ছে না।। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই মধ্যরাতের ঘন্টাটি বেজে উঠবে।। আজ এই অনাকাঙ্ক্ষিত রাত বেশ এলোমেলো করে তুলেছে মিসেস কল্প’র মন।। সকালে তার ক্লাস নিতে হবে কলেজে।। বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা উনি।। মাতৃভাষা হলেও বেশ কঠিন এই বাংলা বিষয়টা একজন এইচএসসি শিক্ষার্থীকে পড়ানো, কেননা এসএসসি পর্যন্ত এই বিষয়টা একটি সিলেবাসের গন্ডিতে গেলানো হয় শিক্ষার্থীদের।। কলেজ জীবনে গেলানো মানেই তার ভবিষ্যৎকে গলাটিপে হত্যা করা বলে মনে করেন মিসেস কল্প।। তাই বিষয়টা বোধগম্ম হলো কিনা সেটা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত থাকেন উনি।।

কয়েকদিন পরেই বাৎসরিক ম্যাগাজিন বের হবে কলেজের উদ্যগে।। শিক্ষক বোর্ড মিটিং থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, নারির জাগরণ ও অধিকার সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখতে হবে মিসেস কল্পকে।। শর্ত জুড়ে বলা হয়েছে সহজ এবং সাবলিল ভাষায় লিখতে যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে তা বুঝে নিতে পারে।। মিসেস কল্প ভেবেছিলেন আজ রাতেই সেটি লিখে ফেলবেন।। কিন্তু বাহিরের যা অবস্থা আর সেই সন্ধ্যে থেকেও বিদ্যুৎ নেই।। তাই লেখাটাকে পরবর্তী রাতের জন্য তুলে রেখে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।। ওদিকে দেয়াল ঘড়িটাও শুণিয়ে দিল, মধ্যরাতে পৌঁছে গেছে সে।।

পাঠ ২:

প্রাতঃকাজ সেরে ফ্রেস হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন মিসেস কল্প।। ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে চশমাটা নিয়ে পড়ে নিলেন।। ডাইনিং টেবিলের উপর আজকের খবরের কাগজটি রাখা।। মিসেস কল্প কাজের মেয়েটিকে ডাকলেন এক কাপ কফি দিয়ে যেতে।। সকালে ১০-১৫ মিনিট কফির কাপে চুমুক আর পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে দিনের কাজ শুরু করেন উনি।। আজও বসে পড়লেন পত্রিকাটি হাতে নিয়ে।। প্রথম পৃষ্ঠায় বেশ বড় হরফে শিরোনাম এসেছে প্রধানমন্ত্রীর সফলতার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে।। প্রধানমন্ত্রীর ডান হাত উঁচিয়ে দু আঙ্গুল দেখিয়ে সাংবাদিকের কেমেরাতে বন্ধি হওয়া ছবিটা বেশ ভাল লাগল মিসেস কল্প’র।। এরপর একধাপে পত্রিকার সর্বোশেষ পাতায় চলে গেলেন উনি।। শেষের পৃষ্ঠায় একটা নিউজের শিরোনামে চোখ আটকে গেল তার, “১৬ বছরের তরুনীকে ধর্ষণ, নদীর জল থেকে সাতদিন পর লাশ উদ্ধার”…. মিসেস কল্প বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন, এমন একটি নিউজ শেষের পৃষ্ঠায়।। আর এত ছোট হরফে লিখা যা প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফারের নামের থেকেও ছোট।। তাহলে এতটাই অবহেলিত নারি, একবিংশ শতাব্দিতেও তাদের লজ্জা হরণ আর হত্যার খবর ছাপা হয় খবরের শেষ পৃষ্ঠায়।। মিসেস কল্পকে ডেকে উঠল কাজের মেয়েটি, ম্যাম…. টিফিন রেডি!!
পাঠ ৩:

জ্যামে আটকে পড়েছেন মিসেস কল্প।। একে তো গরম তার উপর অসহ্য জ্যাম।। গাড়ির হর্ণ, পাবলিকের চেঁচামেচি যেন কান বিদীর্ণ করে দেয়।। গাড়ির জানালাটা খুলে বাহিরের কার্বন মিশ্রিত বাতাসে একটু স্বস্তি খোজার চেষ্টা করলেন মিসেস কল্প।। আচমকা এক ভিখারিনী তার গাড়ির সামনে এসে দাড়াল।। ডান বারিয়ে কিছু ভিক্ষে চাইলো ভিখারিনীটি।। একজন আধ বয়সি নারি পথে পথে ভিক্ষে করে বেরাচ্ছে।। এটা যতটানা মিসেস কল্পকে বিচলিত করল, তারও অধিক ভাবিয়ে তুল্য তাকে।। ভিখারির কাধে হাত রেখে তার পঙ্গু স্বামী।। মিসেস কল্প যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন।। কিসের এত দায় মহিলািটর।। নিজের পঙ্গু স্বামীকে কাধে নিয়ে বেরিয়েছেন ভিক্ষাবৃতি করতে।। কোন পুরুষ কি এমনটা করতো, নাকি তার পঙ্গু স্ত্রীকে রেখে নতুন জীবনের খোজে চলে যেত।। কে জানে, হয়তো করতো হয়তো বা না!! তবে নব্বই ভাগ পুরুষই এমনটা করতো না।। নারিরা চিরটা কাল স্বামীকে দেবতার আসনে বসিয়ে পূজো করে গেল!!

পাঠ ৪:

রাতের খাবার সেরে টেবিলে বসে পড়লেন মিসেস কল্প।। প্রবন্ধটা শেষ করবেনই আজ।। কিন্তু কিছু ভাবনা, প্রশ্ন এসে ভীর জমাতে লাগল তার চিন্তার দুয়ারে….. কি দিয়ে শুরু করবো, কেমন শব্দ ব্যবহারে তা সহজে বোধগম্য হবে।। তাছাড়া যে বিষয়ে কলম চালাবো, সেই বিষয়টা কতটুকু স্বার্থক এই পুরুষ শাসিত সমাজে!! যুগ যুগ ধরে নারিরা কেবল ভোগ আর কর্মের ট্রাম কার্ড হয়েই পুরুষের দাসত্ব করেছে।। সতীত্ব বিকিয়ে দিতে হয়েছে সমাজের গুরুব্যক্তিদের লালসায়।। যত যুদ্ধ আর অপরাধের মূলে নারিকেই দায়ি করা হয়েছে আজও হচ্ছে।। নানাভাবে নানা ফতোয়া যুগে যুগে পুরুষ দ্বারা রচিত হয়েছে।। ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ করে দিনের পর দিন ভোগ করা হয়েছে নারির দেহকে!! এই সবের পরেও কোথায় নারির অধিকার, কোথায় তাদের জাগরন?? এই সবই কি লিখবো প্রবন্ধে??

থাক, অন্যভাবে দেখি শুরু করা যায় কিনা!! বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে শুরু করি।। রোকেয়া দিয়েই কি জাগরণ লিখবো?? তাহলে রোকেয়ার ইতিহাসকেই…… এই যা, ইতিহাস তো মানুষের হাতেই রচিত হয় আবার বিকৃতিও হয়।। নাহলে একাত্তরে যে আত্মত্যাগ নারিরা দিয়েছে, আজ তা সমাজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।। যদি ইতিহাস টানতেই হয় তবে একাত্তর আনবো না কেন, তারও জাগে সতীদাহ কিংবা তারও আগে দাসী, ধর্মগুরুর যৌন দাসী।। তোমরা বারবার ধর্মকে ব্যবহার করেছে তোমাদের কাজে, কে জানে হয়তো ধর্মগুলো তোমাদের হাতেই রচনা!! তোমরা বলেছো, বলছো…. পুরুষ যত খুশি তত নারিকে গ্রহণ করতে পারবে আর নারি একজনের বেশি ভাবনায় আনলেই বেগানা, অসতী।। তোমরা শস্য ক্ষেতের মত আমাদের যৌনতাকে লাঙ্গল মারিয়েছো, আজও তাই করে যাচ্ছো।। আমাদের ধর্ষিত হওয়াটাকেও করেছো হাসির খোরাক!! ধর্মের আইন করেছো ধর্ষিতাকে চারজন চাক্ষুস স্বাক্ষী দাড় করাতে হবে যারা তাকে ধর্ষণ হতে দেখেছে, দেখেছে পুরুষ অঙ্গটিকে নারি অঙ্গে প্রবেশ করাতে।। তাহলে কোথায় নারির অধিকার?? নারিরা যখন জাগরিত হয়ে তাদের অধিকার চায় তখনই আসো তোমাদের কিছু আইন নিয়ে।। নষ্ট মেয়ের বিদ্রুপ ছুড়ে দাও আমাদের গায়ে।। আজব বিচার, সত্যিই আজব পুরুষের সমাজ.. নারিরা চিরকাল বন্ধ শিকলে বন্দিনী!! লেখার কোন বিষয়েই হাত রাখতে পারছিনা।। আর রাখবোও না…… এখানেই ইতি টেনে দিলাম।।

ভোরের আলো জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে।। মিসেস কল্প টেবিলের উপর মাথা রেখে এখনও ঘুমিয়ে।। লেখার কাগজ সাদাই পড়ে আছে।। কিন্তু না….. একটা চিরকুট টেবিলের নিচটাতে পড়ে আছে।। সেখানে লেখা…….

” যত মধুর কথাই বল, যতই নারিকে জাগতে বল, যতই নারিকে অধিকারের কথা শুনাও।। ইতিহাস তোমাদের অর্থাৎ পুরুষের হাতেই চিরকাল রচিত।। নারিকে উপহাস আর যৌনদাসত্বের কবলে চিরকার বন্দিনী করেই রাখবে।।”

৪ thoughts on “বন্দিনী

  1. নিষ্ঠুর হলেও সত্যি নারীরা
    নিষ্ঠুর হলেও সত্যি নারীরা এখনো সমাজের হাতে বন্ধী ।যত্‍সামান্য যেটুকু অধিকার তাঁরা আদায় করে নিয়েছে তা নিয়েও অনেক সমালোচনা হয় ।

Leave a Reply to তপু Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *