র‍্যাবের কানমলা খাওয়ার আগেই ইতিহাস জেনে নে পাগলা…


ইস্টিশনের পেইজ থেকে পোস্টারটা শেয়ার হতে দেখে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। মনে হোল সবার সাথে শেয়ার করা দরকার। ২০০৭ এর ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। আমি তখন ইন্টার্নশীপ শেষ করে এফসিপিএস প্রথম পর্ব পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ধুমায়া পড়ালেখা করছি (কেমন ধুমায়া পড়তাম সেটা কাহিনী পড়ার পরই বুঝবেন 😛 )। প্রতিদিন রুমে আড্ডার আসর বসে। সেইদিনও রাতের খাওয়ার পর রুমে আড্ডা বসছে। আমি, আমার দুই ক্লাসমেট আর দুইজন জুনিয়র। জুনিয়র দুইজন তখন ইন্টার্নশীপ করছে। আড্ডার বিষয়ের কোন আগামাথা নাই। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যকার হেন বিষয় নাই যা নিয়ে তুমুল আড্ডা দিয়ে আমরা প্রায় দেশোদ্ধার করে ফেলেছি। তো আড্ডা বিভিন্ন বিষয় টাচ করে কেমনে কেমনে জানি সেইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য্যে আইসা প্যাচগি খাইয়া গেছে।

আমি যতোই কই ওটার নাম রাজু ভাস্কর্য্য, আমার এক জুনিয়র ততোই ১০০% সিওর দিয়া কয় ওইটা স্বোপার্জিত স্বাধীনতা। আমি তো ১০০% সিওর ছিলাম যে ওইটা সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্য্য। তাই আমারে আর পায় কে? তুমুল তর্ক চলতেছে। কিন্তু আমার সেই জুনিয়র কেন যেন সেদিন পণ করেই ছেড়েছে তালগাছ সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। এক পর্যায়ে সে উতেজিত হইয়া কইল, ঠিকাছে ভাই বাজি লাগেন, দেখি কে জেতে? আমি তো বগল বাজাইতে বাজাইতে রাজী। যেই বাজিতে জেতার চান্স চোখ বুইজা ১০০% সেই বাজি ধরতে ফাকিস্থানি বাজিকর হওয়া লাগে না। 😛

তো ঠিক হইল বাজিতে যে হারবে সে দুই লিটার কোক আর চার প্যাকেট পটেটো চিপস খাওয়াবে। আমি তো নাচতে নাচতে রাজী। কিন্তু প্যাচগি লাগলো এখন কি উপায়ে প্রমাণ হইবে উহার নাম রাজু ভাস্কর্য্য নয়, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা? আমি লেপটা গায়ের উপ্রে আরও কিঞ্চিৎ টানিয়া লইয়া কইলাম, বাজি তুই ধরছস, প্রমাণ করার দায়িত্ব তোর। ও কইল তাইলে চলেন এখনই যামু টিএসসি। আমি চোখ গোল গোল কইরা কইলাম, আমারে পাগলে কামড়াইছে? এই শীতের রাইতে আমারে হাতী দিয়া টাইনাও নিতারবি না। আমার ঐ জুনিয়রের মাথার স্ক্রু কিঞ্চিৎ ঢিলা ছিল। আমি ভাবছিলাম ব্যাপারটা ফান। কিন্তু তালগাছ নিজ দখলে রাখিবার নিমিত্তে সে আরেকজন জুনিয়রকে ম্যানেজ করে সেই রাত বারোটায় রওয়ানা দিলো টিএসসির উদ্দেশ্যে। এই জন্যই ওকে আমরা সবাই পাগলা বইলা ডাকতাম।

তো ওরা দুইজন রওয়ানা দিছে, এইদিকে আমরা অপেক্ষায় আছি কখন পাগলা দুই লিটার কোক আর চিপস নিয়া ফেরত আসে। এক ঘণ্টা যায়, দেড় ঘণ্টা যায় তাও পাগলার আসার কোন নামগন্ধ নাই। আমরা তো ভাবলাম পাগলা কি পাথর খোদাই কইরা ভাস্কর্য্যের নাম পাল্টায়ে তারপর আসবে বলে ঠিক করছে নাকি? :মাথাঠুকি:

দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে সত্যি সত্যি একটু টেনশন হইতে লাগলো। আবার হিরুঞ্চির খপ্পরে পড়ল নাকি? ঐ এরিয়া হিরুঞ্চিদের মক্কাস্থান। আমাদের টেনশন যখন ডালপালা মেলিয়া বৃক্ষে রূপান্তরিত হইছে, ঠিক সেই সময় হাতে দুই লিটারের কোক আর চিপসের প্যাকেট নিয়ে পাগলার আগমন। পাগলার মুখ শুকিয়ে আমশি। পাগলা হইলেও ওর দিল এতো ছোট না যে দুই লিটার কোক আর চার প্যাকেট চিপসের যাতনায় মুখ আমশি হইতে পারে। বুঝলাম ডাল মে কুছ কালা হ্যায়… জিগাইলাম- কিরে কি হইছে? পাগলা কিছু কয় না। ওর সাথের যেই জুনিয়র ছিল সে ওর মুখের ভাবখানা দেখিয়ে হাসিয়া কুটি কুটি। পাগলার মুখ এবার রাগে থমথম করিতে লাগিল। আমি বুঝলাম সিরিয়াস কিছু হইছে। জুনিয়ররে জিগাইলাম- কি হইচে? জুনিয়র হাসি থামায়া ঘটনা বলতে যাবে ওইসময় পাগলা হুংকার দিয়া কহিল- চুপ রাও হতচ্ছাড়া। আমার বেজ্জতির ঘটনা আমিই বলিব। বুঝলাম পাগলা হইলে কি হইবে ইজ্জতদার পাগলা।

ঘটনা যা শুনলাম এইবার আমাদের হাসিয়া কুটি কুটি নয় অনু-পরমানু হইবার দশা। জুনিয়রকে নিয়ে পাগলা রাজু ভাস্কর্য্যের একেবারে পাদদেশের নামফলক দেখতেছিল সিওর হওয়ার জন্য, ঠিক সেই সময় ঐ স্থানে র‍্যাবের একটি টহল গাড়ি এসে উপস্থিত। দেশে তখন জরুরী অবস্থা আসে আসে ভাব। তার কিছুদিন আগেই মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্য্য ভাঙার চেষ্টা করেছিলো একদল হুজুর। র‍্যাব ভেবেছে- পাইছি এইবার, মেডেল এবার না দিয়া যাইবে কুতায়? এতো রাতে ওইখানে আগমনের হেতু শুনিয়া র‍্যাবের সন্দেহ আরও বেড়ে গেলো। এই শীতের রাত বারোটায় কেউ বাজি ধরে রাজু ভাস্কর্য্যের নাম জানতে এসেছে এটা একটা হেমায়েতপুরী পাগরলেও কেউ বিশ্বাস করাইতে পারবে না, আর ওরা তো রীতিমত কালো র‍্যাব। উত্তম মধ্যম দিয়ে ওদের গাড়িতে উঠিয়ে যৌথ সেলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিতেছে শুনে পাগলা পারলে কেঁদেকেটে র‍্যাবের পা ধরিয়া ঝুলিয়া পড়ে আরকি। এইদিকে লাগছে আরেক পেচগি। হিরুঞ্চিদের ভয়ে পাগলা নিজের মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোন রুমে রেখেই ভাস্কর্য্য সন্দর্শনে গিয়াছিল। :ভালুবাশি:

ও যতোই বলে সে ঢাকা মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র, র‍্যাবের সন্দেহ ততোই বাড়তে থাকে। বলে- ফাইজলামি পাইছ মিয়া। ঢাকা মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র রাত বারোটায় এই কামে আসবে? অনেক কাকুতি মিনতি করিয়া যখন পাগলা বুঝাইতে সক্ষম হইল যে কিঞ্চিৎ কষ্ট করিয়া তাহারা যদি গাড়ি লইয়া একটু আগাইয়া বকশীবাজার মোড়ে ঢাকা মেডিকেলের হল পর্যন্ত যায় তাহলেই প্রমাণিত হইবে যে সে সত্য সত্যই ঢাকা মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র। এই বিষয়ে পাগলার কনফিডেন্স দেখিয়া র‍্যাব বোধ হয় নিশ্চিন্ত হইল যে সে সত্য সত্যই একজন মেধাবী ছাত্র। :হাসি:

এইটুকু শুনিয়া আমরা কহিলাম- এরপর? পাগলা কহিল এরপর ঘটিল বাংলাদেশের ইতিহাসের চরমতম ইতিহাস শিক্ষার ক্লাস। র‍্যাব পাগলারে গাড়িতে তুইলা সারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরাইয়া যতগুলা ভাস্কর্য্য আছে সবগুলার সামনে নিয়ে গাড়ি থেকে নামাইয়া প্রতিটি ভাস্কর্য্যের পাদদেশে উঠাইয়া দেখাইয়া দিলো কোনটার নাম কি, যেন বাপের জন্মেও আর রাত বারোটায় বাজি ধরিবার প্রয়োজন না পড়ে। :ভালাপাইছি:

শুনিয়া আমরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়া ফ্লোর পরিষ্কার করিয়া ফেলিলাম প্রায়।

ঘটনাটা শুনে হাস্যকর মনে হলেও এখানেও শিক্ষণীয় বিষয় আছে। অনেকেই জানে না রাজু ভাস্কর্য্যের নাম কেন রাজু ভাস্কর্য্য? অনেকে নামই জানে না। ভেবেছে এটাও হয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত কোন ভাস্কর্য্য। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, ১৩ ই মার্চ ১৯৯২, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি তে সন্ত্রাসে মেতে উঠছিল বিবাদমান বড় দুই ছাত্র সংগঠন-ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীদের নিয়ে ঐ সময় টি.এস.সি তে অবস্থানরত রাজু তাৎক্ষনিক ভাবে এর প্রতিবাদে মিছিল শুরু করল। যুদ্ধরত ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল এর মাঝখানে টি.এস.সি চত্বরকে ঘিরে সন্ত্রাস বিরোধী স্লোগান ধরল- শিক্ষা সন্ত্রাস এক সাথে চলে না। ভীত হয়ে পড়ল সন্ত্রাসীরা। গুলি ছোড়া হলো মিছিল লক্ষ্য করে। মিছিলের নের্তৃত্বে থাকা রাজু গুলিবিদ্ধ হলো মাথায়। সন্ত্রাস বিরোধী শ্লোগান মুখে নিয়ে লুটিয়ে পড়ল রাজু। সেই থেকে দিনটিকে সন্ত্রাস বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করা হয়, আর শহীদ রাজুর স্মরণে নির্মিত হয় সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্য্য।

আমার এই ঘটনা শেয়ার করার উদ্দেশ্য হোল সঠিকভাবে দেশের ইতিহাসটা জানুন। আর না হলে পাগলার মতো কার কার হাতে কানমলা খেতে হবে কে জানে? :শিস:

২৮ thoughts on “র‍্যাবের কানমলা খাওয়ার আগেই ইতিহাস জেনে নে পাগলা…

      1. আমাদের দেশের সত্য কাহিনীগুলোই
        আমাদের দেশের সত্য কাহিনীগুলোই স্যাটায়ার। নতুন একটা ট্যাগ যোগ করা যেতে পারে- ‘সত্যি-স্যাটায়ার’!

  1. র‍্যাবের কানমলা খাওয়ার আগেই
    র‍্যাবের কানমলা খাওয়ার আগেই আরও কয়টা ভাস্কর্যঃ

    জাগ্রত চৌরঙ্গী,জয়দেবপুর চৌরাস্তা

    অপরাজেয় বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, টিএসসি সড়কদ্বীপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    সাবাস বাংলাদেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

    1. ধন্যবাদ রায়ান ভাই। আপনি দেখি
      ধন্যবাদ রায়ান ভাই। আপনি দেখি ভালোই ডরাইছেন। রীতিমত গুগলানো শুরু কইরা দিছেন। 😀

      1. হা হা হা, কথা সত্য। তবে
        হা হা হা, কথা সত্য। তবে র‍্যাবের ভয়ে না। আমার বান্দর বন্ধুদের ভয়ে। এই বান্দরেরা সারাক্ষণই ধান্দায় থাকে কিভাবে বাজি ধরে কাউকে ধরা খাওয়ানো যায়। ভাস্কর্য নিয়ে আপাতত ওদের সাথে ধান্দাবাজি করার ধান্দায় আছি। :চোখমারা:

  2. তাড়াতাড়ি দেখতাছি সবগুলা
    তাড়াতাড়ি দেখতাছি সবগুলা ভাস্কর্য চিনে নিতে হইবো ।তবে বাস্তব স্যাটায়ার হলেও অনেকের ইতিহাস না জানার রোগটা খুব ভালোভাবেই তুলে ধরছেন শেষদিকে ।

  3. হা হা হা হাসতে হাসতে মইরা
    হা হা হা :হাহাপগে: :হাহাপগে: হাসতে হাসতে মইরা গেলুম।

    তবে সত্যিকথা বলতে কি, ”রাজু ভাস্কর্য্যে এই ইতিহাস আমিও সঠিক জানতাম না”

  4. প্রথমেঃ হাহাহাহাহাহাহাহা
    প্রথমেঃ হাহাহাহাহাহাহাহা :হাহাপগে:
    দ্বিতীয়তঃ রাজু ভাস্কর্যো সম্পর্কে জানলাম। এজন্য ধন্যবাদ।

    1. এটাই আমাদের সমস্যা নাহিদ।
      এটাই আমাদের সমস্যা নাহিদ। কতবার আমরা রাজু ভাস্কর্য্যের সামনে বসেছি, অথচ একবারও জানতে ইচ্ছে হয়নি এর নাম রাজু ভাস্কর্য্য কেন? কে এই রাজু?

  5. চমৎকার। শিক্ষা এবং বিনোদনের
    চমৎকার। শিক্ষা এবং বিনোদনের এক অনন্যসাধারণ প্যাকেজ। কথায় আছেনা,-

    ঝীকে মেরে বউকে শেখানো !

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:

  6. (No subject)
    😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

      1. ইয়ে মানে, সকালবেলা হাঁসতে
        ইয়ে মানে, সকালবেলা হাঁসতে হাঁসতে আমিও সত্যি কথা কইতে ভুইলা গেছিলাম :কেউরেকইসনা: :আমারকুনোদোষনাই: আসলে আমিও “রাজু ভাস্কর্য” সম্পর্কে জানতুম না। তবে চিন্তা করছি আজকেই সব ভাস্কর্যের নাম জাইনা নিমু… :হাহাপগে: :হাহাপগে: 😀 😀 :হাসি: :হাসি: :ভেংচি: :ভেংচি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *