” বাস স্টপের মেয়েটি ”

”অ্যায় , তোর বাড়ি কোথায় রে ?” – প্রশ্নটা করতে কিছুটা চমকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো মেয়েটি । রেলিং এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল । বয়স তেরো চৌদ্দ হবে , রং শ্যামলা , চোখমুখ যে খুব উজ্জ্বল তা কিন্তু নয় । কেন জানি না, অবাক হয়ে পড়েছে আমার প্রশ্নে ।
– “বাড়ি? আমার ?”
ওর পাল্টা প্রশ্নে এবার হতবাক আমি । ‘বাড়ি কোথায়’ এর মত নিরীহ একটা প্রশ্ন যে একটা সাধারণ মেয়েকে এতটা চিন্তিত করবে ভাবতে পারিনি । বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষন , কৌতুহল মেটাতে তাই করেছিলাম প্রশ্নটি । ও কোথায় যাবে জানি না । তবে দ্বিতীয়বার আমি আর জিজ্ঞেস করিনি । আমার বাস তীক্ষ্ণ শব্দে এসে পড়েছিল সামনে ।


”অ্যায় , তোর বাড়ি কোথায় রে ?” – প্রশ্নটা করতে কিছুটা চমকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো মেয়েটি । রেলিং এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল । বয়স তেরো চৌদ্দ হবে , রং শ্যামলা , চোখমুখ যে খুব উজ্জ্বল তা কিন্তু নয় । কেন জানি না, অবাক হয়ে পড়েছে আমার প্রশ্নে ।
– “বাড়ি? আমার ?”
ওর পাল্টা প্রশ্নে এবার হতবাক আমি । ‘বাড়ি কোথায়’ এর মত নিরীহ একটা প্রশ্ন যে একটা সাধারণ মেয়েকে এতটা চিন্তিত করবে ভাবতে পারিনি । বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষন , কৌতুহল মেটাতে তাই করেছিলাম প্রশ্নটি । ও কোথায় যাবে জানি না । তবে দ্বিতীয়বার আমি আর জিজ্ঞেস করিনি । আমার বাস তীক্ষ্ণ শব্দে এসে পড়েছিল সামনে ।

রাত্রে খাবার টেবিলে টুকাই হঠাৎ বলল – ” মাম্মাম , আজ টিচার জিজ্ঞেস করেছিল , ‘What are our Three Primary needs ?’ আমি জানতাম না । তাই বলতেই পারি নি । তুমি জানো অ্যানসারটা ?”
– “লিখে রাখ , The Three Primary needs of us are Food , Cloth and Shelter

‘শেল্টার ‘ – বাড়ি,আশ্রয় , সুরক্ষিত স্থান , ঠিকানা – অভিধানে এতগুলো প্রতিশব্দ পেয়ে বেশ ধাক্কা খেলাম । কি সুন্দর মুখস্থের মত এই শব্দগুলো লেখা আছে ঐ ইংরাজী শব্দটার অর্থ হিসেবে । যেকোনো শিক্ষিত মানুষই এতে অভ্যস্থ , অবাক হওয়ার তো কিছু নেই । হঠাৎ মনে পড়ল ঐ বাসস্ট্যান্ডের মেয়েটাকে । কেমন চমকে উঠেছিল সে ‘বাড়ি’ শব্দটিতে । এরকম একটা নিরীহ শব্দও বিস্মিত করেছিল ওকে , ভাবিয়েছিল । আচ্ছা ও কি লেখাপড়া করেছে টুকাইএর মত ? মনে তো হয় নি । জামা কাপড় ময়লা ছিল , দৃষ্টি টাও ছিল কেমন উদাসীন – অন্তত আমার ‘নিশ্চিত গন্তব্যের’ চোখে তো বটেই । আর একটা জিনিসও আমার চোখ এড়াই নি, তা হল বাসে ওঠার আগে ওর সাথে চোখাচুখি হতেই মৃদু হেসেছিল মেয়েটা ।
তারপর যা হয় – ভিড় ঠেলা , ব্যাগ ও দেহ সামলানো , অন্যের ঘাম ও কর্কশ বাক্যবান-গালাগালি-কাশি ও খালাসির চিৎকার সব সামলে যখন নামলাম , মেয়েটিকে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম ।এখন হঠাৎ মনে পড়ল – ওরা অবাক চাহনী ও তার সাথে বড় বেমানান মৃদু হাসি । বাড়ির প্রশ্নে হাসি !- জানি না একে ঠিক কিভাবে ব্যাখা করব । প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার হাসি ? উত্তর নেই তাই হাসি ? অবজ্ঞার হাসি ? শ্লেষের হাসি ?

এসব নিয়ে ভাবতে বসে নিজেকে খুব বোকা বোকা ঠেকল । ভাবনা কিন্তু মন ও মস্তিষ্ক থেকে বিদায় নিল না । আচ্ছা, সব মানুষের অন্য দুটি প্রাথমিক চাহিদার মত বাড়ি বা আশ্রয়স্থল বা ঠিকানা থাকে ? ধরা যাক, একটা দু-তিন বা চার কামরার ফ্ল্যাট বা বাসা, যার মধ্যে তিন থেকে চার জন প্রানী বাস করে – এটাই কি তাদের বাড়ি ? অথবা কিছু মানুষ , যারা একত্রে ঘুরে বেড়ায় বেদুইন যাযাবরের মত, তাঁবুই যাদের শীত-গ্রিষ্মের আশ্রয় , তাদের কাছে বাড়ির চেহারা কি তাঁবু মাত্র ? আবার ধর , এক ভবঘুরে যার রাত কাটে ফুটপাথে , দিন কাটে রাস্তায় , বাসে , ট্রেনে, নগরের বাজারের পথে , তার বাড়ি কোনটা ? অথবা, মনে কর , বস্তির সেই শিশুকন্যা যার জন্মলগ্নে সব ছিল , কিন্তু হঠাৎ আগুন গ্রাস করল ছাদ, খাবার ,পোষাক বাসনপত্র ও মা কে । বেঁচে থাকা শিশুটি একদিন বুঝল অন্ধকার বাড়িতে একটা অন্ধকার নাম নিয়ে বেড়ে উঠেছে সে । প্রতি রাত্রে হাত বদলে , প্রতি মাসে ঠিকানা বদলে , সে এখন বড় বড় মানুষের সঙ্গে বড় বড় দেশে ভ্রমন করে – তার বাড়ি কি ওই দেশগুলি ? আচ্ছা, সে নাহয় ছেড়েই দিলাম , মনে করোতো , সেই শিক্ষিতা মেয়েটির কথা – জন্ম যার হসপিটালে , বড় হওয়াটা বেশকিছু অপরিচিত অনাত্মীয়র হাতে, মায়ের মুখে শুনেছে বটে ‘দেশের বাড়ি’ বলে কিছু একটা আছে তাদের, কিন্তু সেটার স্বাদ কি কোনোদিন জানতেও পারেনি ,দিন কাটিয়েছিল’বাবা’ নামক ব্যক্তির ফিরে আসার ।তারপর বড় হয়ে ছাদ বিশিষ্ট বাড়ির মত কিছু একটা পেল বটে কিন্তু ‘বাড়ি’ কি পেল ?বা যাদের হস্টেলে পড়াশুনা , চাকরি ভিনরাজ্যে , ট্র্যাঙ্ক আর জুতোর সঙ্গে ঠিকানাও বদলে যায় – তাদের কাছে বাড়ির সংগাটা ঠিক কেমন ?

রাত একটা দশ !!
বুঝলাম চিন্তারা জট পাকাচ্ছে । কিছুটা পরিস্কার , কিছুটা আবছা …কিন্তু কিছুতেই যেটা পরিস্কার হচ্ছে না, তা হল ঐ মেয়েটির রহস্যময় হাসি !
ও যদি প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চাইত তবে অমন করে পালটা প্রশ্ন করত কি? আর অবজ্ঞা করারও কোনো কারণ ছিল না । উত্তর না জানা থাকলে বলতে পারত ‘জানি না’ বা অন্য কিছু ।
আর সত্যি বলতে কি জানার আগ্রহ আমারই কি ছিল যথেষ্ঠ !
তাহলে কি সেটা ওর শ্লেষের হাসি ছিল ?
হয়ত ও বলত কিছু , কিন্তু আমার নিশ্চিত গন্তব্যের নিশ্চিত বাসটি এসে যাওয়ায় নিশ্চিত ভাবেই আমি এমন শশব্যস্ত হয়ে উঠে গেলাম যে, ও হয়ত বলতে সুযোগই পায় নি ওর বাড়ির কথা । এটা নিশ্চিত যে, কোনো তিন কামরার ফ্ল্যাট-বাসা ওর নেই , বেদুইনও নয় সে । তবে সে কি ওই হাত বদলানো কালো মেয়ে , নাকি সেই অবাঞ্ছিত অনাহুতের মত বেড়ে ওঠা কিশোরী সে যার কাছে ছাদটা ঠিক বাড়ি নয় , ‘বাড়ির মত কিছু’ একটা !
উত্তরটা যাই হোক না কেন , উদাসীনির ওই বিবর্ন রুক্ষ ঠোঁটের হাসিটি অনেক না-বলা কথার চাবিকাঠি ছিল । সে হয়ত বলতে চেয়েছিল :
“দিদিমনি , তোমারা শেখাও মানুষের তিনটে চাহিদার কথা । আরো একটা শিক্ষাও আছে । সেটা জানার , শেখার বা শোনার সময়ই নেই তোমাদের । একদিন এস সময় হাতে নিয়ে , সেদিন বলব আমার কথা ।”

জট পাকানো চিন্তাদের জট কতটা খুলল জানি না , তবে ভাবনা গুলো কালো কালো অক্ষরে নিজেদের জানান দেওয়ার পরে বুঝলাম আমার গলা তেষ্টায় শুকিয়ে কাঠ । জলের বোতল খুঁজতে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েটি বোতলে জল ভরতে ভুলে গেছে ।
‘আমাদের বাড়ির …” — এটাই কি তবে আমার সত্যিকার বাড়ি ?

হু হু করে তেষ্টা বাড়ছে । কিসের তৃষ্ণা ?

সে গল্প না হয় আর একদিন বলব ।

২৬ thoughts on “” বাস স্টপের মেয়েটি ”

    1. ভালো লেগেছে তোমার ??
      জানো এটা

      ভালো লেগেছে তোমার ??
      জানো এটা আমার প্রথম প্রকাশিত অনুগল্প । প্রথমে একটা ম্যাগাজিনে তারপর আমাদের স্কুলের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল । জানি না, পাঠক দের কেমন লেগেছে, কারণ কোনো ফিডব্যাক পাইনি ।
      কাল এখানে ভয়ে ভয়েই দিলাম ।
      ভালো লেগেছে জেনে কনফিডেন্স পেলাম । :গোলাপ: :গোলাপ: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :ফুল:

        1. লিখি তো । বেশ কিছুদিন তোমার
          লিখি তো । বেশ কিছুদিন তোমার কমেন্ট নেই । ইষ্টিশনে আসো নি ? বোধহয় তুমি পড়নি লেটেস্ট লেখাগুলো, না?

  1. গল্পটা ভালো হয়েছে আপু…
    গল্পটা ভালো হয়েছে আপু… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

  2. ‘আমাদের বাড়ির …” — এটাই কি

    ‘আমাদের বাড়ির …” — এটাই কি তবে আমার সত্যিকার বাড়ি ?

    :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    শব্দ চয়নের বৈচিত্র্যতায় মুগ্ধ না হয়ে পারছি না, হিংসা লাগছে!! দারুণ প্রশ্ন ছুঁড়েছেন শেষে!! :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন:

    1. হাহাহা… হিংসা ! এইটা দারুন
      হাহাহা… হিংসা ! এইটা দারুন কমেন্ট একটা । আসলে বাড়ি নিয়ে একটা কমপ্লিকেশন মেয়েদের থাকেই এই সমাজে । তাই গল্পে মেয়েদের চিরন্তন Identity Crisis এর কথা বলতে চেয়েছি আর কি । যেমন Virginia Woolf চেয়েছিলেন নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র কক্ষ । তো আমি ওই নিজের মত করে সাজানোর চেষ্টা করেছি মাত্র ।

    1. তোমার মত পাঠকের ভাল লেগেছে
      তোমার মত পাঠকের ভাল লেগেছে জানলে আরো লেখার প্রেরনা পাই , ভাই । কিন্তু গল্প তো খুব বেশি লেখা হয় না । আর টাইপ করতে করতে ঘাড়ে ভিষণ যন্ত্রনা হয় । দেখি প্লট পাই কিনা , তারপর…

        1. মানে যারা গল্প / কবিতা পড়তে
          মানে যারা গল্প / কবিতা পড়তে ভালোবাসে । নিয়মিত পড়ে ও লেখে । সাহিত্যের পাঠক … বুঝলে কিছু ? :কনফিউজড: :কনফিউজড: :-B :-B :খাইছে: :ফুল: :ফুল:

          1. গল্প কবিতা যা পড়ি এই
            গল্প কবিতা যা পড়ি এই ইস্টিশনের কল্যানে। বই পড়ে নি আজ পর্যন্ত দুইটা। হাহাহাহাহাহাহা হাহাহাহাহা

  3. চমৎকার লিখেছেন।প্রথমে আপনাকে
    চমৎকার লিখেছেন।প্রথমে আপনাকে একজন কবি ভেবেছিলাম কিন্তু এবার পুরো দস্তুর একজন সাহিত্যিক ভাবতে বাধ্য করলেন।ইস্টিশন সত্যিকার অর্থেই আরো একজন গুনি যাত্রী পেয়েছে…….

    ধন্যবাদ।শুভ হোক আপনার পথচলা…..

      1. সহমত ??? কইসা ?? হাহাহা …
        সহমত ??? কইসা ?? হাহাহা … পারো বটে তোমরা । অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা ভাইটি । :গোলাপ: :কনফিউজড: :কনফিউজড: :হাসি: :হাসি: :হাসি:

    1. প্রতি মন্তব্যে কি লিখব বুঝতে
      প্রতি মন্তব্যে কি লিখব বুঝতে পারছিনা । আমি এখানে নতুন এসেছি । এক ধাক্কায় সাহিত্যিক তাও আবার পুরো দস্তুর … একটু নয় বেশ বেশি হয়ে গেল যে !!! যা হোক, আমি নিয়মিত লিখি না । sudden impulse এ যা মনে আসে তাই লিখে ফেলি…এটা সাহিত্যিক এর কাজ কি ! যাই হোক, আপনার যে ভালো লেগেছে আমার লেখা তাতেই আমি খুব খুশি । অনেক ধনয়বাদ । শুভ কামনা । :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :ফুল: :ফুল:

  4. গল্পটা খুবই ভালো লাগলো আপু।
    গল্পটা খুবই ভালো লাগলো আপু। এত অল্প কথায় এত গাঢ় করে সবাই লিখতে পারে না। 🙂

    কয়েক বছর আগে আমিও এইরকম একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম। তবে ইষ্টিশনে পোষ্ট করিনি, আজ করবো। আপনার গল্পটা দেখেই ওটার কথা মনে পড়লো। পড়ে জানাবেন কেমন হয়েছে। কেমন? 😀

  5. আপু, আমার পুরনো অনুগল্প আলো
    আপু, আমার পুরনো অনুগল্প আলো আধাঁরিতে একটা পবিত্র মুখ পড়ার আমন্ত্রন জানিয়ে গেলাম। 🙂 [আমি এই কাজটি খুব খুব কম করি। মানে এই যে নিজের লেখা পড়তে কাউকে তাগাদা দেয়া। আপনাকে করলাম। 🙂 ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *