শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নীরব চাঁদাবাজি

মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম একটি অধিকার, যা একজন মানবশিশুকে স্বাক্ষর এবং শিক্ষিত করার একমাত্র উপায়। তাই সরকারও শিক্ষাকে সহজলভ্য এবং সার্বজনীন করার জন্য বিনামূল্যে বইসরবরাহ, উপবৃত্তি-বৃত্তিপ্রদান, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যকর্মসূচিসহ নানারকম সুযোগ-সুবিধে চালু করেছে। এসব কর্মসূচি ও সুযোগ-সুবিধের কারণে দেশে দিনদিন স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার হার বাড়লেও তাদের অকালে ঝরেপড়ার হারও কিন্তু কম নয়। তাই উচ্চশিক্ষার সাধ থাকলেও আর্থিক অসমর্থতার দরুণ পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এমনকি এইচএসসি পর্যন্ত আসার আগেই প্রতিবছর লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ঝরেপড়া এখনো রোধ করা যায়নি। এমনকি শিক্ষাবঞ্চিত এমন লাখ লাখ শিশুকে ঘৃণ্য ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপকর্ম ও অসামাজিক কাজে এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমেও জড়িত থাকতে দেখা যায়।

শিক্ষাবঞ্চিত এসব শিশু বা ছাত্রছাত্রীর দুর্ভাগ্যের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যয়বাহুল্যের কারনে আর্থিক অসংগতিসম্পন্ন অভিভাবকদের অনিচ্ছাকৃত পিছুটান! অন্যকথায়, নতুন বা একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি-পুনঃভর্তির নামে সাধ্যাতীত সেসনচার্জ আদায়ের নেতিবাচক প্রভাব। আবার অনেক নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে ভর্তিপরীক্ষায় টেকার পরও ডোনেশনের নামে বিরাট অংকের চাঁদা আদায়ের বাধ্যবাধকতাও আরেকটি কারণ। এসব অযৌক্তিক ও স্বেচ্ছাচারী ফি আদায়ের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান না থাকলেও এলাকাভেদে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি’র মধ্যে যেমন সমতা ও নির্দিষ্টতা নেই, তেমনি সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানভেদেও রয়েছে বিশাল অংকের তারতম্য, যা মারাত্মক বৈষম্যমূলক।

আমরাও স্কুল-কলেজে পড়ার সময় সেসনচার্জ হিসেবে নগণ্য পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতাম। কিন্তু তার বিবরণ প্রদত্ত রসিদে লেখাও থাকতো। যেমনঃ ভর্তি, খেলাধুলা, পাঠাগার, মিলাদ, ল্যাবরেটরি, স্কুল-কলেজ উন্নয়ন ফি ইত্যাদির নামে গৃহীত টাকার খাতগুলো বাস্তবে ছিলো এবং তা যৌক্তিকও মনে হতো। কিন্তু এখন মাঠ-খেলাধুলা, পাঠগারের বইপড়ার বালাই না থাকলেও কোনো যুক্তিছাড়াই স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সাধ্যাতিরিক্ত সেসনচার্জ-ভর্তি ফি আদায় করছে। কোন কোন স্কুল-কলেজের রসিদে সেসনচার্জের বিষয় উল্লেখ থাকলেও ছাত্রছাত্রীরা কখনো সে সুবিধেগুলো ভোগ করতেই পারেনা। অথচ আমরা যারা সন্তানের লেখাপড়ার কঠোর সমর্থক, তারা নিরুপায় হয়ে সন্তানদের স্বার্থেই গলাকাটতে নিজেকে সপে দিচ্ছি এসব কসাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে!! কিন্তু বাস্তবে শিক্ষামন্ত্রণালয় এসব ডাকাতদের থেকে নিরীহ অভিভাবকদের বাচাতে কী করছে, তা আদৌ দৃশ্যমান নয়!! তাহলে শিক্ষার নামে এমন কসাইগিরি ও মনোপলি ব্যবসায়ের হাত থেকে আমাদের বাঁচার কি কোনো উপায় নেই?

এর ফল কী দাঁড়াচ্ছে, অনেক ছাত্রছাত্রী এতো টাকার সেসনচার্জ, ভর্তি ফি দিতে না পারায় অকালেই ঝরে পড়ছে! আমার অভিজ্ঞতামতে, টাকার অভাবে নিজের কয়েকজন ভাইপো/ভাইঝিসহ অনেক পরিচিত ছাত্রছাত্রী ক্লাশ নাইনেই উঠতে পারেনি। আমি কয়েকজনের পড়াশোনার খরচচালানোর আশ্বাস দিলেও শেষপর্যন্ত তাদের ঝরেপড়া রোধ করতে পারিনি, যা আমার জন্য বিরাট ট্রাজেডি বৈকি? আমার মাসিক আয় ২০হাজার টাকা হলেও সন্তানদের ভর্তি করাতে খরচ হয়েছে ৫০হাজারের ওপর। সন্তানদের স্বার্থে অতিরিক্ত টাকা আমি হাওলাদ নিতে বাধ্য হয়েছি। তাহলে ভাবুনতো একবার, সারামাস কিভাবে চলি! ঢাকায় থেকেও আমার সন্তানকে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারছিনে শুধু আর্থিক কারণেই। যেখানে বেতন কম, খরচ কম সেখানেই খুঁজে খুঁজে তাদের ভর্তি করেছি, পড়ার মান খুজিনি? এটাই কি আমাদের ভাগ্য হবার কথা ছিলো পাকিস্তানীদের হাত থেকে বাঁচার পরও!!

তাই নতুন বছর শুরু হলেই আর্থিক অসচ্ছলতার দরুণ অসংখ্য ছাত্রছাত্রী যেমন ঝরে পড়ে, তেমনি আমার মতো মধ্যবিত্তদের মাঝেও ভর্তি-পুনঃভর্তি আর সেসনচার্জের চাপে শুরু হয় মারাত্মক নাভিশ্বাস? এভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় চলছে নীরব ব্যবসায় এবং চাঁদাবাজি। এ যেনো এক হরিলুট অবস্থা। কিন্তু নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে মোটা অংকের সেসনফি এবং ভর্তি ফি’র নামে বাধ্যতামূলকভাবে হাজার হাজার টাকা আদায়ের যৌক্তিকতা এবং আইনগত বৈধতা আছে বলে আমার জানা নেই। আবার উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের পরবর্তী ক্লাশে উঠতে পুনঃভর্তি ফি’র নামেও মোটা অংকের টাকা আদায়ের মতো জবরদস্তির কোনো বিধান আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। নতুন স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করতে গেলেই কিংবা একই স্কুলে নতুন ক্লাশে উঠলেও হাজার হাজার টাকার সেসনচার্জসহ ভর্তি ফিবাবদ কমপক্ষে ৬/৭ হাজার টাকা থেকে ৪০/৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতেই হবে!! অনেক স্কুলে ভর্তিপরীক্ষায় পাশ করেও প্রচুর টাকার ডোনেশনের নামে ঘুষ দিয়েই তবে ভর্তি করতে হবে। ভর্তিপরীক্ষায় পাশ করা কঠিন হলেও আসাদগেটের প্রিপারেটরী স্কুলে আমার ৩য় শ্রেণীর সন্তানটির জন্য ডোনেশন অন্তত ২০ হাজার টাকা হওয়ায় আমি তাকে ভর্তির কথা ভাবতেই পারিনি!

২০১২ সালে কাটাবনের ওয়েস্টার্ন কলেজে ফরমফিলাপ বাবদ দু’হাজার নির্ধারিত থাকলেও ৫০০ ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে মোট ৮হজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে। অভিভাবক হিসেবে আমিসহ অনেকেই এর প্রতিবাদ করেও ফলোদয় হয়নি। এমনকি আমি শিক্ষাবোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একাধিক তদন্ত কমিটিগঠন এবং সঠিক তদন্তরিপোর্ট পেশের ব্যবস্থা করায় শিক্ষাবোর্ড সেই কলেজের পাঠদান বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানালেও অবশেষে কিছুই ঘটেনি। একজন আইনপ্রনেতা এমপি’র দাপটে আদায়কৃত বাড়তি টাকা আর কেউই ফেরত পায়নি। এমন অনেক কলেজ আছে যারা এসব চাঁদাবাজিছাড়াও টেস্টপরীক্ষায় ফেলকৃতদের নিকট থেকে সাবজেক্টভিত্তিক হাজার হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়েও তাদের ফরমফিলাপে এলাউ করে থাকে। আবার অনেক প্রাইভেট ভার্সিটিতে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ভর্তির পাশাপাশি কৃতিত্বপূর্ণ সার্টিফিকেটপ্রাপ্তির সহজলভ্যতার কথাও আজ সর্বজনবিদিত। ঢাকার নুরজাহান রোডের গার্লস স্কুলসহ আরো একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশের টেস্টিমনিয়াল এবং সনদপত্র নিতেও ২০০/৩০০ করে টাকা দিতে হয়েছে আমাকে। আবার অন্য স্কুল ও কলেজে এবাবদ আরেক সন্তানের কাছে কোন টাকাই নেয়া হয়নি। মানে কী দাঁড়ালো, কোন বিধানই নেই সনদপত্র ও টেস্টিমনিয়াল প্রদানের নামে টাকা আদায়ের পক্ষে। তারা জোচ্চুরি করে এমন ব্যবসায় খুলে বসলেও এক্ষেত্রেও সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই লক্ষ্য করা যায়না।

আমার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটিকে অন্তত ইংলিশ মিডিয়াম না হোক, ইংলিশ ভার্সনে পড়াতে চেয়েও পারিনি অরথাভাবে। অথচ সরকার একতরফাভাবে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাকে ছেড়ে দিয়েছে বেসরকারীখাতে, যাদের স্রেফ ডাকাত বললেও অত্যুক্তি হয়না। কেনো, সরকারীভাবে কি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজ স্থাপন করা যায়না? সেই সন্তানকে শেষে ট্যালেন্টস হাইস্কুলে স্কুলে ভর্তি করাতে বাধ্য হয়েছি, যারা বিনামূল্যের বই পর্যন্ত না দিয়ে তা কিনতেও বাধ্য করেছে। অবশেষে নীতিবিরোধী হওয়াসত্ত্বেও সন্তানের রেজাল্ট খারাপের ভয়ে বিনামূল্যের বই কিনেছি ৩মাস পর তাদেরই নির্দেশিত লাইব্রেরি থেকে। এটাও একটা মারাত্মক প্রশ্ন যে, বইয়ের দোকানে সরকারী বিনামূল্যের বই অবাধেই বা বিক্রি হয় কিভাবে? আবার নিতান্ত গরীব ছাত্রছাত্রীরাই বা কী করবে শুধু বিনামূল্যের বই পেয়ে ,যদি না বিরাট অংকের সেসনচার্জ ও ভর্তি ফি পরিশোধ করতে পারে!! তাই প্রাথমিক বা জেএসসি পর্যন্তই আজকাল গরিব-দুঃখীদের সন্তানদের দৌড় পরিলক্ষিত হচ্ছে! ক্লাশ সিক্সে অধিকাংশই ভর্তি হতে পারছেনা—যা সার্বজনীন শিক্ষাবাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় এক বাঁধা।

এখন বেসরকারী মেডিকেলে বা ভার্সিটিতে মধ্যবিত্তদের সন্তানকে পড়ানোও আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে! এখন বেসরকারী মেডিকেলে পড়াতে ১২ থেকে ৩০ লাখ এবং বেসরকারী ভার্সিটিতে লাগে ৩ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত, ভাবতে পারেন? আমার বড়সন্তানকে ছোট থেকেই ডাক্তারী পড়ানোর স্বপ্ন দেখালেও ভর্তিপরীক্ষায় সরকারী কোটায় চান্স না পাওয়ায় তার আশা পূরণ হয়নি।

তবে আশার কথা, কিছুদিন আগে শিক্ষামন্তণালয় মিরপুরের মনিপুরী স্কুলসহ অনেক স্কুলকেই ভর্তির সময় বাড়তি গৃহীত টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিলেও অনেক স্কুল তা ফেরত না দেয়ায় তাদের ওপর শাস্তি আরোপের কথাও শুনেছি। সে শাস্তি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে জানিনে। তবে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের এমন নজরদারী আরো বাস্তবিক, সর্বব্যাপী এবং পক্ষপাতহীন হওয়া জরুরি। এজন্য সেসনচার্জ, ভর্তি-পুনঃভর্তি ফিসহ ডোনেশনের নামে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ জারী করা সময়ের দাবীমাত্র। আর আইন ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে নজরদারীতে আনতে

জেলাপ্রশাসকদের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মোবাইল মনিটরিং সেল বা কমিটি গঠন করে এসব অপকর্ম বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে গরীব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সাধারন মানুষদের এমন জীবন-মরন সমস্যার সমাধান যদি করতে না পারে, তবে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার দাবী করার যৌক্তিক কারণ দেখিনে। অন্যথায় শুধু অর্থাভাবেই ব্যাপক হারে ছাত্রছাত্রী ঝরেপড়াও রোধ করা যাবেনা আদৌ। এমনকি আমাদের ১০০% শিক্ষিত জাতি হবার স্বপ্নও শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *