ক্লারা জেটকিন; আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অন্যতম পথিকৃত…….



বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,

বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর

আজ ৮মার্চ বিশ্ব নারী দিবস।এই নারী দিবস বা নারী আন্দোলনের কথা এলেই সবার আগে যার নাম আসে তিনি হলেন মার্কসবাদী জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন।যার হাত ধরেই ১৯১০ সালে কোপেনহোগেন এ অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় নারী সম্মেলনে ৮ মার্চ হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

সময়টা ১৮৫৭ সাল নারী আন্দোলনের শুরুর দিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলো সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। এই মিছিলে চলে সরকার বাহিনীর অমানবিক দমন-পীড়ন।এরপর থেকে শুরু হয় নারী শ্রমিকদের উত্তাল আন্দোলন।পৃথিবীতে আর কোন্ মানবিক আন্দোলনকে এমন দীর্ঘমেয়াদি ও চূড়ান্ত ফলাফলহীন অবস্থায় এভাবে অনিশ্চিৎ দূরগামী সক্রিয়তায় যুক্ত থাকতে হয় নি।এরপর ১৯১১ সালের ৮মার্চ প্রথম ”আন্তর্জাতিক নারী দিবস” পালনের মাধ্যমে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা অনেকটাই সফলভাবে পরিণতি পাই।

নারী অধিকার ও আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অন্যতম প্রধান পুরোধা ক্লারা জেটকিনের এর জন্ম হয়েছিল নারী আন্দোলনের একদম-ই শুরুর দিকে ১৮৫৭ সালের ৫ই জুলাই জার্মানির ওয়াইডোরায়ু’র সাক্সোনি প্রদেশে।ক্লারা জেটকিনের শৈশবে নাম ছিল ক্লারা আইজেনার।ক্লারা জেটকিনের বাবার নাম ছিল গর্টফ্রেড আইজেনার আর মাতার নাম ছিল জসপিন ভিটেইল।

শৈশব থেকেই মায়ের মত শিক্ষক হওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল ক্লারা জেটকিনের।ছোট থেকেই ঠিক সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন ক্লারা জেটকিন।কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন সমাজতন্ত্রের অন্যতম সফল নেত্রী।তিনিই জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।তিনি বিশ্বাস করতেন কেবলমাত্র সমাজতন্ত্রই নারী মুক্তি দিতে পারে।

ক্লারা জেটকিনের প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার সূচনা হয়েছিল মূলত তার মা জসপিন ভিটেইল এর হাত ধরেই।ছোট বেলা থেকেই ক্লারা জেটকিন তার মায়ের সাথে জার্মান মেয়েদের লীগ সভায় যাওয়া শুরু করেন।এখানেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন প্যারী কমিউন নামক এক নতুন সমাজ ব্যবস্থার সাথে।যে সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীতে এক অনন্য কীর্তির জন্ম দিয়েছিল। যারা সব সময়ে পৃথিবীর চাকাকে সচল রেখেছে তাদের শ্রমের মধ্যে দিয়ে।সেই শ্রমিকশ্রেণিরা একটা গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ তাদের দখলে নিয়ে এসেছিল প্যারী কমিউন এর মধ্যমে।ছোট বেলার সেই সব বীর শ্রমিকদের সাহসিকতা ও গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে সমূলে পাল্টে, নতুন এক সমতার সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যে সম্ভব সে ভাবনা পরবর্তীতে ক্লারা জেটকিনকে একজন সমাজ বির্বতনের নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য ও অনুপ্রাণিত করেছিল।

বায়রণ, ডিকেন্স, সেক্সপিয়র, শিলার, গ্যাটে, হোমার পড়া ক্লারা জেটকিন ছোট থেকেই ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী, যার প্রমাণ তার পরবর্তী জীবনের কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও চিন্তা ভাবনার দিক থেকে গভীর বিশ্লেষণী এবং প্রচন্ড সাহসী ক্লারা জেটকিন মাত্র একুশ বছর বয়সেই ‘জার্মান সোস্যাল ডেমক্রেটিক’ পার্টি’র সক্রিয় নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন।এ সময়েই ক্লারা জেটকিন রাশিয়ান বিপ্লবী অসিপ জেটকিন-এর সাথে পরিচিত হন।পরবর্তীতে ক্লারা আসিপ জেটকিন কে বিবাহ্ করেন।এবং নামের শেষে জেটকিন উপাধি যোগ করেন।

১৮৭৮ সালে সোস্যাল ডেমক্রেটিক পার্টি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।পার্টি’র নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের উপর শুরু হয় দমন-পীড়ন।অসিপ জেটকিনকে গ্রেফতার করা হলে ক্লারা প্যারিসে চলে আসেন।এখানেই তার সোস্যাল ডেমক্রেটিক পার্টির বর্ষীয়ান নেতা জুলিয়াস মটেল ও বার্নস্টাইনের সাথে প্রথম সরাসরি পরিচয় হয়।এতো প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ক্লারা জেটকিন সাহসীকতার সাথে সে সময় পার্টির পত্রিকা প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন।
শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির সংগ্রামকে কিভাবে আরো অগ্রসর করা যায়, সমাজে নারীদের ন্যায্য অধিকারকে কিভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং প্রকৃত অর্থেই সকল বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক সমতার সমাজ নিমার্ণ করা যায় এই ছিল ক্লারা জেটকিনের সব চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবনার ও সেই সকল ভাবনাগুলোকে প্রতিনিয়ত কাজের মধ্যে দিয়ে একটি বিকশিত রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিষ্ঠার সাথে কর্মমগ্ন থাকা।

সমাজতন্ত্রের প্রতি প্রবল আস্থাবান ক্লারা এ সময়টাতে ঘনিষ্টভাবে পরিচিত হন লুক্সেমবার্গ ও কার্ল মার্কসের মেয়ে লরা এবং তার স্বামী পল লাফাগ্রের সাথে।

মার্কসের মেয়ে ও রোজা লুক্সমবার্গের সাথে তার পরিচয় ও ঘনিষ্টতা তাকে আরো উজ্জিবিত করেছিল শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অনুধাবন করতে যে নারীর মুক্তির কথা না ভেবে সমতার ভাবনা এগুবে না। নারী মুক্তি সাম্যবাদের একটা পূর্ব শর্ত। শুধু মাত্র নারীর সমসাময়িক কিছু ন্যায্য অধিকার বা সমবেতনের মাপকাঠিতেই ক্লারার ‘ইকুয়েলিটি’ চিন্তা অগ্রসর হয়নি। আরো ব্যাপকভাবে এবং গভীরতা দিয়ে তিনি নারীর মুক্তির কথা ভেবেছেন শুধু শ্রেণিদৃষ্টির কোণ থেকেই নয় জেন্ডার সমতার ভিত্তিতেও এবং তাদের সেই সংগ্রামে সচেতন করে গড়ে তোলার জন্য এক দক্ষ সংগঠকরূপে নিজেকে কর্মেও হাজির করেছেন। এখানেই ক্লারা জেটকিন আরো অনন্য হয়ে উঠেছেন।
তত্ত্বের ভিতর নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তত্ত্বের সরাসরি প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে সাম্যের পৃথিবী গড়ায় ব্রতী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সারা পৃথিবীর অসংখ্য শ্রমজীবি নারীর স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ এবং তাদের চোখের নিবিড়ে স্বপ্ন দেখার অসীম শক্তিমত্তাকে আবিষ্কার করেছিলেন। নিমগ্ন এক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ক্লারা জেটকিনের দেওয়া ভাষণ এবং পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে তিনি যে সংযোজন এনেছিলেন তার ভাবনার সেটা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে আমাদেরও দেখতে হবে এটা বুঝবার জন্য যে, সমাজতান্ত্রিক সমতার সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে নারীর অধিকারের সম নিশ্চয়তা কতোটা অনিবার্য শর্ত। এ অনিবার্যতাকেই ক্লারা জেটকিন তার সংগ্রামী জীবনের ব্রত করে তুলেছিলেন। এটাই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নিবেদীত প্রাণ প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীলভাবে বিকশিত কমরেডের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
সেই কংগ্রেসে তিনি বলেছিলেন যে-

‘নারীদের বাড়ির চার দেয়ালে আটকে রাখার অর্থ হলো তাদের জীবনকে নিছক সন্তান ধারণ ও ঘরের কাজের দাসত্বে বেঁধে রাখা। তবে এ বক্তৃতায় তিনি আর একটি কথা বলেছিলেন, যেহেতু ধনতন্ত্র নারী পুরুষকে সমানভাবে শোষণ করে চলেছে তাই নারীর জন্য আলাদাভাবে কোন সুযোগ সুবিধা চাওয়া অপ্রয়োজনীয়’

পরবর্তীতে তার সে ভাবনা বদলিয়ে বলেছিলেন-

‘শ্রমজীবী নারীদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে দু’রকম শোষণ চলতে থাকে।ঘরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি ও কারখানায় অক্লান্ত পরিশ্রম। আবার পুরুষের তুলনায় কম মজুরি গ্রহণ করা।’

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন তারিখে মস্কোর নিকটবর্তী Arkhangelskoye তে তিনি মৃত্য বরণ করেন ক্লারা জেটকিন।মস্কোর ক্রেমলিনে তাঁর মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়।

১০ thoughts on “ক্লারা জেটকিন; আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অন্যতম পথিকৃত…….

  1. ভালো লাগলো এই মহীয়সী নারী
    ভালো লাগলো এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে এতো সুন্দর ভাবে সবকিছু জানতে পেরে… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :ফুল: :ফুল: :salute: :salute: :salute: :salute:

  2. খাজাবাবা দ্যা গ্রেট।অসাধারণ
    খাজাবাবা দ্যা গ্রেট।অসাধারণ একটা কাজ করেছ।আমার প্রিয় কবিতার লাইন দিয়ে শুরু। ক্লারা জেটকিনের এই অসামান্য তথ্যবহুল পোস্টটির সফল রুপায়নের জন্য খাজা বাবাকে :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:
    এবং মহীয়সী নারী ক্লারা জেটকিনকে
    :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:
    ইস্টিশন মাস্টারের প্রতি অনুরোধ রইলো বিশ্ব নারী দিবস এবং ক্লারা জেটকিন সম্পর্কে সবাইকে জানার সুযোগ করে দিতে পোস্টটিকে স্টিকি করা হোক।যদিও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট স্টিকি করা আছে তথাপি এই পোস্টটির গুরুত্ব অনুধাবন করার অনুরোধ করছি।

    1. ……অসংখ্য ধন্যবাদ কারাগার
      ……অসংখ্য ধন্যবাদ কারাগার ভাই।কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

  3. মহিয়সী নারী ক্লারা জেটকিন
    মহিয়সী নারী ক্লারা জেটকিন সম্পর্কে অজানা অনেক কিছুই জানলাম ।
    স্যালুট হিম ।

  4. চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট। এই
    চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট। এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না।
    ক্লারা জেটকিন-কে :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

    আর আপনাকে :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply to মুক্ত মন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *