লিভ টুগেদারঃ একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু (পরিচয় পর্ব)

লিভ টুগেদারঃ একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু ( প্রারম্ভ পর্ব)
http://istishon.blog/node/7122

মিতু এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমার ভিতরের সমস্ত কিছু সে দিব্য দৃষ্টিতে পড়তে পারছে। আমার হতবিহ্বল চাউনি আর উজবুকের মতো তাকিয়ে থাকার কারনে সে ফিক করে হেসে ফেলল। সে যত হাসে আমি তত ঘামতে থাকি, আমার চেহারা দেখার মতো একটা বস্তু হয়ে ওঠে। সে যেন পণ করেছে, আমাকে ঘাবড়ে দেওয়াতেই যেন তার স্বস্তি!


লিভ টুগেদারঃ একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু ( প্রারম্ভ পর্ব)
http://istishon.blog/node/7122

মিতু এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমার ভিতরের সমস্ত কিছু সে দিব্য দৃষ্টিতে পড়তে পারছে। আমার হতবিহ্বল চাউনি আর উজবুকের মতো তাকিয়ে থাকার কারনে সে ফিক করে হেসে ফেলল। সে যত হাসে আমি তত ঘামতে থাকি, আমার চেহারা দেখার মতো একটা বস্তু হয়ে ওঠে। সে যেন পণ করেছে, আমাকে ঘাবড়ে দেওয়াতেই যেন তার স্বস্তি!

হাত টা এগিয়ে দ্যায় সে, ঠিক কি কারনে এ আহবান তা বুঝে উঠতে না পেরে আরেক বার অপ্রস্তুত হই আমি। সে সহাস্যে আবার হাত বাড়িয়ে দ্যায়, জানায় তার নাম মিতু। পুরুষোচিত কায়দা টা যত টুকু রপ্ত করা উচিত ছিল ততটা না জানলেও বুঝতে পারি, হাত টা এবার বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। হাত বাড়িয়ে বলি, আমি আইজুদ্দিন।

তার মুখ চোখের ভাব দেখেই বুঝতে পারি আইজুদ্দিন নামটা ঠিক তার পছন্দ হয়নি। আসলে এটা একটা নাম হতে পারে কিনা সেটা নিয়ে যেন ঘোর সন্দেহ তার চোখে মুখে, প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলে থাকা আশ্চর্যবোধক চেহারায় সেটাই পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঠিক নামটা নাকি নামের মানুষটার উপর তার অবজ্ঞা ফুটে উঠল বোঝা গেল না কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ পেল এটা পষ্ট বুঝতে পারলাম।

ঃ নামে কি এসে যায়! আইজুদ্দিন!- মন্দ নয়! তা কি করেন আপনি?
ঃ জী, আমি গ্রাফিক্স ডিজাইনার। ডিপ্লোমা ইন গ্রাফিক্স ডিজাইন। ৬ বছর হল এখানে।
ঃ আমি কি করি নিশ্চয় জানতে চাইবেন না আপনি! তো আমি নিজ থেকেই বলি, কি বলেন?
ঃ না না, আমি নিজেই জিগ্যেস করতাম। তা কি করা হয় আপনার?
ঃ হা হা হা। আমি সিস্টেম এনালিস্ট।

লিফট চলে আসে। এর মধ্যে চলে আসে আরও বেশ কয়েকজন। আর কোনও কথা হয় না। লিফট থেকে নেমে ও চড়ে বসে ওর গাড়িতে। আমার গন্তব্য হাঁটা পথে দশ মিনিট, বাস স্ট্যান্ড খুব বেশি দূরে নয়।

নারীদের স্বভাবশিদ্ধ বেশ কিছু গুন থাকে। ওর মধ্যে পুরুষের চাহনি চেনার গুনটি অন্যতম। কোন পুরুষ তাঁদের দিকে তাকালেই তারা বুঝতে পারে লোকটির মন কি চাইছে, তাই তারা ঘন ঘন ওড়না ঠিক করে নেয়, শরীরের আব্রু ঠিকঠাক কর নেয়। পুরুষ জাত টা খুব কামুক প্রকৃতির! এরা মন দেখেনা, ভালবাসা দেখেনা, স্থান কাল দেখেনা, যা দেখার তা কিছুই দেখেনা। প্রথমে দেখবে বুক, তারপর পশ্চাৎদেশ, তারপর মুখ! মন দেখার সময় কোথায় তাঁদের? নিতান্ত এর বেশি কিছু চাইলে দেখবে বাবার স্ট্যাটাস কেমন, অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ইত্যাদি কিন্তু কিছুতেই মন দেখতে চাইবে না। মেয়েদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা! তারা ঘর বাঁধার আগে ছেলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরীক্ষা করে, ভবিষ্যৎ জীবন স্বাচ্ছন্দ্যের হবে কিনা তার গ্যারান্টি খুঁজে পেতে চায়। দেখা যায়, অতীব সুশ্রী মেয়েরা স্বামী কদাকার হওয়া সত্ত্বেও খুব বেশি অখুশি ও অসুখী হয়না যদি সে স্বামীর অঢেল বিত্তবৈভব থাকে। একই রকম ভাবে লোভী পুরুষরাও নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারনে কোন কোন কদাকার মেয়ের সাথে ঘর করে যায় সারা জীবন অবলীলায়। ব্যতিক্রম হয়তো কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে সেটা কোনক্রমেই উদাহরন হতে পারেনা।

আমি যে দৃষ্টিতে মিতুর দিকে তাকিয়েচিলাম সেটা পুরুষের স্বভাবসুলভ দৃষ্টি তাই মিতুর চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় নি। সে বুঝে নিয়েছে আমি তাকে অনুসরন করি, চোখের চোরা চাহনিতে তাকে গ্রাস করার অদম্য ইচ্ছা পোষণ করি। আচ্ছা, সে কি আশা করে আমার কাছে? যদি সে জেনেই ফেলে আমি তাকে অন্য রকম ভাবে কামনা করি তবে কেন সে আমাকে এড়িয়ে চলে না? কাছে এসে কেন সে আমাকে সপাটে চড় মেরে বুঝিয়ে দ্যায় না যে আমি যা করছি সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। নাকি ওর আজকের এই আলাপের মধ্যে একটা প্রচ্চন্ন প্রশ্রয় জানিয়ে গেল? বুঝিয়ে দিল, আমি যা ভাবছি তাতে ওর আপত্তি নেই। ওর সহাস্য আলাপ, স্মিত হাসি, উচ্ছল ভ্রুকুটি কি এটাই প্রমান করে না?

ভাবছিলাম এবার ঘন ঘন দেখা হবে কিন্তু পর পর বেশ কয়েকদিন নানা ছুতোয় নানা রকম ফন্দিফিকির করেও দেখা করতে পারলাম না। যেচে গিয়ে আবার আলাপ করাটাও সাহসে কুলোচ্ছে না, একেবারে কেটে ছেড়ে দেওয়া মুরগির মতো অবস্থা আমার, দিন টা যেভাবেই হোক কেটে যায় কিন্তু রাত্তির বেলা এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুমের দফা রফা। কয়েক দিনেই চোখ কোটরে বসে গেল, কালশিটে দাগ প্রমান হয়ে রইল আধুনিক মজনুর নয়া প্রেন কাহিনীর।

অবশেষে সে এলো। আমি তখন একটা ডিজাইন নিয়ে এতোই মগ্ন ছিলাম যে অফিস টাইম পার হয়েছে কখন বুঝতেই পারিনি। প্রায় সবাই চলে গেছে, আমি কাজে ব্যাস্ত আর পলায়নপর অফিস বয়-টি ত্যাক্ত বিরক্ত। ম্যানেজার স্যার যান সবার পরে কিন্তু তার যাওয়ার আগেই ছেলেটির ছুটি হয়ে যায় কিন্তু আমি বা অন্য কেউ থাকা পর্যন্ত সে ছুটি বনধ! ছেলেটি হাড়ি মুখে এসে জানিয়ে গেল

ঃ একজন ভদ্র মহিলা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।

আমি হতভম্ভ হয়ে হাত ঘড়ি দেখি, মিতুর এতক্ষন থাকার কথা নয়। তাহলে কে? আমি ভুরু কুঁচকে ছেলেটির কাছে জানতে চাইলাম
ঃ আমাকে একজন মহিলা খুঁজছেন? তোমার ভুল হচ্ছে না তো?

কিন্তু তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই এসে দেখি মিতু বসে আছে। ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে কি যেন দেখচিল কিন্তু আমার পড়িমরি করে ছুটে আসা দেখে আলতো করে ভুরু তুলে তাকাল। বলল
ঃ ক’টা পর্যন্ত অফিস করেন আপনি?
ঃ এ অফিসের কোন বাধাধরা আইন নেই। যে যখন খুশি আসবে আসুক কিন্তু কাজ শেষ না করে যাওয়া নাই। আমি চাইলে সকাল ৯ টায় আসতে পারি আবার চাইলে লাঞ্চ আওয়ারের পরে কিন্তু মাস শেষে ওয়ার্কিং আওয়ারের হিসেব করা হবে, বেতন সে হিসেবেই। আবার বছর শেষে পারফর্মেন্স বিচার হবে নানা মাপকাঠিতে, বেতন বৃদ্ধি ও আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধে বৃদ্ধিও নির্ভর করে সেটার উপর। অবশ্য এখন পর্যন্ত সে সুবিধে খুব কম জনেই পেয়েছে।

মিতু কটমট করে তাকাল আমার দিকে, আমিও বাধ্য বালকের মতো চুপ করে গেলাম। ভাবতে লাগলাম দোষটি করলাম কি?
ঃ আপনাকে জিগ্যেস করেছি ক’টা পর্যন্ত অফিস করেন আপনি, এবার বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়!

আমি সত্যই অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। ও রকম পরিস্থিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ সামনে এসে পড়লে কেমন রকম আচরন করা উচিত সেটা আগাগোড়াই অজানা আমার। কিছু একটা বলতে হয় তাই হড়বড় করে হয়তো অনেক কিছুই অসংলগ্ন কথা বার্তা বলে ফেলেছি, ম্যাদামের বড্ড রাগ হয়েছে!

ঃ এইতো, শেষ হয়ে এলো বলে। প্রায়ই তো এর আগে চলে যাই। এখন ক’টা বাজে যেন?

এবার রাগল না। হাসল, সে হাসিতে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিমা প্রবল। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল, আগ বাড়িয়ে চলতে শুরু করল। বলল

ঃ আপনাকে যেটা প্রশ্ন করেছি সেটার উত্তর আপনি দু বার বলার পরেও দেন নি। আপনার সমস্যা কি? সোজা করে কথা বলতে জানেন না? যাক, আর জেনে কাজ নেই। চলুন বেরিয়ে পড়ি।

কোথায় যেতে বলছে সেটা প্রশ্ন করে জানতে চাইব এতটা সাহস আমার নেই। শুধু জানি, ওর অবাধ্য হওয়ার শক্তি আমার নেই, না বলার ক্ষমতা তো নেই-ই। তাই ওর সাথে গুটিসুটি পায়ে বেরিয়ে পড়লাম। মেয়েরা সম্ভবত আমার মতো মেনি বেড়াল পছন্দ করে।

আজকেও লিফটে ওর সাথে কোন কথা হল না। এ সময়েও এতো লোক অফিসে কি করে!

নীচে নেমে ওর পিছে পিছে চলতে শুরু করলাম। ওর ড্রাইভার কে আগেই জানিয়ে রাখা হয়েছিল, গাড়ি সামনেই হাজির। ও বলল
ঃ উঠে পড়ুন।
ঃ না না, এ পথ টুকু আমি হেঁটে যেতে পারব। আমার কষ্ট হবে না।
ঃ ধুর! আচ্ছা লোক তো আপনি। আমি আপনাকে উঠতে বলেছি, শুনতে পেয়েছেন?

ও সম্ভবত জানে আমাকে সহজেই হুকুম করা যায়। এমনকি দু একটা ধমক বকুনি দিলেও সেটা মুখ বুজে যে সহ্য করব সেটাও সে খুব ভাল করেই জানে। চাবি দেওয়া স্প্রিঙ্গের পুতুলের মতো গাড়িতে উঠে বসলাম আমি। গাড়ি চলতে শুরু করল।

২ thoughts on “লিভ টুগেদারঃ একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু (পরিচয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *